বিকাল ০৫:২৪ ; মঙ্গলবার ;  ১৫ অক্টোবর, ২০১৯  

প্রসঙ্গ তপন রায়চৌধুরী : মহাশয় পুরাণ || মিহির সেনগুপ্ত || পর্ব : তিন

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

পাঁচ.
কীর্তিপাশার জমিদার পরিবার ঠিক কোন পুরুষ থেকে ‘রায়চৌধুরী’ উপাধিটি ব্যবহার করতে শুরু করেন তার কোনও সঠিক হদিস পাইনি। তপন বাবু স্বয়ংও এই বিষয়টি নিয়ে রঙ্গই করেছেন। রোমন্থন অথবা ভীমরতি প্রাপ্তর পরচরিত চর্চা গ্রন্থে এ বিষয়ে সবিস্তার পাওয়া যাবে বলে, আমি আর চর্চিত চর্বণ করছি না। প্রসঙ্গত, একটা কথা বলা আবশ্যক যে বংশ মর্যাদাকে উচ্চস্থান দেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তপন বাবু কোনও কিংবদন্তিকে ইতিহাস বলে চালাতে চাননি। এ বিষয়ে তিনি অকপট সারল্যে এবং তাঁর স্বভাবেচিত সরস বাকরীতিতে যথাযথ মতামত প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি একটি দৈনিকে চিঠির মাধ্যমে তাঁর অনুজ জেঠতুতো ভাই শ্রী অশোক রায়চৌধুরী মশাই উল্লেখ করেছেন, “‘রায়চৌধুরী’ খেতাবটি বোধ হয় নবাবি আমলের নয়। ‘বাকলা’ গ্রন্থে আমাদের বাড়িটি ‘মজুমদার বাড়ি’ বলেই পরিচিত।” এটি যথার্থ খবর। বাকলায় আমিও এমন উল্লেখই দেখেছি। আরও একটি কথা অশোক বাবু তথ্য হিসেবে দিয়েছেন, “তাছাড়া অপর একটি প্রকাশিত গ্রন্থ ‘আমার পূর্বপুরুষ’-এ রোহিনী কুমার লিখেছেন, অর্থের বিনিময়ে সাহেবদের কাছ থেকে খেতাব অর্জন করতে এই পরিবার কখনই লালায়িত ছিল না।” এই খবরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে কী এরকম কোনও রটনা ছিল তখন?
‘আমার পূর্বপুরুষ’ বইটি পড়ার সৌভাগ্য আমার ঘটেনি। তবে বাকলায় প্রদত্ত জিনিয়ালজিতে কোনও বংশ পুরুষের নাম ‘রায়চৌধুরী’ পদবিযুক্ত নেই। দুএকজনের নামের সঙ্গে সেন পদবি আছে এবং বাকিরা প্রায় সবাই ওই উপাধি বা পদবি ব্যবহার করেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের দুএকজনের ‘রায়চৌধুরী’ উপাধি ব্যবহার দেখেছি, তার মধ্যে তপন বাবু এবং অশোকবাবুর নাম উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ছোট হিস্যার একজন বাল্যে আমার পরিচিত ছিল, আমারই সমবয়সী। মনে আছে, দেশে থাকতে, কিশোরকালে তার নাম জিজ্ঞেস করায় সে বলেছিল, ‘শুভঙ্কর রায়চৌধুরী’। রোহিনী কুমার ‘স্বয়ং সেন উপাধিই ব্যবহার করতেন। শুভঙ্কর যখন পুরো নামটা বলেছিল, তার উচ্চারণে বিলক্ষণ গর্বের প্রকাশ ছিল।
