সকাল ১০:৩৭ ; রবিবার ;  ২১ এপ্রিল, ২০১৯  

'খান সাহেবের' কাজকারবার তরুণদের নিয়ে

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট॥

অনিক খান, একজন তরুণ। বয়সের কোঠা কোথায় স্পর্শ করেছে সেটি ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। তিনি আগাগোড়া তরুণ। তরুণ হিসেবেই থাকতে চান। পাঠক নিশ্চয় চিন্তায় পড়ে গেছেন এ আবার কোন অনিক খান? এক কথায় তার পরিচয় দেওয়া সম্ভব না। বহুমুখী এই তরুণের পরিচয় দিতে গেলে কয়েকটি বিশেষণ লাগে। তিনি জনপ্রিয় ছড়াকার, টিভি ও রেডিও উপস্থাপক এবং উন্মাদের নির্বাহী সম্পাদক। চুপি চুপি বলে রাখা ভালো, তিনি সুপার সেলফি ম্যানও। যেকোনও স্থানে সেলফি তোলায় তার জুড়ি নেই। আজকে বাংলা ট্রিবিউনের আড্ডা তার সঙ্গেই।

তার কাছে প্রথম প্রশ্ন ছিল 'অনিক খান' কী খান?

অনিক খান: এই প্রশ্নটি আমি আমার গত আঠারো বছরের কর্ম জীবনে আমার পাঠক, দর্শক, স্রোতা ও সাক্ষাৎকার নিতে আসা সাংবাদিক সহকর্মীদের মুখে এতবার শুনেছি যে, একসময় লাজুক হেসে প্রশ্নটি এড়িয়ে দিতাম। আজকাল উদাস কন্ঠে বলি- “আমি কি খাই জানি না, তবে শুনেছি একসময় ‘জেঙ্গিস খান’ কারও কথা পছন্দ না হলে জল্লাদ দিয়ে তার গর্দান ‘খেয়ে’ দিতেন। ইদানিং মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে হয়- আগামী জন্মে যদি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসার সৌভাগ্য হয়, তবে ‘ছড়াকার জেঙ্গিস খান’ হয়ে ফিরে আসবো।"

ছড়াকার হতে চাইলেন কেন?

অনিক খান: ক্লাসে অনেক রকম ছেলে মেয়ে থাকে না? কিন্তু হঠাৎই একজনকে ভালো গেলে যায় অন্যদের চেয়ে বেশি। আমার আসল স্কুলের বাইরে কৈশর জীবন নামের যাবতীয় আউট বই পড়া স্কুলটাতে আমার ক্লাসের ছড়াকেই ভালো গেলে গিয়েছিল আরকি। যাকে প্রথম পঠনেই প্রেম বলা যেতে পারে!

কবিতা না লিখে ছড়া কেন?

অনিক খান: আমি কথা বলতে ভালোবাসি, তবে সেটা মুখে উচ্চারণ না করে লিখে। লেখার চেষ্টা করতে যেয়ে, কবিতার ধরণ, গঠন, ও তৎকালীন শব্দচয়ন চাইতে ছড়ার সহজ, সারাসরি, সোজাসাপ্টা, সাবলিল, ও নিজের বক্তব্যের মাঝে হিউমার ইনজেক্ট করার সুযোগ আমাকে ছড়ার প্রতি আরও আকৃষ্ট করে। যে ছড়াটা পড়ে কেউ আমাকে বলে যে সে এর কিছুই বোঝেনি, সেটা আমার কাছে কিছুটা হলেও একটা ব্যর্থ ছড়া। তবে ভুল বুঝবেন না। আমি কিন্তু এখনও পাঠক হিসেবে বিশাল কবিতাপ্রেমী!

