বিকাল ০৫:১৩ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৩ মে, ২০১৯  

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী জৌলুস বনাম খেলুড়ে মানসিকতা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মুসা ইব্রাহীম

২০১১ সালে ভারত ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপের দশম আসরের সহআয়োজক ছিল বাংলাদেশ। সেবার বাংলাদেশীদের উৎসাহ-উদ্দীপনা বলা চলে ঘরে বসেই টের পেয়েছিলাম। রাস্তাঘাট সুসজ্জিতকরণ, সড়ক মেরামত, দালানকোঠায় নতুন রং – এসব দেখে যে খেলা সম্পর্কে কোনো জ্ঞান রাখে না, সেও বুঝতে পেরেছে যে একটা কিছু হচ্ছে। আর ২০১১ সালের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যে টাকা উড়েছে (অংকে সেটা প্রায় তিন কোটি মার্কিন ডলার), তা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ।

২০১৪ সালেও টি২০ বিশ্বকাপের স্বাগতিক দল ছিল বাংলাদেশ। এবার আয়োজনটা একটু ভিন্ন ছিল। সড়ক সুসজ্জিতকরণের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনী সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়ে “ফ্ল্যাশ মব” নামক এক ভিন-সংস্কৃতিকে ধারণ করেছিল বাংলাদেশ। যদিও ফ্ল্যাশ মব কেন, কোথায়, কারা আয়োজন করে - সেই মূল ভাবের সঙ্গে ২০১৪ সালের টি২০ বিশ্বকাপের ফ্ল্যাশ মবের বিস্তর ফারাক ছিল। জানা গিয়েছিল – বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞাপনী সংস্থা “কন্ট্রাক্ট বেসিস”-এ ফ্ল্যাশ মব আয়োজন করে। সেই আয়োজনে নিজ প্রতিষ্ঠানের নাম থাকাটা তখন “স্ট্যাটাস সিম্বল” হয়ে উঠেছিল। যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞাপনী সংস্থা ফ্ল্যাশ মব আয়োজন করেনি, তারা নিজেরাই এটা আয়োজন করে ইন্টারনেটে ছেড়েছে – এমন কথাও আমরা শুনেছি।

তবে ২০১৫ সালের আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপের একাদশ আসরের সহ আয়োজক অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ১২ তারিখের আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এজন্য অস্ট্রেলিয়ার আইকন সিডনি অপেরা হাউজ বা নিউজিল্যান্ডের আইকন স্কাই টাওয়ার কোনো বাড়তি সাজে সাজেনি। যদি খোঁজ নেয়া হয়, দেখা যাবে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ যে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, এটা অনেকে জানেই না। যদিও অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন এবং নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের ভেন্যুতে বর্ণিল ফায়ারওয়ার্কস, গানবাজনা, সাবেক ও বর্তমান ক্রিকেটারদের হাজির হওয়া ইত্যাদি নিয়মমাফিক সবকিছুই হয়েছে।কিন্তু এখানে বিশ্বকাপ উপলক্ষে সড়ক মেরামতের হিড়িক পড়ে যায়নি। সড়ক সুসজ্জিতকরণের প্রশ্নই ওঠে না। নতুন করে স্টেডিয়ামও নির্মাণ করা হয় নি। এ উপলক্ষে দালানকোঠায় রং করার মতো অপ্রয়োজনীয় চিন্তাটাও কেউ করে না।

স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত টানা সাড়ে চার ঘণ্টাব্যাপী চলেছে এবারের আসরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টার দিকে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য স্টেডিয়ামের গেট খুলে দেয় আয়োজকরা।

তার মানে এই নয় যে, অস্ট্রেলিয়ার লোকজন খেলাধুলাকে মোটেই পাত্তা দেয়া না। বরং তার উল্টোটা – এখানে সবসময়ই কোনো না কোনো খেলাধুলার আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক আসর লেগেই আছে। ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার – এসব তো খেলাধুলার জগতে পরিচিত নাম। আমাদের দেশে তেমন আয়োজন হয় না, এমন কিছু অপরিচিত খেলা যেমন রাগবি, ঘোড়দৌড়, ইয়টিং, সার্ফিং, প্যারাসার্ফিং, সেইলিং ইত্যাদিসহ নানা খেলায় নিজেদের সামর্থকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করে চলছে এই জাতি। বলে রাখা ভালো, মাত্র ৩১ জানুয়ারি এএফসি ফুটবল টুর্নামেন্ট এই অস্ট্রেলিয়াতেই আয়োজিত হয়েছে। স্বাগতিক দেশ হওয়ার সুবিধাটা অস্ট্রেলিয়া ফুটবল দল তাতে পুরোমাত্রায় তুলে নিয়েছে – চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এবারও আইসিসি বিশ্বকাপের হট ফেবারিট অস্ট্রেলিয়া।

তার মানে হলো – ষোল কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে বিশ্বকাপের আয়োজন হয় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে, ব্যবসার কথা মাথায় রেখে। তাতে স্বাগতিক দলকে দেখা যায় টেনেটুনে প্রাথমিক বৈতরণী পার হতে। প্রায় সময়ই তা সম্ভব হয় না। ছোটখাটো দলের কাছে নাকানিচুবানি খেতে হয়। কিন্তু হট ফেবারিট অস্ট্রেলিয়া যে ক্রিকেট তাদের মাঠে নিজেরাই ছড়ি ঘোরাতে পছন্দ করে, তার প্রমাণ বিশ্বকাপের আগে সর্বশেষ ত্রিদেশীয় সিরিজের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। এখানে অপর দু’টি দল ছিল ভারত আর ইংল্যান্ড। ভারতের অবস্থা কাহিল করে ছেড়েছে অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড। আর ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সহজ জয় পেয়েছে অস্ট্রেলিয়া।

খেলাধুলায় অস্ট্রেলিয়ার এমন সাফল্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, এখানে স্কুল থেকেই এবং স্কুলে নিজেদের উদ্যোগেই নানাধরনের খেলাধূলার দিকে শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তোলা হয়। এই প্রক্রিয়াটা ঘটে সরাসরি অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ - অস্ট্রেলিয়ায় শৈশবেই খেলুড়ে মানসিকতার বীজ বপন করা হয় – সেটা পারিবারিকভাবে যতোটুকু করা হয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও বেশি করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ছেলেমেয়েদের স্কুলের ব্যাগ বহন করতেই শৈশব পার হয়ে যায়। গতানুগতিক ও বৈচিত্রহীন শিক্ষাব্যবস্থায় যে একঘেঁয়েমিভাব তৈরি হতে থাকে, তাকে দূর করতেই হয়তো যেকোনো ইভেন্টে বাড়তি জৌলুস যোগ করতে হয় বাংলাদেশে।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।