দুপুর ০২:০৭ ; রবিবার ;  ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮  

আকাঙ্ক্ষার অবিনাশী সংক্রমণ : মিলির হাতে স্টেনগান || ফিরোজ আহমেদ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের এমন গল্প সাতটি। এর মাঝে ‘অপঘাত’ আর ‘রেইন কোট’ এই দুটো গল্পের বিষয় হলো যেখানে আক্রান্ত মানুষের হারানো সাহস ফিরে পাওয়া। প্রথম গল্পটির শুরুতে ভীরুরূপে চিত্রিত এক গেরস্ত কৃষক পিতা পাকিস্তানী সৈন্যদের সাথে সম্মুখ সমরে নিহত পুত্রের জন্য গর্ব আর শোকের অনুভূতি প্রকাশের ধৃষ্টতা অর্জন করেন: 
“তার জন্য বিলাপ স্ত্রীর এই দুশ্চিন্তা দেখে মোবারক আলী বিরক্ত হয়। যার ছেলে মারা গেছে মাস দুয়েকও হয়নি, সেই মা অন্য কারণে উতলা হয় কীভাবে? সন্ধ্যার পর ছেলের জন্য হামলে কেঁদে মা যদি সারা গ্রাম মাথায় না তুললো তো বুলু এরকম মরা মরতে গেছে কোন দুঃখে?”
দ্বিতীয় গল্পটিতেও সদা আতঙ্কিত এক রসায়নের প্রভাষকের ব্যক্তিত্বের আমূল বদল ঘটে আপাতদৃশ্যে মুক্তিযোদ্ধা শ্যালকটির রেইনকোট গায়ে চড়িয়ে নেয়ার স্পর্শগুণে:
“তার বেঁটেখাটো শরীরটাকে ঝুলিয়ে দেয়া হলো ছাদে-লাগানো একটা আংটার সঙ্গে। তার পাছায় চাবুকের বাড়ি পড়ে সপাৎ সপাৎ করে। তবে বাড়িগুলো বিরতিহীন পড়তে থাকায় কিছুক্ষণের মধ্যে সেগুলো নুরুল হুদার কাছে মনে হয় স্রেফে উৎপাত বলে। মনে হচ্ছে যেন বৃষ্টি পড়ছে মিন্টুর রেইনকোটের ওপর। রেইনকোটটা এরা খুলে ফেলেছে, কোথায় রাখলো কে জানে। কিন্তু তার ওম তার শরীরে এখনো লেগেই রয়েছে।”
মৃত্যুর এতটা নিকটবর্তী হয়েও গোটা জনগোষ্ঠীর সাহস ফিরে পাওয়া নিয়ে এমন দুদুটো গল্প যার আছে, সেই ইলিয়াসের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালকে উপজীব্য করে রচিত গল্পগুলোতে কিন্তু ভাবোচ্ছ্বাস একেবারে অনুপস্থিত, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অধিকাংশ সাহিত্যের যেটা প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। বরং এত এত আত্মত্যাগ আর রক্তপাতের মধ্য দিয়ে অর্জিত দেশটার নতুন দখলদারদের চরিত্র আঁকায় দ্রুতই মন দিলো তার কলম; ‘খোঁয়ারি’ নামের গল্পে তিনি আঁকলেন মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্পত্তি দখলের চিত্র, পটভূমি এই রাজধানী শহরেরই পুরনো অংশ। ‘পায়ের নীচে জল’ আর ‘দখল’ এই দুই গল্পে আছে গ্রামীণ ভাগচাষী কৃষকের দশার খোঁজখবর। জীবনের শেষ পর্বে লেখা ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ গল্পটির উপলক্ষ সমাজে প্রতিক্রিয়াশীল মতবাদের মাথাচাড়া। ‘মিলির হাতে স্টেনগান’-এ ইলিয়াাস মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার আপাত পরাজয় সত্ত্বেও অচেতন স্তরে তার ধারাপ্রবাহ তুলে দিলেন আব্বাস পাগলার কাছ থেকে মিলির হাতে। সেটা এমন একটা সময়ের আখ্যান যখন সমাজের কিংবা ব্যক্তির অসুখের তালাশে উন্মাদের অসংলগ্ন বাক্যেই অনেক বেশি সত্যের প্রকাশ ঘটে। এটা আমরা চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসে দেখেছি, দেখবো মিলির হাতে স্টেনগান নামের ছোটগল্পটিতেও। বস্তু আর চৈতন্য কোন এক সুক্ষ্মবিন্দুতে পরস্পরকে ছেদ করে, সেইখানে তাদের ঐক্যবিন্দু। ব্যাখাযোগ্য বাস্তব আর আপাত-ব্যাখ্যাতীত মনোজগত এখানে পরস্পরের সাথে ষড়যন্ত্র করে অগ্রসর হয়। ইলিয়াসের সাহিত্যকর্মের এটা একটা প্রবণতা আকারে আমরা প্রায়ই দেখি সেই অভেদবিন্দুকে ছোঁয়ার চেষ্টা, মিলির হাতে স্টেনগান এই ধারার অন্যতম প্রতিনিধি।

দুই. 
