বিকাল ০৫:৫৬ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৩ মে, ২০১৯  

টেকনিক্যাল কারণে বিশ্রাম দেওয়া হতে পারে মাশরাফিকে

প্রকাশিত:

মুসা ইব্রাহীম, অস্ট্রেলিয়া থেকে॥

বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড ম্যাচ শেষ হয়েছে গত ৯ মার্চ। তার ফলাফল– বাংলাদেশের কাছে ইংলিশদের ১৫ রানের পরাজয়ে তারা বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়েছে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত যা হয়, পরের ম্যাচগুলোতে ধারাভাষ্যকাররা ভালো খেলিয়ে দল এবং দলের সদস্যদের নিয়ে নানা বিশ্লেষণে খেলার বর্ণনা দিতে থাকেন। কিন্তু ইংল্যান্ডকে হারানোর পর বাংলাদেশের বেলায় তা দেখা গেল না। কেউ বাংলাদেশ দল, দলের সদস্য, দলের উত্থান ইত্যাদি নিয়ে কোনও কথা বলছেন না। আসলে ইংল্যান্ডের কপালে বাংলাদেশ এমনই কালি মেখে দিয়েছে, এমনই এক তোলপাড় তৈরি করেছে যে এই বিশ্বমোড়ল এবং তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা এ নিয়ে টু শব্দও করছে না। বাংলাদেশ নিয়ে আর কোনও মন্তব্য করবে না – এমনটাই যেন ধারাভাষ্যকারদের পণ।

এই ফাঁকে ক্রিকইনফোতে এখনি একবার ঢুঁ মেরে আসুন। দেখবেন–তাদের ‘এডিটর’স পিক’ বিভাগের শীর্ষ পাঁচটি খবরের তিনটিই কেন ইংল্যান্ড হারলো এবং বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলো, তা নিয়ে। রিকি পন্টিংয়ের মতো নামজাদা ক্রিকেটার লিখেছেন তো বটেই, ফরমায়েশি লেখকদেরও এ নিয়ে লিখতে লিখতে নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রথমে আফগানিস্তানকে হারালো। মোড়লরা একে ‘অঘটন’ বলে অভিহিত করলেন। যেন বাংলাদেশ হারলেই সেটা স্বাভাবিক হতো। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার সঙ্গে হারলো। এই মোড়ল ধারাভাষ্যকারদের গলা আরেক প্রস্থ চওড়া হলো। বাংলাদেশ দল কিভাবে বিশ্বকাপে এলো–এ নিয়ে খড়গহস্ত হয়ে কটূক্তি করতে ছাড়লো না কেউ। আবার বাংলাদেশ ৩১৮’র পাহাড়সম রান তাড়া করে স্কটল্যান্ডকে পরাজিত করলো–এতেও নাখোশ মোড়লরা।

এর ঠিক পরপরই যখন আবার শ্রীলঙ্কার কাছে ইংল্যান্ড হারলো–সেটা খেলার হারজিত হিসেবে চিত্রিত করা হলো। এ হলো গিয়ে নোংরা মোড়লিপনা। এর চরম চেহারা বাংলাদেশ দেখলো উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম পর্ব থেকেই ইংলিশদের বিদায় করে দেওয়ার পর। পুরো ক্রিকেট বিশ্ব এখন সরব কেন ইংলিশরা হারলো–এ নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশ কিভাবে একটা পরিপূর্ণ দল হয়ে উঠলো–এ নিয়ে কোথাও কোনও আলাপ নেই। এমনকি বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড ম্যাচ শেষের পর মোড়ল ধারাভাষ্যকাররা ডেকে আনলো ইংলিশ ক্রিকেট দলের কোচকে –দল কেন হারলো, তার বিশ্লেষণ জানতে। এমন নয় যে বাংলাদেশ দল জয়লাভ করার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই মাঠ ছেড়ে হোটেলে চলে গিয়েছিল। নিয়ম মেনে ম্যাচ শেষে জয়ী দলের অধিনায়ককে ডাকতে হয়, তাই তারা বাধ্য হয়ে হয়তো মাশরাফি বিন মুর্তজাকে ডেকেছিলেন। কিন্তু এর পরে আর তারা বাংলাদেশ নিয়ে কোনও কথা বলেননি। এই ঐতিহাসিক জয়ের পর বাংলাদেশ ক্রিকেট দল অবশ্য এখন এসব আর গায়েই মাখছে না।

দি সিডনি মর্নিং হেরাল্ড ডট কমে তাদের ক্রীড়ালেখক বাংলাদেশের কাছে ইংলিশদের পরাজয়ে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার পর এক কলামে লিখেছে, ইংল্যান্ড যদি আফগানিস্তানের সঙ্গেও হারে, তাহলে তাদের বিদায়টা হবে ‘চরম লজ্জার’। আসলে লজ্জাই তো। ইংলিশদের এমন লজ্জা আর কে কবে দিয়েছিল!

