বিকাল ০৫:৩১ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৩ মে, ২০১৯  

ক্রিকেটের জন্য তিন মাস স্কুলে যায়নি মুশফিক : মাহবুব হামিদ তারা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মুসা ইব্রাহীম, অস্ট্রেলিয়া  থেকে॥

সফল ক্রিকেটার। টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের মালিক। সবসময় উইকেটের পেছনে তীক্ষ্ণ চোখ। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অন্যতম ভরসার নাম মুশফিক। তার বাবা মাহবুব হামিদ তারা। ছেলের খেলার টানে দুভাইকে নিয়ে চলে এসেছেন অস্ট্রেলিয়ায়। এখান থেকে নিউজিল্যান্ডেও যাবেন। ছেলেসহ দলের সব খেলোয়াড়কে উৎসাহ যোগাবেন– এটাই তার আশা। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে দেখা হয়ে গেল তার সঙ্গে। উঠেছেন মুশফিকের চাচার বন্ধু এম হামিদের গ্লেনফিল্ডের বাসায়। মাহবুব হামিদ তারার সঙ্গে কথোপকথনে বের হয়ে এলো মুশফিকুর রহিমের অনেক অজানা-

বাংলা ট্রিবিউন : ছেলে শুধু খেলা নিয়ে থাকুক– এটা আপনারা কতটুকু সমর্থন করেছিলেন? আপনারা কখনও চেয়েছিলেন যে মুশফিকুর রহিম ক্রিকেটার হোক? না কি মুশফিকুর নিজে থেকেই ক্রিকেটার হতে চেয়েছেন?

মাহবুব হামিদ তারা: এটা আমাদের কারওরই চাওয়া ছিল না। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলতে-খেলতে সে খেলাটাকে খুবই ভালোবাসত। আর বগুড়া জিলা স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তাকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে দেখেছি। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত সে পড়েছে এই স্কুলে। এরপর বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ভর্তির জন্য মুশফিককে নিয়ে যায় তার চাচা। সেখানে ভর্তি হলো ক্লাস সেভেনে। এরপর মুশফিক খেলোয়াড় হয়ে গেল। এখানে আমার কোনও অবদান নেই। তবে তাকে অনেক সাপোর্ট দিয়েছি।

বাংলা ট্রিবিউন: এখনকার মা-বাবা’রা তো ছেলেমেয়েদের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার দেখতেই ভালোবাসেন। সেখানে ক্রিকেটার হতে আপনারা তাকে কতখানি সমর্থন দিয়েছিলেন?

