বিকাল ০৫:০৫ ; মঙ্গলবার ;  ১৫ অক্টোবর, ২০১৯  

প্রসঙ্গ তপন রায়চৌধুরী : মহাশয় পুরাণ || মিহির সেনগুপ্ত || শেষ পর্ব

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সাত.
বলছিলাম, সব মানুষের স্মৃতি তর্পন হয় না। তপনদার ব্যাপারে যে হয় না, তা যাঁরা তাঁকে চিনতেন জানতেন, তাঁরা প্রত্যেকেই মানবেন। আমরা তাঁর বিষয়ে স্মৃতি রোমন্থন করতে পারি, তর্পন নয়। আগেই বলেছি তিনি স্বয়ং লিখিতভাবে দাবি করেছেন যে তাঁরা তিন পুরুষের নাস্তিক। তার মধ্যে তিনি নাকি আবার একনিষ্ঠ।
সুতরাং তর্পন টর্পন নয়। হতে পারে এক স্মৃতি-রোমন্থন। অথবা ‘স্মৃতি’ই বা কেন? ওটা তো তিনি বাদ দিয়ে শুধু ‘রোমন্থন’ কথাটিই নামায়নে রেখেছেন। আবার তার সঙ্গে একটি ‘অথবা’ যুক্ত করে তাকে প্রলম্বিত করলেন ‘পরচরিত চরিত চর্চা’ বলে।
এই পুস্তকটির নামকরণ একটি উৎকৃষ্ট রঙ্গের খেলা। বিশ্বাস পাঠককুল তা হাড়ে, মজ্জায়, চামড়ায় উপলব্ধি করেছেন। তথাপি এ বিষয়ে একটু বাচাল হই। মহাশয় জানেন, ‘রোমন্থন’ অর্থে জাবরকাটা। জাবর কারা কাটে? গবাদি পশুরা। অর্থাৎ’ গিলিত বাচর্বিত খাদ্যের পুনঃচর্বণ এবং পুনঃভোজন। কেউ বলতেই পারেন, মানুষটি কী পাষণ্ড! সব মানুষকে গোরু বলবেন? বিশ্লেষণে তো তেমনটাই বেরিয়ে আসে। অবশ্য তিনি নিজেকেও বাদ দেননি। আবার দেখুন, মহাশয় স্বয়ং ইতিহাসের চর্চাকারী। সুতরাং তাঁর কাজই হচ্ছে ‘পরচরিত চর্চা’। ইতিহাস তো অন্যদের নিয়ে হদ্দমুদ্দ চর্চা করাই। তাহলে তো আমরা কী বলতে পারি না পরনিন্দা পরচর্চাটা খারাপ জিনিস নয়? 
‘স্মৃতি’ শব্দটি তিনি ব্যবহার করবেন না। কারণ স্মৃতি, টিতিতে তিনি বিশ্বাসী নন। তাহলেই স্মৃতি তর্পন কথাটা কাজে কাজেই এসে যায়। নাস্তিক তপন বাবু তর্পনে বিশ্বাস করবেন, এমনটা হতে পারে না। কারণ বহু ক্ষেত্রেই তিনি দাবি করেছেন, ‘আমি একজন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান নাস্তিক। নাস্তিকতা ছাড়া অন্য কোনও ধর্মে আমি বিশ্বাসী নই।’ মনে হয় স্মৃতি শব্দটার মধ্যেও তিনি আস্তিক্যের গন্ধ পেতেন বলে, তাঁর লেখার নামকরণটা তিনি ওইভাবে করেছিলেন।
একাডেমিক কর্মকা- ছাড়া তিনি যে কাজটিকে জীবনের অন্যতর মহৎ কর্ম বলে জানতেন, তা বোধ হয় নির্ভেজাল আড্ডা গল্প। অর্থাৎ তাও পরচরিত চর্চা। অন্তত, আমার কাছে তিনি সেভাবেই নিজেকে উন্মোচিত করেছেন। আমার বিশ্বাস, তাঁর যশশ্বী ছাত্ররাও তাঁদের গবেষণাপত্রের গুরুভার সময়ান্তরের জন্য নামিয়ে রেখে মহাশয়ের ক্ষুধানর্ধক গল্পামৃত পান করতেন এবং ইত্যবসরে স্নেহময়ী উত্তম রন্ধনশিল্পী হাসিদি, তাঁদের উদর ও নোলার তৃপ্তির জন্য নানাবিধ ভোজ্য প্রস্তুত করতেন। এ কথা তাঁর বেশ বিশিষ্ট ছাত্র-ছাত্রীদের মুখেই শুনেছি। এই অভিজ্ঞতাটা আমার হওয়ার মত সুযোগ হয়নি। তার কারণও ওই আগে যেমন বলেছি, সদ্গুরু নন্দর্শন বিলম্বে ঘটা। তবে তিনি ভোজন করা ও করানোতে যে প্রকৃতই রসজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন, সেটি আন্দাজ করতে ভুল হয়নি। বেশি উদাহরণ, আলোচনার আবশ্যক নেই, পাঠিকা/পাঠক, যদি এখনও না পড়ে থাকেন, অচিরে তাঁর ‘মোগল যুগের খানাপিনা’ নামক নিবন্ধটি পাঠ করুন। অবশ্য তার কিছু নমুনা ‘রোমন্থনে’-এ লভ্য। তবে উক্ত নিবন্ধটির জন্য তাঁর তৃতীয় বাংলা গদ্য গ্রন্থ ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’টি সংগ্রহে রাখতে হবে।
মনে রাখবেন, এসব নিবন্ধাদি একবার পড়ার জন্য নয়। প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের খাদ্যরসিক তথাচ ক্ষুধামন্দ্যের রোগীরা ওটিকে এপিটাইজার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। একথা সবাই জানেন, ভাল ক্লাসিক ইংরেজি ছবি দেখলে, ইংরেজি না জানা লোকেরও ক্ষুধা বাড়ে, তা রান্নাবান্নার বিষয়ে বিলেতের যতই ‘সেদ্দ’ খাওয়ার বদনাম থাকুক না কেন।
তবে প্রাচ্যদেশীয় ভোজনপ্রেমী তথা রসিকদের অন্নপ্রাসনের অন্ন পর্যন্ত বেরিয়ে আসতে পারে এমন উদাহরণও রন্ধনবিষয়ে মহাশয় তাঁর ‘অর্থকারি সংবাদ তথা বালতিতত্ত্ব’ নিবন্ধটিতে দিয়েছেন। রচনাটি রোমন্থনের দ্বিতীয় সংস্করণে পাওয়া যাবে। সেখানে সাহেবদের কারিতত্ত্ব বিষয়ে গভীর জ্ঞানের কথা আছে। তপনদার রচনা থেকে, এ স্থলে একটি ভাল গতরের উদ্ধৃতির লোভ সামলানো গেল না। এক সাহেব সহকর্মীকে প্রতি রবিবার তাঁরা সপরিবারে কীরকম ‘কারি’ খান জিজ্ঞেস করাতে স্মিত হেসে তিনি বলেছিলেন, “শুনবে? তা শোন! বঅল (অর্থাৎ ভাল), তারপর fried bannana (বোধহয় দক্ষিণি কাঁচকলা ভাজা), মুলাগাটনি সুপ, রাইস, fried pomfret (সব সময় অবশ্য পাওয়া যায় না, তখন plaice দিয়ে চালাই), Madras lamb cwry (বুঝলে হে ঝালটা আমাদের সবারই পছন্দ), নান রোটি, রোস্ট চিকেন, শেরউড কোম্পানির চাট্নি, অবশেষে ক্যারামেল কাস্টার্ড (যাকে তোমরা পুডিং বলো), জিলাবি আর টিপ্সি পুডিং।” এরকম বহুবিধ কারির বর্ণনা নিবন্ধটি পড়লে পাঠক দেখবেন কী গভীর অধ্যাবসায়ে প্রাচ্য প্রত্যাকৃত সাহেব পুঙ্গবেরা ‘কারি’ মেনুফ্যাকচার করতে শিক্ষা লাভ করেন। শব্দটা এক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে ‘ম্যানফ্যাকচার’ই রাখলাম। তবে ‘উল্টি’ হওয়ার সহজ উপায়ের জন্য নিবন্ধটি অবশ্য পাঠ্য।
