রাত ০১:০৫ ; রবিবার ;  ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮  

এক রজনীর কাব্য || সালেক উদ্দিন

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

টিএসসি এবং চারুকলার মাঝখানে পুরো এলাকা জুড়ে সারাদিনব্যাপি চলছে কবিতা পাঠের আসর। প্রসস্থ রাস্তার এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে তৈরি করা হয়েছে মঞ্চ। মঞ্চটি দাঁড়িয়ে আছে টিএসসির গোল চত্ত্বর থেকে দুই তিন শ’ গজ উত্তরে চারুকলা, পাবলিক লাইব্রেরির দিকে মুখ করে। সারাদিন উঠতি বয়সি কবিরা ভালোবাসা নিয়ে লেখা কখনো একক কখনো কোরাস কবিতা পড়ে বাহাবা নিয়ে গেছেন। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়েছে এপার বাংলা ওপার বাংলার স্বনামধন্য কবিদের মঞ্চে ওঠানামা। 
ভালোবাসা দিবসের কবিতা পাঠের আসরে এইমাত্র কবি আর কে হোসেন তার দরাজ গলায় যে কবিতাটি আবৃত্তি করলেন তা শুনে উপস্থিত কবি মহাকবিরা নাক সিটকালো। কবি আর কে হোসেন নিজের কবিতা ছেড়ে আবৃত্তি করলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ’ কবিতাটি। অন্য কবিরা যখন নিজেদের সেরা রোমান্টিক কবিতা পাঠ করে বাহাবা কুড়াচ্ছিলেন তখন আর কে হোসেনের মত একজন নামকরা কবি ধার করে এমন একটি হতাশার কবিতা পড়বে তা শ্রোতারাও আশা করেনি। অনুষ্ঠানের সুন্দুর-সুকণ্ঠি উপস্থাপিকা তো কবিকে প্রশ্ন করেই বসলো, স্যার আপনি কি আরো একটি কবিতা পাঠ করবেন?
কোন কবিতা?
আপনার লেখা কোনো রোমান্টিক কবিতা- যেমন ধরুন,‘তোমার উপমা শুধুই তুমি।’
কেনো?
আপনার এই কবিতাটি অনেকেরই খুব প্রিয়। বিশেষ করে উঠতি বয়সি তরুণ-তরুণীদের। তাছাড়া আমার ধারণা আজকের আসরে কবিতাটি প্রাসঙ্গিক এবং শ্রোতারাও এটা বেশ খাবে। 
কবি মেয়েটির কথা শুনে একটু ভাবলেন এবং প্রশ্ন করলেন, কেনো? যেটা পড়েছি সেটা খায়নি? 
ওটা তো আপনার নিজের কবিতা নয়। তাছাড়া ওতে হতাশাই বেশি ব্যক্ত হয়েছে। আমি কি আপনার নামটি আবার ঘোষণা করবো?
না, আজ এই পর্যন্তই। 
উপস্থাপিকার এই কথাগুলো বলার কারণেই হবে হয়তো কবি আর কে হোসেনের মনেও কিছুটা সংশয় দানা বেঁধেছে। তার মনে হচ্ছে, মঞ্চের সামনের সারির কবি-মহাকবিরা মুখ টিপে হাসছেন, দূরের শ্রোতারা একে অপরের সাথে তাকে নিয়েই কিছু একটা বলছে। 
তিনি যখন মঞ্চ থেকে নেমে এলেন তখন মনে হলো সবার তিক্ষ্ম দৃষ্টি তাকে তীরন্দাজের তীরের মত বিদ্ধ করছিল। আহত কবি সামনের সারিতেই তার জন্যে নির্ধারিত স্থানটিতে বসতে যেয়েও আর বসলেন না। আসরে আর থাকতেই ইচ্ছা করলো না তার। তিনি মাথা নিচু করে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলেন টিএসসির ক্যাফেটেরিয়ায়। এক কাপ চা খাওয়া দরকার। চায়ের অর্ডার দিতে গিয়েও দিলেন না। মনে হলো এখানকার লোকগুলোও তাকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে দেখছে। কবি এবার টিএসসি মোড় থেকে হাঁটতে শুরু করলেন বাংলা একাডেমির দিকে। একটু নিরিবিলি জায়গা দরকার। একা একা এক নাগারে বেশ কয়েকটি সিগারেট টানার মত নির্জন জায়গা। এই জায়গার কথা ভাবতে ভাবতে কবি এসে দাঁড়ালেন বাংলা একাডেমির বই বিক্রয় কেন্দ্রের পাশেই গড়ে উঠা ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভবণের সামনে। অনেকদিন পর বাংলা একাডেমি বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজে হাত দিয়েছে। এই ভবণটি তারই একটি স্বাক্ষর। ভবনের সামনে