মাহবুব হামিদ তারা: আমরা কখনোই তাকে ক্রিকেটার হতে বাধা দেইনি। পরিবার থেকে কোনও প্রত্যাশার চাপ ছিল না। মুশফিক যখন ক্লাস নাইনে– তখন সে বিজ্ঞান, মানবিক না বাণিজ্য বিভাগে লেখাপড়া করবে, এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আমাদের বেগ পেতে হয়েছে। মুশফিক অবশ্য একটা সিদ্ধান্ত নিয়েই বাড়িতে এসে বলেছিল, ‘আব্বা, বড় ভাইয়েরা যারা খেলে, তারা বলেছে যে তুই (মুশফিক) সায়েন্স নিবি না, আর্টস নিবি। কারণ, সায়েন্স নিলে নিয়মিত ক্লাস করতে হবে, প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসও আছে। এগুলো মিস করলে তো রেজাল্ট ভালো হবে না। আর রেজাল্ট ভালো না হলে মানসিক একটা চাপ থাকবে। তখন আবার খেলার দিকে ভালো মনোযোগ দিতে পারবি না। তার চেয়ে তুই একেবারে আর্টস নে, একেবারে চাপমুক্ত হয়ে খেলতে পারবি।‘ কিন্তু আমরা মুশফিককে বরাবরই ভালো ছাত্র হিসেবে জানতাম। কাজেই সে সায়েন্স তো নেবেই। তারপরও আমাকে যখন বলল, এ কথা, তখন আমি বললাম– বাবা, তোমার যেটা পড়তে ভালো লাগে, তুমি সেটাই নাও। কিন্তু সমস্যা হলো, যখন আমি বিকেএসপিতে বেতন দিতে গেলাম, তখন। এই বেতন সাধারণত অফিসেই নিয়ে নেয়। কিন্তু আমার বেলায় নিল না। না নিয়ে বলল– আপনি বেতন দেওয়ার আগে ক্লাস টিচারের সঙ্গে কথা বলে আসেন। ক্লাস টিচার আমাকে ধরে আচ্ছামতো বকা দিল। বলল, ‘হ্যাঁ! আপনি কেমন বাবা! ছেলেকে সায়েন্স নিতে দেননি, তাকে হিউম্যানিটিজ নিতে বলেছেন!’ আমি তো ভাবছি, শুরুতেই কেউ এমন প্রশ্ন করে কেন? বললাম, কেন? কোনও সমস্যা হয়েছে? তখন উনি বললেন, ‘আপনি কি জানেন, আপনার ছেলে কত ভালো ছাত্র?’ আমি বললাম, হ্যাঁ, তা জানি। উনি বললেন, ‘তাহলে আপনি এখানে (হিউম্যানিটিজ) ভর্তি করিয়েছেন কেন? আপনি জানেন সে এখানে সেকেন্ড হয়েছে?’ আমি বললাম, ‘ছেলে ভালো মনে করেছে, আলহামদুলিল্লাহ।' তারপর থেকে তো চললই ওর খেলা।

বাংলা ট্রিবিউন: খেলার জন্য আপনাদের দিক থেকে মুশফিকুরকে কখনও কোনও বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছিল কি না? আমরা যেমন জানি যে সাকিব আল হাসানের ব্যাট…।

মাহবুব হামিদ তারা: (মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) না, এমন ব্যাটও ভাঙিনি। তাসকিনের বাবা ব্যাট কেটেছে। আমরা ব্যাট কাটিনি। কারণ ক্লাস সেভেনে যখন আমরা তাকে বিকেএসপিতে ভর্তি করিয়ে দিয়েছি, তখনই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ও খেলবে, ভালো খেললে ভালো হবে। না হলে লেখাপড়া করে যা হতে চায় হবে। খেলাতে তো এখন মাশাআল্লাহ ভালোই করেছে। শুরুর দিকে পরিবারের দু’একজন ছিল। এখন তো পুরো পরিবার তার পেছনে। যার উদাহরণ হলো, এই অস্ট্রেলিয়াতে খেলা দেখতে আসা– তিন ভাই মিলে (মুশফিকের দুই চাচাও এসেছেন খেলা দেখতে)।

 

 

 

বাংলা ট্রিবিউন: তাকে ক্রিকেটে নিয়ে এসেছে?

মাহবুব হামিদ তারা: ও যে ক্রিকেট খেলত, আমি সেটাই জানতাম না। একবার একটা ঘটনা ঘটল। তখন অনূর্ধ্ব ১৪ দলের একটা খেলা ছিল। মুশফিক তখন ক্লাস ফাইভ কি সিক্সের ছেলে। এতটুকুন একটা বাচ্চা। সোজা করে ধরলে বুকের সমান হয়। এ অবস্থা থেকেই ওদের মাটিডালি’র টিম ফাইনালে গেছে। আমাকে পাড়ার ছেলেপেলেরা তখন ধরেছে, আংকেল একশ টাকা দিতে হবে, ভ্যানভাড়া। জিজ্ঞেস করলাম, কিসের ভ্যানভাড়া? বলল, কাল আমাদের ফাইনাল খেলা আছে, আমরা খেলতে যাব। আমাদের দু’টো ভ্যান লাগবে। একটার ভাড়া একশ টাকা পেয়েছি। আরেকটার ভাড়া আপনার কাছ থেকে নেব। তখন আমি বললাম, যাও, নিয়ে যাও।

