সকাল ১১:৪৪ ; রবিবার ;  ২১ অক্টোবর, ২০১৮  

খুলনায় চিংড়িতে অপদ্রব্য মেশানো থামছেই না

প্রকাশিত:

খুলনা প্রতিনিধি॥

খুলনায় চিংড়িতে অপদ্রব্য মেশানোর বাণিজ্য থামছেই না। অসাধু ব্যবসায়ীরা ওজন বৃদ্ধির জন্য চিংড়িতে নানা ধরনের অপদ্রব্য পুশ করছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ি সুনাম হারাচ্ছে। দিনে দিনে চাহিদাও কমছে। একের পর এক অভিযান চললেও অপদ্রব্য পুশ বন্ধ হচ্ছে না। অসাধু ব্যাবসায়ীরা অপদ্রব্য পুশকৃত চিংড়ি পিকআপ ও ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ অব্যাহত রেখেছেন। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় এ বৃহৎ খাতটি হুমকির মুখে পড়ছে।

অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক লাভের আশায় চিংড়ির দেহে পানি, আগার, ভাতের মাড়, সাগু, এরারুট, লোহা বা সীসার গুলি, মার্বেল, ম্যাজিক বল, জেলিসহ বিভিন্ন ধরনের পদার্থ মেশাচ্ছেন। খুলনা মহানগরীর রূপসা নতুন বাজার, রূপসা উপজেলার পূর্ব রূপসা, ফুলতলা উপজেলার জামিরা বাজার, ডুমুরিয়া উপজেলার শাহপুর বাজার, খর্নিয়া বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার মৎস ডিপোতে অবাধে চলছে চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত করে চিংড়ির দেহে বিভিন্ন ধরনের ক্যামিকেল ঢুকিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে ব্যবসায়ীরা।

জেল জরিমানা শোকজের পরও থামছে না অপদ্রব্য পুশের ঘটনা। অপদ্রব্য মেশানোর কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক খাত চিংড়ি শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। গলদা ও বাগদা চিংড়ি বিদেশের বাজার হারাচ্ছে। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন স্থানে অপদ্রব্য পুশকৃত চিংড়ি ধরাও পড়ছে। পরে অপদ্রব্য মেশানো চিংড়ি নষ্ট এবং পুশকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হচ্ছে। তারপরও থেমে নেই এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড। অনেক সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে চলে যাচ্ছে অপদ্রব্য পুশকৃত চিংড়ি। এতে এ শিল্প সুনাম হারাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতি।

র‌্যাব, কোস্টগার্ডের সহযোগিতায় প্রায়ই খুলনায় মৎস মান নিয়ন্ত্রণ ও পরিদর্শন বিভাগ অপদ্রব্য পুশকৃত চিংড়ি জব্দে অভিযান চালায়। চলতি বছর এ পর্যন্ত ৭টি অভিযানে অপদ্রব্য মেশানোর প্রায় ৭ হাজার কেজি চিংড়ি জব্দ করা হয়। এ সময়ে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় হয়। ২০১৪ সালে খুলনা মহানগরীর নতুন বাজার, লবণচরা, পূর্ব রূপসা, ডুমুরিয়া, ফুলতলাসহ বিভিন্ন এলাকায় ২৫৮টি অভিযান পরিচালিত হয়। এ অভিযানে ৩৬ লাখ টাকা জরিমানা এবং অপদ্রব্য পুশকৃত সাড়ে ৮ মেট্রিক টন চিংড়ি জব্দ করার পর বিনষ্ট করা হয়। এ সময় ১টি মামলা ও ৪টি ফ্যাক্টরির লাইসেন্স সাময়িক বাতিল এবং ৭ জনকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। ২০১৩ সালে ২৬৩টি অভিযানে ৫০ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় ও সাড়ে ৫ মেট্রিক টন চিংড়ি জব্দ করার পর বিনষ্ট করা হয়। একই সাথে ৪টি ফ্যাক্টরির লাইসেন্স সাময়িক বাতিল করা হয়। জেলে পাঠানো হয় ৭ জনকে।