ঘাটবাঁধানো ছোট্ট একটি পুকুর। পুকুর না পগাড়! পুকুর বা পগাড় যাই বলি এতে এখন কোমড় পর্যন্ত পানি হবে। কবির মনে হলো এই পানিটুকু সেঁচে ফেললে এখানে কয়েকশ ফেনসিডিলের বোতল পাওয়া যাবে। নেশাখোরদের স্বর্ণযুগ চলছে এখন। আজকাল হাত বাড়ালেই ফেনসিডিল, ইয়াবা পাওয়া যায়। অনেক পান সিগারেটের দোকানও ফেনসিডিলের মতই ইয়াবাও সহজলভ্য। ইউনিভার্সিটি এলাকায়তো এসবের অভাব নেইই এমনকি ঢাকার স্কুলগুলোর গেটেও বিশেষ করে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের গেটে এদের অভয় রাজ্য। শুধু ইশারা বুঝতে হবে। যারা বিক্রি করে আর যারা কেনে তারা এসব ইশারার ভাষা বুঝে। যারা বোঝে না তাদের অভিজ্ঞ বন্ধুরা বুঝিয়ে দেয়। কবির মনে হলো চরুকলা ইনস্টিটিউট ও টিএসসি মোড়ের মাঝামাঝিতে যেখানে কবিতা পাঠের আসরের মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। তার চারপাশে নিশ্চয়ই এখন এসব বেচাকেনা চলছে।  
বাংলা একাডেমির পুকুরের ঘাটে বসে কবি লম্বা করে সিগারেটে টান দিলেন এবং মুখটা গোল করে নিখুঁত কৌশলে বাতাসে ধোঁয়া ছাড়লেন। সিগারেটের ধোঁয়া মুখ থেকে বের হয়ে ছোট্ট গোলাকার একটা কুণ্ডলী তৈরি করছে এবং ধীরে ধীরে তা বড় হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। সিগারেট অনেকেই টানে এবং ধোঁয়া ছাড়ে। এমন নিখুঁত ধুম্রগোলক খুব কম মানুষই তৈরি করতে পারে। বোঝা যাচ্ছিল কবি আর কে হোসেন খুব মনোযোগ দিয়ে সিগারেট টানছেন। যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারবে একটা কিছু ভাবছেন তিনি। কি ভাবছেন কবি? পুকুরের তলানিতে কত শত ফেনসিডিলের খালি বোতল রয়েছে সেই কথা? নাকি ভালোবাসা দিবসের কবিতা পাঠের আসরে তিনি এমন একটি কবিতা কেনো বেছে নিয়েছিলেন সেই কথা? ভালোবাসা বলতে মানুষ কি দুজন মানুষের পরস্পরের প্রতি মানবিক ও শারিরীক আকর্ষণকেই বোঝে? নাকি ভালোবাসার পরিধি আরও অনেক বড়?

অনেকক্ষণ একা বসে আছেন কবি। এখনও টিএসসি ও চারুকলার মাঝামাঝি জায়গায় কবিতার আসর চলছে। আকাশে মস্ত একটা চাঁদও উঠেছে। 
আচ্ছা আজ কি পূর্ণিমা? 
না, আজ চাঁদের ১২ তারিখ, পূর্ণিমার ঠিক আগের সময় এটি। 
কে? চমকে উঠলেন কবি। এতক্ষণতো তিনি একাই ছিলেন এখানে। তাইতো নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন। এখন দেখছে তার পাশে বসে আছে একজন রমনী। সে শুধু বসেই নেই। দিব্যি তার কথার উত্তর দিচ্ছে। কবিকে ভূত দেখার মত করে চমকে উঠতে দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল মেয়েটি। অনেকটা পেত্নীর মত। ছিঃ ছিঃ অপরূপ সুন্দরী এই মেয়েটি পেত্নী হতে যাবে কেনো! পেত্নীরাতো কুৎসিত হয় এবং এমনভাবে কথা বলে যেন মনে হয় নাক দিয়ে কথা বলছে। নিজেকে সামলে নিয়ে কবি মেয়েটিকে প্রশ্ন করলেন, কে তুমি? 
আমি আজকের কবিতা আসরের একজন শ্রোতা। 
আসরতো টিএসসির মোড়ে। এখানে কি করছো?
আপনি যা করছেন।
আমি যা করছি তুমি তা করতে যাবে কেনো?
কারণ আমি আপনার একজন ভক্ত।
কবে থেকে চেনো আমাকে?
আজ সন্ধ্যা থেকে।
কটা কবিতা পড়েছো আমার।
একটাও না।
তবে ভক্ত হলে কি করে?
ভক্ত হতে পূর্ব অভিজ্ঞতা লাগে না? প্রথম পরিচয়েই হওয়া যায় যেমন প্রেম করতে পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় না।
তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু কেনো তুমি আমার ভক্ত হলে বলোতো?
আপনি অন্যদের চেয়ে আলাদা।
কিভাবে বুঝলে?
