বিকাল ০৫:০৮ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৩ মে, ২০১৯  

এমসিজিতে দর্শকরা হতাশ

প্রকাশিত:

মুসা ইব্রাহীম, মেলবোর্ন থেকে॥
 

# মন্তব্য এক:

সাকিব-মাশরাফি-মুশফিক-রিয়াদদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া উচিত। বিশেষ করে বাংলাদেশ দলে যেহেতু বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান আছেন, তাই তাকে এই তালিকায় সবার উপরে রাখবো। তাকে দেখে যাতে অনুজদের মধ্যে লড়াই করার মানসিকতা জাগে।
 

# মন্তব্য দুই:

আফগানিস্তানের সঙ্গে ম্যাচে ফিল্ডিংয়ের সময় বাংলাদেশ দলকে যেমন একটা দল মনে হয়েছে, বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কার ম্যাচে ঠিক তার বিপরীত মনে হলো। এই বাংলাদেশ দলকে দেখে মনেই হচ্ছে না এরা দলগতভাবে ক্রিকেট খেলতে শিখেছে। দেখে মনে হয়, এরা বেড়াতে এসেছে। তারই এক ফাঁকে ক্রিকেটটাও খেলতে হবে দেখে খেলছে। নয়তো তামিম দ্বিতীয় বলেই বোল্ড আউট হবে কেন? ক্রিকেট যে দলীয় খেলা, এটা মনে হয় ভুলেই গেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা।

# মন্তব্য তিন:

আগের ম্যাচেই আফগানিস্তানের সঙ্গে হারতে বসা শ্রীলঙ্কা দলকে এদিন দেখে মনে হয়েছে ঘাপটি মেরে থাকা সতর্ক সিংহ। বিশেষ করে তিলকারত্নে দিলশানকে। আসলে ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই আনামুল স্লিপে ক্যাচ মিস করার পর ম্যাচটা বাংলাদেশ দলের হাত থেকে বের হয়ে গেছে। এরপর পয়েন্টেও আনামুল ক্যাচ মিস করেছে। লং অফে আরেকটা ক্যাচ মিস হয়েছে। মুশফিক স্ট্যাম্পিং মিস করেছে। ফিল্ডিং যাচ্ছেতাই হয়েছে। সবমিলিয়ে দিলশান দু-দু’বার জীবন পাওয়াটাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে।
 

# মন্তব্য চার:

বাংলাদেশ যদি এমনই খেলতে থাকে, ধরে নিচ্ছি স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশ জিতবে, তারপরও দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়া কষ্টকর হয়ে যাবে।


 

মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডের (এমসিজি) গ্যালারিতে বসে যখন বাংলাদেশ দলের ক্যাচ মিসের মহড়া দেখছিল বাংলাদেশের দর্শক, সে সময়ে তাদের করা মন্তব্যগুলো এখানে শুরুতেই বলে দিলাম। পুরো এমসিজি’র দর্শক ধারণক্ষমতা প্রায় নব্বই হাজার। এর প্রায় এক তৃতীয়াংশ দর্শক (ত্রিশ হাজার বারো জন) এদিন খেলা দেখতে এসেছিলেনে। আর উপস্থিত দর্শকের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ছিল লাল-সবুজে’র সমর্থক। বাংলাদেশের উচ্ছ্বল, উচ্ছ্বসিত দর্শক– হাতে বিশাল সব পতাকা, বাঘের পুতুল বা বাঘের পোশাক, ড্রাম-বাদ্যি, বাঁশি ইত্যাদি নিয়ে হাজির হওয়া দর্শকদের অনেকে অভিহিত করলেন – ক্রেজি সাপোর্টার্স। এই উন্মাদনায় আসলে পানি ঢেলে দিয়েছে বাংলাদেশ দলের হতাশাজনক খেলা। ম্যাচ শেষে দলনেতা মাশরাফি বিন মুর্তজাও উপরোক্ত বিষয়গুলোই উল্লেখ করলেন হারের অন্যতম কারণ হিসেবে। বিশেষ করে ক্যাচ হাত গলে বেরিয়ে যাওয়া মানেই ম্যাচটাও বের হয়ে যাওয়া বলে তিনি মন্তব্য করেন। টস জিতে ব্যাট করতে নামা শ্রীলঙ্কা দল নির্ধারিত ৫০ ওভারে এক উইকেটে ৩৩২ রানের জবাবে এদিন বাংলাদেশ ৪৭ ওভারেই ২৪০ রানে অল আউট হয়ে যায়। দল হারে ৯২ রানে।

তবে ডাই হার্ড ক্রিকেট ফ্যান যাকে বলে, তার প্রমাণ রাখতে বহু প্রবাসী বাংলাদেশি সমর্থক খেলার দিন সকালেই সিডনি থেকে মেলবোর্ন উড়ে গেলেন বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচটা উপভোগ করতে। এদের বেশিরভাগই তরুণ। তারা লেখাপড়া করতে বা ভাগ্যের অন্বেষণে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের ভালো কিছু বলতেই তারা অন্ধভক্ত – খেলা হলে তো কথাই নেই, সমর্থন জানাতে একেবারে মাঠে গিয়ে হাজির। ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে আটটায় টাইগার এয়ারের সিডনি টু মেলবোর্ন ফ্লাইটটা এদিন কানায়-কানায় পূর্ণ থাকলো। যাদের অর্ধেকই বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের সমর্থক। এদের সবাই বাংলাদেশ দলের জার্সি, পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুন, ব্যান্ডানা নিয়ে প্লেনে উঠছিলেন।

এ সময় এক অসি বুড়ো ভদ্রলোক নিজে থেকে আলাপ জুড়ে দিলো।

: কোথায় যাচ্ছো?

