সকাল ০৮:৪৫ ; মঙ্গলবার ;  ২৩ জুলাই, ২০১৯  

বগা লেকে স্নান ও গান

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

শেখ রাজীব॥

আমারা যেখানে যাচ্ছি সেখান থেকে নাকি আজকে কিছু লোককে অপহরণ করা হয়েছে। যাত্রার শুরুতেই এই শিহরণ জাগানো সংবাদ সবার মধ্যে ভয়ের বদলে ভ্রমণের মসলা হিসেবে কাজ করলো। ফকিরাপুল থেকে ঈগল এর ডানায় ভর করে সকাল ৮টায় আমরা বান্দরবান কোনও এক পাহাড়ের কোলে থামলাম। জঙ্গলবাড়ির সবাই স্বীকার করে নিলো এটা ঈগল এর বাস হলেও চ্যালা মাছের মতো এসেছে। যাত্রা শেষে আমরা সবসময় চালককে ধন্যবাদ দেই এবারও তার ব্যাতিক্রম হয়নি।

ভ্রমণসঙ্গী: আনিস স্যার, হোসেন সোহেল, মাহিত, অনিক, জিয়া, রাসেল, সালমান এবং আমি শেখ রাজীব। বান্দরবনের একটি খাবার হোটেল থেকে সবার পাকস্থলী হালকা রিচার্জ করে কিছু প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে একটি চান্দের গাড়িতে আমরা রুমার উদ্দেশে রওনা হলাম। তখন বৃষ্টি না থাকলেও বৃষ্টির স্পর্শ সবুজের মাঝে রেখে গিয়েছে। সামনের আসনে আমি আর আনিস স্যার চালকের সঙ্গে ঝগড়া করতে করতে রুমা বাজার এর কয়েক কিলোমিটার আগে পা রাখলাম। এখান থেকে ইঞ্জিন চালিত পালকিতে রুমা বাজার পর্যন্ত যেতে হবে। আমরা ছোটো একটি ইঙ্গিন চালিত পালকিতে করে দুপাশে সবুজ দেয়াল দেখতে দেখতে হালকা সোনালী রঙের বর্ষার ঘোলা জলে ভেসে রুমায় পা রাখলাম। এখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো জন ওরফে মিশুক। আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি এই পাহাড়ি বালকের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় লিখে আমাদের আট জনের কেউ দিতে পারবে না। জনের কর্মকাণ্ড এক মাত্র সরাসরি সম্প্রচার করে বোঝানো সম্ভব।

রুমা থেকে পাকস্থলী সম্পূর্ণ রিচার্জ করে বগালেক এর উদ্দেশে পা বাড়ালাম। কয়েক কিলোমিটার হাটার পর চান্দেরগাড়িতে উঠলাম, সামনের আসনে আবার আমি আর আনিস স্যার। পথে স্যার আমাকে বিভিন্ন গাছ চেনানোর চেষ্টা করছেন আর আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বোঝার বৃথা চেষ্টা করছি। কারণ চান্দের গাড়ির চালক এক মিনিট পর পর আমাকে তার গিয়ার ধরতে বলছেন। মামার সম্পূর্ণ ভাষা না বুঝলেও এটা বুঝতে পারছি তিনি বলছেন-খুব শক্ত করে করে ধইরেন (আমি যদি ভুল করি সবাই কয়েকশো ফুট নিচে)। কিছু রাস্তা আছে ৪৫ ডিগ্রি বা তারও বেশি বাঁকা যদি ভুল না করে থাকি। মাঝে মাঝে পিছন থেকে সোহেল ভাই, মাহিত, জিয়া সবাই গাড়ি ঠেলছে দুপাশে কয়েকশো ফুট পরে সমান মাটি। আমি সর্বশক্তি দিয়ে গিয়ার ধরে আছি।

রাস্তা হচ্ছে লাল ইটের সলিং করা, অধিকাংশ জায়গায় মনে হয় রাস্তার দাঁত পড়ে গেছে। এর মাঝে আমি শুনতে পেলাম সোহেল ভাই বলছে, রাজীব সামনে বসে লস করলো পিছনে বেশি থ্রিল। এই কথা শুনে আমি গাড়ি থামিয়ে সবার সাথে চলে গেলাম। ওহ, সে কি থ্রিল ভাগ্যিস চান্দের গাড়ি থেকে চাঁদ দেখার জন্য ফাঁকা করা। কিছু দূর যাওয়ার পর গাড়ি আর যাবে না, এবার হাঁটা।