সবাই প্রেমের কবিতা পড়ে করতালি নিল আর আপনি পড়লেন বিরহের কবিতা। আপনি কি খেয়াল করেছেন, আপনার কবিতা পাঠের শেষে কেউ করতালি দেয়নি? 
লক্ষ্য করেছি।
তারপরও আপনি আর একটি কবিতা পাঠের সুযোগ নেননি। কেনো নিলেন না? 
কবি মেয়েটির এই প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। মেয়েটি বললো, আমার মনে হয়েছে আপনার সাথে অনেকক্ষণ গল্প করা যায়। কি যায় না?
হ্যাঁ-যায়। কিন্তু আমার যে ওঠার সময় হয়েছে। আমাকে এখন যেতে হবে।
কোথায় যাবেন?  
কোথাও না, হাঁটবো।
কোথায় হাঁটবেন?
কেনো?
আমিও আপনার সংগে হাঁটবো। রাতের বাকি সময়টা আপনার সঙ্গে কাটাবো। আপনি যেখানে যাবেন আমিও সেখানে যাব। 
আমি হাঁটতে হাঁটতে কাওরানবাজারের পচা-মজা কোনো এক অন্ধকার গলিতে ঢুকতে পারি। আবার ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা ভাসমান মানুষের পাশে কিছক্ষণ শুয়ে কাটাতে পারি। 
আপনার ভয় লাগে না? 
না, আমার কোনো ভয় নেই। তবে তুমি সাথে গেলে ভয় পাবো। 
কেনো?
অন্ধকার পচা গলিতে পচা মানুষ তোমার গন্ধ পেলে হায়নার মত ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, তোমাকে টেঁনে হিঁচড়ে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে পারে। তাতে আপনার কি? আমিতো আপনার কেউ লাগি না। 
কথাটি বলেই মেয়েটি উঠে দাঁড়ালো। কবিও উঠলেন, জ্যোৎস্নার আলোয় মেয়েটিকে দেখলেন এবং মেয়েটির সংগে হাঁটতে শুরু করলেন।
হাঁটতে হাঁটতে চলে এলেন কবির বাড়ির ছাদে।
ষোল তলা ভবণের একটি ফ্লাটে থাকেন কবি। ইচ্ছে করলে কবি তার বাসায়ই নিয়ে যেতে পারতেন মেয়েটিকে। ঢাকা শহরে কে কার খোঁজ রাখে! পাশের ফ্লাটে কেউ মরে পড়ে থাকলেও লাশ পচে গন্ধ বের হওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ জানতেও পারে না। কবির মনে হলো তার অবস্থাটাও একদিন এমন হতে পারে। কারণ, বাসায় তিনি একাই থাকেন। স্ত্রী তারই এক বন্ধুর হাত ধরে চলে গেছেন বছর পাঁচেক আগে। শুনেছে সে সুখেই আছে। কবি তার স্ত্রীকে অনেক ভালোবাসেন। তাই তার স্ত্রী সুখে আছেন জেনেই তিনিও সুখী। বড় প্রেম এ রকম হয়। তার স্ত্রীও যে তাকে ভালোবাসতো তা তিনি জানতেন। তবে স্ত্রীর অতি ভালোবাসায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। স্ত্রী থাকলে এই চমৎকার জ্যোৎস্নাময় রাতে এই টুকটুকে মেয়েটিকে এখানে নিয়ে আসতে পারতেন না। নিয়ে আসাতো দূরের কথা, অন্য মেয়ে মানুষের সাথে সুন্দর করে কথা বললেও জীবন জাহান্নাম হয়ে যেত তার। এমনকি কোনো মেয়ে মানুষের মুখে যদি কবির কোনো গুণের কথা আসতো তাতেও কমপক্ষে সপ্তাহখানেক ঝগড়া-ঝাটি চলতো বাসায়। তার লেখা প্রেমের কবিতাগুলো ছিঁড়ে ফেলতো সে। বলতো, অন্য কাউকে নিয়ে লেখেছো। 
একবার কক্সবাজারে কবি সম্মেলনে গিয়েছিলেন কবি। সেলফোনের বদৌলতে ঘণ্টায় গড়ে তিন বার ফোন করতো তার স্ত্রী। হোটেল রুমে একা থাকলেও কবি পত্নীর সন্দেহের শেষ ছিল না। ফোন করেই বলতো তোমাদের সাথে ক’জন মহিলা কবি আছে? হোটেল কক্ষে মেয়ে মানুষের ফিসফিসানি শুনছি কেনো? ইত্যাদি ইত্যাদি। মোট কথা কবির স্ত্রীর ভালোবাসার প্রখরতা এত ছিল যে, তাতে কবি পুড়ে ছাড়খার হয়ে যাচ্ছিলেন। এক সময় অতিষ্ট হয়ে কবিকে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে হতো। আবার ফিরে আসতেন। ধৈয্যের চূত্যি ঘটলে তুঙ্গে উঠতো বাকবিতণ্ডা। কাঁচের জিনিসপত্র ভাঙা ভাঙির শব্দ বের হতো বাসা থেকে। তার স্ত্রীর কমন ডায়লগ ছিল, পুরুষত্বের বাহাদুরী করো না, এই বাহাদুরীর জন্যই একদিন তোমাকে কাঁদতে হবে। 
