রাত ১১:১৪ ; সোমবার ;  ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮  

বিমূর্ত শিল্পকলার ধারণা ও বাস্তবতা || পর্ব-১

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

শরীফ আতিক-উজ-জামান ||

বিমূর্ত ধারার আবির্ভাবের পূর্বেই চিত্রকলাকে রং ও গড়নের সম্মিলন বলে মনে করা হতো। সঙ্গীত ও স্থাপত্যকলাকে বিশুদ্ধ শিল্পের দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হতো যা কোনো কিছুকে অনুকরণ করে সৃষ্ট নয়। রং ও গড়নের মাধ্যমে যে ছবি নির্মিত হয় তা আসলে কিছুই উপস্থাপন করে না―এই ধারণা তাৎক্ষণিকভাবে অনেকে মেনে নিতে পারেননি। যদি চারপাশের দৃশ্যমান বিষয়গুলোকে শুধু ফর্মের বৈশিষ্ট্য দিয়ে বিচার করা হয় তাহলে নিশ্চিত শিল্পী ছবিতে তার বিকৃতি বা আকৃতির পরিবর্তন ঘটাচ্ছেন। শুধু ফর্মের গড়ন পাল্টে নান্দনিক মান সৃষ্টি করা যায় একদা তা ভাবনার অতীত ছিল। এই ফর্মগুলো যে সকল বস্তুর অন্তর্গত বা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা ব্যক্তি বা স্থান, বাস্তব বা পৌরাণিক চরিত্র যা-ই হোক না কেন সেই সময়কে চিহ্নিত করে। শিল্পীর শিল্প সৃষ্টির সামর্থ ও ব্যক্তিত্বের মধ্য দিয়ে তার ইতিহাস অতিক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্ট নয়। বিমূর্ত শিল্পে বাহ্যিক উপস্থাপনার একটি মূল্য আছে। ক্যানভাসের ওপর নকশা ও নির্মাণের ক্ষেত্রে বস্তুর প্রকৃত আকার বা গঠন স্ব-কল্পিত গড়নের নিচে ঢাকা পড়ে যায়। বলা হয়ে থাকে, যে শিল্পীরা এই শিল্পের চর্চা করেন, কিন্তু বস্তুর দৃশ্যগ্রাহ্য রূপ বা প্রকৃত আদল চিত্রায়নে মুন্সিয়ানার ছাপ রাখতে পারেন না তারাই দ্রুত বিমূর্তায়নকে স্বাগত জানান। এই বিষয়টির মধ্যে সত্য থাকলেও উল্লেখ করা জরুরি যে প্রচুর বাস্তব ও অবয়বধর্মী কাজ করার পরই সফল বিমূর্তায়ন সম্ভব হয়। এই নতুন শৈলী শিল্পীদের রং ও গড়নের প্রতি মনযোগী হতে শেখাল। আর তারা শিখলেন স্থান ও সময়কে অতিক্রম করতে। তাই তাদের পক্ষে দূরবর্তী কাল ও স্থানের শিল্পকর্মের প্রতি আগ্রহী হওয়া সম্ভব হলো। তারা এমন জিনিসের উপস্থাপনে আগ্রহী হলেন একদা যা ধারণাতীত ছিল। আদিম শিল্পের সাথে বস্তুর বিকৃত গঠন মিলিয়ে তারা যা সৃষ্টি করলেন তা সমালোচকরা শিল্পপদবাচ্য নয় বলে মন্তব্য করলেন। কিন্তু রাসকিন তার Political  Economy  of  Art-এ আগেই মধ্যযুগ ও রেনেসাঁর চিত্রকর্ম সংরক্ষণের তাগিদ দিয়েছিলেন। একদা যা ছিল কুৎসিত ও দানবিক তা হয়ে উঠল খাঁটি ও বিশুদ্ধ শিল্পকর্মের নিদর্শন। বিমূর্ত শিল্প বাস্তবানুগ আদল অগ্রাহ্য ও ইতিহাসের সীমানা অতিক্রমের মধ্য দিয়ে সর্বজনীন হতে পেরেছে। এর সাথে মুক্ত-জ্যামিতি তাকে এমন এক মাত্রা দিয়েছে যা ‘চিত্রকলা শুধুমাত্র দৃশ্যগ্রাহ্য