সকাল ১১:৪৬ ; শনিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৮  

মির্জা গালিব : বিনি পয়সার কাজল || জাভেদ হুসেন

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

২০১৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গালিবের বয়স হল ২১৭। ‘বেঁচে থাকলে’ কথাটা বলা অর্থহীন কারণ তিনি বহাল হয়ে বেঁচে আছেন উর্দু সাহিত্য আর সব ভাষার কাব্য রসিকদের মাঝে। একজন কবি যিনি কঠিন প্রিয় (মুশকিল পসন্দ) বলে পরিচিত, তিনিই আবার ঐ ভাষার মানুষের মাঝে তুমুল জনপ্রিয়। এটা একটা ধাঁধাঁই বটে। গালিবের সমকালেই বামন কবিরা লেখলেন- 

যুবানে মীর সামঝা কালামে মির্যা সমঝে
আপকি কাহা আপ সামঝে য়া তো খুদা সামঝে

(মীরের কবিতা বুঝলাম, মির্যার কাব্যও বুঝি 
আপনার লেখা আপনিই বোঝেন নয়তো খোদা বোঝেন)

মীর মানে মীর তকি মীর মির্যা মানে মির্যা রফি সওদা। গালিব পাল্টা বললেন- 

নেহি সাতায়িশ কা তামান্না না সিলে কা পরওয়া
মেরে আশআর মে গর মানি নেহি, না সহি 

(প্রশংসার আশা নেই প্রতিদানের পরোয়া করি না
আমার কবিতায় যদি কোনো অর্থ না থাকে, না থাকুক)

প্রশংসার আশা তিনি করেননি। কিন্তু কবি তো, ভবিষ্যৎটা ঠিকই দেখতে পেয়েছেন- 

হুঁ গর্মিয়ে নিশাতে তাসাব্বুর সে নগমা সন্জ 
ম্যায় আন্দালিবে গুলশানে না আফরিদা হুঁ

(ভাবনার আনন্দের উত্তাপে গেয়ে চলেছি গান 
আমি যে বাগানের পাখি তার এখানো জন্ম হয়নি।) 

এতো মনে হচ্ছে যেন নিজেকে প্রবোধ দেয়া। কবি যখন এই পঙক্তি লিখছেন, তখন তিনি আপাদমস্তক দেনায় জর্জরিত, সংসার চালানোর টাকাও নেই। চিঠিতে লিখছেন- 
‘..... বিবি, শিষ্য-বন্ধু, সবার জন্য খরচা বন্ধ। আয় সেই একশো বাষট্টি টাকা। বিরক্তি এসে গেছে। দিন কাটানো মুশকিল। ভাবছি কী করি। এদিকে শীত পড়েছে জাকিয়ে। মদ, মাংশ, গোলাপ- সব কিছু বন্ধ করলেও মাসে সাশ্রয় হয় কুড়ি-বাইশ টাকা। কয়েক দিনের খরচ চলে সংসারের। ’
গালিবের বাপ-দাদা ছিলেন মধ্য এশিয়া থেকে আসা যোদ্ধা। পসার তাদের ভালোই ছিলো। পাঁচ বছর বয়সে বাবা গেলেন, কয়েক বছর পর পিতৃপ্রতিম চাচা। সম্পত্তি ইংরেজরা নিয়ে মাসোহারার ব্যবস্থা করে দিলো। সেই মাসোহারা হাজার টাকা থেকে কমে কয়েকশ’ টাকায় ঠেকলো। এদিকে গালিব পড়েছেন কবিতার প্রেমে, সংসারে নিতান্ত যেন অর্কমা, অসফল মানুষ। এই অপবাদ বোধ হয় বেঁচে থাকতেও তাঁকে শুনতে হয়েছে, নয়তো কেন লিখবেন- 

ইশকনে গালিব কো নিকম্মা কর দিয়া 
বরনা হাম ভি আদমি থে কাম কে 

(এই প্রেম গালিব কে নিষ্কর্মা করে দিলো
নয়তো আমিও ছিলাম খুব কাজের মানুষ) 
এদিকে হাতে টাকা থাকুক না থাকুক, ন্যূনতম খরচের মধ্যে আছে বিদেশি মদ। সে আমলে ফ্রান্স থেকে আমদানি করা ‘ওল্ড টম’ নামের মদ ছাড়া অন্য কিছুতে ঠোঁট ছোঁয়াতেন না। এমনি করে এক ইংরেজ বেনিয়ার কাছে দেনা জমলো সেই আমলেই চল্লিশ হাজার টাকা। বেনিয়া দিলো মামলা ঠুঁকে। গালিবকে আদালতে প্রশ্ন করা হলো, শোধ করতে পারবেন না জেনেও এতো টাকা ধার নিলেন, তাও মদ কিনতে? গালিব উত্তরে বললেন-