এসময় কবির লেখা যে কবিতাটি বন্ধু এবং ভক্ত মহলে হাসির খোড়াক জাগিয়েছিল তার শিরোনাম ছিল ‘স্বামী নির্যাতন’।  কবিতার প্রথম পঙক্তিটি ছিল এমন।
‘তোমার উরুতে চুম্বন করে শুধু মাংসের গন্ধ পাই হৃদয়ের গন্ধ পাই না।’ 
এবং শেষ অংশে কবি লিখেছিলন, ‘এই জীবনেই হয়তো আর একটি মিছিল দেখে যাব, যেখানে নারী নির্যাতন নয় স্বামী নির্যাতনের কথা বলা হবে।’ 
রাত গভীর। লক্ষ তারার আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘ আর মস্ত বড় একটা চাঁদ। সেই চাঁদের দগদগে জ্যোৎস্না তির্যকভাবে পড়ছে সুনসান ছাদের উপর। কবি ছাদের এক কোণে বসে তা অবলোকন করছেন আর একটা কিছু ভাবছেন। মেয়েটি একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে এসে দাঁড়ালো কবির ঠিক পেছনটায় এবং গুনগুন করে গাইতে লাগলো-
আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায় 
মনে পড়ে মোরে প্রিয়...
চাঁদ হয়ে রবো আকাশের গায়
বাতায়ন খুলে দিও।
কেমন লাগলো গানটি?
খুব ভালো। বিরহের গান সব সময়ই ভালো লাগে।
মিলন মানেই তো অপেক্ষামান বিরহ। যেমন জীবন মনেই মৃত্যু অসম্ভাবী। তারপরও জীবনতো জীবনই। তাইতো আজকের এই রাতটি আমার অনেক ভালো লাগছে। নিজেকে উজার করে দিতে ইচ্ছে করছে। আপনি তো কবি বলতে পারেন কেনো এমন লাগছে? 
এমন লাগার কারণ হলো এখন আকাশে পূর্ণ চাঁদ এবং লক্ষ কোটি তারা। তাদের আলো ঢাকার মত কালো মেঘ নেই। সে কারণেই চাঁদও তার সবটুকু আলো ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। প্রকৃতি রাখ-ঢাক পছন্দ করে না। রাখ-ঢাক যা করার আমরাই করি। প্রকৃতি করে না।
নোংরামিটাও তো আমরাই করি, তাই না?
হ্যাঁ, তাই। তবে কোনটা যে নোংরা আর কোনটা পরিষ্কার বলা মুশকিল। একই জিনিস একজন দেখে নাক সিটকায় আর আরেকজন তা নিয়ে অহঙ্কার করে। 
সেটা কেমন?
তাহলে একটা বিখ্যাত ঘটনা শোন। সেই সক্রেটিস প্লেটোদের আরো পরের কথা। গ্রীস তখন সভ্যতার উদাহরণ ছিল। সে সময়কার গ্রীসের এক চিত্রশিল্পী এক অষ্টাদশী তরুণীর ছবি এঁকে তা প্রদর্শন করলে চারিদিকে হৈচৈ পড়ে যায়। কারণ ছবিতে যে মেয়েটিকে আঁকা হয়েছে তার শরীরে একরত্তি বস্ত্র ছিল না। যাকে বলে বস্ত্রহীন এক অষ্টাদশি তরুণী। ধর্ম যাজকদের ঘুম হারাম করে ফেলেছিল ঐ চিত্রকর। তারা শিল্পীর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করলো, ঐ শিল্পী যুবতীর নোংরা ছবি এঁকে যুব সমাজকে পথভ্রষ্ট করছে। তারা শিল্পীর মৃত্যু দাবী করলো। শিল্পীকে যথারীতি আদালতে হাজির করা হলো। বিজ্ঞ বিচারক প্রশ্ন করলেন, আপনি যুবতীর নোংরা ছবি এঁকে তা প্রদর্শনের মাধ্যমে যুব সমাজকে পথভ্রষ্ট করেছেন। এ কারণে কেনো আপনাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে না?
শিল্পী দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বললেন, আমি কোনো নোংরা ছবিই আঁকিনি। আমি যদি কোনো নোংরা ছবি এঁকে থাকি এবং কেউ তা প্রমাণ করতে পারে তবে আপনি যে দণ্ডেই দণ্ডিত করুণ আমি তা মাথা পেতে নেবো। আমি আবারও বলছি, আমি নোংরা ছবি আঁকিনি।
এরপর বিচারকের নির্দেশে ছবিটি আদালতে আনা হল। উপস্থিত সবাই ছি ছি করতে শুরু করলো। আমাদের সমাজে পাপ-পঙ্কিলতার কথা শুনে মুনশী মৌলভীরা যেমন নাউজুবিল্লাহ নাউজুবিল্লাহ বলতে থাকেন তেমনি তখনকার সেই সমাজের ধর্মজাযকরা চোখ বন্ধ করে সেই ধরণের শব্দগুলো আওরাতে লাগলো। বিচারক বললেন, এই ছবিটি কে এঁকেছে?
