সকাল ০৮:৩১ ; শুক্রবার ;  ১৫ নভেম্বর, ২০১৯  

ভিনদেশের গাঁও-গেরামে

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

ফেরদৌস জামান॥

মেঘ ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছা কার না হয়? আর সেটা যদি হয়ে থাকে সাড়ে তের হাজার ফুট উঁচুতে, তাহলে কেমন হতে পারে! যাই হোক, ইন্ডিয়ান ট্রানজিট ভিসা জটিলতার কারনে আপাতত সে ইচ্ছা এযাত্রাতেও অপূূর্ণ রয়ে গেল। সড়ক পথে ভূটান গমনেচ্ছু অনেকেরই অজানা কারনে ভিসা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। তাই বলে ইচ্ছা পুরণের তাড়না তো আর দমাবার নয়। অবশেষে ইন্ডিয়ান ভিসা নিয়ে তাদের দেশেই রওনা করি। হানা দেই গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের গোর্খা অধ্যুসিত কয়েকটি পার্বত্য গ্রামে।

লালমনিরহাট পাটগ্রাম বুড়িমারি সীমান্ত পেরিয়ে ইন্ডিয়ার কোচবিহার। এরপর শিলিগুড়ি হয়ে কয়েক দিনে বেশ কিছু জায়গা ঘুরে উপস্থিত হই পর্বত চুড়ার ছোট্ট শহর কালিম্পঙ। সেখানে সপ্তাহের শনিবার একটি বাজার বসে, ভোর থেকে শুরু হয়ে বেলা সাড়ে এগারটার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। দূর দূরান্ত থেকে পাহাড়ীরা নিজ হাতে তৈরি হস্তশিল্প, উৎপাদিত নানা ধরনের পাহাড়ী সবজি ও ফসল এবং জঙ্গল থেকে আহরণ করা ফলমূলসহ হরেক রকমের জিনিসপত্রের পশরা সাজিয়ে বসে। বাংলাদেশে বান্দরবানের রুমা, থানচী এবং খাগড়াছরির বোয়ালখালি ইত্যাদি পাহাড়ী বাজারে যেমনটি দেখা যায়। একটি নির্দিষ্ট এলাকার জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় সম্বান্ধে অবগতির জন্য বাজার হল অন্যতম উপাত্ত সংগ্রহের জায়গা। ভোরের আলো ফোটার আগেই উপস্থিত হলাম সেখানে। স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী সব খাবারের দোকান খুলে বসেছে ললিত ও নিতু দম্পতি। তাদের দোকানের পথম খরিদ্দার হয়ে বসে পড়ি খোলা আকাশের নিচে পাতানো আসনে। সদ্য ভেজে তোলা লুচির সাথে আলুর দম সহযোগে নাস্তা- একদম অতুলনীয়! অমাদের পরবর্তী গন্তব্যের কথা জানতে পেরে তারা একটি চমৎকার গাইডলাইন তৈরি করে দেন। বাস কাউন্টারে আগে থেকেই খোঁজ লাগানো ছিল, যে করেই হোক প্রথম সারির আসন চাই। পরিপাটি ছোট্ট একটি বাস। প্রায় ষাট বছর বয়োসি স্মার্ট চালক সময় মত গাড়ি ছেড়ে দিলেন। সমস্ত পথেই তার সাথে কথা হয়। হিন্দীতে তিনি যথেষ্ট পারদর্শী। নিজের বেলায় ততোটা না হওয়ায়, কোন কিছু বলবার আগে প্রায় কথাই মনে মনে সাজিয়ে নিতে হচ্ছিল। পাহাড়ী পথ, চালকের আসনে বসে লোক উঠা-নামানোর কাজ তিনি একাই সারেন।