তখন ওরা আমাকে বলল, আপনি খেলা দেখতে যাইয়েন। পরদিন ছিল শুক্রবার, বন্ধের দিন। ভাবলাম জুমার নামাজ পড়ে খেলা দেখতে যাব। কারণ ক্রিকেট খেলা তো সারাদিন ধরে হয়। কিন্তু সেদিন গিয়ে দেখি খেলা শেষ। জিজ্ঞেস করলাম, সীমিত ওভারের খেলা হচ্ছে না কি? ওরা বলল, না, এখানে ত্রিশ ওভারের খেলা। কিন্তু প্রতিপক্ষ ত্রিশ ওভারে যে রান করেছে, সেই রান মাটিডালি’র দল দশ ওভারেই করে ফেলেছে। আমার আর খেলা দেখা হলো না। কিন্তু যখন গিয়ে পৌঁছেছি, তখন খেলার পুরস্কার দিচ্ছে।

ওখানে এক ভদ্রলোক ছিলেন, উনি আগে একসময় বগুড়া দলে খেলতেন। উনি জিজ্ঞেস করছিলেন, আপনার এই ছেলের কোচ কে? আমি ওনার প্রশ্ন শুনে আকাশ থেকে পড়ার মতো বললাম, ও (মুশফিক) খেলেছে এই মাঠে! আমি তো ভেবেছি ও খেলা দেখতে এসেছে। কারণ ও তো পিচ্চি একটা ছেলে, বয়স দশ কি এগারো।

আমার কথা শুনে উনি বললেন, আরে, ও তো ম্যান অব দ্য ম্যাচ। আমি তখন ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ কী জিনিস, তা-ও বুঝি না। ধরে নিয়েছিলাম সেরা খেলোয়াড় হয়েছে হয়তো। উনি তখন বললেন, ওর (মুশফিক) ফুটওয়ার্ক খুবই ভালো। এই শব্দটাও নতুন লাগল। ভাবলাম, ব্যাট, বলে খেলবে, সেখানে পায়ের কী কাজ? বললাম, না তো, ওর তো কোনও কোচ নাই। তবে সে ইএসপিএনে খেলা দেখত খুব, এটা আমি দেখেছি। মনে হয় সেখান থেকেই খেলা শিখেছে। ওই ঘটনার এক বছর পর তো সে বিকেএসপিতেই ভর্তি হলো। এই ওর ক্রিকেট খেলা।

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে মুশফিকুর রহিমের ক্রিকেটার হওয়ার গল্প এটাই?

মাহবুব হামিদ তারা: হ্যাঁ, তা বলতে পারেন। আমাদের একটা সুবিধা ছিল, আমরা ছিলাম যৌথ পরিবার। ছয় ভাই থাকতাম এক সঙ্গে। বাবা-মা ছিলেন। মূলত আমার মা ছিলেন আমাদের আসল অভিভাবক। আমার মা’ই এদের দেখভাল করতেন। আমরা এগুলো খেয়ালই করতাম না। তবে মুশফিকের আবদার যা ছিল, তা আমার এই ছোটভাই (পাশে বসা মাহফুজুল হামিদ দেলোয়ার) আর মুশফিকের মেজবাহ চাচাই মেটাতো বেশি। মেজবাহ’ই ওদের ব্যাট-বল কিনে দেওয়ার কাজগুলো করত। তবে মুশফিককে বিকেএসপিতে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আমার সবচেয়ে ছোটভাই বাদল সব কাজ করেছে। মুশফিকই ওর বাদল চাচাকে বলেছে, কাকা আমি কিন্তু বিকেএসপিতে ভর্তি হব।