কর্য কে পিতে থে ম্যায় পর সামাঝতে থে কে হাঁ
রং লায়েগি হামারি ফাকামস্তি ইক দিন

( কর্জ করে মদ খেয়েছি তবে যাচ্ছে ঠিকই বোঝা
খালি পেটের এই মজা এক দিন জগতের মাঝে রঙ ছড়াবে)
বিচারক ছিলেন মুফতি সদরউদ্দিন, নিজেও বড় কবি। তিনি মুচকি হেসে নিজে দেনা শোধের ব্যবস্থা করে গালিবকে রেহাই দিলেন। আর গালিব নিজে ঋণী থেকে পুরো পৃথিবীকে তাঁর কাছে ঋণী করে গেলেন।
মানুষটির দিকে তাকালে আসলেও অবাক হতে হয়। অভিজাত বংশের ছেলে, থাকেন ভাড়া বাড়িতে, চতুর্দিকে শুধু দেনা। সাত জন সন্তান জন্ম নিয়ে কেউ পনের মাসের বেশি বাঁচলো না। দত্তক নিলেন ভাগনে আরিফকে, কম বয়সেই বোঝা যাচ্ছিলো যে, দূর্দান্ত কবি হবে। সেও মারা গেলো একুশ বছর বয়সে। মদ খান বলে বিবি উমরাও বেগম তাঁর হাতের ছোঁয়া খান না। এমনকি টাকা দিয়ে পাশা খেলার দায়ে কয়েক মাস কয়েদ পর্যন্ত খাটলেন। তবু তাঁর মাঝে কৌতুকবোধের অবাধ প্রবাহ আসে কোথা থেকে?
নিজের প্রচলিত প্রথাগত ধর্ম চর্চার ওপর কোন আস্থা নেই। স্ত্রী সম্পূর্ণ বিপরীত, গালিবের জবানিতে তাঁর ঘর-ফতেহপুর জামা মসজিদ। রমজানের মাসে দিনের বেলা ঘরে বসে পাশা খেলছেন। এক ধার্মিক বন্ধু দেখা করতে এসে এই হাল দেখে বললেন- মির্যা, হাদিসে পড়েছিলাম রমযান মাসে শয়তানকে আটকে রাখা হয়। তোমার ঘর দেখে তো মনে হচ্ছে হাদিসটা ভুল। গালিব হেসে বললেন- জনাব, হাদিস বিলকুল ঠিক আছে, তবে শয়তানকে যে ঘরে আটকে রাখা হয়, এটাই সেই ঘর।
বন্ধুদের জন্য গালিব প্রাণ উৎসর্গ করতেও রাজি। ঘরে বসে নিজেই আঠা দিয়ে খাম বানিয়ে বন্ধুদের অবিশ্রান্ত চিঠি পাঠাতেন। উত্তর না পেলে অভিমান করতেন। সেই চিঠিতেই আধুনিক চলিত উর্দু গদ্যের সৃষ্টি হলো। কী নেই সেই চিঠিতে- নিজের রোগের বর্ণনা, কাব্য-দর্শন আলোচনা, বন্ধুদের নিয়ে রসিকতা...। পড়লে কে বলবে এটা যুগের সর্বশ্রেষ্ট কবি, দার্শনিকের চিঠি! নজির দেখুন মুনশি হরগোপাল তুফতাকে ১৮৫৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর লিখছেন- 
‘অভিমান করেই থাকবে, নাকি অভিমান ভঙ্গ করবে। অভিমান করে যদি চিঠি লিখবে না তো অভিমানের কারণটাই চিঠি লিখে জানাও। আমি এই একাকীত্বে শুধু চিঠির ভরসা নিয়েই বেঁচে আছি। যার চিঠি এলো, ধরে নিলাম সে নিজেই এলো। খোদার শুকুর, দু-চারটে চিঠি আসেনি এমন কোনো দিন হয় না। এমনও হয় ডাক হরকরা দুবার ডাক দিয়ে গেছে । আমার মন এমন হলে খুশি হয়ে ওঠে। চিঠি পড়ে আর জবাব লিখেই দিন কেটে যায়। দশ-বার দিন তোমার চিঠি আসছে না। অর্থাৎ তুমি আসছো না । কারণ কী? চিঠি লিখো, না লিখলে তার কারণ লেখো। আধ আনার জন্য কিপটেমি করো না। তাও যদি করতে হয়,তাহলে বেয়ারিং চিঠি পাঠাও।’
বন্ধুদের জন্য কী আকুলতা! ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে দিল্লি তছনছ হয়ে গেছে। মোঘল অভিজাতদের কে কোথায় ছড়িয়ে গেছে, কেউ জানে না । গালিব বন্ধুদের বিরহে কাতর হয়ে আছেন। মাঝে মাঝেই খবর আসে, একেক বন্ধুর নিহত হওয়ার খবর। গালিব সেই দুঃখ চিঠিতে বলছেন-
