বিকাল ০৪:৫১ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৩ মে, ২০১৯  

রাজনৈতিক সহিংসতার দায় কার?

প্রকাশিত:

সাইফ আহম্মেদ॥

বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কিছু বলা বা লেখার সময় কোনও ভূমিকা দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ কি ঘটেছে, কবে থেকে ঘটেছে সবই আমাদের পাঠক-দর্শকরা জানেন। আমার বলবার বিষয় খুব বেশি নাই তাই সরাসরি যে দু একটি বিষয় নিয়ে বলতে চাই তাই শুরু করছি । প্রথম বিষয় আমাদের গণমাধ্যম। এই বিষয়ে আমার জানাশোনা কম তাই সাবধানে বলতে চাই। যেখানে যা ঘটনা ঘটে সেটা হুবহু তুলে ধরাই যদি সংবাদ হয় তাহলে আমার মতে বাংলাদেশের গণমাধ্যম জিপিএ ফাইভ পাবে।

কারণ আমার ক্ষুদ্র পর্যবেক্ষণে যা দেখেছি তাতে আমাদের গণমাধ্যম সংবাদ প্রচারে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া কোনও পক্ষপাত করে না। সেটা যে মালিক বা যে আদর্শের পত্রিকাই হোক না কেন। আমার মনে রাজ্যের প্রশ্ন সংবাদের পর্যালোচনা নিয়ে। প্রতিদিন এতো লোক বেসকারি টিভি চ্যানেলে বসে অবলীলায় কোন দলকে জনপ্রিয় ঘোষণা করে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী করছে আবার কাউকে ধরাশায়ী করছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় এসব বলার সময় তারা আমার ধারণা বা আমি মনে করি এসব শব্দও ব্যবহার করছে না। তাতে করে মনে হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক যে টক-শোতে কথা বলা বিশেষজ্ঞের কথা একশো ভাগ সত্য।

এবার বলতে চাই পেট্রোল-বোমা হামলা বা সহিংসতা নিয়ে । প্রশ্ন হচ্ছে এই বোমা হামলা করছে কে বা কারা ? আমার একটি সরল সমীকরণ হচ্ছে এটা নিয়ে উনারা যদি কিছু না বলেন তাতে কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না । কারণ এটা জনগণ খুব ভাল করেই জানে। তারপরও তারা কি কারণে যেন প্রতিদিনই নিত্য নতুন যুক্তি নিয়ে হাজির হচ্ছেন টিভি টকশোতে। এই যুক্তিগুলোর অন্যতম একটি হচ্ছে সরকার বোমা-হামলা করে দোষটা বিরোধী দলের উপর দিয়ে বিরোধী দলকে জনবিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে।

প্রশ্ন আসে সরকার যখন তার সব শক্তি দিয়ে এই হামলা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছে, সেখানে তারাই কেন আবার হামলা করবে ? প্রায় প্রতি সপ্তাহেই সরকারের মন্ত্রীরা যখন ঘোষণা দিচ্ছেন এক সপ্তাহের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে । তাহলে সরকার যদি পেট্রোল-বোমা হামলা করে থাকে, তাহলে তো তারা এক আদেশেই বন্ধ করে দিতে পারে। আর পরের সপ্তাহেই বলতে পারে সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। তার মানে দাড়াচ্ছে, সরকার একদিকে ঠিক করার ঘোষণা নিজে দিচ্ছে। অন্যদিকে পেট্রোল-বোমা হামলা চালিয়ে তা আবার ঠিক হতে দিচ্ছে না। বিষয়টা কি কৌতুক না ধাঁধা আমার মাথায় আসছে না।

যারা এই ধরণের প্রেসক্রিপশন দিচ্ছে তারা আবার সঙ্গে আর একটি বিষয় জুড়ে দিচ্ছে, তাদের মতামত সংলাপ হলেই এই বোমা-হামলা বন্ধ হয়ে যাবে। সবচাইতে বড় প্রশ্নটি এখানেই যেখানে বিএনপি বা ২০ দল এই বোমা হামলা করছেই না তাহলে বিএনপির সাথে সংলাপে বসলে কি করে পেট্রোল বোমা বন্ধ হবে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায় সরকার বা তৃতীয় পক্ষ যারা এই বোমা হামলা করছে সংলাপ শুরু হলেও তারা যদি হামলা বন্ধ না করে ? যদি ধরে নেই বিএনপি-জামায়াত পেট্রোল বোমা হামলার সাথে জড়িত নয় সরকার বা তৃতীয়পক্ষ এটা করছে, তাহলে বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনটা কোথায় ? গুপ্তস্থান থেকে একটা প্রেস রিলিজ পাঠিয়ে ৭২ ঘন্টা হরতাল? আর এই প্রেস রিলিজের কারণে সরকার পদত্যাগ করবে অথবা সংলাপে বাধ্য হবে ? কারণ বাস্তবে, অন্তত আমার দৃষ্টিতে দেশে হরতাল অবরোধ বলে কিছু হচ্ছে না । মানুষ চলাচল আর দৈনন্দিন কার্যক্রম কমিয়ে দিয়েছে পেট্রোল বোমার ভয়ে ।

