রাত ১০:৪৯ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৮ এপ্রিল, ২০১৯  

সমাধান নিয়ে তরুণরা কী ভাবছেন?

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মিজানুর রহমান॥

ক্ষমতার লড়াইকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে বর্তমানে যে সন্ত্রাস চলছে তা নৃশংসতার মাত্রার দিক থেকে নতুন হলেও এই সংঘাতের মূল অনেক গভীরে। ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতি দুটি বড় দলের আধিপত্যে সীমাবদ্ধ। যারা আদর্শগতভাবে একে অপরের প্রতি সহনশীল নয়। যার ফলে বিভিন্ন সময়ে দেখা দি‌‌য়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। যার বলি হয়েছে সাধারণ মানুষ।

২০১৩ সাল থেকে এই সংঘাত নতুন মাত্রা পায়। যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে বিএনপি-জামায়াত জোট নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে মাঠে নামে। ২০১৫ সালের উষালগ্নে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনগুলো টানা অবরোধ ও হরতাল ডাকে। পেট্রোল বোমায় দগ্ধ হয় শত শত মানুষ। পুড়ে যায় হাজার হাজার যানবাহন। মারা যায় শিশুসহ অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মহল হাতড়ে বেড়াচ্ছেন চলমান সংঘাতের একটি শান্তিপূর্ণ স্থায়ী সমাধান। আর এ বিষয়েই হালের তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী দেশে ও প্রবাসে অবস্থানরত কয়েকজন শিক্ষক, গবেষক, ব্লগার, সমাজকর্মী ও শিক্ষার্থীর কাছে জানতে চেয়েছিল বাংলা ট্রিবিউন। তাদের ভাবনা নিয়েই এ প্রতিবেদন।


. ইয়ামেন এম হক

গবেষক, টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় ব্ল্যাকল্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, টেম্পল, টেক্সাস

বাংলাদেশ এখন যে সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তার একটা স্থায়ী সমাধানে আসতে অবশ্যই সংলাপের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সংলাপে বসার সঠিক সময় এখনও আসেনি। বিএনপি-জামাতের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি এবং তাদের নেতাকর্মীদের নাশকতা সন্ত্রাসীমূলক কাজকর্ম বন্ধের আগেই যদি সংলাপে বসা হয় তাহলে সেটা দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটা ভয়ানক উদহারণ হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে দেখা যাবে যখনই কোন কিছু বিরোধী দলের পছন্দ না হবে, তারা মনে করবে যে নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত হয়ে জনসাধারণের জানমাল জিম্মি রেখে তারা সরকারকে তাদের দাবি (তা যতই অযৌক্তিক হোক) মানতে বাধ্য করতে পারবে। কোনও গণতান্ত্রিক দেশ এভাবে চলতে পারে না।

আমি মনে করি যে কোনও রকম সংলাপের আগে প্রথমেই বিএনপিকে দুটি শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রথমত, তাদের বর্তমান হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করতে হবে। এতে সংলাপে যাওয়ার একটা প্রাথমিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, জামায়াতের মতো একটি চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের দলের সঙ্গ তাদের ছাড়তে হবে।

বিএনপি যদি এই দুটি শর্ত পূরণ করে সংলাপে আসতে রাজী হয়, তখন তাদের সাথে সংলাপে যেতে সরকারের ওপর একটা প্রত্যাশা কাজ করবে। সেইরকম একটা পরিস্থিতিতে সংলাপ হলে দেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের একটা স্থায়ী সমাধান হবে বলে আমি আশাবাদী।