‘চৌধুরী’ শব্দটি এসেছে চতুর্ধারী কথাটি থেকে। রায়চৌধুরী শব্দযুগ্ম নবাব বাদসাহদের প্রদত্ত উপাধি, এমনই ধরা হয়। সাহেব আমলে এটি সম্ভবত, রায় বাহাদুর, রায় সাহেব, খান বাহাদুর, খান সাহেব ইত্যাদিতে রূপান্তরিত হয়। সাহেবেরা কাউকে রায়চৌধুরী উপাধি প্রদান করেছেন, এমন শুনিনি। চোরাগোপ্তা কিছু হয়েছে কিনা জানি না। চৌধুরী উপাধিটিতে চতুঃশক্তি (অশ্ব, পদাতি, গজ এবং রথ) সম্পন্ন সামন্ত থেকে কুলি, মেথর প্রভৃতিদের ‘প্রধান’ সকলকেই বোঝানো হয়ে থাকে। ‘রায়’ কথাটি মূলত এসেছে রাজা শব্দটির বিবর্তনে। রাজা-রাআ-রায়। এটিও নবাবী বদান্যতাজনিত উপাধি। ‘সেন’ শব্দেও জাতি নির্দেশক অর্থ পরবর্তীকালীন সংস্কারে এসেছে। মূলত, সম্ভবত সেটি কৌশিক পদবি ছিল না। অর্থ- প্রধান-বীর, শুর-অধিনায়ক-রাজা; ভূপ-সেনা, সৈন্য এবং সর্বশেষে জাতীয় উপাধি। জ্ঞানেন্দ্র মোহন এমত বলেছেন। সব ক্ষেত্রেই ঘোষণা যে আমি তোমার থেকে শ্রেষ্ঠ।
অর্থাৎ, এই শব্দসমূহে ‘রাজন্য’ বাচকতা বড় ব্যাপক। কিন্তু যে পরিমাণ মানুষ এইসব উপাধি ব্যবহার করে থাকেন, তাঁদের পূর্বজরা সবাই রাজন্য কুল প্রদীপ হলে, রাজত্বের ভূমি পরিসংখ্যানটা অসম্ভব সমস্যাসংকুল যে হবে, তাতে সন্দেহ নেই। তপন বাবু তাঁর রোমন্থনে, সে কারণেই বিষয়টিকে বিস্তারে না নিয়ে রঙ্গ করেই ছেড়ে দিয়েছেন। মোদ্দা কথাটা হল বংশ গৌরব প্রচার। অর্থাৎ আমি তোমার প্রভু শ্রেণীর।
আমার এ ব্যাপারে খানিকটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কথা তত্ত্বজিজ্ঞাসা আছে। আমাদের বরিশাল জেলার রায়চৌধুরীর সংখ্যা দেশে থাকতে যত না জেনেছি, পশ্চিমবঙ্গে এসে তার অনেকগুণ বেশি নজরে এসেছে। আমার এক দাদা বন্ধু, একদা আমাকে জানালেন, ‘তোমার গ্রামের বাড়ির এক ভদ্রলোক, তোমাকে দেখতে চান। তাঁরা এক প্রখ্যাত জমিদার পরিবার। ‘রায়চৌধুরী’ উপাধি। গ্রামে আমাদের জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে একটি ক্ষীয়মান প্রাচীন জমিদার পরিবার ছিল, তারা চৌধুরী বা সেন চৌধুরী উপাধি যুক্ত- রায়চৌধুরী নন। দেশে ওই বাড়িটি আমাদের স্থানীয় উচ্চারণে ‘চৌধুরী বাড়ি’ বলেই উল্লেখিত হত। আবার তাঁরা নামের সঙ্গে ‘সেন’ পদবিটিই ব্যবহার করতেন। পশ্চিমবঙ্গে এসে তাঁরা পরবর্তী কালে রায়চৌধুরী উপাধিই ব্যবহার করেন।
আমাদের অঞ্চলের একদার প্রখ্যাত বাসণ্ডার জমিদার বাড়ির কর্তাদের আমরা ‘সেন’ বলেই জানতাম। মহিলা কবি কামিনী রায় ওই বংশীয় চণ্ডীচরণ সেনের কন্যা। পশ্চিমবঙ্গে ওই পরিবারের অংশত দুজনের কাছে আমি সেন রায়চৌধুরী- এই উপাধিটি ব্যবহার করতে দেখেছি। বাস-ার ওই জমিদার পরিবারটি তপন বাবুদের এস্টেটে ‘মহলানবীশ’ ছিলেন। যেমন তপন বাবুদের পরিবার শিবনারায়ণ রায়দের রায়ের কাঠির এস্টেটের ‘মজুমদার’ ছিলেন। এক জমিদারির থেকে অন্য জমিদারির উদ্ভব সেই যুগের জমিদারিতন্ত্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। নায়েব কালক্রমে জমিদারির পত্তন করেছেন, উভয় বঙ্গে বা তদানীন্তন অখ- বঙ্গে এটা কিছুই অভিনব ব্যাপার ছিল না। আমার নিজের পূর্বপুরুষও বাসণ্ডার জমিদারির কর্মচারিত্ব সূত্রে পরে তালুকদার হয়েছিলেন।