মজার ব্যাপার হলো, আমি কিন্তু এসব কিছু জানতাম না। বিকেএসপিতে ভর্তির আগে শারীরিক পরীক্ষা হয়। এরপর প্র্যাকটিক্যাল আর লিখিত পরীক্ষা। সবমিলিয়ে মার্ক হলো একশ। একশ’র মধ্যে মুশফিক পেয়েছিল আটানব্বই। তখন কোচ যারা ছিলেন, ওনারা বলছিলেন যে ও (মুশফিক) চান্স পাবে। তখন সে চান্স পেয়েছিল। এ সময় যারা টিকেছে, এমন ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জনকে ওখানে তারা প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এরপর ওখানে ওদের একটা সার্টিফিকেট দেয়।

মুশফিকের সার্টিফিকেটে মন্তব্যের ঘরে ছিল, অতি উত্তম। ক্যাটেগরি ছিল তিনটা– অতি উত্তম, উত্তম আর ভালো। মুশফিকের মতো আরও এগারোজন পেয়েছিল অতি উত্তম। মুশফিক নিশ্চিত ছিল যে, ওকে ভর্তি করে নেবে বিকেএসপি থেকে। যারা এমন চান্স পেয়েছে, নিয়ম ছিল, তাদের এক মাসের মধ্যে জানানো হলে তিন মাসের মধ্যে ভর্তি হতে হবে।

এরপর এক মাস গেছে। দু’তিন মাস সময় চলে গেছে। এই সময়টা মুশফিক বগুড়া জিলা স্কুলে আর ক্লাস করেনি। এটা আমি জানিও না। ওর নানা একদিন আমাকে বলছে, ও যে স্কুল করে না, সেটা তুমি জানো? আমি বললাম, তা তো জানি না। নানা বলছে, ও স্কুল কলে (কিন্তু) যায় না। ও বিকেএসপিতে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে এসেছে। তারপর থেকে আর স্কুলে যায় না।

আমি রাতে বাসায় গিয়ে মুশফিককে বললাম, বাবা, তুমি না কি স্কুলে যাও না? আমার প্রশ্ন শুনে সে চুপ করে মাথা নিচু করে বসে থাকল। আমি বললাম কী হলো, কথা বলো? এবার মুশফিক মাথা নিচু করেই বলল, আমাকে অন্য স্কুলে ভর্তি করে দেন। আমি তখন বললাম, তাহলে তুমি তিন মাস হলো স্কুলে যাওনি! এবার সে বলল, কেন ওরা (বিকেএসপি) যে বলল, যারা আটানব্বই পেয়েছে, তাদের ওরা ভর্তি করে নেবে! সে জন্যই তো আমি আর স্কুলে যাইনি।

এখন কী করা? এমন চিন্তা করে স্কুলে গিয়ে তার ক্লাস শিক্ষককে বলে কোনওভাবে ম্যানেজ করে তাকে আবার ভর্তি করিয়ে দিলাম। কিন্তু এবার স্কুলে গিয়ে তার মেজাজ খারাপ। যেটা বুঝলাম, আসলে ওর এই স্কুলে পড়ার মানসিকতাই নেই। তখন মে কি জুন। ভাবলাম, যাই দেখি বিকেএসপিতে একটু খোঁজ নিয়ে আসি। ওদিকে আমি মুশফিককে বললাম, বাবা শোনো। আমাদের তো ওখানে (বিএকএসপি) বাবা-চাচা-মামা-খুড়া কেউ নেই। কাজেই ওখানে কী হলো, তা কেমন করে বলব? যদি ওখানে তোমার ভর্তি হয়, তাহলে তো হলোই। আর না হলে এ স্কুলে তোমার পড়া করা লাগবে না? এমন অনেক কিছু বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে ক্লাসে পাঠিয়ে দিলাম।