দেশে যখন এরকম অরাজকতা চলছে তখন নাগরিকরা এটা নিয়ে নানা কথা বলবে নানা রকম সমাধান দেবে এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু লোক যদি বোমা হামলা বন্ধ না করার দায়িত্ব নিয়ে নেয় বিষয়টা কেমন হয় ? একটু ভেঙ্গে বলছি। এই ধরণের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে সরকার বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে এটাই স্বাভাবিক।

রাষ্ট্র কিন্তু কখনও কোনও সমঝোতা বা সংলাপ দিয়ে চলতে পারে না । রাষ্ট্রকে চলতে হবে তার সংবিধান ও আইন অনুসারে। সরকার বা সরকারি দল চাইলে আলোচনা সংলাপ সমঝোতা করতে পারে। রাষ্ট্রের নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন নৈরাজ্যকারীদের দমনের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে তখন কিছু লোক বেশ দায়িত্ব নিয়ে টিভি টকশোতে বলছে, ‘‘ পুলিশ দিয়ে বল প্রয়োগ করে পেট্রোল বোমা হামলা বন্ধ করা যাবে না” এটা বলে কি তারা প্রকারান্তরে বোমা হামলা চালানোর দায়িত্ব নিয়ে নিচ্ছেন না।

কারণ রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি এটা দমন করতে পারে তাহলে তার তো কোনও সমস্যা থাকার কথা নয়। তাহলে মনে হয়, হয়তো এধরণের কোনও বিশেষণ যুক্ত না করে সরাসরি বলে দিচ্ছেন, পুলিশ দিয়ে বোমা হামলা বন্ধ করা যাবে না ।

তাহলে কি তিনি বোমা হামলাকারীদের পরিকল্পনা জানেন। এই আলোচকরাই ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে বেশ জোর গলায় টিভিতে বলেছেন, ‘‘ আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি নির্বাচন হলে সহিংসতা কমবে না আরও বেড়ে যাবে’’। নির্বাচনের পরে তারা কিন্তু একবারের জন্যও বলেননি-- আমি যা ধারণা করেছিলাম সেটা ঠিক হয়নি। হয়তো এখন যুক্তি আনবেন বিএনপি আন্দোলন স্থগিত করেছিল বলে সহিংসতা বন্ধ হয়েছিল । কিভাবে বন্ধ হয়েছিল তাতো প্রশ্ন নয় । বন্ধ হয়েছিল কি না ? মন্তব্য করার সময়তো তারা বলেননি যে বিএনপি যদি আন্দোলন বন্ধ না করে তাহলে সহিংসতা বেড়ে যাবে। তারাতো একরকম সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছিলেন।

এই সব আলোচকদের সবগুলো মন্তব্য একত্র করলে কিন্তু আরও বড় একটি প্রশ্ন জন্ম নেবে। যেমন ‘‘হতে পারে এই হামলা সরকার চালাচ্ছে, এই বোমা হামলা বিএনপি-জামায়াত চালাচ্ছে না, পুলিশ দিয়ে হামলা বন্ধ করা যাবে না’’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এই আলোচকরাই আবার এক পর্যায়ে বলছে যদি বিএনপি-জামায়াতও হামলা চালায় তাহলেও তাদের সাথে সংলাপে বসা উচিত। তাদের আছে অকাট্য যুক্তি। সরকার যদি শান্তি বাহিনীর সাথে সংলাপ করতে পারে তাহলে বিএনপি-জামায়াতের সাথে কেন সংলাপ করবে না।

একটি প্রশ্নের উত্তর কি তারা দিতে পারবেন? শান্তি বাহিনীতো রীতিমত যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, তাহলে বিএনপি জামায়াতও কি এখন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে ?

একটি ভয়ঙ্কর আশঙ্কা জানিয়ে আমার লেখা শেষ করছি যারা এখন শান্তি বাহিনীর সাথে তুলনা করে বিএনপি-জামায়াতের অপরাধকে আমলে নেওয়ার বদলে সংলাপ করতে বলছে তারা হয়ত কিছুদিন পরে দেশ থেকে আদালতও তুলে দিতে বলবে। কারণ, তারা তখন বলবে দেশে যেসব চোর ডাকাত চুরি করছে তাদের গ্রেফতার করা যাবে না, কারণ তাদের গ্রেফতার না করে তাদের দাবী দাওয়া মেটাতে হবে, হত্যাকারীকেও গ্রেফতার করা যাবে না কারণ হত্যার পিছনে হত্যাকারীরও কোনও দাবী থাকতে পারে । তাই তাদের গ্রেফতার না করে তাদের সাথে সংলাপ করা হোক। আর এভাবে অপরাধীকে আইনের আওতায় না এনে সংলাপ শুরু করলে একদিন দেশে আইন- আদালতের প্রয়োজনীয়তাও উঠে যাবে।

লেখক: নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মী

saif20@gmail.com

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদকলামতথ্যছবিকপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।