আমার এই বিষয়টি নিয়ে অধিক অগ্রসর হবার ইচ্ছে নেই। আমি শুধু রায়চৌধুরীদের সংখ্যার প্রাচুর্য বিষয়ে আলোচনা করছিলাম। তপন বাবু যে কারণে এই বিষয়টির গভীরে যাননি, আমারও এরকম হঠাৎ করে থেমে যাওয়ার কারণ সেটিই। সব ইতিহাস স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা বুদ্ধির কাজ নয়। আমার যতদূর ধারণা তাতে বিশ্বাসটা একমাত্র রায়ের কাঠির ‘রাজারা’ই আমাদের ওই অঞ্চলে নবাবি সনদপ্রাপ্ত। আমাদের গ্রামের ‘চৌধুরী’দের জমিদারি বিষয়ে কিংবদন্তি বা লোকায়ত বিশ্বাস ছিল যে তাঁরা তাম্রপত্রে নবাবি সনদ লাভ করেছিলেন। আরও অনেক লোক-বিবরণ বাল্যে শুনেছি, সবগুলির উল্লেখের প্রয়োজন নেই। তবে তাঁদের প্রাসাদের ধ্বংসশেষ আমি দেখেছি এবং অন্তত একজন ‘দত্তক’ পুরুষ-সম্ভবত শেষ দত্তক পুত্রকে আমি দেখেছি। কিন্তু তিনি তখন অতিবৃদ্ধ, অন্ধ এবং ভিক্ষেজীবী, যদিও থাকতেন সেই ভগ্ন-প্রাসাদেরই একটি কক্ষে। আমার পিতৃদেবকে দেখেছিলাম তাঁর শেষ সৎকারের জন্য কীর্তি পাশার বাজারে (তপন বাবুদের) চাঁদা আদায় করতে। এঁদের জমিদারি বহুকাল আগেই নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। সরকার জমিদারি, তালুকদারি বাজেয়াপ্ত করণ আইন চালু করার বহু আগেই। তবে তাঁদের বিষয়ে কিংবদন্তি সবটা অনৈতিহাসিক নাও হতে পারে।
বঙ্কিমচন্দ্র ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসে লিখেছেন, ‘প্রতাপ জমীদার এবং প্রতাপ দস্যু। আমরা যে সময়কে কথা বলিতেছি, সে সময়ের অনেক জমীদারই দস্যু ছিলেন। ডারউইন বলেন, মানবজাতি বানরদিগের প্রৌপৌত্র। একথায় যদি কেহ রাগ না করিয়া থাকেন, তবে পূর্ব্ব পুরুষগণের এই অখ্যাতি শুনিয়া বোধ হয় কোন জমীদার আমাদের উপর রাগ করিবেন না।” বঙ্কিম কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের গুণগ্রাহীও ছিলেন। আমরাও যদি সেই পন্থা অনুসরণ না করি, তবে রবীন্দ্রনাথ এবং ইত্যাদি জমিদার বংশীয়দের হাতছাড়া করতে হয়। এবং অধুনাকালে আমাদের ভালবাসা ও শ্রদ্ধার মানুষ এই তপন বাবু প্রমুখদেরও।
সে যাহোক রায়চৌধুরী নিয়ে তত সমস্যা নেই, যতটা এ সময় জমিদার বাবুদের নিয়ে ছিল। কিন্তু সমস্যা যেটা এক্ষেত্রে ছিল, সেটা রয়েই গেল। তপন বাবুর বাপদাদারা কেউই রায়চৌধুরী উপাধিটা লিখিতভাবে ব্যবহার করলেন না। এমনকি তাঁর পিতৃদেবকে পর্যন্ত বরাবর আমরা ‘অমিয় স্যান’ নামে জানলাম, তপন বাবু খামকা কেন রায়চৌধুরী হতে গেলেন? আবার রোহিনী বাবুর যে দাবি অর্থাৎ “অর্থের বিনিময়ে সাহেবদের কাছ থেকে খেতাব অর্জন করতে এই পরিবার কখনোই লালায়িত ছিল না”, তা বেশ কথা। কিন্তু তাহলে খেতাবটি