‘মিলির হাতে স্টেনগান’ আর ‘খোয়ারি’ গল্প দুটিতে বস্তুজগত শাসন করছে অস্ত্র আর রাজনৈতিক ক্ষমতা। এটা এমন একটা সময়কে উপজীব্য করে রচিত যখন পুরনো শাসন ভেঙে পড়েছে, নতুন শক্তি নিজের মত করে বাঁটোয়ারা করে নিচ্ছে চারপাশ। কিন্তু বাস্তব চারপাশে যখন এই অস্থিরতা, আরও অনেক কিছুর মত তা মানুষের মনোজগতেও নিখুঁত ছাপ এঁকে দেয়। যে সমাজ-নিয়মে একজন মুক্তিযোদ্ধার অস্ত্র লুণ্ঠনের হাতিয়ার হয়, আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা তখন সঙ্গতকারণেই মনোবিকলনেরও শিকার হতে পারে। 
শুরুতে বাস্তবতার কয়েকটি টুকরো যথাসম্ভব দেখা যাক, মুক্তিযুদ্ধ ফেরতা রানা পড়াশোনা ছেড়েছে:
‘জানালার পাশে বিছানায় বালিশ ভিজে গেছে, বালিশে অড় খুলে মনোয়ারা মশারি টাঙাবার দড়িতে ঝুলিয়ে দেয়। জানালার তাকে বিএসসি ক্লাসের কেমিস্ট্রির বইয়ের ধুলোপড়া মলাটে পানির থ্যাতলানো ফোঁটা। হালকা নীল রঙের শাড়ির আঁচল দিয়ে বই মুছতে মুছতে মনোয়ারা মিলিকে বকেন :
“কখন থেকে বলছি জানলা বন্ধ কর, জানলা বন্ধ কর! রানা আসুক, মজাটা বুঝবি!” মিলি খুব মনোযোগ দিয়ে আব্বাস পাগলার একটানা ধ্বনিকে শব্দে ভাগ করার চেষ্টা করে। রানাকে তার ভয় পাবার কিছু নাই, এই সব ফিজিক্স কেমিস্ট্রির জন্য রানার বয়েই গেল।”
রানার পছন্দ-অপছন্দই এখন এই বাড়িতে প্রধান, তাই-
“গতকাল পর্যন্ত অনেক-আগে-শেষ শ্যাম্পুর খালি বোতল এবং স্নোর খালি কৌটাও ছিল। রানা আজকাল এইসব ফালতু জিনিস দেখতে পারে না বলে মনোয়ারা কোথায় লুকিয়ে রেখেছে।”
সংসারের স্বচ্ছলতার উৎস রানার জন্য মা তাই সদা তটস্থও। “আব্বাস পাগলার শব্দ চাপা পড়ে রানার কথায়, ‘মিলি চা দে।’ 
মিলি বিরক্ত হয়, ‘এইতো সবাই চা খেলো। চা খাওয়ার সময় তুমি রোজ থাকো কোথায়?’
ভেতর থেকে আম্মা ডাকে, ‘মিলি, রানার চা নিয়ে যা।’
চায়ের পেয়ালার পিরিচে ঝোলা গুড় মাখানো দুটো টোস্ট বিস্কিট। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে টোস্ট শুদ্ধ পিরিচ রানা ফিরিয়ে দিলো।
‘খাবে না?’
নাক কুচকে রানা বললো : ‘এসব খাওয়া যায়?’ ”
কাহিনীতে যদিও বর্ণনা করা হয়নি, পাঠক হয়তো আভাস পাবেন রানার সদ্য উপার্জিত সম্পদের উৎস বিষয়ে: 
“রানারা পঞ্চপাণ্ডবের চারজন মিলে বিকালবেলা কোত্থেকে একটা টেলিভিশন নিয়ে আসে, সেটা চালু করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো।”
কিংবা,
“পরদিন সকালে একটা ফোকসওয়াগন গাড়িতে রানা ফিরে আসে। গাড়ি চালাচ্ছে সে নিজে, মনে হয় মাালিকও সে নিজেই। ঘণ্টা দেড়েক পর মিলিকে ডেকে রানা জিগ্যেস করে, মিলি, আব্বাস পাগলা তোকে ইনসালট করেছে?’ ”
আমরা বারবার টের পাই, বিত্তের ঢল মাত্র শুরু হলেও নিরাপত্তাহীনতাও কম নয়, তাই সংসারে উদ্বেগ নামের অনুভূতিটিরও আমদানি হয়:
“কোথায় যায়! এতা রাত করে কোথায় থাকে!’ মায়ের নিঃশ্বাস ঐ তক্তপোষ থেকে মেঝেতে এবং মেঝের হিম ও ছোটো শূন্যতার আর্দ্রতা নিয়ে মিলির গায়ে শিরশির করে। কিন্তু মিলি জেগে আছে টের পেলে সশব্দ নিঃশ্বাস চেপে রাখা ছাড়া আম্মার আর উপায় থাকবে না। মিলি তাই শুয়েই থাকে এবং এই ওলটপালট সময়ে রানার কবে যে কি হয়- এই ভাবনা মাথায় খামচা দিলে তাকেও কয়েকটা নিশ্বাস গিলে ফেলতে হয়।”
সম্পদের উৎস রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, আর তার প্রকাশ সমরাস্ত্রে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রায় প্রতীকে পরিণত হওয়া স্টেনগান নামের অস্ত্রটি রানার দখলে আছে একটা। মুক্তিযুদ্ধের কার্যকরতম হাতিয়ারটি আজ লুণ্ঠনের উপকরণ:
“ভোর হওয়ার আগে আব্বা আর রানার ঘরে গিয়ে মিলি দেখে টেবিলে মাথা রেখে রানা চেয়ারে বসে রয়েছে। তার বড়ো বড়ো চুল ছুঁয়ে আলগোছে শুয়ে রয়েছে ছিদ্রওয়ালা একটি লোহার অস্ত্র। যুদ্ধের পর এই জিনিসটি নিয়ে রানা বাড়ি ফিরেছিল। এটা নিয়ে ভাইয়া তখন কত কথা বলতো। আর এটা এখন কোথায় রাখে, কখন লুকিয়ে নিয়ে বেরোয় কিছু জানা যায় না। ভাইয়াটা কি হয়ে যাচ্ছে, কতোদিন চুল কাটে না!”
ক্ষমতা-সম্পর্ক রানার শক্তির উৎস, বিএ ফেল মিলির তা বুঝতে খুব সমস্যা হয় না। ভীরু চাকরিজীবী সাবেকি আমলের বাবার উদ্বেগ আর তটস্থ থাকার অর্থহীনতা বুঝতে তার দেরি লাগেনি:
“বাপের জন্য মিলির একটু মায়াই হয়, আব্বা কখন যে কী ভাবে! তার ইচ্ছা করে বাপকে বলে যে আই.বির যারা বাপ, তাদের বাপের সঙ্গে রানার কড়া লাইন। দামি দামি সব জিনিসপত্রে ঘরবাড়ি ভরে তুললো, গায়ে একটি আঁচড় পর্যন্ত লাগে না, আর আই.বি আসবে তাকে ধরতে?”