আপনার উপস্থাপনায় জনপ্রিয় টিভি শো ইয়ং নাইট এর অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের তারুণ্যকে মূল্যায়ন করুন।

অনিক খান: আমার ওই সময়ের অভিজ্ঞতার মাঝে বাংলাদেশের তারুণ্য নিয়ে কত যে অভিজ্ঞতা আছে, তার কিয়দাংশও এখানে লেখার মতো কায়িক শ্রম দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। বলেও সব শেষ করা যাবে না। দূর-দূরান্তের গ্রাম, মফস্বল শহরের তরুণ থেকে শুরু করে নগরের দরিদ্রতম ও চূড়ান্ত সুবিধাপ্রাপ্ত ধনবান তরুণদের নিয়ে গবেষণা ও সাক্ষাৎ করে, তাদের বুঝতে চেষ্টা করে… আসলে এই ক্ষুদ্র পরিসরে এ নিয়ে আর লেখা সম্ভব নয়। শুধু এটুকু বলি- টানেলের শেষে আলো কিন্তু সত্যিই রয়েছে, তবে সমস্যা হলো টানেলটা একটু বেশিই লম্বা, তাই আমরা বেশীরভাগ মানুষই খালি চোখে টানেলটির শেষটুক দেখতে পারছি না বলে ক্রমাগত-হতাশ হতে হতে এখন চক্রবৃদ্ধিহারে-হতাশ হয়ে পড়ছি।

আপনি একাধারে ছড়াকার, টিভি রেডিও উপস্থাপক, উন্মাদের নির্বাহী সম্পাদক। নিজের কোন পরিচয় নিয়ে গর্ববোধ করেন?

অনিক খান: আমি আমার প্রতিটি পরিচয় নিয়েই গর্ববোধ করি। আমি আমার বাবা মার সন্তান, বোন -দুটোর ভাই, ভাগ্নাভাগ্নিদের মামা। আমি একজন মানুষ, মুসলমান, বাঙালি, বাংলাদেশি, লেখক। আমি একজন বাংলাদেশি-বাঙালি-মুসলমান-লেখক-মানুষ। আমার নিজের সব পরিচয়ই আমার গর্বের। তবে ক্যারিয়ারের কথা বললে- ‘অনিক খান, ছড়াকার ও নির্বাহী সম্পাদক, উন্মাদই আমার প্রিয়তম পরিচয়। এছাড়াও এটিএন নিউজের ইয়াং নাইট ও রেডিও ফুর্তির কিছু অনুষ্ঠান করে মানুষের এতো ভালোবাসা পেয়েছি যে সেগুলোকেও প্রিয় পরিচয় না বললে রীতিমত গুনাহ হবে, প্রতিষ্ঠান দুটোর কাছ থেকে নেওয়া আমার এতদিনের কামাই হারাম হবে! অনিক খান হারাম কামাই খায় না।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি? ছড়া নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে এবং বাংলাদেশের তরুণ নিয়ে...

অনিক খান: আমার এই এক জীবনে দেয়া প্রতিটি সাক্ষাতকারের প্রশ্নপত্রে এই প্রশ্নটি তৃতীয় সর্বাধিক ‘জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন’! অথচ এর জবাব আমি প্রায় দশক আগেই দেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকের ক্রোড়পত্রে লিখেই দিছিলাম- “আমার আছে, মিশন? নো!/ ভবিষ্যতের ভিশন/ নো!/ তাইতো আমি দারুন খুশি/ তোমরা সবাই বিষন্ন!”

আর সঙ্গে শুধু এটুকু বলে রাখি, আজ অবদি যা করেছি বা করছি সবই তরুণদের নিয়ে, তারুণ্যকেন্দ্রিক, তারুণ্যভিত্তিক। ভবিষ্যতেও সেভাবেই চালিয়ে যাব, ইনশাল্লাহ।

'কাব্য কাঠিন্য' নিয়ে কিছু বলেন?

