রাত ০৮:২৫ ; বুধবার ;  ২৫ এপ্রিল, ২০১৮  

এগানা চেঙ্গেজির কবিতা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[এগানা চেঙ্গেজি (১৮৮৩-১৯৫৬)। প্রকৃত নাম মির্জা ইয়াস ওয়াজেদ হোসেইন। জন্ম আজিমাবাদে(বিহারের রাজধানী পাটনায়)। উর্দু ভাষার একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। প্রচণ্ড হতাশাবাদী এবং প্রথাবিরোধী; এমনকি তা ধর্মের বিপক্ষে গেলেও। ঈশ্বর, দুনিয়া ও অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব নিয়ে রগড়াশ্রয়ী সরস-কথনে বেশ পারঙ্গম। নিজেকে সম্বোধন করে এক জায়গায় লেখেন : ‘স্বদেশ ছেড়ে যেখানেই বেঁধেছি বাড়িঘর/ তা যেন কারবালার এক রক্তাক্ত প্রান্তর।’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতার বই : নিস্তর-ই-ইয়াস, আয়াত-ই-উইজদানি, তারানা, গানজিনা, কুল্লিয়াত-ই-ইয়াস ইত্যাদি। মৃত্যু উত্তরপ্রদেশের লাখনৌতে। তার এই কবিতাগুলো মূল উর্দু থেকে বাংলায় তর্জমা করেছেন, কুতুব হিলালী।] 

 

নেশা

আপন অবস্থায় আর থাকা হল না 
খোদার দোহাই লাগে 
খুদির নেশা* পেয়েছে আজ বড়
আপন আমাকে আর রাখা হল না।

মুখের কথা ছিল অশ্রুত
ইশারায় মোচড় ওঠে
কিসে কি হয়ে গেল 
আর বোঝা গেল না।

হৃদয়ক্ষরা পাপ বলো
কিংবা তীব্র মনোবেদনা
হাসতে হাসতে
হাসিটাও উধাও হয়ে গেল।

ব্যথাতুর সংগীত অনেক শুনেছ
বুঝেছ কি হে
বুঝতে পারার আগেই
শ্রবণ তোমার তিরোহিত হয়ে গেল।

প্রতিমা দেখে সবাই 
একদা ঈশ্বরকে বুঝেছিল
তারপর ঈশ্বরের ঘর হল
ঈশ্বরের পূজারিরা নিঝুম হয়ে গেল।  

 

নৃত্য 

পাগল করা উদ্দাম আনন্দনৃত্য
খেয়ালির ডুব চাই বন্ধন অতিক্রম।

আড়চোখা দৃষ্টির প্রতি করুণা শুধু
জটিলতার বেড়াজাল থেকে 
মুক্তি কবে! 
 
ডুবন্ত সাগরে ডুবে মরি
এই জীবনের পর 
জীবন বলে আর কিছু আছে কি?

প্রাণ আনচান করে
মরূদ্যান ফিরে ফিরে আসে
প্রতিধ্বনি-অঞ্চলে কার কাছে আকুতি কিসে?

প্রশ্নোত্তর নিয়ে ছোটো কিসের পিছে 
কিসের সংঘ? কিসের অন্তরঙ্গবোধ?
একাকার সব- এখানে সবকিছু মিছে?

 

কাফের 

তুমি ছাড়া সব্বাই কাফের
-আজ্ঞে কি বলতে চাও হে।
মানুষের শিরশোভা নত করে দাও
কি এক উদ্ভট খেলা পেতেছো দুনিয়ায়?

সৃষ্টি নাকি রুহের ফুঁৎকার
দ্বিধা সংশয় অঙ্গীকার
স্মরণ সিজদা প্রণামের বিকার
এত সব অপযজ্ঞের কি দরকার বলো?

জীবন ফুরিয়ে যায়
এ জীবন স্রেফ
মর্মরিত রজনীর
এক ক্ষীণ শীৎকার। 

 

ডগমগ  

অন্তর্গত চাহিদার কি এমন রেখেছে শিষ্টবোধ?
সাধের ডানা দাবিয়ে রাখে কোন সে হুঁশিয়ার? 