জানা গেছে, ডিপো সংলগ্ন এলাকার শ্রমজীবীরা সিরিঞ্জ দিয়ে জেলি পুশ করার কাজে নিয়োজিত থাকে। এরা সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত ডিপোতে অবস্থান নিয়ে জেলি পুশ কাজ করে থাকে। প্রতি কেজি চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশের জন্য আগে ৪ টাকা দেওয়া হতো। এখন এরা ১০ টাকা হারে মজুরী পায়।

চিংড়ির খামার থেকে কারখানা পর্যন্ত ছয়টি স্তরে উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন- ‘ইইউ এফভিও’ অডিট টিমের ৫ সদস্য আগামী এপ্রিল মাসে খুলনায় আসছে। ২০-৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই টিম বাংলাদেশে অবস্থান করবে। এর মধ্যে পাঁচদিন তারা খুলনায় থাকবেন। ইইউ’র অডিট টিম চিংড়ির খামার, ডিপো, আড়ৎ-অবতরণ কেন্দ্র, মাছ বাজার, পরিবহন ব্যবস্থা এবং হিমায়িত কারখানা পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষা করবেন। তারা সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটে কমপক্ষে দু’টি করে খামার পরিদর্শন করবেন। স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে চিংড়ি উৎপাদন, হিমায়িত চিংড়িতে নাইট্রোফুরান ও অপদ্রব্য পরীক্ষায় কাজ করবেন তারা।

উল্লেখ্য, চিংড়ির গুণগতমান নিরীক্ষায় ইইউ প্রতিনিধি দল ২০১১ সালের মার্চ মাসে সর্বশেষ বাংলাদেশ সফর করেন। রফতানিকৃত চিংড়িতে নাইট্রোফুরান থাকায় ১৯৯৮ সালে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশি চিংড়ি রফতানি নিষিদ্ধ ছিল।

খুলনার মৎস্য অধিদপ্তরের মান নিয়ন্ত্রণ ও পরিদর্শন বিভাগের উপ-পরিচালক মো. আব্দুর রাশেদ বলেন, ধারাবাহিক অভিযানের কারণে অপদ্রব্য পুশ এখন অনেক নিয়ন্ত্রিণে এসেছে। আগে শক্ত জিনিস মেশানো হতো। এখন তরল দ্রব্য পুশ করা হচ্ছে। অপদ্রব্য মেশানো বন্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে।

খুলনার মৎস্য অধিদপ্তরের মান নিয়ন্ত্রণ ও পরিদর্শন বিভাগের পরিদর্শক মো. আবুল হাসান বলেন, 'চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কোনভাবেই পুশকারীদের ছাড় দেয়া হচ্ছে না। অভিযানে বিভিন্ন ফ্যাক্টরির লাইসেন্স সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়। জেল ও জরিমানা করাও হয়। কিন্তু তারপরও অপদ্রব্য পুশের ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না।' তিনি বলেন, 'এপ্রিলে আসা ইইউ প্রতিনিধি দলের প্রতিবেদন চিংড়ি শিল্পের ভবিষতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে।'

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি এম খলিলুল্লাহ বলেন, 'চিংড়িতে অপদ্রব্য মেশানো ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা অসহায় হয়ে পড়েছে।'

জানা গেছে, ২০১৪ সালে খুলনায় ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে ২১ হাজার মেট্রিক টন বাগদা ও ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে ১১ হাজার মেট্রিক টন গলদা উৎপাদন হয়। নভেম্বর মাসে খুলনার ২২টি হিমায়িত খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ২০২ কোটি ৭০ লাখ টাকা মূল্যের চিংড়ি রফতানি হয়। ডিসেম্বর মাসে ১১২ কোটি ১৬ লাখ টাকা মূল্যের চিংড়ি রফতানি হয়।

/এমআর/এফএস/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।