এই জয় বাংলাদেশকে নির্ভার হয়ে কালকের (শুক্রবার) ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামার ব্যাপারে আশাবাদী করে তুলেছে। কারণ বিশ্বকাপের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার আগে দলের একটা লক্ষ্য ছিল কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার। সেটা ইংল্যান্ডকে হারিয়ে পূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো খেলছে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। সুতরাং কোনো চাপে নেই বাংলাদেশ দল। বরং প্রতিপক্ষ এখন সমীহ করে কথা বলছে আইসিসি র‌্যাংকিংয়ে নয় নম্বরে থাকা দলটিকে নিয়ে। যদিও নিউজিল্যান্ড ইতিমধ্যেই এই বিশ্বকাপে তাদের সর্বশেষ পাঁচটি ম্যাচের সবগুলোই জিতেছে। অপরপক্ষে বাংলাদেশ তাদের সর্বশেষ পাঁচটি ম্যাচের প্রথমটিতে জয়ের পর, বৃষ্টির কারণে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পয়েন্ট ভাগাভাগি, শ্রীলংকার কাছে হার, এরপর ফের পরের দু’টিতে জয় পেয়েছে। তারপরও এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের যে পারফরম্যান্স, তাতে বাংলাদেশ পাত্তা পাবে না ধরে নিয়ে আইসিসি বাংলাদেশকে তার গ্রুপে চতুর্থ স্থানে রেখে বাংলাদেশের কোয়ার্টার ফাইনালের খেলা মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে সেট করে দিয়েছে–তাও আরেক ক্রিকেট পরাশক্তি ভারতের বিপক্ষে। কিন্তু বাংলাদেশ যে তার হোমগ্রাউন্ডে সর্বশেষ সাতবারের সাক্ষাতে নিউজিল্যান্ডকে ‘বাংলাওয়াশ’ করেছিল, সেটাকে কেউই ধর্তব্যে আনছেন না। কারণটা হলো নিউজিল্যান্ডের হোম গ্রাউন্ডে সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স।

তবে এটাকে পাত্তা দিতে রাজি নন দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজন। নিউজিল্যান্ডের হ্যামিল্টনে অবস্থানরত বাংলাদেশ ক্রিকেট দল বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে জানিয়ে তিনি টেলিফোন আলাপে বলেন, 'বাংলাদেশ দল জয়ের লক্ষ্যেই খেলতে নামবে।'

হ্যামিল্টনের সেডন পার্ক ক্রিকেট গ্রাউন্ডের আউটফিল্ড তুলনামূলকভাবে ছোট। ফলে এই মাঠে শ’তিনেক রান হওয়া কোনও ব্যাপারই নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ টসে জিতলে তিনশ’র ওপরে রান করে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার চেষ্টা থাকবে। তবে টসে হারলে বা পরে ব্যাট করলেও নিউজিল্যান্ডের মাটিতে স্কটল্যান্ডের ৩১৮ রান তাড়া করে জেতার ব্যাপারটা মাথায় থাকবে। সুতরাং জেতাটাকেই লক্ষ্য হিসাবে ধরে মাঠে নামবে বাংলাদেশ দল।'

মাশরাফি’র ইনজুরি সম্পর্কে খালেদ মাহমুদ বলেন, 'তার পায়ের হাঁটুতে বেশ ব্যথা আছে। সেক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচের জন্য ১২জনের নাম আইসিসি’র কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।' তাকে বিশ্রাম দেয়ারও একটা সম্ভাবনার কথা তিনি জানালেন তিনি। এখানে একটা টেকনিক্যাল কারণও আছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষের ম্যাচে স্লো ওভাররেট-এর কারণে আইসিসি ইতিমধ্যেই মাশরাফিকে জরিমানা করেছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে আবারও একই ঘটনা ঘটলে কোয়ার্টার ফাইনালে মাশরাফিকে ছাড়াই মাঠে নামতে হবে বাংলাদেশ দলকে। এটাও তাকে বিশ্রাম দেওয়ার আরেকটি কারণ হিসেবে ইঙ্গিত করলেন তিনি।

ম্যাচের আগে দলের কোচ চন্দ্রিকা হাতুড়াসিংহে আরাফাত সানিকে দলে রাখার ব্যাপারে মন্তব্য করলেও সুজন জানালেন, তার বল খুব বেশি ‘টার্ন’ হচ্ছে না। সেজন্য তার জায়গায় তাইজুলকেও খেলানো হতে পারে। তার মানে হলো, বাংলাদেশ দল কোয়ার্টার ফাইনালের আগে উইনিং কম্বিনেশন ভেঙে আরেকটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চাইছে।

দলের ফর্মেশন যাই হোক না কেন, স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স সমর্থকদের প্রত্যাশার পারদ ভালোই চড়িয়েছে। সেই তিন ‘ল্যান্ড’কে বধ করার প্রত্যাশার কথা জানালেন সমর্থকরা। সিডনি’র ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত শোয়েব হারুনের মতে, 'বাংলাদেশ দলের চলমান যে গতিময়তা, তাতে বাংলাদেশ জেতার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নিউজিল্যান্ডকে খাটো করে দেখার কোনও সুযোগ নেই।'

বাংলাদেশে এক সময়ে অনূর্ধ্ব ১৩ ও অনূর্ধ্ব ১৫ দলে খেলা সাকিব আল মাহমুদুল হকও বহু বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাস করছেন। তিনি এই ম্যাচ সম্পর্কে বললেন, 'বাংলাদেশ যেভাবে খেলছে, তাতে নিউজিল্যান্ডকে হারানো সম্ভব। দলের এই স্পিরিট যদি ধরে রাখা যায়, তা হবে কোয়ার্টার ফাইনালের জন্য বোনাস পয়েন্ট।' আর ক্রিকেটের এই জয়ের ধারাতেই বাংলাদেশ ও দেশের মানুষ অন্যান্য ক্ষেত্রেও সফল হবে বলে তিনি মনে করেন।

সিডনিতে একটি প্যাথলজিক্যাল ফার্মে চাকরিরত মাইনুল কবির তার কাজের ফাঁকে ফাঁকেই বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড খেলার প্রথম ইনিংসটুকু দেখবেন। আর বাকি অংশটুকু বাসায় ফিরে টেলিভিশনে দেখবেন জানিয়ে তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলকে যেভাবে হারিয়েছে, তাতে যে কোনও ফল হওয়া সম্ভব। কোটি কোটি সমর্থকের মতো তিনিও বাংলাদেশের জয় ছাড়া অন্য কিছু ভাবছেন না।'

/টিএন/

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।