বিকাল ০৫:৪১ ; শনিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৮  

তরমুজে ভাগ্য বদল তাহিরপুরের চাষীদের

প্রকাশিত:

হিমাদ্রি শেখর ভদ্র, সুনামগঞ্জ॥

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে তরমুজের বাম্পার ফলন বদলে দিয়েছে এ অঞ্চলের তিন শতাধিক চাষীর জীবন। উচ্চ ফলনশীল জাতের এসব তরমুজ শীতের মধ্যেই বাজারে আসায় স্থানীয় পর্যায়ে এর ভীষণ চাহিদা। ফলে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ও এর আশেপাশের নেত্রকোনাসহ কয়েকটি জেলাতে সড়ক ও নৌপথে সরবরাহ করতে করতেই শেষ হয়ে যায় আগাম জাতের এসব তরমুজ। তাই হরতাল-অবরোধেও এই তরমুজের বাজারে পড়েনি কোনও প্রভাব। চাষীরাও পেয়েছে কাঙ্ক্ষিত দাম। এ এলাকার তরমুজ চাষীদের মুখে এখন হাসি, পরিকল্পনায় আগামী বছর আরও বড় পরিসরে তরমুজ চাষের স্বপ্ন।

উপজেলা কৃষি-সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রতিবছর এ এলাকায় সম্প্রসারিত হচ্ছে তরমুজের চাষ। উপজেলার বাদাঘাট ও উত্তরবড়দল ইউনিয়নের বিন্নাকুলি, লামাশ্রম, রাজারগাঁও, ছড়ারপাড়, জাঙ্গালহাটি, সোনাপুর, পুটিয়া, কাঁশতাল, কড়ইগড়া, পৈলনপুর, মোদেরগাঁওসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের ছোট ছোট হাওরে তরমুজের চাষ করা হয়েছে।

উপজেলা কৃষি-সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতিবছর ২০০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো। তবে আগাম বন্যা ও সময়মতো জমি থেকে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় ১৪০ হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ হয়। বাকি জমিতে তরমুজের বদলে অন্যান্য সবজি চাষাবাদ করা হয়। ধানের থেকে তরমুজ চাষ বেশি লাভজনক হওয়ায় চাষীরা তরমুজ চাষের দিকে বেশি ঝুঁকছেন।

বাদাঘাট ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শামছুল আলম জানান, এক বিঘা জমিতে তরমুজ চাষে খরচ হয় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। আর মৌসুম শেষে ওই জমি থেকে তরমুজ বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার। অন্যান্য খরচ বাদে কৃষকের লাভ হয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মতো।

তিনি বলেন, প্রতিবিঘা জমিতে ৩০০টি ছোট ছোট গর্ত করে তিনটি করে তরমুজের বীজ রোপণ করা হয়। আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে প্রতি বিঘা জমিতে ৭০০/৮০০ তরমুজ উৎপাদন করা যায়। যার ন্যূনতম বাজার দাম ৫০ হাজার টাকা।

কৃষি কর্মকর্তা শামছুলের তথ্র মতে, তাহিরপুরের তরমুজ চাষীদের দেখে পাশের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার শরীফগঞ্জ, সিলডুয়ার ও মাছিমপুর গ্রামের কৃষকরাও তরমুজ চাষে আগ্রহী হয়েছেন।

পৈলনপুর গ্রামের তরমুজ চাষী আবুল কালাম বলেন, এই এলাকায় ধানচাষের চেয়েও তরমুজ চাষ বেশি লাভজনক। তাই এলাকার চাষীরা তরমুজ চাষে উদ্যোগী হয়েছে।

জানুয়ারি থেকে গ্লোরি, জাম্বু, ওরিয়ন, ডোরাকাটা (বাংলালিংক) ও ড্রাগন জাতীয় বিদেশি তরমুজ বাজারজাত শুরু করেছেন ত‌‌‌ারা।

তরমুজ চাষী মারফত আলী, মিলন, ফারুকসহ অন্যান্য চাষীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছর তাহিরপুর কৃষি অফিসের প্রযুক্তিগত সহায়তায় তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। তাহিরপুরের উৎপাদিত তরমুজ খেতে সুস্বাদু ও মিষ্টি তাই চাহিদা বেশি।

কৃষকরা জানান, তরমুজ রোপণ ও ফলনের সময় টিএসপি, এমওপি সুপার জিপসাম সার এবং ফলনের পর জিংক মনো, ছত্রাকনাশক, মাকড়নাশক ও কীটনাশক ব্যবহার করেছেন তারা।

এলাকার কৃষকরা জানান, বর্ষায় পাহাড়ী ঢলে জমিতে মাত্রাতিরিক্ত পলি-বালি পরে তাদের জমি ধান চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সে থেকে ঐ এলাকার কৃষকরা পলি-বালি পরা জমিতে তরমুজ চাষাবাদ করছেন এবং বর্তমানে অধিক ফলনও পাচ্ছেন তারা।

লামাশ্রম গ্রামের তরমুজ চাষী আব্দুর রশিদ বলেন, কয়েক বছর আগেও তারা শুধুমাত্র নিজেদের খাওয়ার জন্য অল্প জমিতে তরমুজ চাষ করতেন। কিন্তু লাভজনক হওয়ায় এখন বাণিজ্যিকভাবে তরমুজ চাষ করছেন।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার রাজারগাঁও গ্রামের তরমুজ চাষী আরজ আলী জানান, বর্ষায় পাহাড়ী ঢলে জমিতে অতিরিক্ত পলি-বালি পড়ে জমি ধান চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এজন্য কৃষকরা এসব জমিতে তরমুজ চাষ করেন এবং বর্তমানে ফলনও ভালো।

রাজারগাঁও গ্রামের তরমুজ চাষী আরজ আলী বলেন, এমনিতে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে উৎপাদিত তরমুজ বাজারজাত করতে তাদের সমস্যায় পড়তে হয়। এ বছর যোগ হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব। তাদের উৎপাদিত তরমুজ জেলার চাহিদা মিটিয়ে অন্যান্য জেলায় বিক্রি হয়। কিন্তু অবরোধ ও হরতালের কারণে এ বছর চাহিদা সত্ত্বেও রাজধানীসহ অন্য জেলাগুলো থেকে পাইকাররা আসতে পারছে না, ট্রাক ভরে তরমুজও পাঠানো যাচ্ছে না। ফলে স্থানীয় বাজারই এখন তরমুজ বিক্রির জন্য একমাত্র ভরসা।

রাজারগাঁও গ্রামের আরেক তরমুজ চাষী মোতলিব বলেন, তরমুজ মৌসুমের শুরুতে ভালো বীজের অভাব দেখা দেয়। সরকার থেকে উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ করা হলে ফলন আরও ভালো হতো।

তাহিরপুর উপজেলা কৃষি- সম্প্রসারন কর্মকর্তা কৃষিবিদ হাসান ইমাম বলেন, সাধারণত বেলে মাটিতে তরমুজ চাষাবাদ করা হয়। অতিরিক্ত ঠাণ্ডার কারণে তরমুজের ফলন কমে যায় তবে এ বছর তেমন শীত পড়েনি তাই ফলনে এর প্রভাব পড়েনি। তিনি আরও জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতা করা হয়।

/বিএল/টিএন/


 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।