এরপর বিকেএসপিতে গিয়ে দেখি, ওর মতো যারা চান্স পেয়েছে, ইতোমধ্যেই তাদের সবাইকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এরপর পনের দিন পার হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা কোনও চিঠি পাইনি। যেকোনওভাবেই হোক, হাতে এসে পৌঁছয়নি। আমি সেই চিঠি নিয়ে দেখি, ভর্তির আর মাত্র একদিন আছে। মানে পনের তারিখ ছিল ভর্তির শেষ সময়, আমি গিয়েছি তেরো তারিখে। আমার আবার ওখান থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়ের কাছে যাওয়ার কথা। মেয়ে তখন সেখানে একটা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। ড্রাইভারকে বললাম, গাড়ি ঘোরাও। আমি সেখানে না গিয়ে উল্টো বগুড়া ফিরেছি। ওই একদিনের মধ্যে বিকেএসপি থেকে দুই ফর্দ কাগজে যা লেখা ছিল, তার সবকিছু যোগাড় করেছি, এই ড্রেস, ওই ড্রেস, সাদা কাপড়, সাদা জুতা, ছয় জোড়া, ব্যাট, কেডস, এ সবকিছু দিনের মধ্যে বানিয়ে, সংগ্রহ করে নিয়ে মুশফিককে ভর্তি করে দিয়ে এলাম। ব্যাস, কিচ্ছা শেষ। (হাসতে হাসতে) তারপর বিকেএসপি’ই হয়ে উঠল ওর বাবা-মা। আমি শুধু মাসে মাসে গিয়ে ওকে গিয়ে দেখে আসি। এরপর দেখি যে, সে ওখানে সেট হয়ে গেছে।

 

 

 

বাংলা ট্রিবিউন: প্রশ্নটা যদিও ক্রিকেটকেন্দ্রিক, তারপরও আপনাকে করছি। মুশফিকুর রহিম আগে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে টেস্ট এবং ওয়ানডে, দু’টো ফরম্যাটেই নেতৃত্ব দিতেন। এখন শুধু টেস্টে। এটা তার খেলোয়াড়ি জীবনে কোনও প্রভাব ফেলেছে কি না?

মাহবুব হামিদ তারা: আমার তো মনে হয় কোনও প্রভাব পড়েনি। কারণ, এর আগে একটা ঘটনা ঘটেছিল, সেটা জিম্বাবুয়েতে। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, মুশফিক খুবই ‘ইমোশনাল’ ছেলে। সেখানে খেলার মাঝপথে, শেষ ওয়ানডে’র আগে সে ক্যাপ্টেনসি ছেড়ে দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল। তখন আমি ওকে টেলিফোনে বলেছিলাম, ‘তুমি কাজটা ঠিক করোনি। কারণ ক্যাপ্টেনসি তো তোমাকে দিয়েছে বোর্ড। তুমি যদি ক্যাপ্টেনসি করতে না চাও, তাহলে সেটা জানবে বোর্ডকে। তুমি একা সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেউ না। আমার মনে হয়, তুমি এ কাজটা ঠিক করোনি।‘ ও তো খুবই ইমোশনাল ছেলে। ও হয়তো ভেবেছে যে, সে হয়তো দলকে ঠিক মতো চালাতে পারছে না। তাই তার ক্যাপ্টেন না থাকাই ভালো। অন্য যে কেউ এসে ভালোমতো ক্যাপ্টেনসি করুক। না হলে এই জিম্বাবুয়ের কাছে আমরা হারব কেন? যাই হোক, যখন ওর ক্যাপ্টেনসি চলে গেল, ২০১৪ সালে দলের পারফরম্যান্স যেটাই হোক, ফলাফল তো ইতিবাচক হচ্ছিল না। অনেক খেলাতেই বাংলাদেশ দল কাছাকাছি গিয়ে হেরে গেছে। কিন্তু এই ফলটা যদি ইতিবাচক হতো, আমরা যদি জিততাম, তাহলে সারা বছরের রেজাল্টটা এমন হতো না। আর ওর ক্যাপ্টেনসিও যেত না। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজে তো সবগুলো খেলাই হাতছাড়া হয়ে ফিরে এলো। তখনই সে মনের দিক থেকে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল, ওর আর ক্যাপ্টেনসি না করাই উচিত। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে ফিরে এয়ারপোর্টেই বলেছে, সে যতটুকু চেষ্টা করার, তা করেছে। এখন বোর্ড যা সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই সে মেনে নেবে। আর অন্য কাউকে দিয়ে যদি রেজাল্ট ভালো করা যায়, তাহলে তার কোনও আপত্তি নেই। তার মানে, সে আগে থেকেই নিজেকে প্রস্তুত করে রেখেছিল পুরো পরিস্থিতির জন্য। এরকম স্পষ্ট করেই সে বলেছে সবকিছু।