আমি।
এটা কি নোংরা ছবি নয়?
না। আমি প্রমাণ করতে পারবো এটা নোংরা নয়।
প্রমাণ করুন।
আমি কি একটু রং এবং একটা তুলি পেতে পারি?
রংতুলি এনে শিল্পীকে দেয়া হলো। শিল্পী তখন বস্ত্রহীন অষ্টাদশী তরুণীর ডান পায়ে একটি মোজা এঁকে পা’টি ঢেকে দিয়ে বললেন, এখন তরুণীটি নোংরা হলো, এর আগে সে ছিল ঈশ্বর প্রদত্ত অপার মোহময় খোলা এক পবিত্র প্রকৃতি।
প্রকৃতির কিছু অংশ ঢেকে কিছু অংশ খুলে প্রদর্শন করলেই সেটা নোংরামি হয়। তাই নয় কি? 
কবি যখন ঘটনাটি বলছিলেন তখন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল কবির সামনের মেয়েটি। কবি যখন থামলেন মেয়েটি বললো, আপনি চমৎকার গল্প বলতে পারেন। 
না। এটা গল্প নয়। সত্য ঘটনা। 
সত্যি। 
হ্যাঁ, সত্যি। 
তা হলে এরপর বিচারক কি সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন?
মেয়েটির উৎকণ্ঠা দেখে কবি হাসলেন এবং বললেন, এরপর আমি আর জানি না।
মেয়েটি কবির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো, আমার তো মনে হয় বিচারক শিল্পীর যু্ক্তিকে গ্রহণ করেননি এবং তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন যেমনটি হয়েছিল সক্রেটিসের ক্ষেত্রে। আপনার দর্শনের সংগে বিচারকের সিদ্ধান্তের ভিন্নতার কারণেই আপনি তা বলছেন না। কি, ঠিক না?
না, ঠিক না। আমি সত্যিই এর পরের ঘটনা জানি না। জানলে বলতাম। আমি সচেতনভাবেই প্রকৃতির মত সত্যনিষ্ঠ থাকি। রাখ ঢাক করি না।
এই ঘটনার এটুকুই শুনেছিলাম আমাদের গ্রামের বাড়ির বড়ভাই মোজাফ্ফর ভাইয়ের কাছে। তখন আমি হাইস্কুলে পড়ি। ইংরেজি সাহিত্যে লেখাপড়া করা মোজাফ্ফর ভাই একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। স্বাধীনতা লাভের পর তিনি যখন পুরোদমে রাজনৈতিক নেতা হয়ে উঠলেন তখন কোনো এক রাজনৈতিক সভায় তার বক্তব্যে এই ঘটনাটি উল্লেখ করেছিলেন। আমি তাকে খুব পছন্দ করতাম। তার কথার মধ্যে জ্ঞান-গভীরতা ছিল এবং খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারতেন। তার মুখে এই ঘটনার এটুকু শুনেই আমি তৃপ্ত হয়েছিলাম। সম্ভবত এ কারণেই এরপর কি হলো তা আর জানার প্রয়োজন হয়নি। 
এখন তো জানতে পারেন?
তার আর সুযোগ নেই। ভিলেজ পলিটিক্সের এক চক্করে আজ থেকে তিন যুগ আগে মোজাফ্ফর ভাই খুন হয়েছেন। থাক সেব কথা। ঘটনাটি কেমন লাগলো বলো?
নিঃসন্দেহে হৃদয়স্পর্শী। তবে আমার প্রশ্ন আরেক জায়গায়। আমি যত দূর জানি কবি সাহিত্যিকরা আগোছালো এবং খুব মনভোলা ধরণের মানুষ হয়ে থাকে। তারপরও সেই ছোট্টবেলায় কবে কোথায় কার কাছে ঘটনাটি শুনেছিলেন তা আপনি হুবহু বর্ণনা করলেন, এটা কিভাবে সম্ভব? আমার তো ছেলেবেলার উল্লেখযোগ্য কোনো কথাই মনে নেই। বলতেই হবে আপনি অন্য কবিদের মত নন এবং আপনার স্মৃতিশক্তি প্রখর। বলতে পারেন, আমি কেনো মনে রাখতে পারি না? মনে রাখার জন্য আমাকে কি একটা টিপস দিবেন? 
মেয়েটির কথা শুনে কবি হাসলেন এবং কোনো কিছু না ভেবেই বললেন, ক্ষমাশীল হতে শিখতে হবে। ক্ষমাশীল মানুষের স্মৃতিশক্তি প্রখর হয়।
এর কারণ কি?