কোত্থেকে পেলেন? মুর্শিদ কুলি? না, আলিবর্দি? শুধু ‘বৈকুণ্ঠ নিবাস’ করেই কী ‘মহাত্মা কৃষ্ণরাম’কে তৎকালীন নবাব কোন্ নবাব? উপাধিটি দিলেন, না তাঁর অধস্তন ষষ্ঠ পুরুষ সেই নাবালক বাবু প্রসন্ন কুমার, সাহেবাশ্রয়ে প্রতিপালিত হবার সময় এটি কোনওক্রমে পাওয়া গিয়েছিল? সাহেবি জমানায় যদিও রায়চৌধুরী উপাধি পাওয়া যেত না বলে জনশ্রুতি, কিন্তু তৎকালীন বরিশাল জেলার তালুক মুলুকের কর্তাদের ওই উপাধি নবাবি আমলে পাওয়ার পক্ষে কিছুটা ভৌগোলিক সমস্যাও থাকে। সবস্থানের প-বির ইতিহাস নবাব বাদশাহের সময় পর্যন্ত টানা কিছুটা অসম্ভব। ভূভাগটার ভৌগোলিক গঠনটা নবীন। অবশ্য এই পর্যালোচনা দ্বারা আমি কোনওমতেই কোনও বক্র ইঙ্গিত করছি না। তপন বাবু বিষয়টি আরেকটু স্পষ্ট করলে, সুবিধে হত। তবে তাঁরও বিষয়টা স্পষ্ট করার প্রচেষ্টা কম ছিল না। যে কারণে, আমি এর সঠিক কারণ নির্দেশ করতে পারছি না, তিনিও সেই কারণেই ব্যাপারটি পারেননি। এ বিষয়ে রোহিনী সেন মশাই-ই খোলসা করে কোনও তথ্য অন্তত বাকলায় দেননি। সুতরাং সন্দেহটা তপন বাবুরও ছিল। তিনি অন্তত বংশ গৌরব জাহির করার কোনও চেষ্টা করেননি। তেমন মানসিকতাই তাঁর ছিল না।
প্রশ্নটি উত্থাপন করেছিলেন তপন বাবুদের গ্রাম কীর্তিপাশার পার্শ্ববর্তী গ্রামের জনৈক ভদ্রলোক। রোহিনী কুমার তাঁদের, তাঁর গ্রন্থে, স্থানীয় ‘রায়’ পরিবার বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর নাম শ্যামল রায়। তিনি বলেছিলেন, ‘তপন বাবুদের এই উপাধির কথা জমিদারি নথিপত্রে পাইনি কোথাও।’ ভদ্রলোক বিষয় সংক্রান্ত নথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেই বলেছিলেন।
তপন বাবু ‘রোমন্থন’ বইটিতে লিখেছেন, “নাবালক বাবু প্রসন্নকুমার সেন বেশ কয়েক পুরুষের জমিদার। সেই সুবাদে তস্য পুত্ররা রায়চৌধুরী পদবি ধারণ করলেন। তাতে আপত্তি করার কিছু নেই। শুধু উত্তর পুরুষের দুচারটে ছিটকে পাশ্চাত্যবাসী হবে একথা চিন্তা করে কাজটা না করলেও পারতেন।” এ ব্যাপারে তপন বাবুর যুক্তিটা মানতে পারলাম না। সাহেবদের উচ্চারণে অসুবিধে হয় বা লিখতে কলম ভাঙে বলে, আমাদের বাপদাদারা একটা জুৎসই পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না, এর কোনও হেতু নেই। উপনিবেশ শাসন কালে সাহেবেরা এস্তের এদেশীয় শব্দ ভুল উচ্চারণে অক্ষয় করে রেখে গেছেন, ‘রায়চৌধুরী’কেও না হয় ‘রয় চউড্রি’ উচ্চারণ করতেন। অথবা করেছেন কীনা সঠিক জানি না। সাহেবদের ভাষার শব্দ ভুল উচ্চারণ করলে আমাদের জাত যায় নিন্দা হয়, কতকিছু বদনাম শুনতে হয়, সায় অশিক্ষিত অভিধাটা পাকা হয়ে বসে। কিন্তু তাঁরা যখন ‘গঙ্গা’ শব্দটা গ্যাঞ্জেম বলে উচ্চারণ করেন বা বাংলাকে বেঙ্গল বা বেঙ্গলি, তখন সেই কদর্য উচ্চারণকে আমরা জাতীয় উচ্চারণ বলে পুরুষানুক্রমে পোক্ত করি। শুধু এই একদার অখ- বাংলায়ই তার জুরি ভরি নজির আছে।