বস্তুর অনুকৃতি’―এই ধারণাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। তবে আজ বিমূর্তবাদী ও তাদের সহগামী পরাবাস্তববাদীরা বেশি বেশি করে বস্তুর সাথে সাদৃশ্য খুঁজছেন এবং প্রাকৃতিক ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হওয়ার সংকল্প থেকে খানিকটা হলেও সরে এসেছেন। তবে তার অর্থ এই নয় যে বিমূর্ত চিত্রকলার মৃত্যু হয়ে গেছে যা এর বিরুদ্ধবাদীরা গত দুই-তিন দশক ধরে দাবি করে আসছেন। তারা বলছেন যে এক মৌসুমে বড় এবং আরেক মৌসুমে ছোট স্কার্ট দেখে দেখে মানুষ যেমন ক্লান্ত হয়ে পড়ে ঠিক তেমনি রং আর আকারের গঠন দেখে দেখে ক্লান্ত মানুষ আবার বস্তুর আদলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। আর এর অর্থ হলো বিমূর্তায়নের মৃত্যু। তারা আরো যুক্তি দেখাচ্ছেন যে পিকাসো ও মন্ড্রিয়েন যা করেছেন তারপর বিমূর্ত শিল্পকলায় তরুণদের যোগ করার মতো খুব কম বৈশিষ্ট্যই অবশিষ্ট আছে। প্রতিটি নতুন মতবাদ চলমান মতবাদের প্রতিক্রিয়ারূপে সৃষ্টি হয়―এমন গৎবাঁধা ধারণা রয়েছে প্রতিটি শিল্পীর মনে। তাছাড়া নতুন ফর্মের স্রষ্টাদের সবসময়ই যুদ্ধ করতে হয়েছে সেইসব শিল্পীদের সাথে যারা পূর্বেকার সময়ের ফর্ম নিয়ে কাজ করেছেন। বিগত সময়ের অনেক মতবাদের সৃষ্টি অন্য মতবাদের বিরুদ্ধাচারণের মাধ্যমে, যেমন―গোথিকের বিরুদ্ধাচারণের মাধ্যমে রেনেসাঁ এবং ম্যানারইজম ও রোকোকোর বিরুদ্ধাচারণের মাধ্যমে যথাক্রমে ব্যারোক ও নিও-ক্লাসিসিজমের উৎপত্তি। কিন্তু নতুন মতবাদের উৎপত্তির এটাই একমাত্র কারণ নয়। একটি জাতির নিজস্ব-সত্তার মধ্যে নিহিত প্রকৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আবিষ্কারের প্রক্রিয়া হিসেবেও নতুন ধারা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও বড়সড় বৈশ্বিক পরিবর্তনের ফল হিসেবে, স্বাধীনতা লাভ, ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ অবসানের ফলে বা ভিনদেশী সাংস্কৃতিক উপাদানের মিশ্রণের ফলেও তা হতে পারে। ধ্রুপদী শিল্পধারার অধোগতির কারণ দেহসৌষ্ঠব চিত্রায়নের ওপর বেশিমাত্রায় গুরুত্ব প্রদান। একটি চলমান শিল্প মতবাদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া তখনই দৃশ্যমান হয় যখন নতুন মতবাদ খুব জোরালো হয় এবং পুরনো মতবাদ বা শিল্পধারা দুর্বল হয়ে পড়ে। যদি প্রভাববাদের মতো কোনো শিল্প মতবাদ বর্তমান সময়ের নিকটবর্তী ও ব্যাপকভাবে চর্চিত হয় তাহলে প্রতিক্রিয়ার ভিতর দিয়ে নতুন ধারা সৃষ্টির বিষয়টি খুব ধোপে টেকে না। প্রভাববাদের বিপরীতমুখি ধারা সৃষ্টি হতে হলে তা কতটা শিল্পী ও দর্শক কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে সে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রভাববাদীদের