রাত ০৪:২৪ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৭ অক্টোবর, ২০১৯  

পাহাড়ের পথে পথে….

প্রকাশিত:

রিয়াজ সেজান॥

পাহাড়ের পথে হারিয়ে যেতে একদিন আমরা পথে নেমেছিলাম। বসন্তের শুরুতে পাহাড়েও সাজসাজ রব পড়ে যায়। পাহাড়ের উঁচু নিচু পথ পাড়ি দিতে গিয়ে প্রথমেই চোখে পড়বে রংবেরংয়ের পাতা। শীত শেষে গাছের কঁচি পাতা আর পথ চলার পথে শুকনো পাতার ছড়াছড়ি (এজন্যই বাড়তি সতর্কতার বিষয়টিও জানা থাকা দরকার। সামান্য দেয়াশলাই কাঠিও পুরো পাহাড়কে জ্বালিয়ে দিতে পারে এক নিমেষে)। পথ চলতে চলতে পুড়ে ছাই এমন পাহাড়ও আমদের চোখে পড়ল। চোখে পড়ল নাম না জানা হাজারও পাহাড়ি বনফুল আর নগর সভ্যতা থেকে হারিয়ে যাওয়া পলাশ, শিমুল, কাঠালচাঁপাও। বসন্তে পাখির কলতান হয়ত নতুন কিছু নয় তবে ঝিরি পথের বাঁকে করা আমাদের ক্যাম্পে পুরো রাত নানান পাখির গান অদ্ভূত অনুভূতি উপহার দিয়েছে।

রাতে অবস্থানের জন্য ক্যাম্প করতে কিছু ব্যাপার মাথায় রাখতে হয়। প্রথমত, ক্যাম্পের আশেপাশে পর্যাপ্ত পানি থাকাটা জরুরি। সারারাত অবস্থানের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ জ্বালানি আর খাবারের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয়। প্রাকৃতি পরিবেশের কোনও ক্ষতি যেন না হয় সেটাও খেয়াল রাখতে হয়। বিশেষ করে সঙ্গে থাকা পানির বোতল, পলিথিন ব্যাগ কোনওভাবেই যত্রতত্র ফেলা ঠিক নয়। রাত্রিযাপন শেষে আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলাই নিয়ম। আর ক্যাম্পের জন্য বেছে নিতে হয় সমতল জায়গা।

বান্দরবানে আমাদের তৃতীয় দিনের ক্যাম্পের অবস্থান ছিল পাহাড়ের উপরে যেখান থেকে ঝিরি পথ কয়েকশ ফুট নিচে। সেখানে অবস্থান কালে খাবার সহ নানা প্রয়োজনে পানির ব্যবস্থা করতে আমাদের বেগ পেতে হয়েছিল। তবে পাহাড়িদের জীবন বৈচিত্রের কথা ভাবলে এমন কষ্ট কিছুই মনে হবে না।

আমরা আটজন পাহাড়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে সত্যিই পৌছে গেলাম জনমানব শূন্য এক অদ্ভূত সুন্দর জায়গায়। ঝিরি পথের বাঁকে হাজারো পাথরের স্তুপ আর চারপাশে পাহাড়ের উচু সবুজ দেয়াল, রংবেরংয়ের বাহারি গাছ, প্রজাপতি, ঘাসফড়িং, মাকড়সাসহ বিচিত্র প্রাণের সন্ধান পেলাম সেখানে। মাঝে আঁকা বাঁকা পথ এগিয়ে গেছে কোন এক পাহাড়েরই দিকে।

কিছুদূর এগুতেই দেখলাম বিশাল এক রাজপ্রাসাদের গেট। দুই পাহাড়ের মাঝে ঝিরিপথ বয়ে যাওয়া ফাঁকা জায়গাটি এমনই এক অদ্ভূত গেটের আকার ধারন করেছে। যা হলিউডের সিনেমা কিংবা কল্পনাতেই দেখা হয়েছে এর আগে। অবশ্য এমন সৌন্দর্যের বর্ণনা বলে বা লিখে বোঝানো যাবে না। তাই ছবি দেখেই বুঝে নেওয়ার অনুরোধ থাকল।