তিন.
বাস্তবতার চিত্রটি এ পর্যন্ত আমরা বেশ পেয়ে গেলাম। কিন্তু এই বাস্তবতাই সমাজের একমাত্র সত্য তো নয়। এই গল্পে তাই রানার বিপ্রতীপ চরিত্রও আছে আরেকটি, যার নাম ইতিমধ্যেই এসে গেছে উদ্ধৃতিতে। সেও মুক্তিযোদ্ধা, ‘আব্বাস পাগলা’ নামেই আপাতত তার পরিচিতি। রানা যদি হয় ব্যক্তিগত সম্পদ বানিয়ে নেয়া অংশটির প্রতিনিধিস্বরূপ, সমষ্টির স্বপ্নের বেহাত হওয়া এবং অসংলগ্নতার জগতে আশ্রয় নেয়ার মূর্তরূপ এই আব্বাস পাগলা। মাস্টার থেকে পাগলায় রূপান্তরের কাহিনীটি জানা যায় তারই বড় ভাই রমজান আলীর বয়ানে, ‘লেখাপড়া আছিলো, ফেলের ভি ভ্যালু দিছে’ বিশ বাইশ বছর আগের এমন একটি সময়ে দুইবার বিএসসি ফেল করা ভালো ছাত্র আব্বাস পাগলা বাপ-দাদার কারবারে না ঢুকে ইস্কুলের মাস্টারিতে ঢুকলো, ‘ইস্কুল তো তার ভালোই ফিট কইরা গেছিলো। পোলাপানে বহুত ইজ্জত করছে।’ কিন্তু আব্বাসকে ‘চার বছর হইলো এই বিমারি ধরছে। স্বাধীনের টাইমে ইন্ডিয়া গেলো, কৈ কৈ যুদ্ধ করছে, অহন ওয়ার ছাড়া আর কথা নাই। শীতের টাইমে আমাগো ভি পাগল বানাইয়া ছাড়ে। ৩/৪দিন বাদে বাদে ফাল পাইড়া চিক্কুর ছাড়বো, কি কমু, ভাড়াইটা থাকবার চায় না। দোতলার ভাড়া বাড়াইতে পারি না!’
এই আব্বাস পাগলার যুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি, কোন একটি চূড়ান্ত বার্তার জন্য সে অপেক্ষারত, সেই নির্দেশনা পেলেই শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে সে:
“ ‘এক মিনিট বাদে বাদে কল আসতাছে, এ্যালার্ট থাকো, এ্যালার্ট থাাকো। গেট প্রিপেয়ার্ড ফর দি ফাইনাল এ্যাকশন।’ একটু বিরতি দিয়ে সে একটা হুঙ্কার ছাড়লো, ‘আমার ভি আছে, ব্যাকটি বানাইয়া ঠিক কইরা থুইছি! ফাইনাল মেসেজ আইয়া পড়ুক, আমি স্ট্রং কানেকশন কইরা রাখছি, ইন্সট্রাকশনের লাইগা ওয়েট করতাছি, দেহি।’”
কোন-এক-সদরদফতর থেকে প্রেরিতব্য বার্তার জন্য আপাতত অপেক্ষা করে বসে আছে বটে, কিন্তু যদি কেবল অস্ত্র একটা থাকতো হাতে, আব্বাস পাগলা এক্ষুণি শুরু করে দিতে পারে শত্রু দমন। তাই নিয়মিত ধর্ণা দেয় সে রানার কাছে:
“নিসর্গে সম্পূর্ণ মগ্ন হওয়া আশরাফ আলীর পক্ষে সম্ভব হচ্ছিলো না, কারণ আব্বাস পাগলার তক্ষুণি একটা স্টেনগান দরকার। রানাকে বলে দশটা না পাঁচটা না, একটা স্টেনগান জোগাড় করে দেয়ার জন্য আশরাফ আলীকে সে খুব বিনীত অনুরোধ জানায়।”
আব্বাসের দখলদার শত্রুর বর্ণনায় কখনো বাস্তব চর্তুপাশ নেই, তা যেন এক অলীক জগত। হানাদারেরা সেখানে দখল করেছে মহাশূন্য, চন্দ্র উপগ্রহটিকে তারা সম্পূর্ণ দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে। সেই অলীক জগতেও কোন একটা বাস্তব ফন্দি-ফিকির যে ঘটছে, সে সম্পর্কে সে নিজে সচেতন, আমাদেরকেও সচেতন করে দেয়:
“এন্টায়ার স্কাইস্কেপ হ্যাজ বিন রেপড মিজারেবলি! খালি বাঙ্কার, ট্রেঞ্চ, এইখানে গর্ত, ঐখানে খন্দ!- এক্কেরে ঝালাঝালা কইরা ফালাইছে, বুঝলি না?’ এর মাঝে খুব করে ছোট্টো একটু হেসেও নিলো, ‘তগো কী কই? আমি তো হালায় ঠিক দেখতাছি, কারা আহে, কেল্লায় আহে- লগে লগে বুইঝা ফালাইছি! মগর-।’ এবার তার আকাশচিত্র বর্ণনা এতো দ্রুত হয় যে শব্দবিন্যাসে ঘোরতর অনিয়ম দেখা দেয়, তখন তাকে ঠিকঠাক অনুসরণ করা বেশ মুশকিল। তবে একনিষ্ঠ মনোযোগ দিয়ে শুনলে তার ব্যকরণ মোটামুটি আয়ত্বে আসে এবং কুচি কুচি ছবিগুলো সম্পাদনা করলে জানা যায় যে শত্রুর যুদ্ধকৌশল সবটাই আব্বাস পাগলার নখদর্পণে এবং তাদের বিনাশ করার চূড়ান্ত নির্দেশের জন্যে অস্থির হয়ে সে একটু চোখ ফিরিয়েছিল, তক্ষুণি হেড কোয়ার্টারের সঙ্গে ছিন্নসম্পর্ক হয়ে পড়ে। একটিমাত্র অস্ত্র হাতে থাকলে আব্বাস পাগলা কি হেড কোয়ার্টারের অর্ডারের জন্য প্রতীক্ষা করে? ‘একটা স্টেনগান থাকলে হু বদারস ফর দি ফাইনাল মেসেজ?’ ”
