বিকাল ০৫:২৩ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৩ মে, ২০১৯  

অামাদের অাছে অাম অাদমি, নেই শুধু কেজরিওয়াল!

প্রকাশিত:

মুহাম্মদ সালাহউদ্দিন॥

গত ১০ ফেব্রুয়ারি দিল্লির বিধান সভার নির্বাচনের ফলাফলে বিজয় লাভ করেছে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি (এএপি)। এই আম আদমির বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় "সাধারণ মানুষের দল"। আসলেই যে এএপি সাধারণ মানুষের দল তা ৭০ টি আসের মধ্যে ৬৭টি বিজয়ের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়েছে।

অভিনন্দন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কারণ তোমরাই দেখিয়ে দিয়েছো ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরেও রাজনীতি সম্ভব। তোমরা আবার প্রমাণ করে দিলে গণমানুষের রাজনীতির মাধ্যমেই ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব। একই সাথে অভিনন্দন দিল্লির জনগণকে, যারা এ পরিবর্তনের সাথে যোগ দিয়েছে। ভোট দিয়ে বিজয়ী করছে অাম অাদমিকে।

উপমহাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় এখানকার রাজনীতি অনেকটাই পরিবারকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। অাম অাদমির বিজয়ের মধ্যে দিয়ে সে অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করেছে বলে অামার মনে হয়। ভারতে এমন পরবির্তন শুরু করেছে আম আদমি পার্টি। আর পাকিস্তানে ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই)। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও এমন কোনও নজীর দেখা যায় নি। তবে প্রায়ই আমাদের সুশীল ও বাম ঘরনার নেতারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে তৃতীয় শক্তির কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে এখনও তারা সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা ঘটাতে পারেন নি। তারা গণমুখী আন্দলনের এজেন্ডা নিয়ে মানুষের সামনেও আসতে পারেনি। ফলে এখনও বাংলাদেশে পরিবার কেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তন ঘটেনি। তবে এ অবস্থার দ্রুত অবসান ঘটবে বলেই আমার বিশ্বাস।

বর্তমান বাংলাদেশের মানুষ প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের উপর ভীত ও ক্ষুব্ধ। কারণ তারা জনগনের জন্য নয় নিজেদের পরিবার ও দলীয় কর্মীদের উন্নয়নের জন্য রাজনীতি করে। তাদের রাজনীতির সুফল কখনোই সাধারণ মানুষের দোর গোড়ায় পৌঁছায় না। বিপরীতে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বা ক্ষমতা আকড়ে থাকার জন্য দুই দলই সাধারণ মানুষের উপর নিপীড়ন করছে। জ্বালাও, পোড়াও, হত্যা, গুম, খুন ও রাজপথ দখলের মাধ্যমে একে অপরকে নিঃশেষ করার চেষ্টা করছে। আর এর শিকার হচ্ছে সাধারণ জনগণ। এসবের প্রেক্ষিতেই আমার মনে হয় বাংলাদেশেও পরিবার কেন্দ্রিক রাজনীতির অবসান হতে চলছে। এখানেও এএপি বা পিটিআই’র মত নতুন দলের সৃষ্টি হবে। যারা জনগণের জন্যই রাজনীতি করবে।

দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর যাত্রা শুরু হয় আম আদমি পার্টির। প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় ২০১৩ সালেই ভারতীয়দের চমক দেখান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ২০১৩ সালের নির্বাচনে আম আদমি প্রথম বার অংশ নিয়েই ৭০ টি আসনের মধ্যে ২৮টি আসন জিতে নিয়ে দ্বিতীয় স্থান দখল করে। তবে কংগ্রেসের সমর্থণ নিয়ে সর্ব কনিষ্ট মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কেজরিওয়াল সরকার গঠন করে। তবে প্রথমবার মাত্র ৪৯ দিনের মাথায় তিনি পদত্যাগ করেন। এবার দ্বিতীয় নির্বাচনে বিশাল বিজয় অর্জন করেছে আম আদমি। তাদের এ বিজয়ের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে সাধারণ মানুষের বিভিন্ন দাবি নিয়েই তাদের আন্দোলন। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দুর্নীতিকে না বলা, বিদ্যুৎ ও পানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন, নারীদের নিরাপত্তা ও সবার জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা। তাদের এসব আন্দোলনের সবগুলোই জনবান্ধব। তার ফলাফলও তারা পেয়েছে।

