রাত ০১:২০ ; শুক্রবার ;  ২১ জুন, ২০১৯  

তরুণদের হারতে দেবে না 'ঠিকানা'

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

তারুণ্য রিপোর্ট॥

ঠিকানা শব্দের আলাদা করে কোনও অর্থ জানার প্রয়োজন হয়তো নেই। আমরা সবাই জানি এই শব্দের মানে। দিন শেষে মানুষ নিজস্ব ঠিকানায় পৌঁছে যায়। কিন্তু যারা ঠিকানা মতো পৌঁছাতে পারে না তাদের জন্য আশ্রয়দাতা হয়ে ওঠাটা আপাতদৃষ্টে অনেক কঠিন। এমন কঠিন একটি দায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছেন ডা. আতিকুল হক মজুমদার। পথচ্যুতদের মানুষগুলোকে একটু পথ দেখাতেই নিরলস চেষ্টা করছেন আতিকুল হক ও তার স্ত্রী মলি আফরোজ রুশদি।

ঠিকানার পেছনের কারিগর ডা. আতিক ও মলি আফরোজ

মানসিক সমস্যায় জর্জরিত আর মাদকাসক্তদের জন্য গড়ে তুলেছেন নিরাময় কেন্দ্র ঠিকানা। আতিক পেশায় চিকিৎসক হলেও তার স্ত্রী মলির পড়াশোনা একদম ভিন্ন বিষয়ে। শুধুমাত্র ভালো লাগা আর দায়িত্ববোধ থেকেই স্বামীর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন মলি। গড়ে তুলেছেন মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদানকারী অনন্য প্রতিষ্ঠান 'ঠিকানা'।

ঠিকানা নিয়ে মলি ও আতিকের পথচলা শুরু ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে। খুব সল্প পরিসরের শুরু করলেও এখন ঠিকানায় রয়েছে ৬০ জন রোগীর আবাসন ব্যবস্থা। আউটডোরেও চলে নিয়মিত রোগী দেখা। ডাক্তার আতিক ছাড়াও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক কনসালটেন্টরাও নিয়মিত চিকিৎসা দিচ্ছেন এখানে।

রোগীদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে লোহার গেট

আতিক জানান, এমবিবিএস শেষ করে মানসিক রোগ বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করার সময় থেকেই তিনি অনুভব করছিলেন চিকিৎসা খাতে এই বিভাগটি খুব অবহেলিত। কমবেশি মানসিক সমস্যা সবারই আছে, কিন্তু সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হবে এই দুশ্চিন্তায় কেউ চিকিৎসার পথ মাড়ায়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষা শেষে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন আতিক। আর তখনই একটি স্বপ্ন বুনেছিলেন। তিনি ও মলি মিলেই জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন।

ডা. আতিক জানান, ঠিকানায় যারা আশ্রয় নিয়েছেন তাদের মধ্যে মানসিক সমস্যাক্রান্তদের চেয়ে মাদকাসক্তের সংখ্যা অনেক বেশি। মাদকাসক্ত তরুণদের হার চোখে পড়বার মতো।

এমন ঘরেই থাকেন রোগীরা

ঠিকানায় এই মুহূর্তে ৩৫ জন আবাসিক রোগী আছে। তাদের অধিকাংশই মাদকাসক্ত। তাদের সারিয়ে তুলতেই নিরলস পরিশ্রম করছেন এই দম্পতি। তরুণদের মাদকাসক্ত হওয়ার কারণ হিসেবে আতিক বলেন, মূলত পারিবারিক অশান্তি, অতিরিক্ত শাসন, বা পারসোনালিটি ডিজঅর্ডারের কারণের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে তরুণরা। এর মধ্যে ইয়াবা বা গাঁজায় আসক্তের সংখ্যা বেশি। আতিক বিশ্বাস করেন শুধুমাত্র বন্ধুত্বপূর্ণ পারিবারিক বন্ধনই পারে তরুণদেরকে এই পথ থেকে সরিয়ে আনতে।

ঠিকানায় ঠিক এমনি একটি পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। এমনকি যে চারতলা ভবন ঘিরে ঠিকানা গড়ে উঠেছে তার দোতালায় সপরিবারে থাকেন ডাক্তার আতিক। মানসিক রোগ ও মাদকাসক্তদের নিয়ে আরও বড় পরিসরে কাজ করার লক্ষ্যেই তিনি পরিকল্পনা করছেন।

আর যেন কেউ স্কিজোফ্রেনিয়া, ডিপ্রেশনের ভয়াল ফাঁদে না পড়ে, মাদকের করালগ্রাসে যেনও কেউ হারিয়ে না যায় সেই চেষ্টাই করে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ডাক্তার আতিক।

মলি আফরোজ রুশদির এমন একটি কঠিন দায়িত্বে যুক্ত হওয়ার গল্পটা একটু অন্যরকম। বোটানির মতো বিষয়ে স্নাতকোত্তর তিনি। বিয়ের পরে নিজের দায়িত্ববোধ থেকেই এ ধরনের কাজে যুক্ত হওয়ার উদ্যোগ নেন মলি। মূলত তিনিই এর মূল উদ্যোক্তা। সার্বক্ষণিক তত্ত্ববধান ও রক্ষণাবেক্ষণের তাবৎ দায়িত্ব মলির নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এর মধ্যে সন্তানদের দেখভালও করছেন। দুই ছেলে তার। একজন নবম শ্রেণিতে পড়ছে, আরেকজন তৃতীয় শ্রেণিতে। বাবা-মায়ের এই উদ্যোগের সঙ্গে সব সময় আছে এই দুই সন্তান। বলা চলে তারাই বাবা-মায়ের এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

টিভি দেখছেন রোগীরা 

মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডের বি- ব্লকের এই পুরো চারতলা বাড়িটি ভাড়া নেওয়া ঠিকানা গড়ে তোলার জন্য। এখনও নির্মানকাজ চলছে। এর মধ্যেই চলছে রোগীদের চিকিৎসা ও রক্ষণাবেক্ষণ। কোনও কিছুতে ঘাটতি রাখেননি এর কর্তাব্যক্তিরা। রোগীদের জন্য রয়েছে ১৮-২০জন সেবক-সেবিকা।

কথায় কথায় ডা. আতিক জানালেন আগ্রহ ও দায়িত্ববোধ থেকে শুরু করা এই পথ কখনওই মসৃণ ছিল না। অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু করে নানাবিধ সংকটের মুখোমুখী হয়েছেন তিনি। কিন্তু থেমে থাকেননি। নিজের পরিবার ও আশেপাশের মানুষগুলোর অনুপ্রেরণায় চালিয়ে যাচ্ছেন ঠিকানা। মোট কথা তরুণদের হারতে ও হারিয়ে যেতে দিবেন না ডা. আতিক ও মলি আফরোজ। চলছে, চলবে এই এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন।

/এফএএন/ 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।