চালককে ধন্যবাদ জানিয়ে বগালেক এর উদ্দেশে হাটা শুরু করলাম আমরা। ততক্ষণে আমাদের সবকিছুর উৎস যা ছাড়া আমরা পুতুল মাত্র, সেই সূর্য নামক নক্ষত্র ঝিমুনি দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে তোমাদের বাংলাদেশের পাহাড়ে আমি এখন ঘুমবো। সূর্যের ঝিমুনির প্রভাবে পাহাড়ি এলাকার আকাশে এক মাতাল করা পরিবেশ সৃষ্টি হলো।

পাহাড়ি এলাকার গ্রামগুলোকে পাড়া বলে। এইরকম একটি পাড়া থেকে আমরা চা পান করলাম। তখন পুরো ঘুটঘুটে অন্ধকার। আজকে আকাশে চাঁদ উঠবে রাত ৩টার পর অর্থাৎ মাসের শেষ দুই একদিনের চাঁদ। পাড়ার কয়েকজন স্পষ্টভাবে বলে দিল কোনও আলো পাবেন না এবং আপনাদের মধ্যে যদি কেউ ধূমপায়ী হয়ে থাকেন অনুগ্রহ কেউ বগালেক এ ওঠার সময় ধূমপান করবেন না। যাই হোক আমরা যার যার টর্চ জ্বালিয়ে সবাই ওঠা শুরু করলাম। যদিও যেখানে টর্চের অালো ফেলি শুধু ওইটুকুই দেখা যায়। দশ মিনিট পর আট জনের দল দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। বিশ মিনিট পর ৩ ভাগ হয়। পাহাড়ে ওঠার সময় বিশ্রাম নিতেই হবে কিন্তু ঘন ঘন নেওয়াটা ঠিক না। এই বিশ্রাম নিতে গিয়েই দলটি ভেঙ্গে যায়। বগালেকে ওঠার সময় অপরিচিত আর এক দলের সঙ্গে দেখা হয় কিন্তু কথা হয় না। আসলে কথা বলার মতো পরিস্থিতি ছিল না। সত্যি কথা বলতে বগালেকে রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে উঠতে বিশ মিনিট লেগেছিল নাকি দুই ঘণ্টা লেগেছিল আমাদের কারো মনে নেই। কারণ আমাদের উদ্দেশ্য ছিল যান্ত্রিকজীবন থেকে হারিয়ে যাওয়ার। আমরা ঘড়ির কাটা থেকে অনেক দূরে ছিলাম। বগালেকে পা রেখে আমাদের দলের ছবি তুললাম।

বগালেকে কাঠের কিছু দোতলা বাড়ি আছে যার ভাড়া নগণ্য কিন্তু সুখ অসীম। মানুষগুলোর ভালোবাসা শহরের ফেসবুকের মত কৃত্রিম নয়। আপনি হয়তো শহরের ফাইভ স্টার হোটেল এ বসে হাজার টাকা বিল করেন, নিয়ন আলোর মাঝে যা সকালে আপনাকে সুখ দেয় না। কিন্তু অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে আপনি রাত ৩টার সময় বগালেক এ ডুবসাঁতার দিয়ে আসতে পারবেন।

মানুষের জীবনে যা ঘটে তার সব কিছু মনে থাকেনা, এতক্ষণ যা লিখলাম তা হচ্ছে ভুলে যাওয়ার পরের অংশ এবং প্রথম দিনের ঘটনাগুলো। এরপর রাত তিনটায় কিছু দামাল ছেলের বগা লেকে স্নান, কাঠের দোতলায় গিটার নিয়ে গান। আকাশে তখন এক ফোঁটা মেঘ নেই একটি একটি করে তারা গোনা যায়। আমার ভ্রমণসঙ্গীরা সবাই জানে পরবর্তী নয় দিনের ভুলে যাওয়ার পরের অংশগুলো আরও বেশি সুন্দর খুব বেশি প্রাকৃতিক। কারণ আমরা অকৃত্রিম ছিলাম।

ছবি: শেখ রাজীব

/এফএএন/


 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।