বাংলা ট্রিবিউন: মুশফিকুর রহিম তাহলে তার খেলোয়াড়ি অনেক সিদ্ধান্তই আপনাদের সঙ্গে পরামর্শ করে নেন?

মাহবুব হামিদ তারা: খুব বেশি না। আর খেলাধুলা নিয়ে আমি খুব একটা বেশি ওর সঙ্গে আলোচনা করি না। তবে ওই সময়টাতে আমি শুধু ওর সঙ্গে এটা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, নিজ আগ্রহেই। এছাড়া খেলা নিয়ে মুশফিকের সঙ্গে খুব বেশি আলোচনা হয় না। কারণ আমি খেলা বুঝি কম। আমি মনে করি, সে খেলা সম্পর্কে ভালোই জানে। কাজেই আমি কেন কিছু বলে এর মধ্য ঝামেলা পাকাতে যাব?

বাংলা ট্রিবিউন: মুশফিকুর যখন বগুড়ায় যান, বাড়িতে সময় কাটান, তখন তিনি কী করতে ভালোবাসেন?

মাহবুব হামিদ তারা: ওকে তো আমরা দেখি, ছোটো-ছোটো ভাইবোনদের নিয়ে খুব মজা করছে। বগুড়া তো ওর কোনও ফ্রেন্ড সার্কেল গড়ে ওঠেনি, স্কুল থেকে ক্লাস সেভেনেই চলে যাওয়ার কারণে। আর বগুড়া জিলা স্কুলের দেড়শ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে শুধু তার ক্লাস সেভেনের বন্ধুরা এসে তাকে নিয়ে গেছে। এটাই হলো বগুড়ায় তার বন্ধুবান্ধব। এ ছাড়া মুশফিক বাসায় এলে তার ছোটো ভাইবোনদের নিয়ে হৈ-হুল্লোড় করে। তাদের নিয়ে চায়নিজ খেতে যায়। এরকমই তো দেখেছি তাকে।

বাংলা ট্রিবিউন:এখন অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানকে ক্রিকেটার বা খেলোয়াড় হিসেবে দেখতে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছেন। তারপরও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এটা খুব বেশি নয়। আপনার কি মনে হয়, কেউ যদি স্বেচ্ছায় এই পেশায় আসতে চায়? সেক্ষেত্রে মা-বাবাদের কেমন সহায়তা দেওয়া উচিত?

মাহবুব হামিদ তারা: আমি তো মনে করি, শতভাগই করা উচিত। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটটা একটু আলাদা। এই অস্ট্রেলিয়ায় খেলোয়াড় তৈরি করার যে প্রক্রিয়া, এটা তো আর বাংলাদেশের মতো নয়। আবার বাংলাদেশে এমনও আছে যে, যারা খেলাধুলা করছে, তারা শুধু খেলাটাই খেলছে। কিন্তু লেখাপড়া বাদ দিয়ে শুধু খেলাধুলা করে কোনও লাভ নেই। যেমন আশরাফুলকে আমরা দেখেছি, ক্যাপ্টেনসি করতে। উনি সাংবাদিকদের সামনে খুবই বিব্রত থাকতেন। কাজেই বলছি, খেলাধুলা করুন আর যাই করুন, লেখাপড়া বাদ দিয়ে কোনও কিছু করা ঠিক নয়। হয়তো খুব ভালো ফল খেলোয়াড়রা করতে পারবেন না, কিন্তু আসল বিষয়গুলো তো তাকে শিখতে হবে। তাই লেখাপড়া বাদ দিয়ে যদি কেউ শুধু খেলাধুলা করতে যায়, মা-বাবাদের উচিত এ জায়গায় তাদের একটু নজর দেওয়া। এটুকু বাদ দিলে যে খেলাধুলা করতে চায়, তাকে খেলাধুলা করতে দেওয়া উচিত। আমি এটা বিশ্বাস করি।

