বিকাল ০৫:২৮ ; সোমবার ;  ১৪ অক্টোবর, ২০১৯  

থমকে আছে মাতারবাড়ী-রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প

দ্রুত এগোচ্ছে পদ্মাসেতুর কাজ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

শফিকুল ইসলাম॥

সরকারের অগ্রাধিকার-প্রাপ্ত পদ্মাসেতু নির্মাণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে চললেও শম্বুকগতিতে চলছে মাতারবাড়ী ও রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের কাজ। সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী এ দুটি প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়া নিয়েও শঙ্কিত সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ২০১৪ সালে নেওয়া সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার-প্রাপ্ত সাত প্রকল্পের মধ্যে গতি নেই রূপপুর পারমাণবিক ও মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কাজে।

সূত্র জানায়, সরকারের অগ্রাধিকার পাওয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাস্তবায়ন কাজ সেভাবে এগোয়নি। নানা জটিলতায় প্রকল্পটি ফাইলবন্দি হয়ে পড়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পদক্ষেপ নেয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সার্বিক দিকনির্দেশনা প্রদান ও বাস্তবায়ন কার্যাবলি মনিটরিংয়ের জন্য ২০১০ সালের ৯ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন বিষয়ক একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অর্থায়নের উৎসগুলো চিহ্নিতকরণ, অর্থায়নে প্রয়োজনীয় শর্তা নির্ধারণ, সম্ভাব্য প্রযুক্তি ও সরবরাহকারী চিহ্নিতকরণের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কারিগরি কমিটি এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ভৌত, কারিগরি ও অন্যান্য বিষয়ে প্রতিবেদন প্রণয়নের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপসহ কয়েকটি কমিটি গঠন করা হয়।

সূত্রমতে, এই প্রকল্পের কাজ শুরু করতে অর্থ ছাড়ের তাগিদ দেওয়া হয়েছিল চলতি বছরের শুরুতেই। এ বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয় পরিকল্পনা কমিশনে। বলা হয়েছিল গত অর্থবছরের (২০১৩-১৪) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ করা অর্থ হতে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রথম ও চতুর্থ কিস্তির অর্থ অবমুক্ত করা জরুরি। এ জন্য কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সম্মতি চাওয়া হয়েছিল। চিঠি দেওয়ার পর বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পরিকল্পনা কমিশন। এ প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য কোনও অগ্রগতি এখনও হয়নি।

সরকারের অন্য প্রকল্প মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র । বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের উদ্যোগে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএস) কক্সবাজার জেলার মহেশখালীর মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা ইউনিয়নে ২০১৪ সালের জুলাইতে শুরু হয়ে ২০২৩ সালের জুন এই মেয়াদে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মূল্যমানের এ উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। কয়লাভিত্তিক এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ৪ হাজার ৯২৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। জাইকার অর্থায়ন ২৮ হাজার ৯৩৯ কোটি ৩ লাখ এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২ হাজার ১১৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। প্রকল্পের প্রধান উপাদান ২টি ইউনিটে ৬শ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি স্টিম টারবাইন, সার্কুলেটিং কুলিং ওয়াটার স্টেশন স্থাপন, ২৭৫ মিটার উচ্চতার ২টি স্টেক, আবাসিক এবং সামাজিক এলাকা গঠন, পানি শোধন ব্যবস্থা, সাব-স্টেশন, গভীর সমুদ্রে জেটি (বন্দর) কয়লা সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনা, অ্যাশ ডিসপোজাল এরিয়া এবং বাফার জোন নির্মাণ করা হবে।

প্রকল্পটির ব্যয় খাত সম্পর্কে জানা যায়, পাওয়ার প্ল্যান্ট (সিভিল), জেটি দুই কিলোমিটার লম্বা, ২৫০ মি. চওড়া এবং ১৮ মিটার গভীর চ্যানেল নির্মাণ বাবদ ৭ হাজার ৯১ কোটি টাকা ব্যয় হবে। পাওয়ার প্ল্যান্ট বয়লার বাবদ ৮ হাজার ৩৭ কোটি টাকা, পাওয়ার প্ল্যান্ট টারবাইন ও জেনারেটর বাবদ ৪ হাজার ৫শ ৭৯ কোটি টাকা, পাওয়ার প্ল্যান্টের কয়লা ও উৎপন্ন এ্যাশ ব্যবস্থাপনা বাবদ ২ হাজার ২শ ২৩ কোটি টাকা, ট্রায়েল রান বাবদ এক হাজার ৯শ ২৬ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এ ছাড়াও টাউনশিপ উন্নয়ন বাবদ ২শ ২৫ কোটি, পরামর্শক খাতে ৫শ ৭ কোটি টাকা, ইন্স্যুরেন্স, লোকাল ট্রান্সপোর্ট ও পোর্ট হ্যান্ডেলিং বাবদ ১ হাজার ৭ কোটি টাকা, জমি অধিগ্রহণ রিসেটলমেন্ট প্ল্যান ও ভূমি উন্নয়ন বাবদ ৪০৮ কোটি টাকা, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন বাবদ এক শ’ কোটি টাকা, সিডি-ভ্যাট বাবদ এক হাজার ৭শ ২৬ কোটি টাকা, ইরেকশন, কমিশনের উপর ভ্যাট ও আয়কর বাবদ এক হাজার ১৮২ কোটি টাকা, পল্লী বিদ্যুতায়ন বাবদ ৭১ কোটি টাকা ব্যয় হবে।

