বিকাল ০৪:৫১ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৩ মে, ২০১৯  

কেন এই নারী দিবস

প্রকাশিত:

লীনা ফেরদৌস॥

আজ বিশ্ব নারী দিবস। সারা বিশ্ব যথাযথ মর্যাদায় বিশেষভাবে পালন করছে এই দিনটি। এই দিনে নারীদের জন্য থাকে বিশেষ বিশেষ সম্মাননা, থাকে বিশেষ স্বীকৃতি, কেনাকাটায় বিশেষ ছাড়, পত্রিকাগুলিতে নারীদের নিয়ে লেখা বিশেষ বিশেষ আর্টিকেল, টিভিতে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা ইত্যাদি। বলা যায় এই একটি দিনই নারীর জন্য সব কিছুতেই থাকে বিশেষ রকমের আয়োজন । এই বিশেষভাবে নারী দিবস পালনের ঘটা দেখে খুব অবাক লাগে! আমরা যারা নারী তারাও দেখি প্রবল উৎসাহ আর উদ্দীপনায় নারী দিবস পালন করি, খুব গর্বিত হই এই ভেবে যে আজ আমাদের নারীত্বের স্বীকৃতি দিবস। কিন্ত হে বিশ্বের নারী- আপনারা কি কখনও ভেবে দেখেছেন, বিশেষ ভাবে এই দিনটি পালন করার কি বিশেষ কোনও প্রয়োজন আছে!

প্রায় ১০০ বছর ধরে নারীদের অধিকার আদায়ের জন্য এই দিনটি বিশেষভাবে পালন করা হচ্ছে, কিন্ত কথা হল নারীর অধিকার কে দেবে- পুরুষ ! পুরুষ কেন একজন নারীকে তার অধিকার দেবে ! নারীতো পুরুষের মতই একজন মানুষ, তাহলে পুরুষদের কাছ থেকে কেন স্বীকৃতি বা অধিকার পেতে হবে তাকে ! কোনও পুরুষ কি কখনও তার অধিকার নারীদের কাছে চেয়েছে !

আসলে দোষটা আমাদের- মানে নারীদের । আমরা নিজেরা নিজেরদের মর্যাদা সম্পর্কে যথেষ্ট সজাগ নই। আমারা পুরুষের উপর নির্ভর হতে পছন্দ করি, পুরুষদের কাছ থেকে স্বীকৃতি পেতে চাই। আমরা আমাদের নিজেদেরকে দুর্বল ভাবি। কিন্ত একটু চিন্তা করে দেখেন -এই যে নির্ভরশীলতা সেটা কি আমাদের মর্যাদা বাড়াচ্ছে, নাকি আমরাই আমাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছি।

ভাবতেও খুব অবাক লাগে আমরা নারীরা এখনও আমাদের নিজেদের মর্যাদা সম্পর্কে সজাগ নই। আমরা এখনও কারও না কারও উপর নির্ভরশীল। শৈশব থেকে শুরু করে বিয়ের আগ পর্যন্ত বাবা বা ভাইয়ের উপর, বিয়ের পরে স্বামীর এবং শেষ বয়সে ছেলের উপর নির্ভরশীল। আমরা কখনওই ভাবি না আমরাও মানুষ, একজন পুরুষের মত আমাদেরও হাত পা , জ্ঞান, বুদ্ধি, সবই আছে, শুধু হয়ত শারীরিক ভাবে আমরা পুরুষের চেয়ে কিছুটা দুর্বল। আমরা কেন তাহলে আরেকজনের উপর নির্ভরশীল হব? কেন নিজের আত্মমর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হব না।