এই সম্পর্কে একটি ঘটনা মনে পড়ল, ষাট সত্তরের কোনও একটা সময়, আমার কলকাতার কর্মস্থলে এক ভদ্রলোকের কাজ করে দিচ্ছিলাম। তাঁর নাম জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, ‘আমার নাম নিরাপদ বাইস্যাক।’ বাইসাক বা বাইস্যাকটা ঠিক কী ‘শাক’সেই প্রশ্নটা করায় ভদ্রলোক আমার উপর যারপরনাই ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। মনে আছে, বাইসাক উচ্চারণ করার সময় তিনি ঠোঁটটা অদ্ভুত কায়দায় বেঁকিয়ে ছিলেন এবং প্রভূত বিরক্তির সঙ্গে ‘বসাক’ শব্দটি উচ্চারণ করে আমাকে আপদমুক্ত করেছিলেন সেই নিরাপদ বাবু। সুতরাং এর দ্বারা আমার সিদ্ধান্ত এই যে প্রসন্নবাবু যদি কাজটা করেই থাকেন, খুব একটা খারাপ কাজ করেননি। তাঁর বংশ তিনি গৌরবান্বিত করবেন, তাতে কার বাপের কী? যাঁদের পছন্দ হয় তাঁরা তা ব্যবহার করবেন, পছন্দ যাঁদের না হয় তাঁরা তা করবেন না। আবার ইতিপূর্বে অর্থকরণ প্রসঙ্গে তো বলেছি ‘সেন’ শব্দটাও কতটা গৌরববাচক। তপন বাবু নিজেও জানতেন এই রোগটা এতদ্দেশীয়দের শুধু ‘সাহেবি রোগ’ নয়, এর প্রাচীনতর পরম্পরা ব্রাহ্মণ্য বর্ম তথা জাতি বিন্যাসে সুপ্রাচীন কাল থেকে প্রবাহিত এবং তপন বাবু তা বিলক্ষণ জানেন এবং তাঁর রচনায় তার আভাসও যথেষ্ট।
রায়, চৌধুরী, রায়চৌধুরীর প্রচলন কাল পাঠান, মোগল আমল। পার, সেন ইত্যাদি বংশীয়দের সময় ব্যাপারটা ছিল মোটামুটি ‘রাজা’ মহারাজা ইত্যাদি পদবিতে বাঁধা। সাহেবি আমলে হল, এইসব শব্দগুলোর উত্তর পদ হিসেবে ‘সাহেব’ শব্দটি সংযুক্তি করণে। তখন রায় সাহেব, চৌধুরী সাহেব, খান সাহেব ইত্যাদির চল হল, বা রায় বাহাদুর, খান বাহাদুর, রাজা বাহাদুর ইত্যাদির। তবে সর্বক্ষেত্রে তাৎপর্যগতভাবে এসবের নির্গলিতার্থ তপন বাবুর উদাহরণে স্পষ্ট, ‘পিদারম সুলতান বুদ।’ বরিশালি বচনে, ‘খানদানের বেয়াকেই ছোলতান।’ অর্থাৎ যে কথা আগে বলেছি, ‘আমার খানদান বহুত উচা খানদান।’
এতো না হয় বংশ বা খানদানের রাজকীয়তার বৃত্তান্ত গেল। প্রসঙ্গত তো বাঙালির জাতি বিষয়ক উচ্চ নীচতার সমস্যাটাও আসে। সেক্ষেত্রে তো আমরা অথৈ পাথারে। আজ একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে দাঁড়িয়েও বাঙালি জাত পাতের মধ্যে প্রায় একশ ভাগ ‘জাতের’ মানুষের দাবি যে তারা অতি উচ্চশ্রেণীর ব্রাহ্মণ বংশে জাত। অথবা শেখ, সৈয়দ। ওই একই ব্যাপার, অর্থাৎ ‘পিদারম সুলতান বুদ’ বা অমুক ঋষি আমাদের পূর্বপুরুষ। সন্ধিৎসু অধিকাংশ মানুষই জানেন বাঙালির (অন্য ভারতীয়দের কথা জানি না) ‘জাত’ নির্মাণ কীভাবে ঘটেছিল, তথাকথিত নীচজাত থেকে উচ্চজাতে উত্তরণের