বাস্তব স্বদেশ যখন হানাদার মুক্ত, তখন আবার দখলদার কেন? ভূখণ্ড বদলে আকাশ কেন, চাঁদ কেন? সেটা কি স্বদেশ-মুক্তির-যোদ্ধা আব্বাস মাস্টারের দলছুট হবার পরিণতি? বাস্তবকে মোকাবেলার ভীতিজনিত স্থানবিভ্রম? নতুন যুদ্ধটায় নেমে পড়লে তা লড়তে হবে সাবেক সহযোদ্ধারই সাথে, সেই কারণে? এমন দশাই কি সংবেদনশীল অক্ষমকে কল্পনার যুদ্ধে ঠেলে দেয়, যেখানে ক্রোধের প্রকাশ অটুট থাকলেও লক্ষবস্তুকে আড়াল করা যায়? বাস্তবকে সহ্য করতে না পারার মানসগঠন এভাবে দেহটার আত্মাহূতি থেকে আত্মরক্ষা করে? অজস্র সংখ্যায় আত্মাহূতিও তো মুক্তিযোদ্ধারা দিয়েছে স্বাধীনতা উত্তর দেশেও; তাদের সেই দ্বিতীয় দফার লড়াইয়ের যতই বিবেকি ন্যায্যতা থাকুক, পতঙ্গের আত্মাহূতির চেয়ে বেশি কিছু তো ছিল না তা। স্বজাতিভুক্ত দখলদারদের রোখার লড়াই সর্বদাই বহুগুণ জটিল ও কুটিল। এই ঘুর্ণাবর্তের শিকার আব্বাস মাস্টারও?
পুরোটাও বা কি অসংলগ্ন? তার ভাবনায় স্থান-কাল গলেমিশে একাকার হলেও কখনো কখনো যা সে বলে, তা আর অর্থহীন থাকে না: 
“ ‘ন্নে-ই!’ আব্বাস পাগলা মুখ ভ্যাংচায়, ‘নেই কেল্লায়? কৈ গেছে? কারে হাইজ্যাক করবো? দুই ঘণ্টা আগে দেখলাম মস্তানগুলি টেলিভিশন লইয়া আইলো, অহন গেছে রেফ্রিজারেটর আনতে? কৈ গেছে, কইলি না?’
ধমক খেয়ে মিলি চুপ করে থাকে। ওরা টেলিভিশন নিয়ে এসেছে পরশু, আর লোকটা কিনা পুরো দুটো দিনকে গুটিয়ে নিয়ে এল দুই ঘণ্টায়! লোকটা এত শক্তি পায় কোত্থেকে? আব্বাস পাগলার মুখের দিকে সে সরাসরি তাকায়। ”
দখলকৃত স্থানের নামটি বদলে গেলেও দখলের বিবরণে বিপদজনকভাবেই চেনা চারপাশের কথাই তো বলে চলে আব্বাস পাগলা; সুস্থ যারা এই বিবরণ দিয়েছে, স্বাধীন দেশে তাদের অসংখ্য জনের ঝাঝরা হয়ে যাওয়া মৃতদেহ পাওয়া তো ছিল নৈমত্তিক বিষয়: 
“ ‘নদীর নাম কী?’ হঠাৎ জিজ্ঞেস করে ফেলেও মিলি আব্বাস পাগলার কাছে ধমক খাওয়ার ভয়ে কুঁকড়ে যায় না, কারণ চাঁদের নদীর নাম জানা তার খুব দরকার। ‘নাম কইতে পারুম না।’  আব্বাস পাগলা বিরক্ত হয় না, ‘নদীর আবার নাম কিয়ের? এই চুতমারানিরা গেছে, খানকির বাচ্চারা অহন নাম দিবো। -নাম দিবো, দাগ দিবো, খতিয়ান করবো, কবলা করবো, দলিল করবো, মিউটেশন করবো- হালারা বাপদাদাগো সম্পত্তি পাইছে তো, বুঝলি না? নদীর দোনো পাড়ে পজিশন লইয়া রেডি হইয়া আছে। দুনিয়ার পানি বাতাস মাটি আগুন পাত্থর তো জাউরাগুলি পচাইয়া দিছে, অহন পচাইবো চান্দেরে!’
মহাকাশের ওপর শত্রুর দখল যত বাড়ে, চাঁদও বিজিত হবার দিকে যতখানি সমীপস্থ হয়, আব্বাসের মনের ওপর চাপও তত ঘনীভূত হয়: 
“ আব্বাস পরদিন ফের আসে। আজ মনোয়ারা তার বোনের সঙ্গে বেরিয়ে গেছে বোনের ছেলের বিয়ের শাড়ি কিনতে, দরজায় ধাক্কা শুনে মিলি একবারে মোড়া হাতে দরজা খুললো। আব্বাস পাগলা প্রথমেই বলে, ‘রাইখ্যাা যায় নাই?’ 
‘না।’
মোড়ার ওপর আব্বাস পাগলা ধপাস করে বসে পড়ে। তাকে হতাশ ও উদ্বিগ্ন দেখায়। ‘রানায় আউজকাও দিলো না, না?’ তার গলায় একটু অভিমান, ‘আমার প্রবলেম বুঝবার চায় না। তামাম রাইত আমার ঘরের উপরে মেশিনগানের গুলি ছুঁড়ছে।...”