হাসিদি অবশ্য তপনদার এই জাতীয় নিবন্ধাদি রচনার জন্য তাঁর পতি দেবতার সর্বদা তারিফ করতেন না। কয়েক বছর আগে, কেয়াতলা, না তার আগের কলকাতার সাময়িক উপনিবেশী বাসায় বসে একটি ‘ছ্যাবলা’ রচনা পাঠ করতে দিয়েছিলেন। হাসিদির লেখাটি আদৌ পছন্দ হয়নি, এ নিয়ে তিনি কিছু বললেনও। লেখাটি এখনও ছাপার অপেক্ষায়। তিনি চাননি ওটি ছাপার জন্য যাক। তপনদা মানছিলেন না। তপনদা ও আমি লেখাটি নিয়ে খুব হাসাহাসি করছিলাম। হাসিদি বোধহয় একটু বিরক্ত হয়েই পাশের ঘরে চলে গেলেন। আমি বলেছিলাম, ‘ওটা না হয় নাই পাঠালেন। উনি যখন চাইছেন না। উনি বোধহয় একটু serious লেখা চাইছিলেন।’ তপনদা বললেন, ‘হাসি সম্ভবত চায় না, আমি ওর উপর ছাড়া অন্য কারুর বা কিছুর উপর মনোযোগী হই, যেমন সান্ধ্য গেলাম। আমার ব্যাপারটা কি জান, আমি জীবনটাকে খুব একটা seriously নিইনি।’ এই কথাটা নিয়ে আমি তর্ক তুলতে পারতাম। সেটা শোভন হতো না বলে তুলিনি। মানুষটি যে অত্যন্ত সিরিয়াস হিউমারিস্ট, তা আমি গোড়াতেই বুঝেছিলাম। তবে সবাই জানেন, তাঁর হিউমারের ঘরানাটা ছিল, সৈয়দ মুজতবা আলি সাহেবের ঘরানা।
হাসিদি যে অসাধারণ সুন্দরী মহিলা, এ কথা সবাই একবাক্যে বলবেন। তপনদা এ কথাটা তাঁর সব গদ্যে, বিশেষত বাঙালনামায় বিশদের চাইতেও বিস্তৃতিতে লিখেছেন। কিন্তু খুব কম পরিসরে হাসিদি যে অসাধারণ গুণেরও অধিকারী, তার বিবরণ আমরা পাই। ‘বাঙাল নামার’ রিভিয়্যুটা আমি করি, এরকম একটা অভিমত তিনি আমার কাছে প্রকাশ করেছিলেন এবং সেজন্যই তাঁর ওই বইটার সৌজন্য কপিটি আমাকে না দিয়ে, বলেছিলেন, তুমি তো প্রকাশকের তরফ থেকে পাবেই, এটি অমুককে দিও। সে যাক। আমি লিখেছিলাম। কিন্তু প্রকাশক অশোক মিত্রকে দিয়ে রিভিয়্যুটা করিয়ে ছিলেন। আমার লেখাটি আমি একটি সাধারণ পত্রিকায় প্রকাশ করি। তপনদাকে সেটি পরিয়েও ছিলাম। সেখানে হাসিদির বিষয়ে প্রাগুক্ত মন্তব্যটি ছিল। ভয় হয়েছিল, বাড়াবাড়ি হল কিনা ভেবে। কিন্তু না, তিনি স্বীকার করেছিলেন ত্রুটি হয়েছে। ‘হাসি গুণবতী, নইলে আমায় বিয়ে করে।’ রঙ্গরসের আসরে সব রকম শব্দ ব্যবহারকে তিনি প্রশ্রয় দিতেন, কিন্তু সেই সব শব্দের প্রায়োগিক বিধি রস সৃষ্টি প্রকরণ ব্যতিরেকী হলে চলবে না। তপনদার দাবি ছিল, ‘আমরা যদি ভাষা শব্দের ব্যবহারে শ্রীরামকৃষ্ণের পন্থানুযায়ী সরল এবং অকপট হই তবে ‘বঙ্গপরস্বতী লজ্জারুনা হবেন না।’ অত্যন্ত তথাকথিত অশ্লীল শব্দও ব্যবহার গুণে যে গভীর রস ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করতে পারে, তিনি নিজেই তার প্রমাণ।
বরিশালের একটি প্রাচীন নাম আছে, চন্দ্রদ্বীপ। সেই স্থাননামটি অনুসারে তথাকার ভাষার নামটি ইাম একটু তৎসমায়িত করে করে রেখেছিলাম চান্দ্রদ্বীপি। নামটি তপনদার বেশ পছন্দ হয়েছিল। বলেছিলেন, ‘এ দিব্য হয়েছে। শকুনের মুখে ছাই দিয়ে- বাঙাল নামটি এতদিনে ঘুচে বেশ একটা ‘তৎসম’ কৌলীন্য পেল। এবার থেকে ভাষাটাকে ‘ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ’ বলে চালাবার একটা যুৎসই অবস্থান পেলাম।
কোলকাতায় একটি ফ্ল্যাট কিনবেন। সময়টা ’৯৪-৯৫, কী ওইরকম কোনও একটা বছরে। কোন এক দালালের খপ্পরে পড়েছেন। বোধহয় কিছু টাকা পয়সা আগাম দিয়ে ফেলেছেন। তারপর যা হয়, লোকটা ল্যাজে খেলিয়ে যাচ্ছে। একদিন বললেন, ‘চল তো একটু আমাদের সঙ্গে, ও ব্যাটার তো মনে হয় খোঁজে কোনও ফ্ল্যাটই নেই।’ জায়গাটা যতদূর মনে পড়ছে, সাদার্ন এভিনিউর কোথাও। অফুস্থলে গিয়ে জানা গেল, সব ফ্ল্যাটই বুকড। দালাল অফিসের ম্যানেজার জানাল, লোকটি জালি। তাদের কাছে কিছুদিন কাজ করেছিল বটে, এখন বিতারিত। তপনদা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কী হল?’ আমি বললাম, ‘This is Indian moderity. এটাকে এদেশের প্রবচনে বলে, ফাঁটা বাঁশে লেজ আটকে যাওয়া।’ তপনদা, তাঁর টাকার দুশ্চিন্তা তথা বিরক্তি মুহূর্তে ভুলে গিয়ে দুম করে প্রবচনটা ক্যাচ্ ধরে বললেন, ‘কথাটাকে তোমরা ল্যাজ আটকে যাওয়া বল? কুমার যেন বলেছিল-’। হাসিদি বললেন, ‘তুমি থামবে?’ যা হোক, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে টাকাটা উদ্ধার হয়েছিল।

আট.