উপায় মূলত কী, কুলজি গ্রন্থগুলো কতটা গাঁজা খেয়ে রচিত হয়েছিল এবং প্রকৃতপক্ষে বাঙালি হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ইত্যাদিদের শরীরে কতটা আর্য তথা অন্য রক্ত প্রবাহিত। কিন্তু তাতে কী? জাত ধর্মের কাজিয়ায় তাতে কিছু ইতর বিশেষ হয় না। আবার এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহাশক্তিশালী ধর্ম। তপন বাবু তাঁর গোটা জীবনকাল জাত, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদির বিরুদ্ধে কলম চালিয়েছেন। তাঁর পরম সুকৃতি যে তিনি বেঁচে থাকাকালে সাম্প্রতিক ‘ওয়াপসি’ বা স্বগৃহে ফেরার এই সাম্প্রতিক মহতী হিন্দুত্ব আন্দোলনটি শুরু হয়নি। ‘রায়চৌধুরী’ উপাধি নিয়ে তাঁর রসুরসপূর্ণ পরিচরিত চর্চা সেই মর্মেও স্মরণযোগ্য তথা চর্চাযোগ্যও।

ছয়.
গত বছরেও এই সময়টাতে তাঁর চার নম্বর কেয়ালোর বাসায় বসে আড্ডা মেরে এসেছি। তাঁর সঙ্গে পরিচয় হবার পর, এটা একটা বাৎসরিক নির্ঘন্ট তথা কর্তব্যের মধ্যে ছিল। কারণ, প্রতিবছর শীতটা তিনি আর হাসিদি, তাঁদের কোলকাতার এই বাসায়ই কাটাতেন। নভেম্বর মাস শুরুর এক আধদিন আগে পরে আসতেন, যেতে যেতে সেই মার্চ মাসের চার থেকে আট তারিখ। এরই মাঝে একমাত্র মেয়ে খুকু বা সুকন্যার কাছে পনের বিশদিন কাটিয়ে আসতেন মেয়ে, জামাই, নাতনির সাহচর্য উপভোগ করে। ওঁরা থাকেন জাপানে। সেখানে তপন বাবুর সবচাইতে বড় আকর্ষণ তাঁর নাতনি লীলালক্ষ্মী বিঘ্নরাজা। বাঙাল নামার শেষ প্যারায় লিখেছেন, “মৃত্যু, মৃত্যু, মৃত্যু। আমার চারপাশে যে দিকে তাকাই শুধু মৃত্যুই চোখে পড়ে। বুঝতে পারি, নিজের মৃত্যুও আর খুব দূরে নয়। মৃত্যু চিন্তার আলোয় পৃথিবীটাকে অপরিচিত মনে হয়। সব আশা-আকাঙ্ক্ষা, ব্যর্থতাবোধ অবান্তর হয়ে যায়। মনে হয় আর অল্পদিন পরে এইসব আশা নিরাশা ভালমন্দ বিচার কিছুরই আর অর্থ থাকবে না। হঠাৎ মন কিছু বড় প্রিয় বড় মূল্যবান হয়ে ওঠে। চেতনালুপ্ত হয়ে যাবে, এই রূপরস শব্দ গন্ধের বর্ণময় জগৎ আমার নাগালের বাইরে চলে যাবে- এই চিন্তা মনে একটা বিষণœতার আবরণ টেনে দেয়। আমার চেতনার জগতে লীলালক্ষ্মী থাকবে না, কারণ সেই জগৎটাই বিনষ্ট হয়ে যাবে। মৃত্যুর আর সব পরিণাম মেনে নিতে পারি, শুধু ওই অবর্ণনীয় ভালোবাসার পাত্রী ছোট্ট মানুষটি আমার বিনষ্ট চেতনার বাইরে চলে যাবে এই সত্য মেনে নেবার শক্তি কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।”
অন্যত্র একটি স্থানে বলেছেন, “আমার জীবনে সবচেয়ে স্মরণীয় দিন ১ লা সেপ্টেম্বর, ১৯৯৮। সেদিন দেবতারা স্বর্গ থেকে পুষ্পবৃষ্টি করলেন। দেবদুতরা লম্বা লম্বা ভেঁপু বাজালেন, দ্যুলোক-ভুলোক এক স্বর্গীয় আলোকে প্লাবিত হল। যিনি সেই শুভদিন শুভক্ষণে ভূমিষ্ঠা হলেন তাঁর নাম লীলালক্ষ্মী বিঘ্নরাজা। তাঁকে দর্শন করে আমার চতুর্বর্গ লাভ হল।”