‘এতো বন্ধু মরলো, এখন যদি আমি মরি, তবে আমার জন্য কাঁদার কেউ থাকবে না। লোকে বলে- মরনেওয়ালার সাথে শেষ বিচারের দিন দেখা হবে। সেখানেও কী ছাই দেখা হবে- পূণ্যবানের সারি আলাদা, পাপীর আলাদা, শিয়া এক জায়গায়, সুন্নি আরেক জায়গায়। আমার তো সব দলেই বন্ধু আছে।’
নিতান্ত পারিবারিক অভাব, অনটন চিঠিতে লিখতে কসুর করছেন না। সদ্য মোগল যুগ শেষ হওয়া সময়ে, ব্যক্তি নামের ধারণাটা তখনো দানা বাঁধেনি। চিঠি-পত্র নিতান্ত কেতাদুরস্ত ব্যাপার। সেই সময়েই এক চিঠিতে সৈয়দ ইউসুফ মির্যাকে লিখছেন-
‘আমার এক ভাই পাগল, মারা গেলো। তার চার বাচ্চা, তাদের মা জয়পুরে পড়ে আছে। এই তিন বছরে ওদের একটা টাকা পাঠাতে পারিনি। ভাইঝি আমায় কী বলবে- আমারও এক চাচা আছে । আমার আপনজন রাস্তায় ভিক্ষে করবে আর আমি তা দেখবো। এমন অঘটন সহ্য করতে বুকের পাটা লাগে।’
এ তো নিতান্ত আটপৌরে আমাদেরই জীবনের কথা। এখানে কবি নামের বাহ্যিক অস্তিত্ত্ব ধুলো মাটির সঙ্গে সন্তান হারানোর বেদনার্ত অশ্রুতে মিশে, বন্ধুর চিঠি না পাওয়ার অভিমানে সিক্ত হয়ে একাকার হয়ে আছে। এ তো আমারই জীবন, গালিব যে একেবারে আমারই কোনো বন্ধু প্রতিবেশী  অথবা আমি নিজে! এ তো নিতান্ত আটপৌরে আমাদের জীবনের কথা। এখানে কবি নামের বাহ্যিক অস্তিত্ত্ব ধুলো-মাটির সাঙ্গে, সন্তান হারানোর বেদনার্ত অশ্রুতে মিশে, বন্ধুর চিঠি না পাওয়ার অভিমানে সিক্ত হয়ে একাকার হয়ে আছে। গালিব যে একবারে আমারই কোনো বন্ধু, প্রতিবেশী, অথবা আমি নিজে। 
অথচ ও দিকে মর্যাদাবোধ টনটনে। এমন মারাত্মক অভাবের কালে ডাক পেলেন দিল্লি কলেজে ফারসির অধ্যাপক হওয়ার। কলেজের প্রিন্সিপাল গালিবের বন্ধু মানুষ। যাওয়া-আসা ছিলো। গালিব চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলেন। সেকালে মান্যজন এলে সদর দরজা হতে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে যাওয়ার নিয়ম ছিলো। গালিব পালকি নিয়ে অপেক্ষায় রইলেন। কেউ এলো না বলে ফিরে গেলেন। পরে প্রিন্সিপাল সাহেব বার্তা পাঠালেন- আপনি এবার এসেছেন কর্মপ্রার্থী হয়ে, তাই আমি আপনাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে যেতে পারি না। গালিব উত্তর পাঠালেন- সম্মান বাড়বে বলে চাকরি নিতে চেয়েছি, যা আছে সেই সম্মানও যদি কমে তবে এমন চাকরিকে দূর থেকেই সালাম। 
এ এক অম্ভুত সংমিশ্রণ। এক দিকে বাস্তব জীবনের চাবুকের আঘাত, অপর দিকে সেই বাস্তবকে অতিক্রম করে, অস্বীকার করে নয়, গালিব যেন নিতান্ত আমাদের মতো মানুষ। আর এই জন্য দূরুহতম এই কবি জনপ্রিয়তমও বটে।       

সুর্মায়ে মুফত নযর হুঁ মেরি কিমত য়ে হ্যায়
কি রহে চশমে খরিদ্দার পে ইহসাঁ মেরা 

(বিনি পয়সার কাজল আমি মূল্য এতটুকু
খরিদ্দারের চোখে যেন কৃতজ্ঞতা থাকে)

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।