যখন শুধুমাত্র সূর্যালোকের আলোকচিত্রী ও দানবীয় অবাস্তবতার স্রষ্টা হিসেবে আক্রমণ করা হলো তখন তাদের গুরুত্ব কমতে শুরু করল। পরবর্তীসময়ে কয়েকটি শিল্পগতিধারা বিভিন্ন দিক থেকে একসাথে এসে জড়ো হলো। কেউ কেউ একেবারে সরল প্রাকৃতিক গড়ন, কেউ আবার একেবারে আকারহীনতা নিয়ে হাজির হলেন যাকে প্রভাববাদের প্রতি এক ধরনের ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা চলল। এক দল প্রভাববাদ কর্তৃক বাতিলকৃত বস্তুনিচয়ের পুনঃসমাগম ঘটাতে লাগলেন। আরেকদল প্রকৃতির আদল তুলে ধরার ক্ষেত্রে যে বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লিখিত শিল্পীরা আমলে নেন নি তা ফিরিয়ে আনতে প্রয়াসী হলেন। ১৮৮০ সালে প্রভাববাদের যে সব বেশিষ্ট্য এই প্রতিক্রিয়ার সূচনাকালীন প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল তার মাঝে ধ্রুপদী শিল্পীরা সুস্পষ্ট রৈখিক ফর্মের অভাব ও এক ধরনের অস্পষ্টতা দেখতে পেয়েছিলেন। সেই কারণে রেনোয়া প্রভাববাদ থেকে সরে এসেছিলেন বলে অনেকে মন্তব্য করে থাকেন। অন্য শিল্পীদের মতে প্রভাববাদ খানিকটা বিশৃঙ্খল ও পদ্ধতিহীন। আর নব্য-প্রভাববাদীরা পূর্বসূরীদের রং ব্যবহারের কৌশল গ্রহণ করেছিলেন, তবে তা ধ্রুপদী ধারাকে সমর্থন না করলেও যথেষ্ট গঠনমূলক ও পরিকল্পিত ছিল। কিন্তু অনেকেই বিশ্বাস করতেন যে প্রভাববাদ অনেকটাই আলোকচিত্রধর্মী, অনেক বেশি নৈর্ব্যক্তিক। কিন্তু প্রতীকবাদীরা তাদের কাজে একধরনের জোরালো অনুভূতি ও নান্দনিক সক্রীয়তা তুলে ধরেন। ভিন্ন মতবাদের শিল্পীরা প্রভাববাদীদের অসংগঠিত বলে মনে করতেন। কিন্তু প্রভাববাদীরা যদি শিল্পীর অনুভূতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন তাহলে তাদের উত্তরসূরীরা বিশেষ মানসিক অবস্থা এবং ভাব নির্মাণ ও প্রদর্শনের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলেন। ঐতিহাসিক সত্য হলো, ১৮৮০’র দশকে প্রভাববাদের বিরুদ্ধে যে প্রতিক্রিয়া তা এই শিল্পধারার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সম্ভাবনার আগেই এসে গিয়েছিল। একটি শিল্পকর্মে স্থায়ী ভাব (motif) ভিন্ন ভিন্ন রঙের বৈচিত্র্যে উপস্থাপন ১৮৯০’র দশকের বৈশিষ্ট্য। প্রভাববাদের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় প্রথমে ফ্রান্সে, পরে সমগ্র ইয়োরোপ জুড়ে। এই প্রতিক্রিয়া ছিল শিল্পীর জীবনের অভিজ্ঞতাজাত। ভ্যান গঘ ও গগ্যাঁ তাদের চিত্রকলায় নিজেদের সমাজ-বিচ্ছিন্নতাকে নানা বর্ণে তুলে ধরেছেন। গগ্যাঁর বন্ধুবলয়ে আরো শিল্পীরা ছিলেন যারা পরিণত সময়ে বুর্জোয়া সমাজের আশির্বাদ ছেড়েছেন বা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। ১৮৮৫ সালের দিকে