এতক্ষণ যা যা লিখলাম সেইসব খবর একজন অগ্রজের স্নেহ প্রকাশের বৃত্তান্ত মাত্রই নয়, অথবা এমনও নয় যে এর দ্বারা আমি নিজের গৌরব বৃদ্ধি করতে চাইছি। অনেকে হয়ত ঠাট্টা করে এও  বলতে পারেন যে আমার অবস্থাটা ‘রাজেন্দ্র সঙ্গমে, দীন যথা যায় দূর তীর্থ দরশনে”- এরকম একটা ব্যাপার। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে আমার সৌভাগ্যটা তার চাইতে একটুও কম নয়। আক্ষরিক অর্থেই, আমার এই অকিঞ্চিৎকর জীবনের যে কটা দিন তাঁর চলন-দারিতে চলেছি রাজেন্দ্র সঙ্গমে দীনের তীর্থ যাত্রাই হয়েছে। নানা কারণে গৌরব অর্জনও আমার অবশ্য হয়েছে। তার প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল ‘রোমন্থনের’ দ্বিতীয় সংস্করণটি প্রকাশ হবার সময়। সেই সংস্করণে মূল রচনাটির সঙ্গে আরও কিছু লেখা যুক্ত হয়েছিল। তার মধ্যে একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধ- যার বিষয়বস্তু ছিল আমার একটি অন্যতম প্রধান গ্রন্থ সিদ্ধিগঞ্জের মোকাবের পর্যালোচনা। লেখাটি প্রথমে ‘নন্দন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম আমার প্রথম প্রসান মাপের বই। তপনদা প্রাণখুলে বা বলা ভাল হাতখুলে বইটির প্রশংসা করেছিলেন। ফলে বেশি বয়সে লেখালেখির জগতে আসা আমার ব্যাপক খ্যাতিলাভ হয়েছিল। সেই সংস্করণেই তপনদার কাছে লেখা আমার সেই মেগা-চিঠি নিবন্ধটিও সংকলিত হয়ে তাঁর প্রায় বুকের মধ্যে আমার স্থান অক্ষয় করে দিয়েছিল। এ যে কতখানি গৌরবের, এমন কি অহঙ্কারেরও, তা যে কোনও সংস্কৃতিকর্মীই অনুমান করতে পারবেন।
২০০৩ সালে সুবর্নরেখার প্রকাশনায় আমার সবচেয়ে বড় এবং উল্লেখযোগ্য বই বিষাদবৃক্ষ প্রকাশিত হয়। ইচ্ছে ছিল, বইমেলা থেকে বই নিয়ে সোজা তাঁর কাছে গিয়ে হাতে হাতে দিয়ে আসব। বইটি সেবার আমার নিজের খরচেই প্রকাশিত হয়েছিল। বেরোবার তারিখটা কথা প্রসঙ্গে তপনদাকে বলেছিলাম। সুবর্নরেখার স্টলে পৌঁছোতে সেদিন একটু দেরীই হয়ে গিয়েছিল। স্টলে পৌঁছোতে, ইন্দ্রদা- অর্থাৎ সুবর্নরেখার মালিক ইন্দ্রনাথ মজুমদার জানালেন, ‘খানিক আগে তপনবাবু এসেছিলেন। বইটা হাতে নিয়ে দুএক পৃষ্ঠা ওল্টালেন, তারপর বললেন, “ইন্দ্র, বইটা আমি নিয়ে গেলাম, মিহির এলে বোলো।” -‘পয়সা ছিল না, বুঝলি?’ জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘চেয়েছিলেন নাকী?’ ইন্দ্রদা আঁতকে উঠে বললেন, ‘খেপেছিস্? তবে আখেরে লাভ হবে দেখিস।’ লাভ হয়েছিল। তবে সেটা ইন্দ্রদার। অচিরে একটা রিভিউ বেরিয়ে ছিল দেশে। অসামান্য প্রশংসা, সঙ্গে গেরিক সাম্প্রদায়িকতাবাদিদের প্রতি সতর্কতা- যাতে বইটি স্বার্থগতভাবে ব্যবহারের বৃথা চেষ্টা কেউ না করেন, যেহেতু বইয়ের মূল সুর মানবতাবাদের। সেদিন রাতেই বাসায় টেলিফোনে জানিয়েছিলেন, ‘পড়তে শুরু করেছি। বড় কাজ করেছ। এখন থেকে যা লিখবে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেই লিখবে। হাবিজাবি লিখে লাভ নেই। সাম্প্রদায়িকতা আমাদের বড় শত্রু।’ মানুষটি আদ্যন্ত অসাম্প্রদায়িক এবং ইহজাগতিকতা-মনষ্ক।
বই বিষয়ক আর একটি কথা বলে এই প্রসঙ্গটা শেষ করব। একখানি বই লিখেছিলাম মহাভারত বিষয়ে। বইটি দু’দুবার চেষ্টা করেও মোটামুটিও শুদ্ধ বা সদ্ভোবজনক হয়নি। বইটির নাম ‘বিদুর’। অবশেষে তৃতীয়বারের প্রচেষ্টায় ব্যাপারটি পানে দেবার মত হল। সাহিত্য সংসদ আগ্রহ করে বইটি প্রকাশ করলেন। বইটি পড়ে তপনদা বললেন, ‘বইটা ভাল লিখেছ। রিভিউটা আমি করব কী?’ বললাম, ‘সেটা অবশ্যই আমার সৌভাগ্য।’ তপনদা বললেন, ‘অনেক দিন ধরে মনে একটা ইচ্ছে ছিল যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে একটা বই লিখব। ‘হিস্ট্রি অব মেন্টালিটি’টা শেষ করেই ওটা ধরব ভেবেছি। দেখি, তবে মহাভারতচর্চা নিয়মিতই করছি। তোমার বিদুর আমার লোভ বাড়িয়ে দিল। তুমি যেন আবার দুম করে যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে আগে ভাগে লিখে ফেলো না।’ বললাম, ‘ওভাবে লজ্জা দেবেন না। আমি লিখলেও তার দৌঁড় কতটা হবে, তা আপনি বিলক্ষণ জানেন। তাছাড়া আমার ক্ষমতা এবং পাঠদারিদ্র বিষয়ে আমি নিজেই যথেষ্ট অবহিত। সংস্কৃত মহাভারত পড়া দূরস্থান, সংগ্রহেও নেই।’
কিন্তু তপনদা বিদুর বইটা, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পর্যালোচনা করতে পারলেন না। কিছু নিহিত স্বার্থের কারিগর বিষয়টা কায়দা করে প- করে দিয়েছিল। সেসব কথা বিস্তারিত আলোচনা করলে, সমস্যা আছে বলে চেপে গেলাম। তপনদা পরে একদিন বলেছিলেন, ‘সারস্বত জগতটা শুধু এদেশে নয়, সর্বত্রই বড় মাৎসর্য আমন্ত্রণকারী।’ তাঁর কথাটা স্বীকার করে নিয়েছিলাম কারণ তা সত্য। এই ঘটনা বেশি দিনের নয়, মাত্র গত বছরেরই আগের বছরেই ঘটেছে। গত বছরেও প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন, কিন্তু ফল একই হয়েছিল। ইতিমধ্যে তাদের এদেশে থাকার সময়কাল দ্রুত শেষ হয়ে আসছিল এবং দুজনেই খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। বাথরুমে পড়ে গিয়ে কোমড়, পায়ের হাড় ভেঙেছিল হাসিদির। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ওদেশে চলে যেতে হয়েছিল হাসিদিকে নিয়ে। কয়েক মাস চিকিৎসার পর হাসিদি মোটামুটি সুস্থ হলে তপনদা পড়লেন। তার পরে তো শুধু ক্রমাবনতির ইতিহাস। অনেকে বয়সের দোহাই দেয়। কিন্তু ওটা একটা বাজে কথা।


নয়.
তপনদা বরিশালকে কোনও দিন ভোলেন নি। তার ‘বাঙাল-নামা’ লিখতে গিয়ে লেখাটা দুনিয়ানামা বা বিশ্বনামা হয়ে গিয়েছিল। কারণ, গোটা পৃথিবীই একসময় তাঁর কাছে বরিশাল হয়ে উঠেছিল। ২০০০ সালে কোলকাতা এসে একদিন ফোনে বললেন, ‘তোমাদের হাসিদির এতদিনেও শ্বশুরবাড়ির ভিটে দেখা হয়ে ওঠেনি। কোনও ব্যবস্থা করতে পার?’ বললাম, ‘আমি ত প্রতি বছরই একবার দুবার যাই। এবার চলুন না ফেব্রুয়ারি মাসে যাই বরিশালে। আমি সঙ্গে থাকলে আপনাদের অসুবিধে হবে না আশা করি।’ -‘তাই ভাবছিলাম। তবে ভিসা টিসার ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে। আমাদের কিন্তু আবার ব্রিটিশ পাসপোর্ট।’ বললাম, ‘দালাল ধরে করিয়ে নেব। তবে খরচ একটু বেশি।’
ঠিক হল, আমি কয়েকদিন আগেই তাঁদের একদার “নিজ মৌজা” কীর্তিপাশা যাব। কাছেই আমার কুটুম্ববাড়ি। সেখানে উঠে তপনদার পৈত্রিক প্রাসাদ দর্শন করানোর ব্যবস্থা করব। প্রাসাদের সামনের অংশের দোতলার হল ঘরে এখন একটা মেয়েদের ইস্কুল। নীচের অংশে ইস্কুলের অফিস, শিক্ষকদের বসার ঘর, এইসব। এছাড়া বাড়ির সামনের দিকে তপনদার ঠাকুরদায়ের পিতৃনামে প্রতিষ্ঠিত প্রসন্নকুমার উচ্চ বিদ্যালয়। ইস্কুলের সামনে প্রকাণ্ড ফুটবল মাঠ এবং একদিকে একটি বেশ বড় দিঘি। মাস্টার মশাই এবং ইস্কুল কর্তৃপক্ষের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করে সেই মাঠে এবং প্রাসাদের হলঘরে দুটি আলাদা সভার বন্দোবস্ত করা হল। মধ্যাহ্ন ভোজন আমার শ্বশুরালয়ে।
তপনদার বাবার নাম কৌলীকভাবে অমিয় সেন। ডাকনাম স্থানীয় পরম্পরায় চাঁদ বাবু। রায়চৌধুরি উপাধি নাকি নবাবি আমলের। কেউ ব্যবহার করেন, কেউ করেন না। তাঁদের জমিদারির দুটি ভাগ- বড় হিস্যা এবং ছোট হিস্যা। একদা একত্রিতই ছিল। পরবর্তীকালে বিভক্ত। প্রাসাদের মাঝখানের দেয়ালটা তপনদার ভাষায় বর্ণনায় ‘বার্লিন ওয়াল’। দুটো অংশই এখন বেশির ভাগ খ-হর বা ধ্বংস্তূপ। শুধু বড়হিস্যার সামনের অংশটি অট্টালিকা প্রাসাদত্বের অহংকার এখনও ঘোষণা করে চলেছে। এ প্রসঙ্গে খুঁটিনাটি অনেক কিছুই বর্ণনীয় থাকলেও নিস্প্রয়োজনে রচনা প্রলম্বিত করছি না। তপনদার কাছে লেখা সেই সুদীর্ঘ পত্র পাওয়া যাবে। নামকরণ করা হয়েছিল ‘আহ্লাদে ফাউকানো অথবা ভাটি পুত্রর পত্র বাখোয়াজি।’
তপনদা আমাকে বলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত ব্যারিস্টার এবং আওয়ামী লীগ নেতা কামরুল হাসান সাহেবকে ঢাকায় যোগাযোগ করে জলপথে বরিশার আসার ব্যবস্থা করে রাখতে। তিনি এয়ারে হাসিদিসহ ঢাকা গিয়ে তাঁর অতিথি হবেন। পরের দিন বরিশালে আমি তাঁদের রিসিভ করে গাড়িতে কীর্তিপাশা নিয়ে আসব। ফোন মারফত কামরুল হাসানকে যোগাযোগ করতে তিনি জানালেন, জলপথে ভাল ব্যবস্থা করা যায়নি। তপনদায়েরা ঢাকা-বরিশাল প্লেনে আসবেন।
আমি আমার কুটুম্বদের নিয়ে ঝালকাঠি শহরে তাঁদের নৈশাবাসের ব্যবস্থা করে তাঁদের আসার আগের দিন ঝালকাঠিতেই রাত কাটালাম। পরদিন ভোরে গাড়ি নিয়ে চলে গেলাম বরিশাল এয়ার স্টেশনে। তাঁরা এলেন। পথে বললেন, ‘কালকে ঢাকা ফেরার ব্যবস্থাটা কী করবে?’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার ইচ্ছে কী?’