. রায়হান রশিদ

শিক্ষক, ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়

দেশের বিশিষ্টজনদের কথা শুনে মনে হয় যেন সংলাপেই চলমান সব সমস্যার সমাধান। শুনতে কথাগুলো আপাত বিচারে এমনকি যুক্তিসঙ্গতও মনে হতে পারে, কিন্তু তাদের এই কথাগুলো আসলে কোনও অর্থই বহন করে না। এগুলো গৎবাঁধা কথা যা অতীতেও প্রতিবার আমাদের বলার চেষ্টা করা হয়েছে। এটা এখন একেবারে স্পষ্ট -সব ধরনের সুস্থ এবং আইনসিদ্ধ রাজনৈতিক পন্থাকে ত্যাগ করে সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে বিএনপি-জামায়াত। সংলাপের আর কোনও জায়গা তো আসলে থাকছে না। জনগণকে জিম্মি করে কার সাথে সংলাপ, কী এজেন্ডার ভিত্তিতে সংলাপ হতে পারে-সে বিষয়ে আমাদের বিশিষ্টজনেরা কিন্তু সুবিধাজনকভাবে নীরব। পৃথিবীর কোনও দেশই সন্ত্রাসীদের সাথে সংলাপ করে না, আপস করে না। এটা একটা নীতিগত অবস্থান। সরকার জনগণের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করবে এটা শুধু ন্যূনতম প্রত্যাশাই না, এটা একটা ন্যায্য দাবিও। এই কঠিন সময়ের সমাধানের পথ সহজ কিছু হবে সেটা যেন আমরা ধরে না নিই।

বিচারহীনতার সংস্কৃতির ক্ষতিকর প্রভাব বহুদূর বিস্তৃত। রাজনৈতিক যে সহিংসতায় এই মুহূর্তে বিএনপি-জামায়াত লিপ্ত, সেগুলোরও যথার্থ বিচার না হলে তা শুধু নতুন এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতির জন্ম দেওয়ার পাশাপাশি একটা ভুল দৃষ্টান্ত হয়ে থেকে ‍যাবে। যা দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফলাফল বয়ে আনবে না। তাই দল-মত নির্বিশেষে ন্যায়বিচারের শাসনই পারবে এসব সংঘাত, অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি, দায়হীনতা একে একে দূর হবে।


. বিদিত লাল দে

লেকচারার, ব্রুনেল ইউনিভার্সিটি, লন্ডন

বাংলাদেশ সম্ভবত বিশ্বে একমাত্র দেশে যেখানে দেশটির স্বাধীনতার সরাসরি বিরোধিতাকারী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দল তাদের আদর্শ অক্ষুণ্ণ রেখে রাজনীতি করার, এমনকি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হবার সুযোগ পেয়েছে। তারা গোড়া থেকেই রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের উদার, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং সাম্যবাদী পরিচিতির সাথে সহমত পোষণ করেনি। বরং বিভিন্নভাবে আমাদের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুসহ চার নেতাকে অবমূল্যায়ন করে, খাটো করে, বিকৃত করেছে। বিগত ৪৫ বছরের এই রাজনৈতিক গোঁজামিলের অনিবার্য পরিণতি তথাকথিত দ্বিদলীয় ব্যবস্থা। কিন্তু হতাশাজনক হলেও সত্য যে স্বাধীন বাংলাদেশের শতকরা ৩৫ ভাগ মানুষের সমর্থনপুষ্ট বিএনপির জামায়াত নির্ভরতা এবং নেতৃত্বের হঠকারিতা, অপরিণামদর্শীতা এবং আদর্শহীনতা দেশের জন্য বিপদ বয়ে আনছে। এটা স্থায়ীভাবে কলুষিত করতে পারে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে। পরিষ্কার কথা, পেট্রোল বোমাকে আমরা আমাদের রাজনীতির মূলধারা হিসেবে দেখতে চাই না। দ্বিদলীয় রাজনীতিতে কোনও সমস্যা নেই। পৃথিবীর অনেক দেশেই তা আছে। সমস্যা হল যদি এই দলগুলো কোনওটি দুর্বৃত্তায়িত হয়- যা কিনা বর্তমানে বিএনপির মধ্যে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে। আর সন্ত্রাসের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জান-মালের ক্ষতি করে কেউ নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারলে তা সন্ত্রাসকেই কেবল উস্কে দিবে। সেই প্রেক্ষিতেই খালেদা-তারেক এবং জামায়াতের সাথে আলোচনার কোনও সুযোগ নেই। এমতাবস্থায় বিএনপির ভেতরের উদার এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষের গণতান্ত্রিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি মধ্য-ডান ঘরানার দল জন্ম নিতে পারে যারা ৭১-এর চেতনাতে বিশ্বাস রাখবে, জামায়াতসহ সকল উগ্র দক্ষিণপন্থী এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে এবং দেশে একটি স্থিতিশীল, টেকসই গণতন্ত্রের বিনির্মাণে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে একটি স্থায়ী সমাধান বের করবে।