অনিক খান: বিগত ১৮ বছরে দুহাত ভরে ছড়া লিখছিলাম, এই গত বছর তিনেক আগে পর্যন্ত। এখানে, ওখানে, মিডিয়ার সবখানে! কিন্তু ইদানিং কেমন যেন ঠিক ছড়া ‘বের হচ্ছে না’ তাই গত দুবছর কোন বইও করিনি। এই কারনেই ২০১৫ সালে প্রকাশিত আমার এই নতুন ছড়ার বইয়ের নাম ‘কাব্যকাঠিন্য’! এই বইটির ছড়াগুলো কোন পত্রিকা বা অর্ল্টানেটিভ মিডিয়ার জন্য লেখা নয়, শুধু আমার নিজের জন্যেই বিভিন্ন সময়ে লেখা। কিন্তু পাঠক কেন তার নিজের টাকা খরচ করে আমার এসব ব্যাক্তিগত ছড়া পড়বে? তাই বইটি থেকে আমি কোন রয়েলিটি নিচ্ছি না। বইটির মলাটও আমার বানানো এবং লেখকের ছবিটিও সেলফি – ওসবের জন্যেও কোনও পেমেন্ট আমি নিচ্ছি না আর এভাবেই বইটির মূল্য ধরা হয়েছে কম এবং বইটি ছাপা হয়েছে স্বস্তা কাগজ ও পাতলা মলাটে। তবে মেলায় মাত্র সোয়া দুইদিন বইটি থাকার পরও পাঠক-ক্রেতার আগ্রহ ও প্রকাশকের মুখের হাসি দেখে আমার মন খারাপ হয়েছে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বেঁচে থাকলে লেখা থামাবো না। এই সুযোগে গোপনে বলে রাখি বেশ কিছু বছর যাবৎ একটি উপন্যাসে হাত দিয়েছি- নাম ‘অশোক: গৃহমুখী বৈরাগ্যের গল্প’। এই বছরের মাঝামাঝি তা প্রকাশ করার ইচ্ছা আছে ইনশাল্লাহ।

রেডিওতে শো করতে কেমন লাগে? টিভি ও রেডিওর মধ্যে কোন শো সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে?

অনিক খান: দুটোর দুরকম মজা। দুটো করতেই আগে অনেক ভালো লাগতো, এখন আর লাগে না। আই অ্যাম স্যরি।

উন্মাদে কাজ করতে গিয়ে মজার অভিজ্ঞতা।

অনিক খান: ধরুন চিত্রনায়িকা পূর্ণিমা ম্যাডামের কাছে যদি আপনি জানতে চান যে- “আচ্ছা ছবির শুটিংয়ের সময় আপনাকে কখনও কি বৃষ্টিভেজা দৃশ্যে নাচের মুদ্রায় ‘কাট’ করে আবার নতুন করে করতে হয়েছে?” সেই প্রশ্ন শুনে পূর্ণিমা ম্যাডামের যেমন মনের অবস্থা হবে- হিউমার/স্যাটায়ার/কার্টুন পত্রিকা উন্মাদের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে এই ‘মজার ঘটনার’ প্রশ্ন শুনে আমি চিত্রনায়িকা পূর্নিমার হতাশা ধরতে পারছি!

তবে একটা ঘটনা বলি- এই বছর খানেক আগে আমাদের সম্পাদকীয় কার্যালয়ে ঢুকেই আমি সম্পাদক আহসান হাবীবকে বলেছিলাম- “বস্ চলেন উন্মাদ বন্ধ করে দিয়ে অন্য কোন ব্যবসা শুরু করি! জাতিকে রসিকতার খোড়াক যোগানোর দিক থেকে আমরা পিছিয়ে পড়েছি, আমাদের এতোদিনের হিউমার প্রোভাইড করার দায়িত্ব ইজ নাও ইন থ্রেট! মাত্রই রাস্তায় দেখে আসলাম সাবেক (স্বৈরতান্ত্রিক) রাষ্ট্রপতি জনাব হুসেইন মোঃ এরশাদ সাহেব ‘গণতন্ত্রের ডাক’ দিয়ে পোস্টার লাগিয়ে এলাকা ছেপে ফেলেছেন!” বস্ও গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন- “তাহলে চলো একটা ছাপাখানা দেই, তুমি ধরো পোস্টারের জন্য নতুন নতুন ছড়া স্লোগানের আইডিয়া দিয়ে নতুন পোস্টার ছাপানোর অর্ডার আনতে পারবা না?”