‘বহুকালের সখ, সেই ছোটবেলার ‘ইস্টিমার’, ওই যে ফ্রেমিংগো কোম্পানি টোম্পানির জাহাজ টাহাজ তার একটায় আর একবার অন্তত ভ্রমণ করা।’ হায়রে বাঙালের নস্টালজিয়া! হায়রে হারানো ফুরোনো দিনকে ফিরে দেখার বা পাওয়ার আকাক্সক্ষা!! তাতো দেখছি কাউকেই ছাড়ে না! তবু ভাগ্য ভাল, যে তপনদা জ্যোতিঠাকুরের মিনিমাঙ্না ইস্টিমারে চাপার বায়না ধরেননি। বললাম, ‘স্টিমার সার্ভিসের চল এখন খুব একটা নেই। একটা স্টিমার অনিয়মিত ভাবে  চলে। তবে সটাফ্রেমিঙের নয়। ব্যবস্থা একটা করেছি। কাল সন্ধ্যেয়। কিন্তু আমি সঙ্গে থাকব না। গ্রামে আর কয়েকটা দিন কাটিয়ে বাসে ফিরব।’
‘কীভাবে ঠিক করলে?’
‘পুষ্প, মানে আমার এক বন্ধুর বোন বরিশালে থাকে। ওর বর খুব বড় উকিল এখানে। ওই পুষ্পর ঘাড়ে দায়িত্ব চাপিয়েছি। কোনও অসুবিধে হবে না। সে একেবারে ‘থাকিবার, খাইবার, শুইবার সুবন্দোবস্ত, সুন্দরী স্ত্রীর সহিত একত্র বন্দোবস্তো।’ তবে শর্ত আছে। কাল, আমাদের সবার পুষ্পর বাসায় মধ্যাহ্ন ভোজ খেতে হবে। তবে আমার অভিজ্ঞতা ব্যাপারটা ভয়াবহ। ওর বর যেমন খায়, তেমন খাওয়ায়। ‘সামান্য দশ পদ মাছ’ ছাড়া তার আয়োজন মোটামুটিও হয় না।’ তপনদা বললেন, ‘খাইছে।’ সুদীর্ঘ পরবাসেও বিশুদ্ধ ‘চান্দ্রদ্বীপি’ তাঁর সঙ্গ ছাড়েনি পথঘাট তাঁর স্মৃতির ছবির অনুসারী ছিল না। তা থঅকার কথাও এতদিনের পর থাকে না। বছর পঞ্চাশেক আগে নাকি একবার এসেছিলেন। তবে কীর্তিপাশার বাড়িতে যাননি। বরিশাল স্টিমার ঘাটের কাছে ‘নাবালক লজ’টা তখনও দেখতে পেয়েছিলেন। কাল ফেরার পথে দুটো জায়গায় যাওয়ার ইচ্ছে। নাবালক লজ এবং জিলা ইস্কুলটা, তপনদার প্রোপিতামহের শিশু বয়সে এক প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে তাঁর পিতা রাজকুমার বিষ প্রয়োগে নিহত হন। তাঁর স্ত্রী ‘সতী’ হয়েছিলেন। পরিবারে তখন মাৎস্যন্যায়ী অনাচার। তৎকালীন ব্রিটিশ জেলা শাসক নাবালক প্রসন্ন কুমারের দায়দায়িত্ব এবং বিষয় সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ স্বহস্তে গ্রহণ করে তাঁকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলেন। জমিদারি এস্টেটটি তদবধি ‘নাবালক বাবুর এস্টেট’ এবং তাঁর বড় হয়ে ওঠার পরের বরিশালস্থ বাসস্থানটির নাম হয় নাবালক বাবুর লজ।
বরিশাল ঝালকাঠি রোড ধরে যাবার সময় তপনদা সেদিন এইসব গল্প শোনাচ্ছিলেন। অবশ্য এসব গল্প তার বউ ঠাকুরদা রোহিনী কুমারের ‘বাকলা’ গ্রন্থে আমি আগেই পড়েছিলাম। গল্পের মধ্যে, মাঝে মাঝে তিনি এবং আমি ‘ফুট’ কেটে চলেছিলাম। হাসিদি হাসছিলেন। মজা করে বলেছিলাম, ‘হাসিদি, আপনি ওই পরিবারে আসার পরেই কী তপনদায়েরা সাবালক হলেন?’ হাসিদি বললেন, ‘কী জানি? পুরোটা বোধহয় এখনও হননি। দেখ না, কথাবার্তার শ্রী। যেমন কথায়, তেমন লেখায়।’ তপনদা বললেন, ‘অনেক পুরুষের অভ্যেস তো, তাছাড়া এস্টেটের অন্ন কিছুটা হলেও তো খেয়েছি, এস্টেটা গেছে, কিন্তু নাবালকত্বটা রয়েই গেছে। ওটা সামন্ত-আভিজাত্য। তুমি ঠিক বুঝবে না।’
গাড়ি আস্তে চলছিল। মাঝে মাঝে দাঁড় করিয়ে তপনদা হাসিদিকে নদী, পথঘাটের বিশেষ বিশেষ জায়গার স্মৃতি-ইতিহাস বলছিলেন। কোন্টা কালিজিরা নদী, সেটাই প্রাচীন সুগন্ধার অবশেষ কীনা, বর্তমান ঝালকাঠি নদীটাই শেষতক সুগন্ধার স্মৃতিবাহী নদী কিনা- এইসব। ইস্কুল জীবনে, নাবালক লজ থেকে বাড়ি যেতেন সাইকেলে। সঙ্গে থাকতেন একজন ইংরেজ সাহেব- পারিবারিকভাবে পরিচিত, কী যেন নাম- ভুলে গেছি। বরিশালি ভাষায় দক্ষতা ছিল। তপনদা বললেন, ‘এইসব জায়গায় হঠাৎ সাইকেল থামিয়ে নেমে পড়ে সাহেব একপাক নেচে, গেয়ে নিতেন- ‘আইজ ঠাকুমার রান্ধন খামু।’ ঠাকুমা নাকী রন্ধনে দ্রৌপদি, তপনদা বলেছিলেন। হাসিদি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বাকিটা?’ আমি বলেছিলাম, ‘পরিবারে কিন্তু প্রসন্ন বাবুর মা এবং ঠাকুমা দুজন ‘সতী’ হয়েছিলেন, সামলে কথা বলবেন। গেলে, দুদুখানা সতী স্থান দেখতে পাবেন।’
আমাদের রাস্তা গিয়ে তার অ্যাসফল্টত্বক হারাল কীর্তিপাশার বাজারের বিপরীত পারে এক ব্রিজের গোড়ায়। ব্রিজটা কংক্রিটের না হলেও তার উপর দিয়ে গাড়ি যাবে। ওপার থেকে বাজারের শুরু। তার মাঝখান দিয়েই রাস্তা। কিন্তু এখন সংকীর্ণ। গাড়ি আস্তে আস্তে চলল। এই বাজার, রাস্তা এবং এলাকা তপনদাদের ‘নিজমৌজা’, একেবারে নিজস্ব ভূমি। কম করে আশপাশ দশগ্রামের মানুষ হাজারে হাজারে ভিড় করে রাস্তা প্রায় অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। হাসিদির হাঁটুতে আর্থারাইটিস। হেঁটে যেতে পারবেন না। পুষ্পকে বললাম, তুই হাসিদির দায়িত্বে থাক। আমি তপনদাকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। সঙ্গে অবশ্য ঝালকাঠি থেকে আমার বড় শ্যালিকাও ছিলেন। ওঁরা গাড়িতেই ইস্কুলের মাঠ অবধি যাবেন। তপনদা বললেন, ‘এ বেশ হল। পথি নারী আবর্জনা।’ অবশ্য নারীরা কথাটা শোনেন নি। তাহলে আবর্জিতা বোধে বিবর্জিতা টের পাইয়ে দিতেন। বললাম, ‘পুষ্প কিন্তু বরিশালের মহিলা সমিতির নেত্রী।’ তপনদা বললেন, ‘বাবারে!’