অন্যদিকে ইমরান খানের পিটিআই পরিবার ও উগ্রবাদের বাইরে গিয়ে পাকিস্তানে নতুন রাজনীতির পথ খুলে দিয়েছে। ১৯৯৬ সালে এ দলটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৯৭ সালে প্রথম বারের মত তারা জাতীয় নির্বাচনে অংশ করে। তবে তারা প্রথমবার বিজয়ী হতে পারেনি। তবে পিটিআই সবার দৃষ্টি আকর্ষণে সফল হয় ২০১৩ সালের নির্বাচনে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে জাতীয় সংসদে ৩৫টি আসন দখল করে। দারিদ্র দূরীকরণ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নারীর স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, আইনের ভিত্তিতে সমতা, বেকারত্বদূরীকরণ সহ সবার জন্য আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করনের জন্য রাজনীতি শুরু করে তারা। একই সাথে তরুণ প্রজন্মকে তাদের আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করতেই সক্ষম হয় ইমরান খান। বর্তমান পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্ম ভেবে থাকে আগামী নির্বাচনে পিটিআই সরকার গঠন করবে। আর বর্তমান সরকারর প্রধান সমালোচক হচ্ছেন তারা। এখান দেখার বিষয় পাকিস্তানে পরিবর্তন হয় কিনা!

আম আদমির বিজয়ের পর ফেসবুকে একটি স্টাটাস দেখলাম... "বাংলাদেশে আম আদমি আছে কিন্তু তাদের কোনও পার্টি নেই”। আসলেই তাই। ৯০’র স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর থেকে পালা করে কখনও আওয়ামী লীগ কিংবা কখনও বিএনপি ক্ষমতায় থেকেছে। তাতে আমাদের মত আম আদমীদের কোনও পরিবর্ত হয়নি।

গত কয়েক মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রায় শতাধিক আম আদমির প্রাণ গেছে। গত কয়েক বছরের প্রতিটি সরকার পরিবর্তনের সময় এরকম আরও কয়েক’শ আম জনতার প্রাণ গেছে। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতার পালাবদলের সময় রাজনৈতিক সংহিসতায় ৮২ জনের মৃত্যু ঘটে। ২০০১ সালে একই ভাবে ক্ষমতা পরিবর্তনের সময় জীবন দিতে হয়েছিল ৯৬ জনকে। ২০০৬ সালে মারা যান ৩২ জন এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে জীবন দিয়েছেন ৫৯ জন। অবশ্য এদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মীর সংখ্যা একেবারেই কম। উল্টো দিকে সাধারণ মানুষই এ ধরণের রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হন। কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী সরকার এসব আদমির জন্য তেমন কিছুই করেনি বা করেন না। উল্টো দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, অবিরাম দূর্নীতি, বিচার বর্হিঃভুত হত্যা ও মানবাধিকার লংঘনের প্রতিযোগীতায় তারা মেতে ওঠে। যার সর্বশেষ মঞ্চায়ন এখন চলছে।

ভারতীয় আম আদমিদের শুভেচ্ছা জানানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি আম আদমিদের জীবনের পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখি। রাজনৈতিক হানাহানি থেকে নিস্তার চাই। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা চাই। একই সাথে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার মধ্য দিয়েই দলয়ীকরণ, স্বজনপ্রীতি ও চাকরির ক্ষেত্রে সবার সমতার নিশ্চয়তা চাই। আর পরিশেষে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই “পরিবারকেন্দ্রিক সরকারগুলো নাগরিক সুবিধা প্রদানের ব্যর্থ হলে বাংলাদেশেও আম আদমি পার্টির উত্থান ঘটবে”।

লেখক: এম.ফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

salahuddin.ier.du@gmail.com

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।