আরিফ জেবতিক

ব্লগার ও সমাজকর্মী

স্থায়ী সমাধানের খুব সহজ উপায় হচ্ছে স্থায়ী সমাধান চাওয়া। এই চাওয়াটুকু সমাজের কোনো একটা অংশের আয়েশী চাওয়া নয়, সকল মানুষের সমবেত চাওয়া। আমার কাছে মনে হয়নি যে এদেশের মানুষ এসবের স্থায়ী সমাধান যে তাঁদের নিজেদের হাতেই আছে, এই ব্যাপারটিতে সচেতন। তাঁদেরকে সচেতন করার কোনো চেষ্টাও কারো নেই। আমরা একটি আত্মকেন্দ্রিক সমাজে বাস করছি যেখানে অধিকাংশ মানুষ নুন আর পান্তার যুদ্ধে নিজেরা এতই ব্যস্ত, রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে তাঁদের ভাবার অবসর নেই। বাদবাকি যারা এসব বিষয়ে কথা বলেন, ব্যতিক্রম বাদে তাঁদের সকলেই আসলে এই সংঘাতে কোনো না কোনো একটি পক্ষ, তারা সংঘাতের সমাধান চান নিজেদের মতো করে, সার্বজনীন সমাধান নয়। এখানে সাধারন মানুষ পুড়লে কারো কিছু যায় আসে না, এজন্যই বিএনপি-জামায়াত তাদের কর্মসূচি থামায় না আর সরকারও নির্মূল করার মতো শক্ত অবস্থানে যায় না। সাধারন মানুষ যতদিন বলবে না এনাফ ইজ এনাফ, এই সংঘাত থামবে না। সাধারন মানুষ যখন সোচ্চার হবে তখন এই সংঘাত থামবে। যে দেশে মানুষ এখনও জেনেশুনে চাঁদাবাজ কিংবা সন্ত্রাসীকে ভোট দেয়, সেদেশে এই সংঘাতের দায় শুধু রাজনৈতিক মহলের নয়, বরং ব্যর্থতার ভাগীদার আমাদের মতো সাধারন মানুষেরাও। রাজনৈতিক শক্তিরা যখন বুঝতে পারে যে পুড়ে মরলেও এই জনগন শেষ পর্যন্ত তাদেরকেই ভোট দেবে, তখন তারা সংঘাত থামানোতে গা করবে না বরং সংঘাতে জিতে হিরো ভাব নিয়ে ভোট চাওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগ দেবে।


আশফাক আনুপ

শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ

দুটি বৈরি আদর্শের দ্বন্দ্বের একমাত্র সত্যিকার সমাধান হলো একপক্ষের পূর্ণ উত্থান এবং অন্যপক্ষের পূর্ণ পতন। তবে এটাকে সমাধান হিসেবে মেনে নিতে প্রথম আপত্তিটা আসে এই যুক্তিতে যে- দু'পক্ষেই তো বিপুল সরব ও নীরব জনসমর্থন আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে- ঠিক এই আদর্শিক বিভাজনটা '৭০-এও ছিল, '৭১-এও ছিল। '৭০-এ গণতান্ত্রিকভাবে এবং ৭১’এ সামরিকভাবে সে দ্বন্দ্বের নিরসন ঘটেছে- তবে নির্মূল ঘটেনি। বিজিতপক্ষকে তাই এখন আর নতুন করে গণতান্ত্রিকভাবে পরাজিত করার কোনও প্রয়োজন নেই বলে আমি মনে করি। বরং এই প্রশ্ন যে এসেছে এবং আসছে সেটাই খুব দুঃখজনক। সেক্ষেত্রে বলপ্রয়োগেই যদি আবার সেটাকে দমন ও “নির্মূল” করা হয় তাতে আমি অন্যায় দেখি তো না-ই, বরং সেটাকেই একমাত্র সমাধান বলে মনে করি। মনে রাখতে হবে, বিপুল জনসমর্থন থাকা নাজি আদর্শকে কেবলমাত্র সামরিকভাবেই পরাজিত করা হয়নি, আইনিভাবে দলিত করা হয়েছে এবং ক্রমাগত প্রচেষ্টায় সামাজিকভাবেও নির্মূল করা হয়েছে। ৩য় শক্তির যে আইডিয়া প্রায়ই দেখা যায় তাও আসলে অপ্রয়োজনীয়। নতুন শক্তিটি ৩য় নয় বরং ২য় শক্তি হোক। আর ২য় শক্তি ভেবে যে “অপশক্তি”কে পোষা হয়েছে এতদিন- তার মূলোৎপাটন হোক। এটাই একমাত্র নিশ্চিত সমাধান।