কিন্তু হাঁটার উপায় নেই। কীর্তিপাশা এখনও হিন্দু প্রধান গ্রাম। উত্তরের বিস্তীর্ণ বিল অঞ্চলের গ্রামগুলো নমশূদ্র সমাজ অধ্যুষিত। অন্যান্য গ্রাম সবই মুসলমান প্রধান। বাজার সংলগ্ন বসতির অধিকাংশ মানুষ কর্মকার সমাজের। এঁরা শিক্ষা সংস্কৃতিতে খুবই উন্নত, যদিও এখন আর আগের ব্যাপকতা নেই। তথাকথিত শিক্ষিত হিন্দু উচ্চবর্ণীয় ভদ্দরলোক প্রায় সেই এবং ভাগ্যিস্! মানুষগুলো সব বয়স ধর্ম নির্বিশেষে রাস্তায় পড়ে সাস্টাঙ্গ প্রণিপাত করছে তাদের একদার রাজপুত্রকে। তপনদার দুচোখে অঝোর ধারা। মানুষটিকে কোনও দিন আদৌ আবেগপ্রবণ দেখিনি। একজন একজন করে বুকে জড়িয়ে ধরে এখন কাঁদছেন। এই কান্নার অর্থ বা মাহাত্ম্য সবাই বুঝবেন না। এটা তিনি নিশ্চয় বোঝেন নিজে, কারণ তিনি ‘রোমন্থনের কবি’, আর বুঝি আমি, কারণ ওই সময়টায় আমি ‘বিষাদবৃক্ষ’ রচনার দুর্মর প্রহরগুলো কাটাচ্ছিলাম। এটা ২০০০ সাল, ২০০৩ এ বিষাদবৃক্ষ তার পুস্তকশরীর পাবে। আমি বিষাদ বৃক্ষের কবি হব।
হঠাৎ একজন কাঁচা-পাকা দাড়িওলা প্রৌঢ়কে দেখে তপনদা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আরে ভুডি, তুমি তো দেখি এক রকমই আছ।’ বুঝলাম, তপনদার ভুল হয়েছে। ‘ভুডি’ অর্থাৎ ভুতি গাজিকে আমিও চিনতাম। তিনি সেই সময়ের প্রায় পঁয়তিরিশ চল্লিশ বছর আগে মারা গেছেন এবং বৃদ্ধ বয়সেই। যাকে তপনদা ভুডি বলে জড়িয়ে ধরেছেন, সে ওই ভুডি গাজিরই কনিষ্ঠপুত্র, সিদ্দিক গাজি। ও আমার চাইতে বয়সে কিছু বড় হলেও, আমাদের সঙ্গে ইস্কুলে পড়ত। কথাটা একটু ফাঁকায় এসে তপনদাকে বলতে, বললেন, ‘তাই তো, কিন্তু ও যে একদম ওর বাপের চেহারা-অবিকল।’ বললাম, ‘সবার নিরুত্তিয়াতে বলুন, একদম নয়- ‘একছের’, এখানে আমি কইলকাত্ইয়া কথা কই না।’
সেবারে, বহুকাল বাদে, কীর্তিপাশার বড় হিস্যার প্রাসাদের সামনে একটা বড় রকমের খুশির উৎসব যেন ভেঙে পড়েছিল। ওই রকম গ্রামে এত জন সমাগম রাজনৈতিক সভা সমাবেশেও হয় না। ইসকুলের সামনের মাঠে মঞ্চ বাঁধা হয়েছিল প্রকাণ্ড। রাস্তায় পর পর অন্তত তিনটি তোরণ সজ্জিত করা হয়েছিল। ইসকুলের ছেলেমেয়েরা শিক্ষকেরা একের পর এক এসে প্রণাম করছিল বর্গবর্ণ নির্বিশেষে। একটি কিশোরী গান গেয়ে বরণ করল, ‘ঝরা ফুলদলে কে অতিথি, এলে সাঁঝের বেলায় কানন বীথি।’
তপনদা বক্তৃতায় বললেন, ‘আমার অনুজপ্রতীম মিহিরের কল্যাণে এই তীর্থ দর্শন আমাদের সম্ভব হয়েছে। আপনাদের সকলকে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা এবং প্রণাম। মিহিরকে আশীর্বাদ।’ আমার নামটার অহেতুক উল্লেখে আমি গৌরবান্বিত বোধ করেছিলাম।
তপনদাকে ইসকুলের শিক্ষকেরা এবং পরিচালক মণ্ডলি, অফিস ঘরে আপ্যায়ন করলেন। এই ইস্কুল বাড়ি তাঁর পূর্বজদের কৃত নয়। ১৯৬১ সালের ঝড়ে সেই টিনের চালা, কাঠের খুঁটির তিনটি ইস্কুলসহ ধুলিস্যাৎ হবার অনেক দিন পরে, সরকারের বদান্যতা এই বিল্ডিং তৈরি। সুন্দর ছিমছাম বাড়ি। হাসিদি এবং তপনদা খুবই আপ্লুত বোধ করছিলেন স্মৃতিবিজড়িত এই বিদ্যালয়টির ব্যবস্থাপনা দেখে। ইস্কুলের সেক্রেটারি ভদ্রলোক, নাম রুস্তম মোল্লা, বয়সে যুবক, বললেন, ‘এই ইস্কুলের জমি, জায়গা সবই এখনও আপনাদের সম্পত্তি। বাড়িটাতে তো পরবর্তীকালে ‘বালিকা বিদ্যালয়’ স্থাপিত হয়েছে। বাড়ি এবং সংলগ্ন সম্প্রতি এই দুইটা ইস্কুলের সম্পদ-এখনও। আমরা মুসলমানেরা ওই বাড়ির একখানা ইঁটও নেহাত হতে দিইনি। কিছু স্থানীয় হিন্দু স্বার্থান্বেষী কিছু অনৈতিক কাজ করেছে। তবে তার জন্য আমরা হিন্দু মুসলমান, শুভবুদ্ধির মানুষেরা তাদের জেল জরিমানাও করিয়েছি।’ তপনদায়েরা ভীষণ তৃপ্তিবোধ করেছিলেন। আনন্দে তপনদার চোখ অশ্রুসজল হয়েছিল। 
এই সবের পর, প্রাসাদের দরবার হল, যেটি এখনও অভগ্ন, সেখানে যেতে হল। এটি সেই বালিকা বিদ্যালয়। নাম নবীনচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়। আমার মাস্টার মশাই অশ্বিনী কুমারের মৃত্যুর পর, তাঁর সম্পত্তির আয়, তাঁর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী একাজেই ব্যায়িত হয়ে আসছে। ইসকুলের নামটি নিয়ে তপনদা আমার কাছে জিজ্ঞাসু হলেন। নবীনচন্দ্র অশ্বিনী বাবুর বাবার নাম।
রুস্তম এবং আমি তপনদাকে বললাম, ‘মাস্টার মশাইয়ের ইচ্ছে ছিল তাঁর বাড়িতে নবীনচন্দ্রের নামে মেয়েদের একটি হস্টেল হোক। কিন্তু তখন বাংলাদেশ সদ্য স্বাধীন। সর্বত্র বিশৃঙ্খলা। মাস্টার মশাইয়ের গ্রামে জনবসতি, প্রায় নেই তখন। সেই সময় সমাজ কর্তারা তাঁর সম্পত্তির জন্য একটি ট্রাস্ট বানিয়ে, বড়হিস্যার বাড়িতে একটি ইনটারমিডিয়েট কলেজ স্থাপন করে ছিলেন। বেশ কিছু কাল ইসকুলের এক্সটেনশান হিসাবে সেটি চলেও ছিল। কিন্তু স্থানীয় কূট-কচালি রাজনীতিতে ব্যাপারটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে এই বালিকা বিদ্যালয়ের উদ্ভব। বিষয়টি জটিল ছিল এবং এখনও দুটি ইস্কুলের মধ্যে গ্রাম্য কোঁদল এ নিয়ে আছে।
তপনদা পরে আমাকে বললেন, ‘আমাদের পিতৃপুরুষের ভিটেতে অন্য লোকের পিতৃনামে ইসকুল দেখে, প্রথমে মনটা একটু যে সংকীর্ণতায় আচ্ছন্ন হয়নি এমন নয়। পরে ভাবলাম, সবটাই তো সদুদ্দেশ্যে। তাছাড়া, তোমার সেই চিঠিতে অশ্বিনী বাবুর যে পরিচয় জেনেছি, তাতে আর ক্ষোভ থাকার তো কোনও কারণ থাকতে পারে না। জমিদারি বিষয়টা পাপের পাঁকেই জন্মেছে। এতো তার পূণ্যের ব্যবহার। সুতরাং, ভালই হয়েছে বলব।’
