বিকাল ০৫:৪৬ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৩ মে, ২০১৯  

জয়ে ফিরেছে বাংলাদেশ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মুসা ইব্রাহীম, ক্যানবেরা থেকে।।॥

বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত জয়ের দেখা পেল। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে বিশ্বকাপের একাদশ আসরে এসে প্রস্তুতিমূলক আর ওয়ার্ম আপ চারটি ম্যাচেই হারের পর এই জয়টা ছিল খুবই আকাঙ্ক্ষিত এক জয়। তা ক্রিকেট দলের সদস্যরা যেমনটা চেয়েছেন, দর্শক-সমর্থকরাও মনে হয় তাদের সমার্থক হয়ে গিয়েছিলেন। আর জয়ের আনন্দের আতিশয্যটা এমনটাই ছিল যে, ক্রিকেটাররা মাঠের চারদিকে একটা বিজয়ী-ল্যাপও দিয়ে ফেললেন খেলা শেষে। কারণ একটা পাষাণভার নেমে গেছে ততক্ষণে বুক থেকে। ক্রিকেটাররা প্রত্যাশার চাপ মিটিয়ে আকাশে উড়লেন। ওড়ালেন দর্শকদের। বাংলাদেশ আফগানিস্তানকে ১০৫ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে শুভসূচনা করল বিশ্বকাপের মূল পর্বে।

দুপুর বারোটার দিকে অবশ্য যখন ক্রিকেটাররা মাঠের উদ্দেশে হোটেল ছেড়ে যান, তখন তাদের চেহারায় এই প্রত্যাশার চাপটা যেন পাথরের মতো চেপে বসেছিল। শুধু মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ আর সাব্বির 'হাই, হ্যালো' করলেন। বাকিরা চারপাশটা ঠিক মতো দেখলেনও না। উঠে পড়লেন টিম বাসে। দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজনের হাসিখুশি চেহারাও যেন এদিন জাদুঘরে পাঠানো হয়েছে। তিনিও যে ক্রিকেটারদের মতো চাপ নিয়ে ঘুরছেন, তার সঙ্গে কথা বলে মুহূর্তেই সেটা বোঝা যায়। মিডিয়া ম্যানেজার রাবিদ ইমাম অবশ্য শুধু বলেছিলেন 'ছেলেরা চনমনে আছে। তারা জয়ের ব্যাপারে উজ্জীবীত।' ক্রিকেটাররা বাসে ওঠার আগে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন সবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি ক্রিকেটারদের জয়ের মন্ত্রই শিখিয়েছিলেন, জানালেন খালেদ মাহমুদ।

এদিন মাঠে আসা দর্শকদেরও একটা প্রত্যাশা ছিল এই ম্যাচটাকে ঘিরে। কেউ বলেন, বাংলাদেশ টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে কমপক্ষে তিনশ রান করা উচিত। তাদের এই চাওয়াও কিন্তু পূর্ণ হয়নি। তবে এই চাওয়াটাকে ছাপিয়ে গেছে বাংলাদেশের বোলিংয়ের সময়টা। এসব নিয়ে দর্শকরা কেমন উচ্ছ্বসিত ছিলেন? এটা বোঝাতে একটা পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। এদিন ক্যানবেরার মানুকা ওভাল মাঠে ১০ হাজার ৯৭২ জন দর্শক উপস্থিত হয়েছিলেন, ধারণক্ষমতা ছিল ১৩ হাজার। এই দর্শকের প্রায় ৯৫ শতাংশই ছিল বাংলাদেশি ক্রিকেট সমর্থক। গ্যালারির পুরোটা জুড়েই ছিল লাল-সবুজ। হয় সেটা পতাকায়, নয়তো জার্সিতে, অথবা মাথার ব্যান্ডানায়। কেউ-কেউ তো বাঘ সেজেছে, অ্যানিমেশন মুভির চরিত্র হাল্ক বা সুপারম্যান সেজেছেন। কেউ বিশালকায় বাঘের পুতুল নিয়ে পুরোটা গ্যালারি ঘুরেছেন। বহু দর্শক গালে বা পুরা মুখে বাংলাদেশের পতাকা এঁকে খেলা দেখেছেন। আবার কেউ মাথায় পতাকা বেঁধে অথবা হ্যাটের ওপরে বাঘের পুতুল বসিয়ে, মাথায় লাল-সবুজ পরচুলা লাগিয়েও বাংলাদেশের খেলা দেখেছেন। ফলে মাঠে ঢুকে কখনোই মনে হয়নি যে, বাংলাদেশের বাইরের কোনও স্টেডিয়ামে খেলাটা হচ্ছে। বরং মিরপুরের শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের নাম বললেই বেশি মানানসই হতো। এত বাংলাদেশী দর্শক। একেবারে কানায় কানায় পূর্ণ যাকে বলে।