এম সানজীব হোসেন

পিএইচডি গবেষক, ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংঘাত হচ্ছে বহু বছর ধরে চলতে থাকা "ক্ল্যাশ অব আইডেনটিটিস" বা পরিচয়ের সংঘাত। আমাদের মূল পরিচয়ে কোনটি বেশি প্রাধান্য পাবে - জাতীয়তা না ধর্ম, আমরা ধর্ম-নিরপেক্ষ হবো নাকি অন্য ধর্ম ও মতামতের প্রতি অসহনশীল থাকবো, আদিবাসীদের প্রতি আমাদের আচরণ কেমন হবে, খেলার সাথে রাজনীতি আমরা মেশাবো কিনা - এমন সব ছোট বড় প্রশ্নের ব্যাপারে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী আজও ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। তাই, এই সংঘাত থেকে আমরা মুক্ত হবো তখনই যখন এই দুই পরিচয়ের যেকোনও একটির নির্ধারক পরাজয় ঘটেছে। "ক্ল্যাশ অব আইডেনটিটিস" এর সমাপ্তির সাথে সাথে সংঘাতপূর্ণ রাজনীতিও শেষ হবে বলে মনে করি।


ইশতিয়াক রউফ

তথ্যপ্রযুক্তিবিদ (ইনফরমেশন সিকিউরিটি) ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভেনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশের রাজনীতির মূল সমস্যা হলো, এই রাজনৈতিক সংঘাত আর "দ্বিদলীয়" নেই। বিএনপি এখন জামায়াতে ইসলামীর তাঁবেদার হয়ে যাওয়ায় সমস্যা এত প্রকট রূপ ধারণ করছে। এর আগে লীগ-বিরোধী মানুষের স্থান ছিল বিএনপি। সেখানে যারা যেতেন, তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ প্রায়োরিটি ছিল না। কিন্তু আজকের বিএনপি-তে স্থান পেতে হলে এক অর্থে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হয়ে যেতে হবে। ১৯৯০'র দশকে লীগ-দল মারামারি হতো, আবার দুই দলের সাথেই রগ-কাটা শিবিরের সংঘর্ষ হতো। এখন জামায়াতের সেই জঙ্গী কর্মকাণ্ডকে বিএনপি আত্মস্থ করে ফেলেছে। ১৯৯০'র দশকের রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্য দিয়েও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব, কিন্তু ২০১৫ সালের বাংলাদেশ অন্যরকম। জামায়াত বর্জন করলেই সুস্থ মানুষের রাজনীতি এবং কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে। পৃথিবীর সব দেশেই বড় দুই দল একে অপরের প্রতি অসহনশীল, কিন্তু আর কোথাও একটা বড় দল নিশানা করে জনগণকে আগুনে পুড়িয়ে দেয় না।