সময় শেষ হয়ে আসছিল। তপনদা বালিকা বিদ্যালয়ের মিটিংটাতেও যোগ দেবেন। হাসিদি আমাকে বললেন, ‘তুমি আমাকে সবটা ঘুরিয়ে দেখাও। ছবিও নেব। শুধু বাড়ির অন্দরমহলের দেখাটা তোমার তপনদার সঙ্গে করব। ততক্ষণে ওর কাজ শেষ হোক।’
বিস্তীর্ণ জমিদার বাড়ির দুই হিস্যার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত দেখানো অনেকটা সময় এবং পরিশ্রম সাপেক্ষ। তার উপর হাসিদি আর্থারাইটিসের বনেদি রোগী। তাহলেও শ্বশুরবাড়ি প্রথম দেখাটা উৎসাহের জন্য ভালভাবেই হল। সেই দেখার বিবরণ এবং আলাপ আলোচনা নিয়ে পৃথক একটি লেখা প্রয়োজন। একসঙ্গে অতটা লেখার পরিসর এখানে নেই।
ভেতরে ঘরগুলো, তার প্রত্যেকটির প্রাক্তন ব্যবহারের কথা, তপনদায়েরা বাড়ি এলে, কোন্ অংশের ঘরে থাকতেন, নেতাজি খেতাব শেষ বরিশাল সফর করেছিলেন, কোন্ ঘরে ছিলেন, ঐতিহাসিক হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ই বা যখন আসতেন, কোন্ ঘরে থাকতেন, এই তাবৎ বৃত্তান্ত তপনদাই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতেন এবং শোনালেন।
এত বড় ব্যাপার মাত্র দুদিন এক রাত্তিরে হওয়া সম্ভব নয়। সময় এত দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছিল। দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা হয়েছিল আমার কুটুম্ব বাড়িতে। কুটুম্বেরা শাঁসাল গৃহস্থ। হাঁকে ডাকে, এখনও প্রবল দাপুটে। শাশুড়ি তখনও বেঁচে। সুতরাং অতিথি আপ্যায়ন সামান্য দশপদে। প্রাচীন পরম্পরাক্রমে শাশুড়ি ঠাকুরুন, চাঁদ বাবুর ছেলেকে অক্লেশে তথা স্বাভাবিকতায় তুমি সম্বোধনে কথাবার্তা, কুশলাদি বিনিময় করলেন। তিনি বয়সে তপনদার বড় না ছোট সেটা প্রশ্ন নয়। গ্রাম সুবাদে কাকিমা বটেন।
ফেব্রুয়ারি মাস। এই সময় বিল গাঁয়ে একরকম শসা জাতীয় ফল বা সবজি হয়। শসার চাইতে আকারে বৃহত্তর, পেল্লায় বলা যায়। নাম মর্মা। বস্তুটি কাঁচা এবং তরকারি হিসেবে ভোজ্য। অত্যন্ত সুস্বাদু। তাঁরা দুজনেই মধ্যাহ্ন আহারের আগে প্রচুর মর্মা খেলেন। তপনদা পরিচিত হলেও হাসিদি এই প্রথম জিনিসটির স্বাদ নিলেন এবং উচ্ছসিত। খাওয়ার উপকরণে ছোট চিংড়ি দিয়ে মর্মার সবজি ছিল। সেটাই দেখলাম, অন্যান্য বিশেষত আমিষাদারকে পরাজিত করল। তপনদা বললেন, ‘হালার মর্মা আর খিরই কতদিন পর যে খাইলাম!’
রাতটা কাটানোর ব্যবস্থা কুটুমদের সহায়তায় হয়েছিল একদার বন্দর শহর এবং এখনকার জিলাসদর ঝালকাঠির শহরে। আমার ‘সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম’ বইটির অন্যতর প্রধান চরিত্র রাজা নাসিরের সুগন্ধা তীরস্থ ফ্ল্যাট বাড়ির তিনতলায়। তপনদার আকাঙ্ক্ষা ছিল, আমাদের পুরাণ প্রসিদ্ধ নদী সুগন্ধাকে ভালভাবে দেখার। তেতালার ব্যালকনিতে বসে সেদিন রাতে এবং পরের দিন ভোরে প্রাণভরে সুগন্ধাকে দেখা হয়েছিল। সুগন্ধা আমাদের বড় আদরের নদী। কিন্তু এখন আর তার সেদিন নেই। রাজা নাসির বা নসু এবং অন্যান্য উপস্থিত অনেকেই, তা কি গ্রামের বাড়িতে কি গঞ্জের এই তিনতলায়, প্রায় সবাই আমার সিদ্ধিগঞ্জের মোকামের চরিত্র। তপনদার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে তিনি হাসিদিকে বললেন, ‘হাসি এদের দেখ। এরা এর সিদ্ধিগঞ্জের মোকামের মানুষ’ বইয়ের মানুষ জ্যান্ত দেখতে পাওয়া ভাগ্যের কথা।’ হাসিদি কৌতূহল প্রকাশ করছিলেন, নাসির এবং তার ভাইদের নামের আগে ‘রাজা’ বিশেষণটির কারণ জানতে। নাসির বলল, ‘শুনেছি, আমরা নাকি রাজা প্রতাপাদিত্যের বংশধর। পরবর্তীকালে ধর্মান্তরিত।’ তপনদা বললেন, ‘প্রতাপাদিত্যের বংশ নেই। ওরা সম্ভবত বসন্তরায়ের বংশের সঙ্গে সম্পর্কিত।’ হাসিদি তপনদা, নাসির, আমার এক শ্যালক কমল আর আমার একটা সমবেত ছবি নিলেন। পরে একটা প্রিন্ট আমাকে পাঠিয়েছিলেন। ছবিটা আছে।
নটা সাড়ে নটায় বেরিয়ে দশটার মধ্যে বরিশাল। পুষ্প কলিই সন্ধ্যেয় তার বাসায় চলে গেছে। আজ তার গরীবখানা মধ্যাহ্ন আহার। সন্ধ্যেয় ব্যবস্থামত এঁদের সবাইকে স্টিমারে ঢাকার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে আমি গ্রামে ফিরব এবং আরও কয়েকটা দিন এখানে থাকব। তপনদা বললেন, ‘তিনটা জায়গা হয়ে পুষ্পর বাসায় যাব। জিলা ইস্কুলে যাওয়া, নাবালক লজ দেখা এবং মিশন ইস্কুলটায় যাওয়া।’ মিশন অর্থাৎ বরিশালের বিখ্যাত অক্সফোর্ড মিশন ইসকুলটি পুষ্পর বাড়ির পাশেই। বাকি দুটি জায়গা দেখতে যাওয়া হল। প্রথমে জিলা ইসকুল। কিন্তু সেটি সেদিন বন্ধ। প্রিন্সিপাল ভদ্রমহিলার কোয়ার্টার ইসকুল সংলগ্ন। মহিলা তপনদার পরিচয় পেয়ে ফোন মারফত বিশিষ্ট শিক্ষক শিক্ষিকা এবং সংশ্লিষ্ট অনেকেই খবর দিলেন। অচিরে অফিস ঘরটি পরিপূর্ণ হল এবং ব্যাপক আড্ডা, স্মৃতি কতূয়ন চলতে থাকল। প্রচুর ফল, ডাবের জল, চা-কফি পর্যায়ক্রমে চলতে থাকল।
