রাত ০৮:৫৯ ; মঙ্গলবার ;  ১৮ জুন, ২০১৯  

খ-তে খালেদ, খ-তে খাদ্য

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

তারুণ্য রিপোর্ট॥

নামের অদ্যাক্ষর খ দিয়ে শুরু হয়েছে বলে খালেদ সাইফুল্লাহ'র প্রিয় কাজ খাওয়া দাওয়া। খাওয়া ছাড়া তিনি কিছু কল্পনাও করতে পারেন না। তাই ভেবেচিন্তে প্রথম উপন্যাসটাও লিখে ফেললেন খানা খাদ্য নিয়ে। সম্ভবত সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ'র 'শীম কীভাবে রান্না করতে হয়' এর পরেই দ্বিতীয় কোনও খাদ্যবিষয়ক উপন্যাস লেখা হলো বাংলাদেশে।

খালেদ নিজে ভোজন-রসিক, খেতে এবং খাওয়াতে ভীষণ ভালোবাসেন। ঘুম থেকে উঠে খাওয়ার চিন্তা করেন। ঘুমাতে যাওয়ার আগে খাওয়ার কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েন। তাই তার চারপাশ খাদ্যময়। তবে উপন্যাস কেনও খাওয়া বিবর্জিত হবে এটাই তিনি জানতে চান। তিনি শুধু খাদ্যরসিক নন আদতে রসিকও। বাংলাদেশের একমাত্র ফান ম্যাগাজিন উন্মাদের একনিষ্ঠ কর্মী।

এই বইমেলায় বর্ষা দুপুর প্রকাশনীর ২০৪ ও ২০৫ নম্বর স্টলে মাত্র ১০০টাকায় পাওয়া যাবে ' শাহানানামা' উপন্যাসটি। পাঠককে খালেদ নিশ্চয়তা দিয়েছেন এই বই পড়লেই অর্ধভোজনের স্বাদ পাবে তারা। যদিও নিন্দুকেরা দাবি করছে শাহানা খালেদের বিশেষ বান্ধবী তাকেই নিয়েই রচিত এই উপন্যাস। এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি শুধু মাথা ঝাকান। অর্থাৎ বই শুধুই খানা নিয়ে।

মানবী নয়, ভালোবাসাটা খাদ্যের প্রতিই বেশি তাই প্রথম বই খাদ্য নিয়ে। খাদ্যরসিক তরুণ খালেদ এবার মুখোমুখি হয়েছিলেন বাংলা ট্রিবিউন তারুণ্যের-

বই লেখার পেছনে অনুপ্রেরণা কী ছিল?

খালেদ: বই লেখার পেছনে অনুপ্রেরণা কিছু ছিল না। যা ছিল সেটা আসলে চাপ! খুব বেশি লোক বই লেখার কথা জানতেন না। জানতেন আমার প্রকাশক, আমার খুব কাছের কিছু মানুষ, পরিবারের সদস্যরা, আর আমার মশারি-বালিশ। কাজের থেকে ফিরে রাতের বেলা ঘুমানোর আগ পর্যন্ত মশারির ভেতর যতটুকু লেখা সম্ভব, প্রতিদিন টুকটুক করে ততোটুকুই লিখে গেছি। ওই প্রকাশক, বন্ধু-বান্ধব, পরিবারের সদস্যদের অসহনীয় চাপেই সময়মতো বই লিখে শেষ করা সম্ভব হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: লেখালেখিকে কি পেশা হিসেবে নেওয়ার চিন্তা করেছেন কখনও?

খালেদ:জ্বি, চিন্তা করেছি। এখনও চিন্তা করি। আরেকটু সাহসী হয়ে উঠতে পারলেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেব। যারা লেখালেখি করেই জীবন পার করে দেয়ার চিন্তা করেছেন, তাদের দৃঢ় মনোবল দেখে আত্মবিশ্বাস যোগানোর চেষ্টা করি।

শাহানানামা'র জন্য দেওয়া ঘোষণা 

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার মতো তরুণদের আপনার বই কতটা প্রভাবিত করবে বলে মনে করেন?