:: মেলবোর্ন।

: বিগ ম্যাচ, হাহ্?

:: হ্যাঁ, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে।

: বেস্ট অব লাক।

:: ধন্যবাদ।

মনটা ভালো হয়ে গেল। খেলাপাগল ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় জাতি অসিরা খেলাকে এমনই সম্মান করে।


 

মন ফুরফুরে ভাব নিয়েই সবাই– ছোট ভাই শোয়েব হারুন, স্ত্রী উম্মে সরাবন তহুরা আর ছেলে ওয়াসি ইব্রাহীম রাইদকে নিয়ে চড়ে বসেছি প্লেনে। প্রায় সাড়ে আটশ' কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে মেলবোর্ন এয়ারপোর্টে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর প্লেন গিয়ে পৌঁছালো। সেখানে অপেক্ষারত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরের সহপাঠী জহিরুল মল্লিক জুয়েলের গাড়িতে করে চললাম মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডের দিকে। সে মোনাস বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্রই পিএইচডি শেষ করেছে। আমার অনুরোধে এদিনের বাংলাদেশ দলের খেলা দেখার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে।

গাড়ি শহর পেরিয়ে প্রায় এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে ইয়ারা নদীর তীরে অ্যামি পার্কের পাশে গিয়ে থামলো। উদ্দেশ্য – সকালের নাশতা সেরে ফেলা। জুয়েল আগে থেকেই পাউরুটি, হ্যাশ ব্রাউন, চিকেন সসেজ, চিকেন উইংস, কোলস্ল ইত্যাদি গাড়িতে সংগ্রহ করে রেখেছিলো। আমরা সেসব নিয়ে ইয়ারা নদীর তীরে রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনে গিয়ে নামলাম। এদেশে যেকোনও পার্কেই কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষ যাতে দীর্ঘ সময় কাটাতে পারে, তেমন ব্যবস্থা করে রেখেছে। হাতের কাছেই পানি, টয়লেট ইত্যাদি তো আছেই। আরও আছে বারবিকিউ করার সুব্যবস্থা। সেখানে যে কেউ পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে সময় কাটাতে পারে। আমরা সব খাবার নিয়ে বারবিকিউ ওভেনের পাশে জড়ো হলাম। খাওয়া-দাওয়ার মাঝেই মেলবোর্নে ডিপার্টমেন্ট অব হিউম্যান সার্ভিসেস-এ কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে কর্মরত ওয়াসিম আতিক কিশোর এবং একটি প্রাইভেট ফার্মের হিসাব কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম আজিম এসে যোগ দিলেন। তাদেরকে নিয়ে প্রায় আধঘণ্টা হেঁটে এমসিজিতে হাজির হতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর থেকে মেলবোর্নের মোনাস বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে আসা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে আহসান হাবিব, মনিনূর রশিদ, সাইফুল মালাক, শাহরিয়ার হায়দার, মাহবুব সরকার, জুই গোমেজ, ফয়েজ মজুমদারসহ আরও অনেকের সঙ্গে দেখা হলো।

গ্যালারিতে দর্শকদের উৎসাহ দিতে থাকা টাইগার মিলন, টাইগার আশরাফুল আলমসহ মুখে বাঘের আদলে শিল্পকর্ম নিয়ে বহু দর্শককে ম্যাচ উপভোগ করতে দেখেছি। অনেকেই এসেছেন পুরো পরিবার নিয়ে। মাঠের যে অংশে বাংলাদেশ দলের ড্রেসিং রুম, তার পাশের গ্যালারিতেই বিশাল পতাকা বিছিয়ে মুশফিকুর রহিমের বাবা মাহবুব হামিদ তারাকে তার ভাই এবং অন্যান্য বন্ধুবান্ধবসহ ম্যাচ উপভোগ করতে দেখা গেল। তিনি বারবার আক্ষেপ করছিলেন – একটা উইকেট চাই, একটা উইকেট।


 

আর তরুণ যারা খেলা দেখতে এসেছেন, তাদের অনেকেই অস্ট্রেলিয়ায় আসার আগে কিশোর বয়সে ক্রিকেট খেলতেন। কেউ কেউ আবার এই অস্ট্রেলিয়াতেই দল গঠন করেছেন। নিজেদের মধ্যে তারা নিয়মিতই ক্রিকেট খেলেন। খেলার প্রায় শেষ দিকে তাদের কেউ কেউ মন্তব্য করলেন, এখনকার ক্রিকেট হলো আধুনিক ক্রিকেট। এ যুগে ব্যাটিংয়ে একটা দল যদি ২০ ওভারে একশ', পঁয়ত্রিশ ওভারে দুশ' এবং পঞ্চাশ ওভারে যদি তিনশ’র ওপরে রান করতে না পারে, তাহলে বড় দলের সঙ্গে সেই ম্যাচ একপেশে হয়ে পড়তে পারে। তাদের কথা শুনে মনে হলো – শ্রীলঙ্কা দল একেবারে এটাই করেছে। আর বাংলাদেশ দল এটাই করতে ব্যর্থ হয়েছে। যা আসলে ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।

 

তবে দর্শকদের অনেকেই মনে করেন – এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশ দলকে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে খেলতে হবে আগামীতে নিউজিল্যান্ড, স্কটল্যান্ড আর ইংল্যান্ডের সঙ্গে। আর মাত্র দুটো জয় বাংলাদেশ দলকে দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলার সুযোগ করে দিবে। এখন দেখা যাক।

/এএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।