ওমর শেহাব

পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড

সংঘাত খুব বেশিদিন থাকবে না। দীর্ঘমেয়াদী দ্বিদলীয় রাজনীতিতে দুটি দলেরই স্বাধীন নীতি ও আদর্শ থাকতে হয়। আওয়ামী লীগের সেটা থাকলেও বিএনপির নেই। বিএনপি ছিল আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি কৃত্রিম ভুল বুদবুদ, যেটি রাষ্ট্রীয় আইন ভেঙে তৈরি হয়েছিল। আনুষ্ঠানিকভাবেই এটি নিজের আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা। এরকম পরজীবী দল বেশিদিন টেকে না, বিএনপিও টিকবে না। তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে না আসার ফলাফল আমরা এখন বিএনপির কাজে কর্মে দেখতে পাচ্ছি। বিএনপি নিজে নিজেই এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

এক্ষেত্রে রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ আর গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ও বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতি সামনে রেখে কে বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারবে ও পারবে না তা নিয়ে তাদের স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া উচিৎ। আগ থেকে এমন হলে এই সংঘাতও এতদূর আসত না আর সত্যিকারের বহুদলীয় রাজনীতি আরও আগেই শুরু হত।


অনিন্দ্য রহমান

সংবাদকর্মী ও কলাম লেখক

বাংলাদেশে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক সংঘাত হচ্ছে না। যা হচ্ছে তা হলো সন্ত্রাস। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকদের সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদের হাত থেকে রক্ষা করা। আর মিডিয়া ও সিভিল সোসাইটিকে বড় বড় বাণী দেওয়ার আগে বুঝতে হবে, কোনটা সন্ত্রাস আর কোনটা পলিটিকাল প্রোগ্রাম।


শাহেদ ফয়সাল

এমবিএ ছাত্র, ব্যবসায় প্রশাসন ইন্সটিটিউট (আইবিএ)

শিক্ষিত শ্রেণিকে রাষ্ট্র-শাসনে আসতে হবে। যারা দেশের ইতিহাস জানবে, ভালো খারাপের প্রভেদ করতে পারবে, কোনও অবস্থাতেই আদর্শ জলাঞ্জলি দেবে না। সেটার একটা উপায়ই আমি দেখি- শিক্ষা। আমি তো মনে করি মেধাবীদের, শিক্ষকদের রাষ্ট্রশাসনে আসা উচিত। খুব খারাপ লাগে যখন দেখি আমাদের পরের প্রজন্মগুলাকে প্রশ্ন ফাঁস করে পাস করানো হচ্ছে। এরা চুরিই শিখছে। বড় হয়েও দুর্নীতিপরায়ণ হবে। এই নতুনদের দিয়েই সুদূরপ্রসারী সমাধান সম্ভব ছিল। এখনও অসম্ভব না। তবে এখন আরও কঠিন হয়ে গেল।

দুই নেত্রীর প্রস্থানের পর যারা ক্ষমতায় আসবে তাদের ব্যাপারে আমি সন্দিহান, তবে একই সঙ্গে ইতিবাচক। কারণ সমাজে খুব কম করে হলেও শিক্ষিতশ্রেণির মানুষরা রাজনীতি নিয়ে সক্রিয়ভাবে ভাবতে শুরু করেছে।


পৃথ্বী শামস

শিক্ষার্থী, বুয়েট

দুই বিপরীত মেরুর আদর্শের সংলাপে কোনও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হবে বলে মনে হয় না। সন্দেহ নেই গণতন্ত্রে শুধু আওয়ামী লীগের আধিপত্য গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিদ্বন্দ্বীহীন কোনও একক দল নিয়ে গণতন্ত্র বাঁচে না। বরং স্বাধীনতার পক্ষের একটি শক্তিকে আমি আওয়ামী লীগের বিপরীতে দেখতে চাই। যারা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রাপ্ত বাংলাদেশের সংবিধানের চার মূলনীতিতে আস্থাশীল হবে, মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের ভূমিকাকে স্বীকার করেই বর্তমান আওয়ামী লীগের দুর্নীতির বিকল্প হিসেবে মাঠপর্যায়ে জনসংযোগ করে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ময়দানে আবির্ভূত হবে। সে হতে পারে একটি বাম জোট বা অন্য কেউ।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।