একজন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ শিল্পকলাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করবেন এমন ভাবনাটাই অবাস্তব ছিল। তখন শিল্পীর স্বাধীনতা আর নৈতিক সততা ছাড়া কিছু ছিল না। প্রভাববাদ প্রকৃতিকে অনুভূতি-নির্ভর চিত্রকল্পের জন্য একটি ব্যক্তিগত ও অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে রূপান্তর করেছে। সেই সাথে অসুখি মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে পুঁজিবাদের দিকে আকৃষ্ট করেছে। প্রাথমিক দিকেও প্রভাববাদের একটি নৈতিক ভিত্তি ছিল। এর প্রথাহীন দৃশ্যকল্প, অবিরত পাল্টে যাওয়া বহিঃপ্রকৃতির অন্বেষণ বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত ছিল। ১৮৬০ থেকে ১৮৭০ সালের মধ্যে শহরকেন্দ্রিক যে স্বাচ্ছন্দ্য তা তখনকার চিত্রকলার বিষয় ও নান্দনিক ভাবনার মধ্যে সক্রীয় ছিল। শিল্পকে তারা একান্ত নিজস্ব নান্দনিক পরিতৃপ্তির বিষয় বলে মনে করতেন। সেখানে উদ্দেশ্য ও ধারণার বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়নি। বুর্জোয়া সামাজিকীকরণের ধারণাটি সম্প্রদায়, পরিবার ও গীর্জা থেকে সরে এসে রাস্তা, বিশ্রামাগার ও ক্যাফে সর্বত্র বাণিজ্যিক আদলে ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৮৮০ সাল পর্যন্ত প্রভাববাদী শিল্পের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সমঝদার ছিল না এবং নব্য-প্রভাববাদীরা দেহসৌষ্ঠবের বিশালতা ফিরিয়ে নিয়ে এলেন। ১৮৮০ ও ১৮৯০-এর দশকের ফরাসি শিল্পীরা প্রভাববাদীদের আক্রমণ করেছেন তার কাঠামো বা গড়নহীনতার জন্য। গগ্যাঁর ছবির যে সব জিজ্ঞাসাসূচক শিরোনাম, ‘আমরা কোথা থেকে এসেছি? আমরা কে? আমরা কোথায় যাচ্ছি?’ ইত্যাদি মনের বিশেষ এক অবস্থা। কিন্তু তাদের বিস্তর মানসিক অবস্থা ও নৈতিক নিরাপত্তাহীনতার পিছনে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে সে সম্পর্কে শিল্পী খুব ওয়াকিবহাল ছিলেন না। তাই তারা একধরনের ধর্মসদৃশ বিশ্বাস বা কোনো আদিম বা সুশৃঙ্খল সমাজের প্রথা ও আদর্শকে তাদের সামগ্রিক আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য অপরিহার্য মনে করেছেন। মধ্য ও আদিম যুগের চিত্রকলার প্রতি তাদের যে আগ্রহ তা থেকেই তাদের Integral Nationalism-এর ধারণা তৈরি হয়েছিল। শিল্পীদের নিয়ে ভ্যান গঘের সঙ্ঘ তৈরির উদ্যোগ ছিল পুঁজিবাদ কর্তৃক ভেঙে দেওয়া মানুষের সামাজিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। তাদের Composition-এর তত্ত্ব খুবই প্রথাগত এবং প্রভাববাদীরা তা পরিত্যাগ করেছিলেন। বস্তুকে জড়ো করে কিছু রচনা করার প্রচেষ্টা যেমন প্রকৃতির মাঝে বিদ্যমান শৃঙ্খলার ধারণাজাত তেমন শিল্পীর মানসিক অবস্থা থেকেও উদ্ভুত, কিন্তু