বিশ্বের নারী আন্দোলনের প্রায় ১০০ বছর কেটে যাচ্ছে, এখনো কি সেই আন্দোলনের সিকি ভাগ আদায় হয়েছে? যে সমাজে শুধুই মুখে মুখেই নারী-পুরুষের সমঅধিকারের কথা বল হয়, কিন্তু এই শত বছরের চেষ্টা সত্ত্বেও এখনো নারী-পুরুষ সমতা নিশ্চিত করা যায়নি, বন্ধ করা যায়নি নারী নির্যাতন। এখনো যখন পারিবারিক এবং সামাজিক ভাবে পদে পদে নারীকে যৌতুক, বাল্যবিবাহ, বন্ধ্যত্বের কারণে শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়, একটু প্রগতিশীল, আত্মনির্ভরশীল নারীরা হয় ধর্ষণের শিকার-সেখানে কে দেবে আমাদের সমঅধিকার আর কেনই বা তবে এই আন্দোলন! অধিকার চাওয়াই বা কেন ! আর কাদের কাছেই বা এই অধিকার চাওয়া! কিসের স্বীকৃতি চাই ! মাতৃত্বের স্বীকৃতি, জীবন সঙ্গিনীর স্বীকৃতি, কন্যা সন্তানের স্বীকৃতি ! সমাজে আমাদের যে অবদান সেটা সবাই জানে বা বোঝে, নারী ছাড়া কখনো একটা সুস্থ-সুন্দর-সুখের জীবন হতে পারেনা, যুগে যুগে নারী পুরুষের পরিপূরক, নারীর অবদান ছাড়া কখনই সংসার ,সমাজ বা পৃথিবী সামনের দিকে এগিয়ে যেত না । তাই আমি মনে করিনা আলাদা ভাবে আমাদের কোন স্বীকৃতির প্রয়োজন আছে ।

যে সমাজে এখনও নারীদের কোন ব্যক্তি স্বাধীনতা আছে বলে মনে করে না, নারী তাদের কাছে শুধুমাত্র গৃহকর্মী, সন্তান উৎপাদন যন্ত্র, চিত্ত-বিনোদনের খোরাক এবং ভোগ্যপণ্য সামগ্রী ছাড়া আর অন্য কিছু নয়, তাদের কাছে কেনই বা আমাদের এই স্বীকৃতি চাওয়া।

আসুন বন্ধুরা, এবার আমরা নিজেরাই না হয় একটু জাগি, অনেক বছর তো অবুঝ আর অবলা হয়েই কাটালাম । নারী আর পুরুষের বৈষম্য বাদ দিয়ে নিজেদের মানুষ হিসাবে নিজেরাই স্বীকৃতি দেই। আমরা নারী – বিধাতার অনবদ্য সৃষ্টি। আমাদের মাঝে পুরুষের জন্ম, আমাদের ঘিরেই পুরুষের জীবন। তবে আমরা কেন আমাদের স্বীকৃতি চাই পুরুষের কাছে। পুরুষতো কখনও তাদের কাজের জন্য আমাদের কাছে স্বীকৃতি চায় না বা তার অধিকার চায় না।

যদি কখনও পুরুষ তাদের কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ একটি বিশেষ দিবস পালন করে, তবেই না হয় আমরা তখন নারী দিবস পালন করব। আসুন আমরা সচেতন হই, নিজের স্বীকৃতি বা অধিকার নিজেকেই দিতে শিখি, কারও দেওয়া স্বীকৃতির আশায় পিছিয়ে না থেকে সামনের দিকে এগিয়ে যাই পুরুষের পাশাপাশি, আত্মনির্ভরশীল হই। যতদিন না আমরা আত্মনির্ভরশীল হব ততদিন নিজেদের সম্মান, অধিকার বা মানুষ হিসাবে স্বীকৃতি- কিছুই আমরা পাব না, তার পরিবর্তে শুধু ঘটা করে নারী দিবস পালন করে, ঘটা করে নিজেদের দুর্বলতা , আত্মমর্যাদা কে ক্ষুণ্ণ করা হবে।

লেখক: একটি বহুজাতিক পাওয়ার কোম্পানি'র জনসংযোগ ব্যবস্থাপক

/এফএএন/


 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।