দখলের এই প্রক্রিয়ায় চাঁদের যে চেহারা বদলে যাচ্ছে, তার সাথে রক্তস্নাত দেশটায় স্বপ্নের মৃত্যুর, সৃজনীশক্তির উড্ডয়নের ক্ষমতার পতনেরও তুল্যমূল্য করা যেতে পারে:
“কুত্তার বাচ্চাগুলি চান্দের গ্রাভিটেশন বাড়াইয়া দিতাছে। এতোগুলি মানুষ গেছে, এতোগুলি আর্মস লইয়া গেছে, গ্রাভিটেশন বাড়বো না? অহন কী হইবো? অহন কী হইবো? তুই ক, অহন কী হইবো?’ মিলি বলতে না পারলে আব্বাস পাগলা নিজেই জবাব দেয়, ‘অহন দুনিয়ার জানোয়ারগুলির লাহান চান্দের বাসিন্দাগো পায়ের মধ্যে গোদ হইবো, জিন্দেগিতে অরা আর উড়বার পারবো না।’ ”
কিন্তু বারংবার ফিরে ফিরে রানার কাছেই কেন আসতে হয় আব্বাস মাস্টারের? নতুন করে দখলকৃত অঞ্চলটির নামটাকে যারা আড়াল না করে সরাসরি উচ্চারণ করেছে, মুক্তিযুদ্ধত্তোর বাঙলায় রানাদের স্টেনগান তো তাদেরই দমন করেছে। তাহলে আব্বাস কি অস্ত্রের সাথে সাথে তার সাহসও জমা দিয়েছে? আব্বাস মাস্টার শুধু তার সংবেদনশীলতাটুকু জমা দিতে পারেনি বলেই তার মনোবিকলন? নাকি আরেক মুক্তিযোদ্ধার প্রতি এককালীন প্রীতি আর বর্তমান ঘৃণা তাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রানার কাছেই নিয়ে আসে: 
“ একটু থেমে সে আক্ষেপ করে, ‘রানায় আমারে দিলো না। একটা স্টেনগান দিবো- আমারে জবান দিয়া অহন খালি ঘুরাইতাছে! উই হালায় ভি অকুপেশন আর্মির লগে লাইন দিছে কৈ যাই? খালি দালাল, খালি কুইসলিং!’ মন খারাপ করার ভঙ্গিতে সে বলে, ‘ঠিক আছে! আমারে তো চিনে নাই। এই কোলাবোরেটরগুলিরে আমি টিকটিকি দিয়াও মারাই না। অহন ঠ্যাকায় পইড়া আইছি! ঠিক আছে একদিন না একদিন তগো ব্যাকটিরে কব্জার মইদ্যে পামু, দুই উংলি মইদ্যে ধইররা তগো মাক্ষির লাহান জাইত্তা মারুম।’ ”

চার.
কিন্তু রানা কেনো এই উৎপাত দিনের পর দিন সহ্য করে যাবে? আব্বাস পাগলা যে নিয়মিত তার ‘ইভনিংটা স্পয়েল’ করে দিচ্ছে। তাছাড়া দখলের নিয়মই তো এই, অসমরূপ কাউকে থাকতে দেয়া হবে না। যারা এই প্রগাঢ় নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে, লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে অস্ত্রের ভাষাতেই রুখে দাঁড়িয়েছে, তাদের জন্য এসেছে রাষ্ট্রের নানান বাহিনী, কেননা বিরোধিতা সহ্য করা করবে না লুণ্ঠক। উন্মাদের অসংলগ্ন কথাতেও যদি থাকে কোনো সত্যের আভাস, সেটাও তো সহ্য করা মুশকিল। অবশ্য বিরক্তিকর এই বোঝাটিকে দূর করার বেলাতেও রানার বর্তমান যোগাযোগের ক্ষমতার প্রকাশটা ভালোভাবেই ঘটে:
“ রানা বলে, ‘আব্বাস পাগলার এ্যাডমিশন হয়ে গেছে। মজনু ভাই টেলিফোন করে দিয়েছিলো। গণভবন থেকে ফোন পেয়ে সাইকাট্রির প্রফেসর বলে, ‘পাবনা পাঠাবার দরকার কী? প্রফেসর নিজের ওয়ার্ডে ভর্তি করিয়ে নিয়েছে।’ ”
আব্বাসকে সরিয়ে দেয়ার তৎপরতা শুরু হলেও সংবেদন নামের ব্যাধিটি যে সংক্রমণের সূচনা ঘটিয়েছে আরও একজনের মাঝে; পিজি হাসপাতালে আব্বাস পাগলার সাথে দেখা করতে গিয়ে তাই ব্যাকুল মিলির প্রশ্ন: 
“ ‘ভাইয়ার কি আসার কথা ছিলো?’ আব্বাস পাগলার বহু-আকাঙ্ক্ষিত বস্তুটি নিয়ে আসতে পারলে ভালো হতো ভেবে মিলি চঞ্চল হয়ে ওঠে, ‘ভাইয়ার কিছু নিয়ে আসার কথা ছিলো কি?’ ”
কিন্তু হাসপাতালে তো আকাশ দেখার উপায় নেই, ‘দরজার ওপারে বারান্দা, বারান্দার রেলিঙ ডিঙিয়ে হাসপাতালের মূল দালান। এই উঁচু দালান দিয়ে মহাশূন্য আড়ালে পড়ে গেছে। না, এখানে শুয়ে সৈন্যসমাবৃত মহাকাশ দেখার কোনো উপায় নেই।’ তাই-
“আব্বাস পাগলার ‘ফাঁকা পেট আরো ফাঁকা করে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে, রানায় একটা ধামকি দিলে হালারা আমার ভাতের কোটাটা বাড়াইয়া দেয়, বুঝলি না?’ ” 
