দুপুর ১২:৫৩ ; রবিবার ;  ২১ অক্টোবর, ২০১৮  

কখনোই কাম্য নয়

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট॥

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় শনিবার বিকেলে ককটেল বিস্ফোরণে এক বালক ও সেলিম নামের এক যুবক আহত হয়েছে। এ ঘটনায় ককটেল নিক্ষেপকারী সন্দেহে তিন শিশুকে গণপিটুনি দেয় স্থানীয়রা। পরে তাদেরকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের পর তিন শিশুকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

ঘটনার শিকার হওয়া তিন শিশুর নাম হোসেন, মানিক ও রিপন। এদের সবার বয়সই প্রায় ১২ বছর। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম তাদের ছেড়ে দেওয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, শিশুরা রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে। তিনি এ ধরনের ঘটনাকে খুব ভীতিকর হিসেবে বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন, 'লোকজন কেন তাদের নিজেদের হাতে দায়িত্ব তুলে নিলো? কারণ তারা মনে করেছিল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ন্যায় বিচার করবে না।'

অধ্যাপক রওনক আরও বলেন, 'এ ধরনের আচরণ মানবাধিকারের লঙ্ঘন, বিশেষ করে শিশুদের অধিকারের লঙ্ঘন। অনেক দেশেই যখন শিশুরা সহিংসতার মধ্যে বেড়ে উঠে তখন তাদেরও আটক করা হয়। কখনও কখনও তারা সহিংসতার কাজেও ব্যবহৃত হয়। আমাদের অবশ্যই এ বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত যে, আমাদের শিশুদের যেন বিভিন্ন দলের কর্মীদের দ্বারা ব্যবহৃত না হয়।'

বিস্ফোরণের সময় পাশেই ক্রিকেট খেলছিল কিছু তরুণ। তারা দেখতে পায়, এই তিন বালক দৌড়াচ্ছে। এর মধ্যে হোসেনের হাতে রক্তের দাগ ছিল।

ওসি জানান, তারা মনে করেছিল এই তিনটি শিশু বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে এবং এটা করতে গিয়ে হোসেন আহত হয়েছে।

পথশিশু ও হারিয়ে যাওয়া শিশুদের খুঁজে বের করে বেসরকারি সংস্থা অপরাজেয় বাংলাদেশ। তারপর আশ্রয়, পড়াশোনাসহ নানাবিধ ব্যবস্থা করে দেয় তাদের। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু বলেন, শিশুদের অধিকার সংক্রান্ত বিদ্যমান প্রতিটি আইনে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, একটি শিশুকে যে কোনও পরিস্থিতিতেই নির্যাতন করা যাবে না।

তিনি বলেন, 'একটি শিশু যদি না বুঝে অথবা বড়দের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অপরাধ সংঘটন করে তাহলে বড়দের উচিত তাদেরকে শুধরে দেওয়া। অপরাধের যেন পুনরাবৃত্তি না করে সে বিষয়ে তাকে বোঝানো উচিত।'

ওয়াহিদা বানু বলেন, 'এ ধরনের ক্ষেত্রে ছিন্নমূল শিশুরা পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। আমি মনে করি, যদি তারা পথশিশু না হতো তাহলে যারা তাদের প্রহার করেছে তারা মারধরের আগে দু'বার চিন্তা করতো। পথশিশুদের প্রতিবাদ করার মতো কোনও অভিভাবক নেই।'

তিনি বলেন, 'এ ঘটনা তারা জীবনভর মনে রাখবে। তারা সহজে বড়দের বিশ্বাস করতে পারবে না। এমনকি এই ঘটনা ভবিষ্যতে তাদের প্রতিহিংসাপরায়ণ ও হিংস্র করে তুলতে পারে।'

ওয়াহিদা বানু বলেন, 'প্রতিটি শিশু একটি স্বপ্নের দুনিয়ায় বসবাস করে। এই ঘটনা তাদের অপরাধীর মতো করে চিন্তা করাতে পারে। তাদের অভিভাবকদের উচিত, যত দ্রুত সম্ভব তাদেরকে মানসিক রোগের চিকিৎসক দেখানো। কিন্তু আমি জানি না তাদের মা-বাবার পক্ষে এটা সম্ভব কিনা।

তিনি বলেন, 'মানুষ নৈতিকতাবোধ হারাচ্ছে। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় মানুষ অসহায় বোধ করছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবশ্যই পরিবর্তন হওয়া উচিত।'

মারধরের পর এই শিশুদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর মধ্যে পুলিশ আহত হোসেনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে। সেখানে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

হোসেন হাতে আঘাত পেয়েছিল সে জানায়, একজন লোক বোমাটি ছুড়ে মারে। তখন সেটি বিস্ফোরিত হয়নি। ফলে আমি মনে করেছিলাম এটি একটি বল এবং এটা ছুঁড়ে মারি। কিন্তু তখন এটি বিস্ফোরিত হয়।

ওসি বলেন, 'এ ঘটনা ছিল একটি ভুল বোঝাবুঝি। আসলে এই শিশুরা এসেছিল প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের জন্য। আমরা ওদেরকে তাদের মা-বাবার কাছে হস্তান্তর করেছি।'

শনিবারের ঘটনায় যারা এই শিশুদের মারধর করেছিল তাদের রবিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা বিক্রেতাদের দাবি, এই গণপিটুনি সম্পর্কে তাদের কিছু জানা নেই।

মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, 'আমরা প্রায়ই বাচ্চা পকেটমারদেরকে পিটুনি দিতে দেখি। এই প্রবণতার তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষজন উন্মত্ত হয়ে যাচ্ছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া একটি ভালো সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। মানুষ অনিরাপদ ও শঙ্কিত বোধ করছে।'

তিনি আরও বলেন, দেশে ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি ভালভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গণপিটুনির মতো সহিংসতা সমাজের উন্মত্ত ও মুখোমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অভিক্ষেপ ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর সহিংসতার কারণে অসহিষ্ণুতা লক্ষ্যণীয় মাত্রায় পৌঁছেছে। সহিংসতাই সমাজের চরিত্রে পরিণত হয়েছে।

 

/এমপি/এসটি/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।