ক্ষমাশীল মানুষেরা কম স্বার্থপর হয়। এরা সবার কথা ভাবতে পারে, ভালোবাসতে পারে, ভালোবাসা পেতে পারে। আর ভালোবাসা দিয়ে যা দেখা হয় বা শেখা হয় তা স্মৃতিতে সারা জীবন গেঁথে থাকে। 
আচ্ছা কবি আপনি কি নিজেকে ক্ষমাশীল মনে করেন?
হ্যাঁ, আমি ক্ষমাশীল।
তা হলে তো আপনার স্ত্রীর কথা সবই মনে আছে, আছে না?
হ্যাঁ, আছে। 
আপনার স্ত্রী আপনাকে ছেড়ে চলে গেলো কেনো?
আমি ধরে রাখতে পারিনি বলে।
কেন, ধরে রাখতে পারেননি?
জানি না।
কখনও জানতে ইচ্ছা হয়নি?
হয়েছে। 
তখন কি মনে হয়েছে?
মনে হয়েছে সহজলভ্য জিনিসকে কেউ মূল্য দেয় না। আমরাও দেইনি।
তা হলে তো সবার স্ত্রীরাই অন্যের হাত ধরে বের হয়ে যেত, তাই কি হচ্ছে?
না, হচ্ছে না।
তা হলে আপনার বেলায় হলো কেনো?
বলতে পারবো না।
আমার মনে হচ্ছে আপনার স্ত্রীই শুধু আপনাকে ভালোবাসতো আপনি বাসতেন না। 
কথাটা ঠিক না।
তা হলে ঠিক কি বলুন।
ভালোবাসা এবং প্রত্যাশা দুটো জিনিস রাত ও দিনের মত। এক সঙ্গে মিশতে পারে না। ভালোবাসার কাছে কোনো প্রত্যাশা থাকতে নেই। ভালোবাসা প্রতিদান যা দেবার এমনিতেই দেয়। প্রত্যাশা যখন ভালোবাসার সামনে এসে দাঁড়ায় তখনই সৃষ্টি হয় সংঘাতের। আমার স্ত্রীর ক্ষেত্রে সম্ভবত সেটাই হয়েছিলো।

আপনি কি আপনার স্ত্রীকে এখনও ভালোবাসেন?
বাসি।
কতটুকু ভালোবাসেন?
গলা পর্যন্ত।
মানে?
গলা পর্যন্ত ভালোবাসায় ডুবে আছি আমি।
সে ডুবে আছে কতটুকু?
ঐ যে বললাম প্রত্যাশার বেড়াজাল থেকে বের হয়ে আসতে পারলে, ক্ষমাশীল হতে পারলেই তারও ভালোবাসা গলা অব্দি পূর্ণ হয়ে যাবে।
তারপর?
তারপর শুধুই প্রশান্তি, শুধুই ভালোবাসা।
সেতো আপনারই এক বন্ধুর সাথে লিভিং টুগেদার করছে। আর আপনি তার জন্যে অপেক্ষা করছেন। বুক বেঁধে বসে আছেন। ভাবছেন ফিরে আসবে সে। আপনার কি মনে হয় না যে প্রশান্তির কথা আপনি বলছেন তা আপনার স্ত্রী তার বর্তমান পার্টনারের কাছ থেকে পেয়ে গেছে। 
কথাটি শুনে কবি কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ। কবি যখন আর তার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার প্রয়োজন মনে করছিলেন না তখন মেয়েটি আবার প্রশ্ন করলো, আচ্ছা কবি, এরপরও যদি আপনার স্ত্রীকে আবার ফিরে পাবার সুযোগ আসে তবে আপনি তাকে গ্রহণ করতে পারবেন?
কবি এবার কিছু বলতে যেয়ে থেমে গেলেন। ডুবে গেলেন ভাবনার রাজ্যে। কী ভাবছেন কবি? ভালোবাসার তত্ত্ব কথা? নিজের জীবনের সেই অভিজ্ঞতার কঠিনতম প্রভাবের কথা? নাকি সেই তত্ত্বের বেড়াজাল থেকে বের হয়ে এসে ভাবতে শুরু করেছেন তার সামনে যে উদ্যত যৌবনের ২৪/২৫ বছরের সাহসী মেয়েটি রয়েছে যার যৌবনের স্রোতধারা হিরোশিমার অগ্নিস্ফুলিঙ্গকেও এক নিমেষে নিভিয়ে দিতে পারে তার কথা?
মেয়েটি এবার প্রশ্ন করলো, কবি আপনি কি কিছু ভাবছেন?
হ্যাঁ। 
আমি কি ধরে নিতে পারি এই মুহূর্তে আপনার কাছে আপনার স্ত্রী অতীত এবং আমি বর্তমান। এখন আপনি সেই কথাটিই ভাবতে শুরু করেছেন এবং আমাকে এমন কিছু বলতে চাইছেন যা শোনার জন্য বিনাবাক্যে আপনার সাথে এই নির্জন ছাদে চলে এসেছি।
হ্যাঁ, তাইতো। কি নাম যেন তোমার?