ওষুধে হোক, যুদ্ধক্ষেত্র অদর্শনে হোক, ঘুমের আবেশে হোক আব্বাস পাগলা আজকাল পেটের খিদেটা বেশ অনুভব করছে। কিন্তু তাও কি সমাজের কাঁটা উপড়ানো কি অত সহজ! রানারা কি অত সহজে পার পেয়ে যাবে! ঘোর নৈরাজ্যের সেই সময়ের আগুনের তাপ প্রায়ই ঘাড়ের ওপরও আছড়ে পড়ে, মিলির স্বপ্নেও হানা দিতে থাকে আব্বাস পাগলার জন্য আকুতি: ‘তোমাদের ঘরে স্টেনগান এলেমজি, এসেমজি। তোমাদের পকেটে পকেটে রিভলভার, পিস্তল। তোমাদোর বগলে কুঁচকিতে গ্রেনেড। একটি মাত্র অস্ত্র দিয়ে এই লোকটির হাত দুটোকে তৈরি করতে দিলে না! দেখো কি রকম ফায়ারিং চলছে, এখন তোমরা কি করবে?’ ঘোরতর গোলাগুলির মাঝে মা ফিসফিসিয়ে ডাকেন, ‘মিলি! এই মিলি! খাট থেকে নাম, নিচে নেমে শুয়ে পড়!’, ডাকে ছোট বোন লিলি ‘আপা, মেঝের ওপর শুয়ে পড়ো।’ আর স্বপ্ন আর জাগরণের, বস্তু আর বোধের এফোড় ওফোড় বিন্দুতে টালমাটাল মিলির কিন্তু এই সব কাণ্ড কারখানা দেখে হাসি পায়; “চাঁদে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য শত্রুসৈন্য নিচে গোলাবর্ষণ করে চলেছে, আর এরা ধরে নিয়েছে গুলি চলেছে জানালার বাইরে গলিতে!- এখন এদের বাঁচায় কে? কানের একেবারে কাছে শোনা গেলো: ‘সরে যা, জানালা দিয়ে গুলি-’ ”  
সুস্থ হয়ে রানাকেই খুঁজতে আসে আব্বাস, যদি রানার ইনডেনটিং ফার্মে কিছু একটা মেলে। মিলি ওদিকে কিন্তু ততদিনে প্রায়-প্রস্তুত, আব্বাসের দেখা দৃশ্যগুলো দেখবার জন্য সে এখন উন্মুখ। রানার স্টেনগানটা শাড়ির আঁচলের ভেতর থেকে বাড়িয়ে ধরতেই “আব্বাস পাগলার ফিটফাট মুখ ঝুলে পড়ে, তার মুখ এখন একরঙা, মানে কেবলই কালো, তার লাল নীল হাসির মিটিমিটি বাল্ব সব ফিউজড হয়ে গেছে, সে বিড়বিড় করে বলে, ‘মিলি আমি না ভালো হইয়া গেছি। তুমি বোঝো না? আমার ব্যারাম ভালো হইয়া গেছে।’ ”
অথচ ওদিকে তখন আব্বাসের চোখের দিকে কেবল চোখ মিলির, “কেননা আব্বাসের চোখ যা দেখতে পায়, তা মিলি নিজে দেখতে পারলেই আব্বাস পাগলার সঙ্গে ও শত্রুপক্ষ ঠেকাবার কাজে নেমে পড়তে পারে। কিন্তু দেখো, আব্বাস পাগলার চোখের বহুবর্ণ জমি কিন্তু ঘুমের ঘষায় ঘষায় পানসে শাদা হয়ে গেছে। আব্বাস পাগলা থেকে আব্বাস মাস্টারে ফেরত এসেছে সে। বাস্তবের এপারে তাকে ফিরিয়ে এনেছে ওষুধ! মিলি ‘বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে সোজা ছাদে উঠে দেখে ধোয়ামোছা মসৃণ ঘাড় নিচু করে গুটিগুটি পায়ে হেঁটে যাচ্ছে আব্বাস মাস্টার। মুণ্ডুটা তার অতিরিক্ত রকম নোয়ানো।’ গলির মাথায় পৌঁছাবার আগেই সবগুলো মুখ একই রকম ঝাপসা হয়ে আসে বলে দৃশ্যের পার্থক্যে আর কিছু আসে যায় না, সব দলা পাকিয়ে যায়।
আব্বাস মাস্টারও নেই, শত্রুর আর কাকে ভয়? দখলদার বাহিনী তাদের কাজ তবে এতদিনে সম্পূর্ণ করে ফেলেছে! ‘চাঁদ তাহলে এতক্ষণে শত্রুর কব্জায় চলে গেছে! দখলকারী সেনাবাহিনীর এক নাগাড় বোমাবাজিতে চাঁদের হাল্কা মাটির ধুলো এবং বারুদের কণা নিচে ঝরে পড়েছে। রোদ ও বাতাস তাই ধোঁয়াটে ও ভারি, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বৈ কি! হাতের স্টেনগানের ইস্পাতে আঙুল বুলাতে বুলাতে পায়ের পাতায় চাপ দিয়ে মিলি আরো ওপরে দেখার চেষ্টা করে। রাস্তায় মানুষজন ও যানবাহন তো বটেই, ইলেকট্রিক তারের জটাধারী পোল এবং আশেপাশের ছাদের টেলিভিশনের এ্যান্টেনাগুলো পর্যন্ত তার চোখের লেভেলের নিচে। তবে কি-না চাঁদের রেঞ্জ এখনো মেলা দূর, ওকে তাই দাঁড়াতে হয় পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে। এতে হচ্ছে না। এবার একটা উড়াল দেয়ার জন্য মিলি ডানা ঝাপ্টায়।”

পাঁচ.
