সকাল ১১:৩৬ ; শনিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৮  

ফের উত্তপ্ত চাঁপাই: ৫ দিনে ১৯ ট্রাকে আগুন, নিহত ২

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

আনোয়ার হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ॥

বেশ কিছুদিন শান্ত থাকার পর হঠাৎ করে আবারও চাঁপাইনবাবগঞ্জে সহিংসতা বেড়েছে। নাশকতা রোধে যৌথবাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ার পর ৪৮ দিন প্রায় স্বাভাবিক ছিল জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। তবে হঠাৎ করে আবার সহিংসতা বেড়েছে সেখানে। গত পাঁচদিনের সহিসংতায় ১৯টি ট্রাকে আগুন দেওয়া হয়েছে। চালক ও হেলপার নিহত হয়েছেন এবং দগ্ধ হয়েছেন অন্তত চারজন।

হঠাৎ সহিসংতার নেপথ্যে রয়েছে জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীরা। হরতাল-অবরোধের ভেতরেও জামায়াত অধ্যুষিত পুরো চাঁপাইনবাবগঞ্জের দোকান-পাট, ট্রেন, বাস ও ট্রাক চলাচল স্বাভাবিক হয়ে এসেছিল। কিন্তু, নতুন কৌশলে জামায়াত-বিএনপি আবারও এসবে প্রকাশ্যে সহিসংতা শুরু করে।

৫ জানুয়ারি ‘সরকার হঠাও’ আন্দোলনের শুরুর দিন থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত জামায়াত-বিএনপি’র নেতাকর্মীরা শিবগঞ্জ-কানসাট-সোনামসজিদ পর্যন্ত মহাসড়কে বিদ্যুতের খুঁটি, গাছ কেটে ব্যারিকেড, সড়ক খুঁড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, একাধিক ট্রাকে পেট্রোলবোমা হামলা, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, হত্যা অব্যাহত রাখলে এলাকাটি একরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এমনকি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর সোনামসজিদে ৯দিন ধরে ভারতীয় পণ্য আমদানি-রফতানি বন্ধ এবং বন্দর থেকে পণ্যবাহী ট্রাক দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিবগঞ্জের দুটি স্থানে ক্যাম্প স্থাপনসহ যৌথবাহিনী অভিযান শুরু করে। চলতি মাসের ১ মার্চ পর্যন্ত জামায়াত-বিএনপি’র কর্মীরা গা ঢাকা দিলে বন্দর সচলসহ সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে। তবে এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় জামায়াত-বিএনপি’র তিনজন ও আওয়ামী লীগের তিনজন মারা যান। আহত হয় অনেকে।

জামায়াতের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা জানান, শিবগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে যৌথবাহিনী অভিযানের নামে জামায়াত নেতা, উপজেলা চেয়ারম্যানসহ একের পর এক নেতা কর্মীদের বাড়িঘর ভাঙচুর, তছনছ, লুটপাট ও বাড়িতে অবস্থানরত নারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। এতে তাদের দলীয় ত্যাগী নেতাকর্মীরা আবারও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

তিনি আরও জানান, তাদের দুর্ভেদ্য এলাকা শিবগঞ্জ-কানসাট-সোনামসজিদ মহাসড়কের ওপর দিয়ে যৌথবাহিনীর পাহারায় প্রতিদিন চার/পাঁচ’শ ট্রাক বন্দর ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তাদের আন্দোলনকে একেবারে ম্লান করে দেয়। দলীয় নেতাকর্মীরা এটা মেনে নিতে না পারায় আবারও তারা সক্রিয় হয়ে উঠে। এমনকি বিভিন্ন স্থানে দোকান-পাট খোলার কারণে মার্কেটের গেটে ককটেল রেখে এবং মার্কেটের সামনে ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

এছাড়া শিবগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে রকি হত্যার পর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধিসহ স্থানীয় সংসদ সদস্য গোলাম রাব্বানীর গণমিছিল দেখে জামায়াত-বিএনপি কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। এজন্য আতঙ্ক বাড়াতে তারা শিবগঞ্জ পৌরসভার ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা একরামুলের বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে।

বিএনপি’র নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা জানান, যৌথবাহিনীর তল্লাশির নামে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানসহ একাধিক নেতাকর্মীর বাড়ি ভাঙচুরে তাদের দলীয় নেতাকর্মীরা ফুঁসে ওঠে। তারপর খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের পাঁয়তারায় দলের নেতাকর্মীদের মাঝে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তারা আবারও মাঠে সহিংসরূপে বেরিয়ে আসে।