উভয়ক্ষেত্রেই বস্তুর আকার বিকৃতিকরণ বিশেষ এক গুরুত্ব বহন করে। কেউ কেউ একখানা ক্যানভাস চান গীর্জার মতো সফেদ ও পবিত্র যেখানে সবকিছু দৃশ্যগ্রাহ্য, সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্নভাবে রঙে-রেখায় তুলে ধরা যায়। আবার অন্যরা রং ও রেখা ব্যতিরেকে জড় বা চলমান বস্তুর অর্থহীন অবস্থান নির্বাচন করেন। এই সমস্যাগুলো স্যুরাতের কাজে লক্ষ্য করা যায়, তবে সেই সমস্যা ভিন্নভাবে সমাধান করা হয়েছে। উপরে বর্ণিত চিত্রকলা ছাড়াও ফ্রান্সে ভিন্ন ধরনের চিত্রকলার প্রচলন ছিল। তবে শিল্পগতিধারার ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় যে রক্ষণশীল ও শিক্ষায়তনিক ধারার শিল্পকলাও সময়ের আবর্তে পড়ে পাল্টে যায়। প্রভাববাদের বিরুদ্ধ-প্রতিক্রিয়াসমূহ শিল্পী ও শিল্পরসিক উভয়ের প্রতিক্রিয়া থেকেই উদ্ভূত যদিও অনেকে মনে করেন শিল্পের বিরুদ্ধবাদিতার বীজটি তার প্রকৃতির মাঝেই নিহিত থাকে। যদি প্রভাববাদ-পরবর্তী শিল্প নির্মাণের ঝোঁক চুড়ান্ত বিষয়ীকেন্দ্রিক ও বিমূর্ত-নির্ভর বলে সনাক্ত হয়ে থাকে তবে তার সূত্র প্রভাববাদের মাঝেই ছিল। মন ও প্রকৃতি এবং ব্যক্তি ও সমাজের নতুন আদর্শিক বিরুদ্ধবাদিতা সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণ থেকে আগত যা প্রভাববাদের আগেও ছিল এবং আজকের দিনে তা অনেক বেশি প্রকট। ভ্যান গঘ বা গগ্যাঁর কাজে যে আর্তি, অস্থিরতা ও মূল্যবোধ  সাম্প্রতিক কালের অজস্র শিল্পী সেই একই দ্বান্দ্বিক অবস্থা উপলব্ধি করছেন। বাস্তববাদী ও বিমূর্ত শিল্পকলার বিরুদ্ধে যে অবস্থান তার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে তা যথেষ্ট অশৈল্পিক। কিন্তু এর সমর্থক ও স্রষ্টারা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলেন। তাদের মতে এই শিল্প শর্তনিরপেক্ষভাবে নান্দনিক এবং শাশ্বত নিয়মের অনুসারী। বিমূর্ত চিত্রশিল্পী বাহ্যিক জগতের সরাসরি উপস্থাপনাকে অবজ্ঞা করেন, কারণ তা তাদের বিবেচনায় যথেষ্ট যান্ত্রিক এবং সেখানে শিল্পীর নিজস্ব অনুভূতি ও কল্পনার কোনো জায়গা নেই। বিমূর্তায়ন বস্তুর অন্তর্নিহিত নির্যাস অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকে। দৃশ্যগ্রাহ্য বা অবয়বগত শিল্পকে অধিকমাত্রায় গুরুত্ব দিলে সেখানে শুধু নিয়মতান্ত্রিক কিছু গড়ন দেখা যাবে, শিল্পীর কল্পনার কোনো ছোঁয়া পাওয়া যাবে না। একটি বস্তুর শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য ও নতুন অর্থ শুধুমাত্র বিমূর্তায়নের মাঝেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এই বিমূর্ত প্রকাশভঙ্গি একান্তই ব্যক্তিগত। তবে এই মন্তব্য নিতান্তই একপেশে এবং উপস্থাপনের ভ্রান্ত ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রাচীন