'আবার তোরা মানুষ হ' চলচ্চিত্রটির কথা মনে আছে? ছবিটির অনেক নিন্দা হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের 'অমানুষরূপী' উপস্থাপনার জন্য। প্রয়াত তারেক মাসুদ অবশ্য তাঁর এক লেখায় এই চলচ্চিত্রটি দেখার ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোন হাজির করেছিলোন: “১৯৭২-৭৩ সালে আসলেই কিছুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা আদর্শচ্যুত হয়েছিল। তারা মুক্তিযোদ্ধা বটে, তবে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ৯ মাসের অস্ত্রের স্বাদ পাওয়ায় তারা শুধু অস্ত্রের ভাষায়ই কথা বলতে শিখেছিল। এর মানে কিন্তু এই নয়, তারা সবাই ‘পশু’ হয়ে গিয়েছিল। তাদের ভালোবাসার পাত্রীকেও অস্ত্রের ভাষায় প্রেম নিবেদেন করেছিল। যুদ্ধ একটি ভাষা তৈরি করে দেয়। আর সেই ভাষাটি হলো অস্ত্রের ভাষা। এই জিনিসটি আমরা দেখেছি ১৯৭২-৭৩ সালে। এই ছবিটি সৃজনশীল ছবি হিসেবে না হোক, ওই সময়ের হিস্ট্রিক্যাল ডকুমেনশন অব মাইন্ড, নট অনলি সেলফস। সময়ের এবং মেন্টাল স্পেস বা মেন্টাল যে টাইমটা ছিল, তা ওই জিনিসটাকে প্রতিনিধিত্ব করে। ব্যাপারটা আসলে তখনই জটিল হয়ে পড়ে, যখন যিনি নির্মাণ করলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর অবস্থানটা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল কি না। যখন দেখা যায়, তাঁর অবস্থানটাই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে বিভিন্নভাবে, তখন কিন্তু মানুষ সেটাকে প্রশ্ন করে এবং সেই হিসেবে কিন্তু ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবিটি বিতর্কিত হয়েছিল এবং এর সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।”

স্বাধীন বাংলাদেশেই মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশের বেপরোয়া লুণ্ঠনে প্রবৃত্ত হওয়ার বর্ণনা পাওয়া যাবে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের পূর্বে উল্লেখিত 'খোঁয়ারি' নামের ছোটগল্পটিতেও, গল্পের 'মানিক ভাই' তো আদতে সদ্যস্বাধীন দেশে ক্ষমতাসীন যুবসংগঠনের অবিসংবাদিত নেতার নামটিরই অর্থ ঠিক রেখে শব্দটা একটুখানি পালটে নেওয়া; ২০১১-এর ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত শামসুদ্দীন আবু জাফরের রোজনামচার ৮ জুন, ১৯৭৫ তারিখে এই যুবনেতার কথাই উল্লেখ করা হয়েছে দেশের শীর্ষতম ধনীতে পরিণত হওয়া ব্যক্তি হিসেবে। নতুন স্বাধীন দেশের যে চিত্র খোঁয়ারিতে পাওয়া যাবে, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ নিয়ে সকল ভাবালু কল্পনাতে তা যেন সুঁইয়ের খোঁচা। বীরযোদ্ধারা রাজনৈতিক ক্ষমতাকে পুঁজি করে নেমে পড়েছেন সম্পত্তি বানাতে; যেখানেই দুর্বল কাউকে পাওয়া যাচ্ছে, লোপাট হয়ে যাচ্ছে তার ঘড়বাড়ি, সংখ্যালঘুর চেয়ে দুর্বল আর কে আছে, তাদের বিপন্নতার বোধই খোঁয়ারির উপজীব্য।
কিন্তু 'অমানুষে' পরিণত হওয়া মুক্তিযোদ্ধাই তো একমাত্র বাস্তবতা নয়। তার বিপরীতে ইলিয়াসের নিজেরই সৃষ্ট চরিত্রেরা যেমন আছে, অজস্র মুক্তিযোদ্ধার চরিত্র আমরা বাস্তবেও লড়াকু প্রতিবাদী হিসেবেই পেয়েছি, যারা মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশেও মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর একটি আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের সংগ্রাম বিভিন্নভাবে অব্যাহত রেখেছেন, প্রাণও দিয়েছেন। সেই বিবেচনায় বলা চলে তারেক মাসুদ ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবিটার পর্যালোচনা করার সময় মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশের আদর্শচ্যুত হয়ে যাবার কথা বলতে গিয়ে, তাদের ভাষা বুঝতে গিয়ে যুদ্ধোত্তর সমাজে অস্ত্রের উপস্থিতির ওপরই অধিক গূরুত্ব দিয়েছেন। ফলে বাস্তবতার আংশিক একটা চিত্র আসছে এই পর্যালোচনায়, ব্যক্তির মনের ওপর অস্ত্রের বাস্তবতার ভূমিকা প্রধান হয়ে উঠেছে।
বহু জাতিই তো সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয়েছে, তরুণদের হাতে হাতে অস্ত্র এসেছে। প্রাণ বাজি রাখা  সেই সশস্ত্র তরুণরা যুদ্ধোত্তর সমাজে জাতীয় পুনর্গঠনের শক্তি হবেন, নাকি নিজেরা অমানুষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নতুন জাতির সম্ভাবনাকে ধূলিস্যাৎ করে বিত্তের পাহাড় বানাবেন, জনগণের ওপর চেপে বসার প্রবণতা প্রদর্শন করবেন, সেটা সর্বদাই নির্ভর করে ক্ষমতায় কারা অধিষ্ঠিত হলো, তাদের চরিত্রবৈশিষ্ট্যের ওপর। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে রাষ্ট্রের যে প্রকাশ ঘটে সেটা যেন হুবহু 'খোঁয়ারি' আর 'মিলির হাতের স্টেনগান' গল্পেরই প্রতিচ্ছবি। 