ছল শুধু ছল; ভবিষ্যৎ বহুদূর
হালের দিনগুলি বৃথাই গুনি
ভুলের খেসারত বড় সহ্যহীন  
মৃত্যুর চাইতেও ভারী সীমাহীন 
ভয়ার্ত বন্দির মতো অসহায় অস্থির।  

কণ্টকিত জমির মাঝে পাহাড় হেরে যায় 
সমুদ্রের সংকুলান সেখানে কি করে হবে?
উঁচু যত নিচু পতনের শঙ্কা তীব্র হয় তত
খান্দানি কদমখানির কি এমন বিভূষণ!

নিজের প্রশংসায় এবার নিজেরই খানিক ডগমগ হওয়া!
পতনে আমার হাসির দৌড় আর কত বাড়াবে তারা?
ঈশ্বর জানেন- আমি কে? কি আমি?

এগানা হে! 
নিজেকে নিয়ে তুমি
সংশয় আর কত বইবে? 

 

বদনাম   

জীবন, বসন্তই বুঝলা না
চিরস্থায়ী বসন্তের বাসনা পোষো
আহাম্মক! দুনিয়া সে তো ক্ষণপার্শ্ব পল 
প্রাণের আরামালয় কখনো নয়।

বিনম্র দৃষ্টির মাঝে অজস্র লক্ষ্য থাকে
আসে না মুখে যা চোখে তাই ভাসে
এ জগৎ পাপদগ্ধ কিন্তু প্রেমময় 
প্রায়শ্চিত্তহীন স্বর্গ শাশ্বত নয়।

মহাকাল অতিক্রান্ত 
আদিমতা ছাড়ে না
দৃষ্টিহীন বদনাম 
সর্বনাশা ঘোচে না।   

বাড়ন্ত ব্যবধান দীর্ঘ হতে থাকে 
মাটিমুক্ত নই যখন; কেনো তবে 
নাগালহীন আকাশের হিসেব কষা?  
কেনো এত স্বপ্নাচার কল্পলতা?

অবরুদ্ধ দৃষ্টির বাস্তবতা জেনো বিষম 
দূর হতে ভাসে স্বর- হও স্বয়ম্ভর
এ জীবন কেনো হবে প্রীতিহীন নিষ্ফল?  

 

স্বাদ    

তিক্ততার স্বাদ এখনও পেল না জীবন 
সবুর সম্পন্ন হল; অপেক্ষার পরীক্ষা 
আজও শেষ হল না  
আমার বসন্ত হেমন্ত যার হাতে 
মর্জিনামা তার আজও জানা হল না।

কাঙ্ক্ষিত মুক্তির আশায় 
কারারাত্রির পরিক্রমা থেমে থেমে চলে 
দূরের ইশারা- সেও অনেক বড় পাওয়া।

প্রাণের কারাভান পাপের পঙ্কজে ছোটে
পুণ্যের পদাতিক আজও হওয়া হল না;
আশা ও শঙ্কার চক্রে ঘুরে ঘুরে মরি
দেবালয় কাবাঘর- সে কোথায়?  
আপন ঘরখানি আজও পাওয়া হল না।

পূজার বাসনা নেই- কেমন পূজারি তুমি
দুর্ভাগা! অপ্রাপ্তির স্বাদটুকু পেলে না আজও।

এগানা বলে যায় : চেষ্টা বৃথাই 
ঈশ্বরের স্মরণ পরে
আগে চাই ঐশ্বরিক প্রাণ।  

 

উপশম

দুর্বোধ্যতার উপশম কী হতে পারে?
ঈশ্বরকে প্রতিদ্বন্দ্বী দেখি স্বয়ং ঈশ্বরের;
স্বভাবের রাগমালা শোনোনি তুমি?
হৃদয়-স্পন্দন বোঝো না তুমি?
দিগদর্শন নয়-
এখন সময় দিলদর্শনের। 
স্তম্ভিত বিস্ময়ের কোনো প্রয়োজন নেই।
নিজেকে নিজের 
প্রতিরূপে দাঁড় করিয়ে নাও
যা হচ্ছে হয়েছে বা হবে
সব হতেই থাকবে।
দুর্বোধ্যতার উপশম শুধু সংহার।

 


খুদির নেশা* অহম অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।