পুলিশ সুপার বশির আহম্মদ জানান, যৌথবাহিনীর পাহারা ছাড়া যখন-তখন ট্রাক চলাচল করায় বিচ্ছিন্নভাবে দুষ্কৃতকারীরা ট্রাকে পেট্রোলবোমা হামলা করায় হতাহতের ঘটনা ঘটছে। রাতে ট্রাক-বাস না চালানোর পুলিশি নিষেধ উপেক্ষা করে চালকরা ট্রাক চালানোয় সহিসংতা এড়াতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

মটর শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা আইয়ুব আলী জানান, পেটের দায়ে এবং সোনামসজিদ থেকে ঢাকার ভাড়া ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ায় অনেক চালক পুলিশি পাহারা ছাড়াই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাক চালাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক নেতা জানান, জামায়াত-বিএনপি’র একাধিক মামলার নেতাকর্মীরা প্রকাশ্য মিছিল করলেও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। স্থানীয় সাংসদদের এলাকায় না থাকা এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রতিরোধ কমিটি মাঠে সক্রিয় না থাকায় জামায়াত-বিএনপি’র কর্মীরা সহিংসতার ঘটনা ঘটাচ্ছে।

শিবগঞ্জ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ১২টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান জামায়াত-বিএনপি সমর্থিত হওয়ায় নাশকতা রোধে তারা তেমন কার্যকরী ভূমিকা রাখছে না বরং নেপথ্যে নাশকতা কাজে ইন্ধন দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি যৌথবাহিনীর অভিযানে তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের বাড়িঘর তছনছ করার বিষয়টি দ্রুত মিডিয়া কর্মীসহ অন্যদের কাছে বিভ্রান্ত ছড়াচ্ছে।

জেলা ট্রাক মালিক গ্রুপের সভাপতি আমিনুল ইসলাম সেন্টু জানান, পুলিশ পাহারা ছাড়া রাতে ট্রাক না চালানোর বিষয়টি মালিকদের একাধিকবার জানানোর পরও চুপিসারে ট্রাক চালানোর ঘটনায় পেট্রোলবোমায় চালকসহ মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে, স্থানীয় প্রশাসন ট্রাক চলাচলে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও গত মঙ্গলবার রাতে কয়লাবাড়ী ট্রাক টার্মিনালে অবস্থানরত ৯টি ট্রাক পোড়ানোর ঘটনায় খোদ রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি ও এফবিসিসিআই’র পরিচালক আব্দুল ওয়াহেদ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক সাধারণ মানুষ ও তাদের বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতি ও হয়রানির শিকার না হয় সেজন্য এবং হরতাল-অবরোধে যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা তদন্ত করে দোষীদের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

এদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বোর্ডের সভাপতি মো. মনিরুল ইসলাম জানান, কানসাটে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি অফিসে জামায়াত-বিএনপি’র এ ধ্বংসযজ্ঞ হামলায় দায়েরকৃত তিনটি মামলার বেশির ভাগ আসামিরা পুলিশের ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকায় তারা সহিংস ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। ফলে যৌথবাহিনীর অভিযানে পুরো শিবগঞ্জসহ জেলার মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসার ঠিক আগ মুহুর্তে সাময়িক কৌশলে থাকা জামায়াত-বিএনপি তাদের শক্তি জানান দিতে আবারও সহিসংতা চালায়।

গত সোমবার রাতে শিবগঞ্জ ও কানসাটে তিনটি ট্রাকে আগুন, মঙ্গলবার ভোরে কানসাটে কাভার্ড ভ্যানে পেট্রোলবোমা হামলায় এক চালক নিহত এবং হেলপার ৮০ ভাগ দগ্ধ হয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। একইদিন সকালে জেলা শহরের শান্তির মোড় ও হরিপুরে তিনটি ট্রাকে আগুন এবং ওই দিন রাতে সোনামসজিদ কয়লাবাড়ী ট্রাক টার্মিনালে অবস্থানরত ৯টি ট্রাকে ও বৃহস্পতিবার রাতে গোমস্তাপুরের মহিপুরে আরও একটি পিক-আপে পেট্রোলবোমা মেরে পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা।

এছাড়া নিরাপদ রুট হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-গোমস্তাপুরের নিমতলি কাঁঠাল এলাকায় একটি পণ্য বোঝাই ট্রাকে দুর্বৃত্তরা পেট্রোলবোমা হামলা চালালে শিবগঞ্জ উপজেলার জালমাছমারি এলাকার আলাউদ্দিনের ছেলে হেলপার সেলিম (৩৫) দগ্ধ হয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। একই ঘটনায় দগ্ধ চালক সাহেব আলী (৩৬) ও আলুর মালিক ফিরোজ (৩৫) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

/বিএল/টিএন/


 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।