কাব্য।
বাহ্ চমৎকার নাম তো।
কবির মুখে চমৎকার কথাটি শুনে কাব্য হেসে উঠলো। কবি জিজ্ঞেস করলেন,
কি, হাসলে কেনো?
সন্ধ্যার পর থেকে একসঙ্গে, আর মধ্য রজনীতে নাম জিজ্ঞেস করলেন কিনা তাই।
সত্যি ভুল হয়ে গেছে। এতক্ষণ নস্টালজিয়ায় ডুবে ছিলাম তো তাই তোমাকে উপলব্ধি করতে পারিনি। তুমি কিছু মনে করো না।
এখন কি নস্টালজিয়া থেকে বের হয়ে এসেছেন?
হ্যাঁ। অনেকটা।
পুরোটা বের হবেন কখন?
এখনই।
কবি আপনি কি এতক্ষণ ক্লান্ত ছিলেন?
হ্যাঁ।
এখনও কি ক্লান্ত?
না।
আবার ক্লান্ত হবেন কখন?
না, স্মৃতি নিয়ে আর ঘাটাঘাটি করবো না।
সেটা কোনো বুদ্ধিমান মানুষের কাজও নয়। বুদ্ধিমান মানুষের জীবন শুরু হয় আজ থেকে এবং তা আগামীর দিকে অগ্রসর হয়। অতীত নিয়ে যারা বিহ্বল হয়ে থাকে তারা সামনের দিকে এগুতে পারে না। জীবনকে উপভোগ করতে পারে না।
তুমি ঠিকই বলেছো। আচ্ছা কাব্য তুমি যখন আমার সঙ্গে হাঁটতে চাইলে আমি বলেছিলাম, আমার সঙ্গে যাওয়া তোমার ঠিক হবে না। আমি এমন সব জায়গায় যাব যেখানেকার মানুষেরা তোমাকে টেঁনে হিঁচড়ে ছিঁড়ে ফেলতে পারে। তারপরও তুমি আমার সঙ্গে এলে, একটুও দুঃশ্চিন্তা করলে না, ভয় পেলে না, কেনো বলোতো?
আমি কোনো কিছুই নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করি না। ভয় পাই না। জীবনে যা কিছু ঘটার নিয়ম-মাফিকই ঘটবে। এ নিয়ে দুঃশিন্তা করে বা ভয় পেয়ে সময় নষ্ট করার কোনো অর্থই হয় না। আমি আমার এটুকু জীবনে যা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করেছি বা ভয় পেয়েছি তা কখনও ঘটেনি। অযথা অনেকগুলো মূল্যবান সময় নষ্ট করেছি, মাথার চুল ছিঁড়েছি। 
কবি কাব্যের এই কথাটি শুনে আশ্চর্য হলো এবং কিছু একটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলো। সম্ভবত আর একটি কবিতার প্লট পেয়ে গেলো সে। বললো, কাব্য তোমার সঙ্গে কথা বলে অনেক ভালো লেগেছে। এবার তুমি যাও আমি কিছুটা সময় একা থাকতে চাই।
কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গেই কাব্য উঠে দাঁড়ালো এবং কবির সামনে থেকে চলে গেলো। মনে হলো যাওয়ার জন্য কাব্য উদগ্রীব ছিল। কবি তাকে উঠতে দেখলেন তবে চেয়ে চেয়ে তার চলে যাওয়া অবলোকন করলেন না বরং উঠে এসে ছাদের পশ্চিম পাশের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। মনে পড়লো তারই লেখা একটি গানের কয়েকটি লাইন
যাবেই যদি যাও ফিরে এসো বলবো না
বাকি পথ চলবো একা কারো হাত ধরবো না।
সবাই চলে যায় থাকেনাতো কেউ 
থাকার জন্যে আসে না তো কেউ,

বিরহ ব্যথায় কেঁদেছে সবাই,

আমি আর কাঁদবো না।
এই চলে যাওয়া কাব্য আর কবির চিন্তায় প্রাধান্য বিস্তার করতে পারলো না। প্রধান্য পেলো এই গীতিকাব্যটি। কবির লেখা এই গীতিকাব্যটি সুর করেছিলেন প্রয়াত সংগীতজ্ঞ দেবু ভট্টাচার্য এবং কণ্ঠ দিয়েছিলেন উঠতি বয়সি কণ্ঠশিল্পী কাইয়ুম। দেবু ভট্টাচার্যের মৃত্যুমাসে তার বাসায় বসেই গানটি লিখেছিলেন কবি। দেবু ভট্টাচার্যকে সবাই দেবুদা বলে ডাকতো। তার বাসা ছিল মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের মেথর পট্টির পাশে এক স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় কমিশনার সেতুর বাড়ির নিচ তলায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দুর্দান্ত এই দেশ প্রেমিক