স্বপ্নের মত গ্রাম- লাভা ও লোলেগাঁও, উভয়ের মাঝে ব্যবধান ২৬ কিলোমিটার। অসম্ভব সুন্দর পথ, এঁকেবেঁকে প্রবেশ করেছে পাইনের ছায়া ঢাকা, মেঘে ভাসা পরিবেশের মাঝে। মেঘ ছুটছে দ্রুত গতিতে। ঘন্টা চারেকের মধ্যে বাস গিয়ে উপস্থিত হয় লাভাগাঁও। দশ মিনিট বিরতির পর ছেড়ে দেয় লোলেগাঁও-এর দিকে। ইতিমধ্যে উচ্চতা সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার ফুট ছাড়িয়েছে।

লোলেগাঁও বনের মাঝে ঝুলন্ত সেতু

লোলেগাঁওয়ে জঙ্গলের মাঝে প্রায় ১০০ মিটার দীর্ঘ একটি কাঠের সেতু আছে। এপার থেকে ওপার যাওয়ার জন্য জনপ্রতি টিকিট মূল্য ২৫ রুপি। সমতল থেকে আগত এক কিশোরের কাছে কেমন লাগল জানতে চাইলে, অসন্তুষ্ট সুরে বলে, যান গিয়ে দেখে আসুন, পঁচিশ টাকায় একেবারে ফাঁটিয়ে দিয়েছে। ভালো লাগলো বিশাল আকারের বৌদ্ধ মূর্তিকে সামনে নিয়ে খোলা জায়গায় বসে চা-নাস্তা খেয়ে। অনবরত মেঘের পাল এসে ছুঁয়ে দিয়ে যায়। নির্দিষ্ট সময় পর পূনরায় একই বাসে ফিরে আসি লাভাগাঁও। গ্রামটি একটি পাহাড়ের পীঠে চড়ে বসে আছে। চারিদিকে কেবল ফাঁকা উপত্যকা। মেঘের স্রোতে ক্ষণে ক্ষণে ভাসিয়ে যায় উপত্যকার সবুজ বনানী, হারিয়ে যায় খোদ লাভাগাঁও। থাকার জায়গার ভাড়া বেশ চড়া, তাছাড়া গ্রামটি পর্যটকে ঠাসা। স্বস্তি বোধ না হওয়ায় মত বদলে ফেললাম। সর্টকাট ট্রেইলে ট্রেকিং করে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে চলে আসি রিপশ নামক অন্য একটি গ্রামে। জনমানব শূন্য উঁচু নিচু ট্রেইল, চলছি শুধু তিন জন অপরিচিত মানুষ। পীঠে ও বুকে ওজনদার দুইটি করে ব্যাগ, অথচ ক্লান্তির ছিটেফোটাও টের পেলাম না। শীত প্রধান এলাকায় ট্রেকিং করার এই এক সুবিধা।

মেঘের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে বৌদ্ধ মূর্তি

বাজেটের মধ্যে মিলে গেল কটেজের একটি কক্ষ। কাঠের তৈরি কটেজ, লম্বা বারান্দাটি সম্মুখের পাহাড়ের খাঁদ পর্যন্ত ছড়ানো। দৃষ্টি দীর্ঘ করে তাকালে মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দেয় কাঞ্চনজংঘার বরফ ঢাকা শ্বেত চূড়া। পাশের কক্ষে জায়গা করে নিয়েছেন কোলকাতা থেকে আসা সস্ত্রীক অমিত-দা। আলাপ পরিচয়ের পর্ব শেষে তার সাথে লম্বা আড্ডা। পাহাড় জঙ্গল ঘুরে বেড়ানো তার নেশা এবং পাখির ছবি তোলা শখ। দক্ষিন এশিয়ার প্রাকৃতিক ভারসাম্য যে হুমকির মধ্যে আছে, সে বিষয়ে তিনি ভিষণভাবে একমত এবং উদ্বিগ্ন।