এই পাওয়ার প্ল্যান্টটি থার্মাল এফিসিয়েন্সির দিক থেকে পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চমানের। এর থার্মাল এফিসিয়েন্সি ৪১ দশমিক ৩ ভাগ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেটা ৩৫ ভাগ, ভারতে ২৯ ভাগ, ইউকে, জার্মানি এবং ফ্রান্সে ৩৮ ভাগ, এমনকি খোদ জাপানেও ৪০ ভাগ। জনগুরুত্বপূর্ণ ও দেশীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন দ্রুত করতে ফাস্টট্র্যাকে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এদিকে ট্রায়াল পাইল স্থাপনে অ্যাংকর পাইলের মধ্য দিয়ে ৮ মার্চ রবিবার থেকে পদ্মা সেতু মূল অংশের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। ভারী যান্ত্রপাতি ব্যবহার করে বিশাল ক্রেনের মাধ্যমে এই অ্যাংকর পাইল স্থাপন করা হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানি শুরুর ক্ষণটিকে রীতি অনুযায়ী দুটি কালো ষাঁড়, দুটি খাসি ও দুটি মোরগ পদ্মা নদীতে উৎসর্গ করেছে বলেও জানা গেছে। চীনের রীতি অনুয়ায়ী, কাজের সফলতা ও দুর্ঘটনা রোধে এই পশু উৎসর্গ করা হয়। রবিবার সকাল ৯টার দিকে এগুলো উৎসর্গ করার মধ্য দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে কাজ শুরু হয়।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দুই নম্বর পিলারের কাছে নদীতে এই অ্যাংকর পাইল স্থাপন শুরু হয়েছে। এরপরই ২০ মার্চ থেকে ট্রায়াল পাইল স্থাপন করা শুরু হবে। মূল পাইলের হ্যামারটি পরিদর্শন এবং এটি পরিচালনের কৌশল রপ্ত করতে ১৫ মার্চ একটি কারিগরি টিম জার্মানি যাবে। এই টিম সেখানে অন্তত দুই সপ্তাহ প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং হাতে কলমে খুঁটিনাটি সব বিষয়ে অবগত হবে। এরপরই এপ্রিলে এটি জার্মানি থেকে পাঠানো হবে মাওয়ায়। এছাড়া মাওয়ার কন্সট্রাকসন ইয়ার্ডের পাশের বিশাল ওয়ার্কসপে মূল পাইল তৈরির প্রস্তুতিও চলছে। কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করেছেন, চার বছরের জন্য ঘোষিত নির্ধারিত শিডিউল অনুযায়ী যথাসময়ে বা তারও আগে পদ্মা বহুমুখী সেতুর কাজ সম্পন্ন হবে।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রধান শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অর্থনৈতিক ব্যাপারে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ২৩ শতাংশ ও বাস্তবায়নের ব্যাপারে ১৫ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। তিনি বলেন, অবশ্যই অাগামী চার বছরের মধ্যেই পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে।

উল্লেখ্য, পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ করে বিশ্ব ব্যাংক আপত্তি দোলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন তিন বছর পিছিয়ে গেছে। সরকার নিজস্ব অর্থায়নেই এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিলেও দেরি হওয়ার কারণে এই সেতুর নির্মাণব্যয় ৪ হাজার কোটি টাকা থেকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকায়। তারপরও সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা আশা করছেন, ২০১৮ সাল নাগাদ বহুল প্রতিক্ষিত পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, বর্তমানে যেভাবে কাজ এগিয়ে চলছে এতে ২০১৮ সালের মধ্যেই এ সেতু দিয়ে যান চলাচল শুরু হবে।

সূত্র জানায়, মূল পদ্মা সেতুর জন্য নদীর বিভিন্ন স্থানে মাটি পরীক্ষার কাজও চলছে দ্রুতগতিতে। সেতুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুই পাড় মিলে একটি সেনানিবাস স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় পদ্মা সেতু এলাকায় ৯৯ ব্রিগেডের সেনানিবাস স্থাপন সংক্রান্ত তিনটি বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্তে এসেছে। ইতোমধ্যেই প্রকল্পের জাজিরা সংযোগ সড়কের কাজের অগ্রগতি গত অক্টোবর পর্যন্ত ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, অবকাঠামো নির্মাণ কাজের অগ্রগতি হয়েছে ১০ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং মাওয়া সংযোগ সড়কের কাজের অগ্রগতি হয়েছে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ। পদ্মা সেতু প্রকল্পের নদীশাসনের কাজের জন্য চীনা কোম্পানি সিনো হাইড্রোর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সরকার। চুক্তি অনুযায়ী ৮ হাজার ৭০৭ কোটি টাকায় সিনো হাইড্রো এ কাজ করবে।

/এসআই/ এমএনএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।