সন্ধা ঘনিয়ে আসছিল। কিন্তু সমতল খুঁজে পেলাম না। উপায়ন্তর না দেখে সামনের খাড়া পাহাড় পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হলো। পাথুরে খাড়া ঢাল বেয়ে ওঠার সময় সামান্য এদিক ওদিক পা পড়লেই ঘটতে পারে বড় ধরনের দূর্ঘটনা। তারপরও টিকে থাকার যুদ্ধে ক্যাম্পাররা একে একে পাড়ি দিল বিশাল এ পাহাড়। ঝুপ করে রাত নেমে আসলে পাহাড়, ঝিরি পথ আর পাথরের রাজ্যেই কাটিয়ে দিতে হলো রাতটা।

পরদিন সকালে আবারও যাত্রা। এবারে উদ্দেশ্য সামনের পথ ধরে জনবসতির সন্ধান। টানা তিন ঘন্টার বেশি হাঁটার পর দূর থেকে দুই পাহাড়ির দেখা মিলল। তবে পাহাড়ের অনেক ভেতর থেকে আমাদের দলবেধে এগিয়ে আসা দেখা অনেকটা ভয়েই পালিয়ে গেল তারা। অবশেষে তাদের পালিয়ে যাওয়ার পথ ধরেই ফিরলাম লোকবসতিতে।

খানিক জিরিয়ে আবারও পা বাড়ালাম আমরা। ফেরার পথে সন্ধান মিলল ঝিরিপথের বাঁকে একটি পাহাড়ি গুহার। এবারের পথটা একেবারেই অন্যরকম, শেওলা ঢাকা স্যাঁতসেতে সবুজ অরণ্য। তার মাঝে ঝিরিপথের বাঁক। কোথাও হাঁটু পানি কোথাও কোমর, আবার কোথাও পানি গলা পর্যন্ত। আমাদের চেষ্টা ছিল পাহাড়ের দুইপাশে জঙ্গলের সরু পথ বেয়ে লক্ষ্যে পৌছানো।

পথে একজন ক্যাম্পার হাঁপিয়ে ওঠায় তাকে রেখেই এগিয়ে গেলাম সবাই। এগিয়েই মিলল গুহার দরজা। ঘুটঘুটে অন্ধকারে সরু পথ বেয়ে আস্তে ধীরে গুহার ভেতর ঢুকলাম আমরা। কিন্তু গুহার পথ এতোটাই সরু আর সংকীর্ণ ছিল যে বাধ্য হয়েই মাঝ পথ থেকে ফিরে আসতে হলো আমি সহ আরেকজন ক্যাম্পরকে। অন্যরা সেই সরু পথে হামাগুড়ি দিয়েই গুহার অপর প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে এলো। তাদের হাতে থাকা ক্যামেরায় তুলে আনল জানা অজানা নানান প্রাণীর চিত্র।

বান্দরবন রোয়াংছড়ি উপজেলা থেকে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম। এরপরের পথ-পরিক্রমা, মানচিত্র হয়ত বলা সম্ভব। আর এতে দু চারজন পর্যটক উৎসাহিত হলেই একদিন গড়ে উঠবে পর্যটন শিল্প। সেই সাথে উন্নত হবে রাস্তাঘাট, ধ্বংস হবে পাহাড়-ঝিরিপথ, গড়ে উঠবে হোটেল-আবাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য।

তবে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সভ্যতা অনস্বীকার্য, কিন্তু সমগ্র পৃথিবীকে বাঁচাতে প্রয়োজন বাস্তুসংস্থান বা প্রাকৃতিক ভারসাম্য। আর এ ভারসাম্য রক্ষা কেবল প্রকৃতিরই কাজ। নিজেদের খাতিরেই তাই প্রকৃতিকে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া জরুরী।

লেখক: সাংবাদিক ও ক্যাম্পার

ইমেইল: reajsejan@gmail.com

ছবি: শেখ রাজিব

/এএলএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।