বাংলা ট্রিবিউন:এবার ভিন্ন একটা বিষয়। বাংলাদেশ প্রায় ষোলো কোটি মানুষের দেশ। কিন্তু এখনও আমরা অলিম্পিক গেমস থেকে শারীরিক সক্ষমতা প্রমাণ করে যে খেলাগুলো থেকে পদক নিয়ে পেতে হয়, তা আমরা পারিনি। তাহলে আমরা অন্যান্য দেশের খেলোয়াড়দের চেয়ে ঠিক কোন জায়গায় পিছিয়ে? আপনার কাছে প্রশ্নটা হলো, মুশফিকের যে সময়টা বিকেএসপিতে কেটেছে, তার আগের সময়টুকুতে আপনারা তার খাওয়া-দাওয়া বা পুষ্টির ব্যাপারটা কতটুকু দেখভাল করেছেন?

মাহবুব হামিদ তারা: বাড়িতে থাকাকালীন স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়াটাই সে করত। তবে বিকেএসপি থেকে যখন যে শীত বা গ্রীষ্মে ছুটিতে আসত, তখন দেখতাম তাকে বিকেএসপি থেকে লম্বা একটা তালিকা দেওয়া হয়েছে। একমাস বা দেড়মাস বাড়িতে থাকার সময় সে কখন কী খাবে, না খাবে, তার রুটিন চেকআপ, কী করা লাগবে– এর একটা চার্ট দেওয়া হতো। সেটা আমরা মেনে চলার চেষ্টা করেছি, তাকে সাপোর্ট করার চেষ্টা করেছি। আর অলিম্পিকের যে কথাটা বললেন, সেক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হলো, বাচ্চারা শুধু খেলতে চাইলেই হবে না, তাদের সেই সরঞ্জামাদি, সেসব সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। এখন তো দেখা যায় অলিম্পিকে আমাদের খেলোয়াড়রা বাছাইপর্বেই বিশ জনের মধ্যে বিশতম, দেড়শ জনের মধ্যে একশ ত্রিশতম হয়েছে। এ কারণে অলিম্পিকে ভালো করতে হলে বাচ্চাদের মধ্যে যে সমস্ত গুণ থাকা দরকার, সেসব তৈরির সুযোগ করে দিতে হবে। এটা আমাদের দেশে খুব বেশি করা হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না। মূল কথা হলো, অলিম্পিকের জন্য কাউকে তৈরি করতে হলে আমাদের বাচ্চাদের জন্য যে মানের সুযোগসুবিধা, পুষ্টির ব্যবস্থা থাকা উচিত, সেটা করা হচ্ছে না বা দেওয়া হচ্ছে না। আর বাছাইটাও তেমন হওয়া দরকার। যারা ক্ষমতাধর, তারা যেন বাছাই না করেন। যোগ্যতাসম্পন্ন যারা, তাদেরই বাছাইয়ের মাধ্যমে বের করে আনা দরকার। তাদের দীর্ঘমেয়াদি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুললে হয়তো এই পঞ্চবার্ষিকী মেয়াদে আমরা পদক পাব না। তবে পরের পঞ্চবার্ষিকী মেয়াদেই আমরা পদক পেয়ে যাব। এটাই আমার বিশ্বাস।

বাংলা ট্রিবিউন : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

মাহবুব হামিদ তারা: বাংলা ট্রিবিউন ও এর পাঠকদেরও ধন্যবাদ।

/এফএ/এমএনএইচ/
 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।