'আবার তোরা মানুষ হ' সিনেমার যেটা দুর্বলতা, তাারেক মাসুদের মূল্যায়নেরও দুর্বলতাটা সেটাই। লুটতরাজকে এখানে ভাবা হয়েছে হয়েছে অস্ত্রবাজ কিছু মুক্তিযোদ্ধার বিপথগামী ব্যক্তি বা বাহিনীতে রূপান্তরিত হবার পরিণতি; এর পেছনে যে রাজনৈতিক ক্ষমতার একটা ভিত্তিভূমি আছে, সেটা একেবারেই অনুপস্থিত। কিন্তু ইলিয়াসের গল্পে অর্থনীতি আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যা ঘটে চলেছিল রাষ্ট্রের জন্মপ্রক্রিয়ার শুরু থেকেই, তার নির্ভুল ইশারা পাওয়া যাবে। শুধু তাই না, মুক্তিযুদ্ধোত্তর অস্ত্রের উপস্থিতিতে তরুণদের একাংশের অমানুষ হয়ে যাওয়াই তো একমাত্র বাস্তবতা না। স্বপ্নভঙ্গ হওয়া তরুণদের একটা বড় অংশ সেই যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রের জোরেই রাষ্ট্রের অসুখ সারাবার চেষ্টায় আত্মঘাতী যুদ্ধে নেমে পড়েছেন, দলে দলে অকুতোভয়চিত্তে প্রাণ দিয়েছেন, সেটাও তো মিথ্যে নয়। 
সেক্টর কমান্ডার কর্নেল কাজী নুর উজ জামান এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তাঁর বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে জন্ম নেওয়া সেই উচ্চতর আদর্শের কথা, যুদ্ধের সমাপ্তির পর অনেকেই তাঁরা আর বাড়ি ফিরে যেতে চাইছিলেন না, জীবন দিতেই তাঁরা যুদ্ধে এসেছেন, এই যুদ্ধ বছরের পর বছর চলতে পারে, তা মেনে নিয়েই তাঁরা লড়াইয়ে এসেছেন। তাঁদের মিনতি ছিল, কর্মক্ষেত্রে কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তো কয়েক বছর পর ফেরত যাওয়া যাবে, কিন্তু এখন তাঁরা চান দেশ পুনর্গঠনের কাজে নামতে। ভেঙে যাওয়া অবকাঠামো ঠিক করা, কি নিরক্ষরতা দূরীকরণ অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা- সব কাজেই তাঁরা লেগে পড়তে চান। কাজী নুর উজ জাামান বললেন, এই উৎসর্গীপ্রাণ তরুণদের নিয়ে একটি জাতীয় পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলো না, বরং মুক্তিফৌজকে ভেঙে দেওয়া হলো। ইতিহাসের ওই বিয়োগান্ত ক্ষণে ওই কাজী নূর উজ জামান এরই কিশোর মুক্তিযোদ্ধা পুত্র নদিম আত্মহত্যা করেছিলো চর্তুদিকের হতাশার চাপ সইতে না পেরে। অমানুষদের বিপরীতে মনোবিকলনের শিকার মানুষদের আমরা পাই, পাই প্রতিরোধচেষ্টারত মানুষদেরও সাক্ষাৎ। 
ভেঙে দেয়া এই মুক্তিফৌজের খুব ছোট একটা অংশই 'আবার তোরা মানুষ হ' ছবির অমানুষ। যেটা খুব প্রকাশ্য করে বলা হয়নি, সেটা হলো এই ‘অমানুষে’ পরিণত হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অংশের পেছনে ছিল প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রশক্তির মদদ। কিন্তু হাসান আজিজুল হক কি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পগুলোতে যে হার না-মানা মুক্তিযোদ্ধাদের দেখা পাই, শুরুতে তাঁরাই সংখ্যায় ছিলেন বহুগুণ বেশি। আরও বড় সত্য হলো, শেষ পর্যন্ত রাজনীতিতে তাঁরা দুর্বল আর কোণঠাসা হলেন, রক্ষীবাহিনী আর কোর্টমার্শালের শিকার হলেন, নিজেরাও শতধা বিভক্ত হলেন, আর বাংলাদেশ নিজেও ক্রমাগত দূরে সরে গেল মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার রাষ্ট্র আর সংবিধান থেকে। ইলিয়াসের 'মিলির হাতের স্টেনগান'-এর সেই আব্বাস পাগলা তো কুৎসিত বর্তমানকে মেনে নিতে না পেরে স্টেনগান খোঁজা মুক্তিযোদ্ধাই। যুদ্ধোত্তর দেশে রাষ্ট্র যখন সকলকে আহবান জানিয়েছে ভাঙাচোরা বিধ্বস্ত মাতৃভূমির কাছে তখনই বড় কিছু আশা না করতে, তখন মিলির ভাই রানার টোস্ট বিসকিট-গুড়ের স্বাদ আর ভালো লাগে না, কোত্থেকে যেন টিভি আসে বাড়িতে, রানা একদিন চালিয়ে আসে ফোকসওয়াগন, গলির মোড়ে ব্যাঙ্ক ডাকাতি হয়... ঠিকাদারি পারমিট আর লুণ্ঠনে দ্রুত গড়ে নেয়া যাচ্ছে ভাগ্য। সালটা উনিশ তিয়াত্তর, আব্বাস পাগলা নীল আমর্স্টং এর চাঁদে যাবার সাথে চার বছর গুণে জানিয়ে দেয় আমাদের। যে অস্ত্রটি কিছুদিন আগে ব্যবহৃত হয়েছে দেশ স্বাধীন করার কাজে, সেটাই এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পদ আহরণের জন্য, সেই অস্ত্রটিই তো মিলি তার ভাইয়ের কাছ থেকে চুরি করেছিল আব্বাস পাগলাকে দেবে বলে। আর সেই আব্বাস পাগলাও ‘এখন ভালো' হয়ে গেছে’, অর্থাৎ অসুস্থ চারপাশকে সুস্থ বলে মেনে নিতে শিখে গেছে। হাসপাতালেই সে জমা দিয়ে এলো তার সংবেদনশীতাকেও। লড়াইয়ের বাসনাটা কিন্তু সঞ্চালিত হয়ে গেছে মিলির মাঝে। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষাও তেমনি অন্তর্হিত হয় না, কেননা যে প্রবল আর উচ্চতর চেতনার জন্ম সে দিয়েছিল, তার বিনাশ অসম্ভব। ফলে ‘আবার তোরা মানুষ হ’ চলচ্চিত্রে অস্ত্রের ভাষার যে অমানুষী প্রকাশকে প্রধান চিত্র করে তোলা হয়েছে, তা বাস্তবের খণ্ডাংশ মাত্র, এবং একরৈখিক। বিপরীতে একটা স্টেনগানের জন্য আব্বাস পাগলার আকুতিটা যে সংক্রমিত হলো মিলির মাঝে, সেটাও একই বাস্তবতার এক বহুমাত্রিক সম্ভাবনায় পূর্ণ বয়ান বটে।

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।