পাইন বন

এখানকার সকাল সবচেয়ে সুন্দর। পর্বতের ও-পাশ থেকে সূর্য আস্তে করে উঠে এলো। সকালের নাস্তা খেয়ে ট্রেকিং- রিকিসুমের পথে। দুই ঘন্টা ট্রেকিং এর পর বনাঞ্চল শুরু। শতবর্ষী পাইন বনের মাঝ দিয়ে ট্রেইল। ভূটান অভিজানে ব্যর্থ হয়ে মনে হয়েছিল, মেঘে মেঘে ট্রেকিং বোধহয় এবার আর হল না! কিন্তু সে ভাবনা অমূলক প্রমানিত হতে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। গা-ছমছম করা নিরবতা, থেকে থেকে গিরগিটি আর পাখির ডাক। তিন ঘন্টায় পৌঁছি লোকালয়ে, লোকালয় মানে পথের ধারে পাহাড়ের খাঁদকে নিচে রেখে একটি মাত্র পরিবারের নিবাস। ফুলে ফুলে ঢাকা আশপাশ। ব্যাগ বোঁচকা সে বাড়িতে রেখে আবার ট্রেকিং শুরু রিকিসুম যাওয়ার জন্য। সেখানে রয়েছে অর্ধগোলাকৃতির একটি স্থাপনার ধ্বংশাবশেষ। একেবারে ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত। সাহেবরা নাকি শিকার করার জন্য জায়গাটি নির্মাণ করেছিলেন।

পর্বত চূড়া থেকে সিকিমের একাংশ

এর পরের গ্রাম তিস্তাগাঁও। খরস্রোতা তিস্তা নদী সুদূর তিব্বত থেকে বয়ে আসতে আসতে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। তারপর ব্রহ্মপুত্রে একাকার হয়ে পথিমধ্যে যমুনা ও মেঘনা হয়ে মিশে গেছে বঙ্গোপসাগরে। নদীর কোল ঘেঁষে পাহাড়ের ঢালু শরীরে গড়ে উঠেছে গ্রামখানি। একটি বাজারও আছে। আশ্রয় মিলল অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা জনি গোর্খার বাড়িতে। দুইতলা বাড়ি, দেশ বিদেশ থেকে আগত টুরিস্টদের থাকার বন্দোবস্ত আছে এখানে। খাটে শুয়ে তিস্তার কলকলিয়ে বয়ে যাওয়ার শব্দ শোনা যায়। আর দ্বিতীয় তলার বারান্দায় বসলে তো কথাই নেই, নদীর স্রোত একেবারে পায়ের নিচে।

তিস্তা পাড়ের তিস্তাগাঁও

এখানকার প্রধান আকর্ষণ 'ত্রিভেনী’। গ্রাম থেকে এক কিলোমিটার যেতে হয়। হাতের ডানে তিস্তা নদী এবং বাম পাশে পাহাড়ের খাড়া দেয়াল। পথটি মূলত পাহাড় কেটেই তৈরি করা হয়েছে। নদীর অপর পাড়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে অনেক উঁচু পথ। সাদা, লাল, হলুদ সহ নানান রঙের গাড়ি চলছে। অনেক ব্যস্ত সড়ক, বেশ কয়েকটি গাড়ি একসাথে পিপীলিকার সারির মত দেখায়। ত্রিভেনী হল, একটি পয়েন্ট যেখানে দার্জিলিং এর ও-দিক থেকে রাঙ্গিত নামক অন্য একটি নদী এসে ঢুকে পড়েছে তিস্তার পেটের মধ্যে। সৃষ্টি হয়েছে তিনটি মুখ, তাই নামকরন হয়েছে ত্রিভেনী।

তিস্তার উপর নির্মিত একাধিক বাঁধের মধ্যে নির্মাণাধীন একটি

ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে যায়। জনি এবং তার স্ত্রীর নিকট দুধের সর থেকে স্থানিয় পদ্ধতিতে মাখন প্রস্তুতের জ্ঞান এবং তাদের কথ্য ভাষার শিক্ষা নিতে নিতে একপর্যায়ে ঘুমোবার সময় হয়ে যায়। গত কয়েক দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে পরের দিন বিকেলের মধ্যে পৌঁছে যাই অতি পরিচিত ইট-পাথরের অরণ্য শিলিগুড়ি শহরে। তারপর এযাত্রায় ক্ষান্ত দিয়ে ফিরে আসি জন্মভূমি বাংলাদেশে। 

ছবি সৌজন্য : লেখক

/এএলএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।