পশ্চিম পাকিস্তান থেকে দাপটের সাথে দেশে ফিরে এসেছিলন ১৯৭২ সালে। সেখানে গজল সম্রাট মেহেদী হাসান, বাঙালী সুরকার আলতাফ মাহমুদদের নিয়ে ছিল তার জগৎ। পাকবাহিনীরা আলতাফ মাহমুদকে নৃশংশভাবে হত্যা করার পর তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। মেহদী হাসানের শত অনুরোধও তাকে তার এই ফিরে আসার সিদ্ধান্ত থেকে নড়াতে পারেনি। দেশে ফিরে সে তার সেই হারানো গৌরবময় দিন আর ফিরে পায়নি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ডিপুটি ডাইরেকটর হিসাবে চাকুরী পান। এক সময় অবসর নিলে তার পাশে শুধু দৈন্য ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। শেষ বয়সে মেথরপট্টি থেকে বাংলা মদ কিনে খেতেন। দেবু ভট্টাচার্যের এমন দুঃসময়ে তার সাথে কবির পরিচয়। কবি তখন উঠতি বয়সি তরতাজা এক তরুণ। দেবু ভট্টাচার্যের গীতিকার হিসাবে গান লিখতেন। এই গানটি সেই সময়কারই। ক্ষণজন্মা এই চিরকুমার সংগীতজ্ঞ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বড় অনাদরে মারা যান। তার এই পরিণতির সাথে কবি মধুসূদন দত্তের শেষ পরিণতির বেশ মিল ছিল। অবশ্য মৃত্যুর পর বাংলা একাডেমি তাকে একুশে পদকে ভূষিত করেছিল। দেবু ভট্টাচার্যের কথা মনে হতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল কবির। রেলিং ছেড়ে চলে এলেন আগের জায়গায়। 
কী আশ্চর্য! কাব্য চলে যায়নি। কবির বসার জায়গায় বসে আছে কাব্য। বসে আছে নির্ভেজাল প্রকৃতির মত। শরীরে কাপড়ের লেশমাত্র নেই। গ্রীসের সেই চিত্রকরের আঁকা ছবির মত। দগদগে জ্যোস্নায় জ্বলজ্বল করে জ্বলছে কাব্যের ফর্সা শরীর। কবি এসে বসলেন তার পায়ের কাছে। কাব্য প্রশ্ন করলো,
কে বেশী সুন্দর? আমি না জ্যোস্না?
কবি মেয়েটির পায়ের পাতা থেকে ধীরে ধীরে চোখ বুলাতে বুলাতে তার হাটু, উরু, নাভিমূল, বক্ষ, নাক, চোখ, চুল ছুঁয়ে আকাশের চাঁদাটায় দৃষ্টি স্থীর করলেন। লক্ষ করলেন জ্যোস্না মেয়েটিকে হার মানাতে পারছে না আবার জ্যোস্নাও হার মানছে না মেয়েটির কাছে। 
মেয়েটি আবার প্রশ্ন করলো,
বললে না কবি, কে বেশি সুন্দর? 

দুজনেই এখন নিখাঁদ প্রকৃতি। কাকে সুন্দর বলবে কবি! তারপরও কবির দুই চোখ মেয়েটির ফর্সা শরীরে আটকে রইলো। কবির মনে হল এই কিছুক্ষণ ধরে তাকিয়ে আছে সে। অথচ সময় নির্দেশ করলো তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ ধরে যেন কাব্যকে নিয়েই লিখছে সে নতুন একটা কবিতা। এক সময় দূর থেকে ভেসে আসা একটি কালো মেঘ ঢেকে দিলো চাঁদটিকে। ইরানী মেয়েদের মত ধবধবে ফর্সা কাব্যের দেহখানিও ঢাকা পড়লো কবির উদাম দেহের আড়ালে। এভাবে কতক্ষণ কে জানে। ওদিকে কালো মেঘের আড়াল থেকে চাঁদ আর বের হয়েছিল কিনা সেটা আর খেয়ালে এলো না। তারপর ক্লান্তি এবং গভীর নিদ্রা। যেন রণযুদ্ধে জয়ী এক ক্লান্ত বীর আত্মসমর্পণ করেছে ঘুমের কাছে। 
যখন ঘুম ভাঙলো কাব্য তখন আর কবির বুকের মধ্যে নেই। সেখানে পড়ে আছে একটি চিরকুট। তাতে লেখা আছে মাত্র চারটি বাক্যের একটি মহাকাব্য। 

‘প্রত্যাশার এই ছোট্ট বলয়টি অতিক্রম করতে পারলেন না কবি!
যে আগুনে অন্যেরা পুড়ে সে আগুনে আপনিও পুড়লেন!
আপনি আর দশজনের চেয়ে আলাদা কিছু নন। 
আপনাকে ভালোবাসা যায় না।’

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।