সিডনি থেকে এদিন শুধু এক 'টাইগার কার র‌্যালি ফর টাইগার'- এর মাধ্যমেই শুধু দেড়শ গাড়ি একসঙ্গে এসেছে। এছাড়া আরও বহু সিডনিবাসী বাংলাদেশিরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাড়ি চালিয়ে প্রায় পৌনে তিনশ কিলোমিটার দূরে ক্যানবেরায় খেলা দেখতে এসেছেন। একইভাবে সিডনি থেকেও প্রায় একশ ষাট কিলোমিটার দূরের নিউক্যাসল এবং ক্যানবেরা থেকে প্রায় পাঁচশ কিলোমিটার দূরের মেলবোর্ন থেকেও প্রবাসীরা এসেছেন খেলা দেখতে।

তারা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ব্যাটিং-বোলিংয়ের পুরোটা সময় যেভাবে সমর্থন দিয়ে গেছে, সেটার উল্লেখ করতেই হলো ম্যাচ শেষে ম্যান অব দ্য ম্যাচ পুরস্কার নেওয়ার সময় মুশফিকুর রহিমকে (৭১ রান, দু'টি স্ট্যাম্পিং)। তিনি মন্তব্য করলেন, দর্শকদের সাপোর্ট তাদের সবসময় ম্যাচে থাকতে সহায়তা করেছে। আসলে বাংলাদেশ দল তাদের ব্যাটিংয়ের ওপেনিং থেকে শুরু করে প্রায় ত্রিশ ওভার পর্যন্ত সময়টুকু ছাড়া ম্যাচের প্রায় পুরোটা সময় একচ্ছত্র ছড়ি ঘুরিয়েছে।

অধিনায়ক মাশরাফিও বললেন সে কথাই 'ছেলেরা দারুণ ক্রিকেট খেলেছে। ২৬৭ রান করার পর বোলাররা দারুণ বল করেছে। সবাই এদিন উজ্জীবীত ছিল।'

সাকিব-মুশফিকের ১১৪ রানের পার্টনারশিপটাই ছিল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। এমন মন্তব্য করলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক ববি আহমেদ। তিনি জানালেন, শুরুর দিকে উইকেট একটু স্লো ছিল। তাই ব্যাটে বল আসতে সমস্যা হচ্ছিল। এ কারণে শুরুর দিকে রান কষ্টের ছিল। পরে সাকিব-মুশফিক ব্যাট চালিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে নেয়। এরপর বোলিং ইনিংসে পরপর তিন ওভারে তিনটি উইকেট নিয়ে বাংলাদেশ ম্যাচের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপন করে। তার মতে এ জয় 'প্রত্যাশিত' ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ কেমন করবে, জানতে চাইলে এবার তিনি আর আগের দিনের মতো কোনও রাখঢাক করলেন না। বরং খোলস থেকে বেরিয়ে এসে মন্তব্য করলেন, ব্রিসবেনের উইকেট ব্যাটিং উইকেট। এখানে কেউ কাউকে ছাড় দেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।