খালেদ: তরুণদের প্রভাবিত করার কোন মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বই লিখিনি। আমার লিখতে ভালো লেগেছে, আমি লিখে গেছি। প্রশ্ন হলো তরুণদের ভালো লাগবে কিনা। ভালো লাগার পরেই প্রভাবিত হওয়ার প্রশ্ন। এই বই তরুণদের উপর কতটুকু প্রভাব বিস্তার করলো সেটা মাপার অবশ্য একটা উপায় আছে। তরুণ প্রজন্ম যদি হুট করেই মোটাসোটা হওয়া শুরু করে তাহলে তাতে এই বইয়ের কুপ্রভাব থাকা অসম্ভব নয়! খাদ্যসাহিত্যই এই বইয়ের মূল উপভোগ্য।

বাংলা ট্রিবিউন: নিজের সম্পর্কে যা বলতে ইচ্ছা করে-

খালেদ: আমি সৈয়দ খালেদ সাইফুল্লাহ্‌। আর দশটা সাধারণ বাঙালির জীবনে যেমন প্রাপ্তির হাসি বা অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাস থাকে, আমারও অবিকল তেমনই। ইস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গোবেচারা-শান্তশিষ্ট ছিলাম, এখনও অফিসের ডেস্কে বসে কেরানির কলম পিষে যাই। সকাল বেলা চিৎকার-চেঁচামেচি করে বাজার করি, বাসে কাঁঠাল গোঁজা হয়ে অফিস যাই, রাতে বাসায় ফিরে আরাম করে মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে ঢেকুর তুলি, ভ্যালেন্টাইনস ডেতে চাপা হাহাকার বুকে চেপে ঘুরি, বন্ধুদের চায়ের দোকানে পেয়ে গেলে আড্ডা দিয়ে উল্লসিত হই-এভাবেই কেটে যাচ্ছে জীবন। শারীরিক বর্ণনা দিতে গেলে আমি বলি- দৈর্ঘ্যে মেরেকেটে সাড়ে পাঁচফুট, প্রস্থেও দৈর্ঘ্যের সমান, ঘোরতর কৃষ্ণবর্ণ! এইতো।

বাংলা ট্রিবিউন: নিজের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি-

খালেদ: বাঙালি পুরুষ মানুষের কিছুক্ষণের জন্য গা-হাত-পা ছেড়ে দেয়ার একটা উপযুক্ত স্থান হলো সেলুন। হাতে ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে সেলুনে গিয়ে বসুন। টিভিতে তখন চলছে হিন্দি কোনও লারেলাপ্পা মার্কা গান, সিরিয়াস টাইপের সেলুন হলে কোনও বুদ্ধিজীবির টক-শো। পত্রিকাটা হাতে নিয়ে একটা ঝাড়া দিয়ে বসবেন, কানে ভেসে আসবে আজকের সারাদিনের সব বাজারে গপ! পত্রিকায় চোখ দিয়ে সেসব গপ্পে কান খাড়া রাখলে কিছুক্ষণের মধ্যে আপনি নিজেই হয়ে উঠবেন আস্ত একটা প্রথম আলো-যুগান্তর-সমকাল-বাংলা ট্রিবিউন!

এইসব সুখ তাপাতে তাপাতে একসময় আপনার আপনার সিরিয়াল চলে আসবে। আপনি পেপারটা ভাঁজ করে আড়মোড়া ভেঙে চেয়ারে বসবেন। নাপিত ততোক্ষণে আপনাকে সাদা কাপড়ে মুড়ে ফেলেছে। তারপর কি চুল কাটা শুরু? উঁহু! প্রথমে সে আপনার চুলে পানি মেরে একদফা দলাই-মলাই করে নেবে, চুলে টান দিয়ে তা কতটুকু শক্ত বা আলগা সেটা পরখ করে নেবে, চিরুনি দিয়ে ঘ্যাসঘ্যাস করে চুলে টান দিয়ে খুশকি আছে কিনা তা দেখে নেবে। এইটুকুর মধ্যেই যে সুখ আপনি পাওয়া শুরু করেছেন তাতে চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। বুঁজে বুঁজেই আপনি বলে দিলেন কোন ছাঁট হবে- রাহুল ছাঁট, না খান্না ছাঁট, না আর্মি ছাঁট, না বাটি ছাঁট, না ফলের বাটি ছাঁট। ব্যস, বলেই আপনার কাজ শেষ। চাইলে আপনি ঘুমিয়ে নিতে পারেন, বা গলা ফাটিয়ে তর্কে নামতে পারেন, বা গুনগুন করে গান গাইতে পারেন- আপনার ব্যাপার।