জায়গাটি দুর্ভাগ্যক্রমে তার প্রাক্তন সৌন্দর্য ভ্রষ্ট হয়েছে। যদিও আমি অনেক পরে এই দেশ ছেড়েছি, কিন্তু তখনও যে সৌন্দর্য এই বেল-পার্ক স্থানটিতে ছিল, কালের প্রকোপে এবং শহরায়ণ জনিত উন্মাদ উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রকোপে তা আজ আর নেই। সবচেয়ে করুণ অবস্থা সামনের বয়ে যাওয়া কীর্তনখোলা এবং তার পাড়ের ঝাউগাছগুলোর। একটা ঝাউগাছও আর নেই। রাস্তার বৃহদায়ন তাকে নিঃশেষে ধ্বংস করেছে। জেলা ইস্কুল থেকে বেরিয়ে নাবালক লজের স্মৃতির জগতে ঢুকতে চাইছিলেন তপনদা। সঙ্গে গাড়িতে একজন পথপ্রদর্শক ছিলেন। কিন্তু তিনি যেখানে নিয়ে পৌঁছালেন, সেটা একটা সিনেমাহলের সামনের খিঞ্জি জায়গা। আশেপাশে লোহালঙ্কর, সিমেন্ট, বালির জঞ্জাল। একে তাকে বর্ণনা দিয়ে জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে ওরকম একটা বাড়ি সেখানে ছিল বটে, কিন্তু সে তো বহুবছর হল বিক্রি হয়ে গেছে। সে বাড়ি ভেঙে এখন সেখানে একটা বড় হাই-রাইজ, ফ্ল্যাটবাড়ি উঠেছে। তপনদার হতাশা এবার আর বাঁধা মানল না। দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেললেন তিনি। ফ্ল্যাটের মালিকের এক উত্তরাধিকারি, কীভাবে যেন খবর পেয়ে গাড়ির কাছে এসে তাঁর ওখানে খাবার জন্য আমন্ত্রণ করলেন। তাঁর দাদিমা নাকি উপরতলার ঘর থেকে আমাদের ওখানে খোঁজাখুঁজি করতে দেখেছেন। যাওয়ার মানসিকতা বা সময় কোনওটাই ছিল না। সুতরাং ভগ্নহৃদয় তপনদাকে নিয়ে পুষ্পর বাসার দিকে রওনা হতে হল। এর আগে কোনওদিন তপনদাকে হতাশ আবেগে ভেঙে পড়তে আমি অন্তত দেখিনি। এ যেন আধুনিকতার লোহা লঙ্করের প্রচ- আঘাতে একটি বহুকাল পেষিত ছন্দময় কবিতার ল-ভ- হয়ে যাওয়া। রাস্তায় তপনদা আর একটাও কথা বললেন না। 
পুষ্পর বাসায় ফিরে দেখা গেল গোটা বরিশাল শহর সেখানে ভেঙে পড়েছে যেন। সাংবাদিক, শিক্ষক, অধ্যাপক, পত্রিকা-সম্পাদক, পুরোনো মানুষজন- সে এক কাণ্ড। পুষ্প এবং তার বর সেন্টু, তাদের দুজন পাচিকাসহ দুদুটো রান্নাঘরে হিমশিম খাচ্ছে। উপস্থিতদের মধ্যে একটা বড় অংশই মধ্যাহ্ন আহারে অংশী। সেন্টুর সঙ্গে আমার আলাপ বেশিদিনের নয়। অত্যন্ত সুরসিক ভোজন পটু তথা অতিথিবৎসল মানুষ। উকিল, বলল, ‘আলাপ পরিচয় আছিল না, ভালই আছিল। সম্পর্কে গেরাম সুবাদে বড় সম্বন্ধি, কিছু কইতেও পারি না। তয় এবার আইয়া যা একখান বাশ দেলেন, হেয়ার ঘা শুগাইতে মলম লাগান লাগবে এক বছর।’ ওর কথার ধরণটা এমনই ছিল। দুঃখের বিষয় সেন্টু আজ আর নেই। বছর তিনেক আগে হঠাৎ একদিন ফোন পেলাম বরিশাল থেকে, সেদিনই ও হঠাৎ এক হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। বড় মধুর সম্পর্ক ছিল ওর আমার। তপনদা, হাসিদিও খবরটিতে বড় শোক পেয়েছিলেন।
অনেক মানুষ, অনেক খবর, অনেক ফুললেচ্ছা বিনিময়, অনেক সাক্ষাৎকার, ছবি তোলা, অনেক প্রতিশ্রুতি এবং সবচাইতে অনেক ভয়ঙ্কর সেই বাঙাল-আতিথেয়তার অদম্যতা, যা আধুনিক ভোজনে অনীহা প্রকাশ করলে গলায় বাঁশ ঢুকিয়ে গেলাবার ব্যবস্থা করা বিনি।
দুপুরের খাওয়ার পর তপনদার গতদিন থেকে ধকলের কথা চিন্তা করে আমাকে একটু কঠোর হতে হল সমবেত, উৎসাহী স্ব-জেলাবাসীদের প্রতি। এটা দু’হাজার সাল। হিসেবমত তপনদার বয়স চুয়াত্তর বছর। ডাক্তারেরা তাঁর হৃদয়বিষয়ক চেতাবনি দিতে আরম্ভ করেছেন। পিতৃভূমি পূর্ণদর্শনে পূর্ণ্য এবং আহ্লাদ যতই চাপুক, কোনও অঘটন ঘটবে, কোনও সুমুন্ধি দ্যাশের ভাই, এ শর্মাকে বাঁচাবে না। পুষ্পকে তাই বললাম, ‘তপনদাদের তো এবার একটু বিশ্রামের সুযোগ দিতে হয় রে।’ পুষ্পও তাই চাইছিল। কিন্তু এতগুলো মানুষকে তারই বাড়ি থেকে ভাগায় কিভাবে। এ ব্যাপারে সেন্টু এলেমদার। তাকে লাগানো হল। সে বৈঠকখানায় গিয়ে সরাসরি তপনদাকে বলল, ‘দাদা, সাড়ে ছটা সাতটায় তো আবার পুষ্পর মহিলা সমিতির লগে আপনার ইস্টিমার যাত্রা আছে। হারা রাইতের ধকল। কই বোলে যে এ্যাটটু গড়াইয়া লইলে অয় না? রাইতে কৈলোম মহিলা সমিতির নাচ, গান আরও কত কি যে চলবে ভাইব্যা আমার তো গায় জ্বর।’
তপনদা বাঁচলেন, আমিও নিশ্চিন্ত। তখন তিনটে বাজে। একটি না-ছোড় সাংবাদিক ছোকড়াকে সময় দিলেন পাঁচটা, সাড়ে পাঁচটা। ছেলেটি দুঃসাহসিক সাংবাদিক। দিব্য ছেলে। সাড়ে পাঁচটায় তাকে সাক্ষাৎকার ফটোসেশন যতটা সম্ভব দিয়ে স্টিমার ঘাটে যাবেন। আমাকে বললেন, ‘তুমি স্টিমারে আমরা না ওঠা পর্যন্ত থেকো।’
শেষ পর্যন্ত সবই হল। কিন্তু কারুরই যেন তৃপ্তি নেই। আমারও না। পুষ্পর ব্যবস্থাপনায় স্টিমারের আকাঙ্ক্ষাটা পুরা হল। সেটাও অসম্ভব রাজসিক ব্যবস্থাই ছিল। সাতটায় স্টিমার ছাড়ার ভোঁ পড়ল। বরিশাল একস্প্রেসের একদার যাত্রীদের স্মৃতিতে ‘ইস্টি’মারের ভোঁ-টা বড় নস্ট্যালজিক। এটা সেই তখনকার ক্লেমিঙ্গ কোম্পানির জাহাজ নয়। তবু তপনদা কেন যেন আরেকবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন। এই ভোঁ-এর গভীর বিচরণ ইতিহাস তপনদা জানেন।

শেষ কৈফিয়ত
এই রচনা তপন বাবুর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় নিয়ে নিতান্তই ব্যক্তিগত গদ্য আলেখ্য। তথাপি রচনাশেষে বোধ হচ্ছে নিজেকে আরও অনেকটাই গোপন রাখতে পারলে হয়ত শোভন হত। পাঠকেরা ভাবতেই পারেন, লোকটা মহাশয় ভদ্রলোকের সঙ্গে নিজের ঢাক অনেকটাই পিটিয়ে নিল। সে কারণেই এই শেষের কথা কয়টি জুড়ে দিচ্ছি। এটাকে পাঠক আমার কৈফিয়ত হিসেবে ধরে নিতে পারেন। অবশ্য লেখার মধ্যে অনেক স্থলেই আমি বিষয়টা উল্লেখ করেছি। তবু আরেকটু খোলসা করি। কারণ, ইতিমধ্যে তপন বাবুর বিষয়ে যেটুকু লিখেছি সেজন্যে দুএকজন এমন কথা তুলেছেন। তবু এই লেখাটা লিখলাম, কারণ, আমার তাকে শ্রদ্ধা জানাবার একটা দায় আছে। 