চিত্রকলায় পরিপ্রেক্ষিত, দেহসৌষ্ঠব, ছায়াসম্পাত ইত্যাদি ছিল প্রকাশের উপায়। সমস্ত চিত্রিত বিষয়াবলী, তা সে যতই বাস্তবানুগ হোক না কেন, এমনকি তা যদি আলোকচিত্রও হয়ে থাকে, তাকে মূল্যবোধ, পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে আকার দেওয়া হতো এবং তা তার সারবস্তু তুলে ধরতো। অন্যদিকে অভিজ্ঞতার অতীত ‘বিশুদ্ধ শিল্প’ বলে আসলেই কিছু নেই। সমস্ত ফ্যান্টাসি, আনুষ্ঠানিক গড়ন ও হাতের অবিরাম আঁকিবুকি কোনোপ্রকার নান্দনিক জ্ঞান ছাড়া অভিজ্ঞতার আলোকেই হয়ে থাকে। প্রভাববাদীদের দৃষ্টান্ত থেকেই এই বিষয়টি পরিষ্কার। এগুলো আলোকচিত্র বা ফ্যান্টাসিধর্মী হতে পারে। রোমান্টিক ও ধ্রুপদী শিল্পকলার বৈশিষ্ট্য বর্তমান থাকা সত্ত্বেও প্রকৃতির যে স্থায়ী সুর তাদের কাজে ছিল তা খুব প্রশংসিত হয়নি। প্রাচীনপন্থীরা বস্তুর সৌন্দর্যকে নিখুঁত করে তুলে ধরতে চাইতেন, আর বিমূর্ত শিল্পীরা তার কদর্যতাকে। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে বিরোধিতার ক্ষেত্রটি খুব প্রকট নয় বলেই অনেক সমালোচক মনে করেন। বাস্তববাদী ও বিমূর্ত ধারার শিল্পীরা নিজেদের মনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। প্রথম দল দৃশ্যগ্রাহ্য জগৎকে পুনঃনির্মাণ করেন সঠিক পরিপ্রেক্ষিত, রূপরীতি ও রঙের সঠিক মাত্রা প্রয়োগের মাধ্যমে; আর দ্বিতীয় দল মনের খেয়ালে রং-রেখার মুক্তবিন্যাসে নতুন রূপরীতি প্রয়োগ করে দৃশ্যগ্রাহ্য বস্তুর নতুন এক আদল তৈরির মাধ্যমে। কিন্তু প্রকৃতির দৃশ্যগ্রাহ্য রূপের চিত্রায়ন যেমন সৃষ্ট শিল্পকর্মের নান্দনিক মূল্যের নিশ্চয়তা দেয় না, তেমনি বিমূর্তায়নও বাস্তববাদ থেকে উৎকৃষ্ট শিল্পকর্ম এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। শুধু বলা চলে যে শিল্পধারার পরিবর্তন মানুষের রুচি ও ভাবনার পরিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে। শিল্প সমালোচক আলফ্রেড এইচ বার বিশ্বাস করেন যে দৃশ্যগ্রাহ্য জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিল্প আবেগ, ধর্মীয়, সামাজিক এমনকি যৌনানুভূতি থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বাস্তবানুগ রূপরীতির মাঝে নান্দনিক মূল্য রয়েছে, কিন্তু বিমূর্তায়নে সেই মূল্যের খুব একটা হেরফের হয় না। বিভিন্ন গড়ন, শূন্যস্থান, রং, রেখা, আলোছায়া ও প্রতিমা যা মানুষ বা প্রকৃতির বৈশিষ্ট্যের আদলে নির্মিত হতো তা চিত্রকলা থেকে হারিয়ে গেল। একইসাথে বিমূর্ত চিত্রকলার নন্দনতত্ত্বের নতুন বৈশিষ্ট্য ওই বিষয়গুলোকে বাদ দিতে উৎসাহিত হলো যেগুলোর সাথে শিল্পীর মনের একটি যোগসূত্র রয়েছে। (চলবে)

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।