উন্মাদ, রেডিও, তবুও, ইয়ং নাইট, অনেকগুলো জাতীয় দৈনিক কোনটাতে কাজ করতে বেশি স্বস্তি বোধ করেছেন?

অনিক খান: এক সময় 'তবুও' ছিল বলতে গেলে আমার নিজের প্রতিষ্ঠান। তবুও এবং উন্মাদে কাজ করে যে স্বস্তি, আনন্দ ও তৃপ্তি পেয়েছি, তার তুলনা নেই! সত্যি করে বলি- এই মাল্টিমিডিয়ার যুগেও ইচ্ছা করে ‘প্রেস মিডিয়া’তে জীবন দিয়ে কাজ করতে।

বয়স ৪০ পার হলে কোথায় দেখতে চান নিজেকে?

অনিক খান: যাবতীয় গায়ে মাখা সাবান বা স্নো-পাউডার-লোশনগুলোর সুন্দরী প্রতিযোগীতার সম্মানিত বিচারক মণ্ডলির প্যানেলে। শুনেছি এই দেশের সিনিয়রদের ক্যারিয়ার বিষয়ক মাপকাঠিতে এটাই নাকি সাফল্যের একটি উচ্চতা বিশেষ! আমার জন্য দোয়া করবেন!

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ কি পথে না বিপথে?

অনিক খান: ইতিহাস সাক্ষী দেয়- বাংলাদেশের তরুণরা পথ-বেপথের তোয়াক্কা করে না। তারা জঞ্জাল সরিয়ে নিজেদের পথ নিজেরাই তৈরি করে নেয়।

তরুণরা কি করতে পারে? তাদের জন্য কোনও পরামর্শ?

অনিক খান: বাংলাদেশের সিংহভাগ তরুণ ‘ইন্টেলেকচুয়ালি অন্ধ’ না- তারা এখন একটা জিনিসই করতে পারেন, আর তা হচ্ছে দেশ-বিদেশের সকল মহারথীদের সকল পরামর্শ মন দিয়ে শুনে, তাদের বই পড়ে, তবে ওসবের ধার না ধেরে, সব বুঝে, মাথায় ঢুকিয়ে নিজের দেশের জন্য নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে চলা। এবং এই চলতি পথে, যখন তিনি সেই জায়গায় পৌঁছাবেন যেখানে তার সামনে এমন কোন স্বার্থ থাকবে না যা দেশের স্বার্থের চেয়ে বড়, তখন তার ডাক শুনে কেউ আসুক আর না আসুক, সে এগিয়ে যাবেই! হয়তো মিছিলের একজন হয়ে কিংবা একাই একজনের একটি মিছিল হয়ে।

প্রিয় পাঠক যদি আপনি অনিক খানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চান তবে জেনে নিন- অনিক খান: ছড়াকার, নির্বাহী সম্পাদক-উন্মাদ ম্যাগাজিন ও টিভি/রেডিও উপস্থাপক। ই-ডাক: i@anikkhan.com। আপনার সঙ্গে অচিরেই কাজ শুরু করতে পারেন অনিক খান, কারণ আপনি একজন তরুণ। ও ভালো কথা, খান সাহেবের বইগুলোর জন্য প্রকাশনীগুলোতে ঘোরাঘুরি না করে রকমারিতে অর্ডার করে দিন নিচের লিংকে- 

http://rokomari.com/author/6296;jsessionid=BA4D0DBC17FB38D9AA890C4E000840A9

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন।

/এফএএন/ 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।