আমার নিজের লেখালেখির সূত্রপাত ঘটেছিল তপন বাবুর একটি রচনাকে কেন্দ্র করে। তাঁর কাছে হঠাৎ লেখা একখানা সুদীর্ঘ চিঠির পরিণামস্বরূপ। তারপর থেকে তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত আদান প্রদানের শুরু। তাঁর এবং আমার একই অঞ্চলে পৈত্রিক বাস্তুভিটে হওয়ার ব্যাপারটা একটা ভিন্ন সমাপাতন। অবশ্য তাতেও গা-ঘেঁষাঘেঁষির গন্ধ থাকে। কিন্তু সেটা মনুষ্য চরিত্রে, বিশেষত বরিশালি বাঙালদের চরিত্রে কমবেশি থাকেই। বিশেষ করে আমরা বরিশাল-বাসীরা (প্রাক্তন তথা অধুনা) সেখানের সুসন্তানদের জন্য ভীষণ গর্বিত, যেসব অশ্বিনী দত্ত, এ. কে ফজলুল হক এবং গৈলাবাড়ি ছিল এরকম অনেক প্রখ্যাত কবি, শিল্পী তথা দার্শনিকদের বিষয় আমরা হামেশা গর্বের সঙ্গে বলে থাকি। কিন্তু সে কথা থাক। তপন বাবুর শেষ খবরটা আসার পর এক অচেনা বৃদ্ধ ভদ্রলোক এসএমএসএ জানালেন যে তাঁর এক দূর সম্পর্কের কাকিমার বাপের বাড়ি ছিল কীর্তিপাশা। এই খবরটির প্রথমে অবশ্য ছিল অক্সফোর্ডের প্রখ্যাত অধ্যাপক তপন রায় চৌধুরির বিষয়ে শোক জ্ঞাপন। এটি একটি গৌরব বোধ প্রকাশের খবর। আশা করি, পাঠক এসব শুনে আমার গা-ঘেঁষাঘেঁষির অপরাধটা খানিকটা মার্জনা করতে পারবেন।
তপন বাবুর সারস্বত চর্চা বিষয়ে আমি সামান্যতম আলোচনার মধ্যেও যাইনি, যেমন যাইনি তাঁর বহুপঠিত বাংলা রচনা কয়টির বিচারে। আমার আলেখ্য কথা একান্তই আমার। সেখানে আমাকে তো থাকতে হবেই। তথাপি, এটুকু বলতে পারি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সামান্য সময়ও থাকিনি তার মধ্যে। এই কৈফিয়তটুকু, আশা করি পাঠক মেনে নেবেন। বলার কথা অনেক ছিল। কিছু কিছু মানুষ বিষয়ে বলার কথা অনেক থাকে। তপন বাবুর বিষয়েও, তাঁর একাডেমিক কর্মকাণ্ড ছাড়া অন্যান্য ব্যাপার নিয়ে আমারই তাঁর অনেক গুণগ্রাহী লেখালেখি করেছেন, হয়ত আরও করবেন। প্রত্যেকেই তাঁদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী লিখবেন। আমার মনে হচ্ছে, তাঁরাও অনেক কথাই লিখতে চান। আমিও তেমনি কোনও বিশেষ জায়গায় দারি টানতে পারছি না। আমার অভিজ্ঞতার কত কথাই না বলা হল না।
যেমন তাঁর ঢাকায় ফেরার দিন সকালে ঝালকাঠির যে ফ্ল্যাটে আমরা আগের রাতে ছিলাম, সেখানে চা খেতে খেতে কিছু কথা হয়েছিল। সে কথা বলিনি। আমি তাঁর কীর্তিপাশা পুনর্দর্শন বিষয়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিলাম। বলেছিলাম, ‘আপনি তো জাতে কালচারাল লেস্টিস্ট। অনেকে আপনাকে র‌্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটও বলেন। কিন্তু সে যাই হোক, আমি অতশত বুঝি না। আমার জানতে ইচ্ছে হচ্ছে, কাল কীর্তিপাশার বাজারে গ্রামগঞ্জের যে হাজারো মানুষ আপনাকে দেখে রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছিল এবং আপনিও তাদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন, এর কারণ কী? সামন্ততন্ত্র বা জমিদারতন্ত্রের সবটাই যদি খারাপ, তাহলে তাদের মধ্যে এবং আপনার মধ্যেও এই সম্পর্কটা এতকাল বেঁচে রইল কী করে?’
তপন বাবু খানিকটা ভেবে বললেন, ‘এর উত্তর সহজে দেওয়া যাবে বলে আমি মনে করি না। আমাদের কাজকর্ম-মস্তিষ্ক নিয়ে। হৃদয়কে যদিও আধুনিক বিজ্ঞান চিন্তকেরা মস্তিষ্কের সঙ্গে এক করে দেখেন, কিন্তু প্রাচ্য হৃদয়কে সবসময়ই বড় আসনখানা দিয়ে এসেছে। ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমরা এতটাই প্রণয়াসক্ত যে, তার রকমসকম বুদ্ধির ব্যাখ্যায় সবসময় আসে না।’
আমি বললাম, এই মানুষগুলো কিন্তু বিদগ্ধ ঐতিহাসিক ড. তপন রায় চৌধুরিকে চেনে না। এমনকী ওই বিশাল জনতার মধ্যে একজনও আপনার বাংলা গদ্যেরও একটা লাইনও পড়েনি, এ কথা আমি আমার এদের সঙ্গে নিয়ত যোগাযোগের সূত্রে হলপ করে বলতে পারি। এমনকি মাস্টার মশাইয়েরাও না।’
‘তাহলে তোমার ধারণাটা কী?’
‘আমার ধারণা, তারা চেনে কীর্তিপাশার জমিদার চাঁদ বাবুর ছেলেকে। আর মানে, একটা পরম্পরাগত সম্পর্কের বন্ধনকে। আমি জানতে চাইছি, সেটাকে আপনারা কী বলবেন?’
‘এটা আমিও ভাবি। আরও ভাবতে হবে। মানুষের সম্পর্ক বড় অদ্ভুত ব্যাপার। বিশেষ করে এদেশের মানুষদের হৃদয়গত ব্যাপারটা। কিন্তু দেখ, আমি সাহিত্যিক নই, আমি ইতিহাসের লোক।’ 
আমি আর এগুইনি। নিজের সীমা সম্পর্কে আমার ধারণা খারাপ না। আর যাই হোক তপন রায় চৌধুরির সমতালে শ্রেণী মানসিকতার আলোচনায় যাবার দুর্বুদ্ধিতে না পড়ার মত বুদ্ধি আমার ছিল। তাই যাইনি।
তবে একটা কথা এই যে তপন বাবু সব রকমের সন্ধিৎসুকে মর্যাদার সঙ্গেই গ্রহণ করে আলাপ আলোচনা করতে এবং ভিন্ন মতকে মর্যাদা দিতে এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যেও অনেকেই তাঁকে নানাভাবে নানা প্রশ্ন করেছেন। তিনি ধীরভাবে তাদের কথা শুনেছেন এবং জবাব দিয়েছেন। এ ব্যাপারে তাঁর একটা পক্ষপাতিত্বেরও দিকও আমি দেখেছি। তা কি ওদেশে গিয়ে, কি আমার ভদ্রেশ্বরের বাড়িতে যখন এসেছিলেন তখন। পুরুষ এবং মহিলার মধ্যে, তাঁর পক্ষপাত মহিলাদের প্রতি অধিক এবং সেটা তাঁকে আমি বলেও ছিলাম। তিনি স্বীকার করে নিয়েই জবাবে বলেছিলেন, ‘তুমি বলছ? কিন্তু তথাপি আমি প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভাবি, বোধহয় এটা যথাযথ ভাবে করা হল না। মহিলাদের প্রতি আমার এই মানসিকতা সাধনা-লব্ধ বলেই আমি মনে করি।’
ব্যাপারটা নিয়ে চটুল রঙ্গরস হতেই পারত। কিন্তু ওই যে বলেছি, তাঁর রুচি বোধের বেড়া এবং স্বভাবচটুলতার অন্তরালে নিহিত সিরিয়াসনেস, তার জন্য সেটা কখনোই ঘটেনি।

আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন-

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় পর্ব

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।