ওদিকে কাঁচি-চিরুনি হাতে নাপিত কিন্তু কাজ শুরু করে দিয়েছে। আপনি কখনও টের পাচ্ছেন চিরুনির সুরসুরি, কখনও চুলে হালকা টান- যে টানে ব্যাথার চেয়ে সুখ হাজার গুনে বেশি, কখনও কাঁচির স্পর্শ। সুখের মেঘে তখন আপনি ভাসছেন। ভাসতে ভাসতে একসময় আপনি যেন হারিয়েই গেলেন মেঘের দেশে...

নাপিতের ধাক্কায় আপনার ঘুম ভাঙলো! বেচারা আয়না হাতে দাঁড়িয়ে, আপনার পেছনের চুল কাটানো কেমন হলো তা দেখাবে বলে। দেখবেন আর কী... জানেনই তো কাজ হবে নিখুঁত। আপনি আবার চোখ মুদলেন, কারণ আপনি জানেন- চুল কাটানো শেষ, কিন্তু সুখের এখনও শেষ না। সুখের মাত্র শুরু...

প্রথমে ধরা হবে আপনার আঙুল। মট মট শব্দ করে সেটা ফোটানো হবে। এতো শব্দ কোথথেকে আসে কে জানে... নিজে নিজে চেষ্টা করে দেখুন, ঐ শব্দের ধারে কাছেও যাবে না! আঙুলের পর এবার আসবে কবজিতে। তারপর হাতের ম্যাসাজ। আপনি যখন দলাই-মলাই খেয়ে হারকিউলিসের শক্তি অনুভব করছেন, কারিগর মশাই তখন খেলা শুরু করেছেন আপনার সেন্টার নার্ভ থেকে দুইপাশের দুই কাঁধে। কোন কথা বলার মুডে তখন আপনি নেই। তারিয়ে তারিয়ে মাথা নাড়িয়ে সমঝদারের মতো উপভোগ করছেন শুধু!

একসময় পিঠে নেমে গোটাকয়েক পুরুষালি রদ্দা। ওতে আপনার ক্ষতি কিছু হবে না। ইশকুল জীবনে স্যারের বেতের বাড়ি খেয়ে আপনি-আমি সবাই পিঠকে বালির বস্তা বানিয়ে ফেলেছি! রদ্দা খাওয়ার পরে আপনার পিঠে যখন সুখ-সুখ ভাব আসবে, তখন শুরু হবে বুড়ো আঙুল দিয়ে পিঠের গিঁটে গিঁটে ম্যাজিকাল মালিশ! কে বলেছে বাঙালি মালিশ জানে না?

খেলা শেষ? দাঁড়ান দাঁড়ান... শেষরাত আসার আগে ওস্তাদের মার আবার শুরু হয় নাকি? পিঠ থেকে গোঁত্তা খেয়ে নাপিত উঠে গেছে সোজা মগডালে, মানে আপনার মাথায়! ব্যস তারপর যেন ব্যাটা ওস্তাদ জাকির হোসেন। তবলার বোলে ধা-ধিন-ধিন-না শুরু হয়ে গেছে আপনার তালুতে। আর ওদিকে সুখের চোটে তড়পাতে তড়পাতে আপনি যেন কানে শুনতে পাচ্ছেন বিসমিল্লাহ খাঁর সানাই...

সানাই কোথায়... এতো নাপিতেরই গলা- স্যার, বাড়িত গিয়া ভাত খাইবেন না?

আপনি অতি অনিচ্ছায় মেঘের দেশ- তারার দেশ থেকে ফিরে এলেন ধূলি-ধূসরিত বাজারের কোণের সেলুনে। সুখের তৃপ্তিতে চোখের কোণে টলমল জমে আছে একফোঁটা পানি! সেটা মুছে নাপিতের পাওনা-গণ্ডা-বখশিশ মিটিয়ে আপনি হাঁটা শুরু করলেন সামনে। সামনে কঠোর সংগ্রাম, আর মুখে এক চিলতে হাসি। সামনের মাসে আবার এক টুকরো সুখের কথা চিন্তা করেই কি...??? কে জানে... হলফ করে বলতে পারি, খাওয়ার পরের সুখ এটাই।

/এফএএন/ 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।