গত বছরও লীলালক্ষ্মীর বিষয়ে নানান সুখকর গল্প করেছেন। একটা আফসোস ছিল। জামাতার চাকরির কারণে, তাঁদের আজ ম্যানিলা, কাল জাপানে দৌড়োদৌড়ি। বলেছিলেন, ‘বেড়ানো আমাদের দুজনেরই প্রিয়। কিন্তু আফসসটা তো নিয়ত সাহচর্যের। দিনগুলো যেন বড় দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তাছাড়া, বয়স হয়ে যাওয়াটা যে কী অনিচ্ছার ব্যাপার। এমতকথায় মাধুর্যটি আরও যেন কাছের হয়ে যান। 
গত বছরের এই সময়টার পর তাঁর সঙ্গে আর প্রত্যক্ষ যোগ সম্ভব হয়নি। এবারে যে আসতে পারবেন না সেটা শেষ দেখা হওয়ার দিনও জানা ছিল না। হাসিদি বলেছিলেন, তাঁর বোধহয় আর আসা সম্ভব হবে না। বলেছিলেন, শরীর আর দিচ্ছে না। তপন বাবু বলেছিলেন, তিনি একা আসলেও আসবেন। তারপর আর সামনাসামনি কথা হয়নি। সবই বন্ধুবান্ধব মারফত অথবা টেলিফোনে। পর পর দুবার বাথরুমে পড়ে গিয়ে, হাড় ভেঙে, হাসিদির এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল যে নিজের অসুস্থতাসত্ত্বেও তপনদাকে তড়িঘড়ি এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সোজা বিলেতের হাসপাতালে পাড়ি দিতে হল। হাসিদি তপনদার চাইতে বছর পাঁচেকের বড়। সেখানে বেশ কিছুদিন চিকিৎসায় থেকে তিনি যদি খানিকটা সুস্থ হলেন, তপনদা পড়লেন। সরাসরি যোগাযোগ নেই। আত্মীয়বন্ধুদের মাধ্যমে মাঝে মাঝে খবর পাই। সেসব খবর মর্মান্তিক। ওরকম একজন তুখোড় গপ্পোবাজ, সুরসিক মানুষ একটা সময় নাকি একেবারেই নির্বাক। সেরিব্রাল সমস্যায় নাকি তাঁর ওই দুর্ধর্ষ চিন্তন প্রক্রিয়াটাই স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পথে। ওই মাপের একজন মানুষের এভাবে বেঁচে থাকার নিরর্থকতা এবং প্রায় উদ্ভিজসদৃশ অজ্ঞের মানসিক অবস্থা ভোগ করার করুণতা মেনে নিতে পারিনি। তথাপি এমন ভাবিনি যে এর চাইতে তিনি এবার সসম্মানে বিদায় নিন।
তপনদার গ্রামের বাড়ি এবং আমার দেশের বাড়ি পাশাপাশি গ্রামে। সেটা একদা ছিল বরিশাল জেলার অন্তর্গত। বর্তমানে জেলা পুনর্গঠিত হয়ে ঝালকাঠিতে পড়েছে। ১৯৯৩ এর আগে তপনদার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেনি। তারপর থেকেই তাঁরা স্বামী স্ত্রী দুজনেই আমার খুব কাছের মানুষ ছিলেন।
কথাটা ‘কাছের মানুষ ছিলেন’ এমনটা লিখতে কলমটা সরছিল না। মনে পড়ে, এই তো সেদিন ১৯৯৫ এর মার্চে, অকসফোর্ড ফিরে যাবার কয়েকদিন আগেই নিজেদের আগ্রহেই আমার এই ভদেশ্বরের বাড়িতে তাঁরা একরাত থেকে গেলেন। তার পর থেকে সব সময়ই তো ‘তিনি’, ‘তাঁরা’ আছেন, এই বোধটাই অভ্যস্ততায় আছে, কাছের মানুষ হিসেবেই। সেটাকে ‘ছিলেন’ কীভাবে করি? সুতরাং তিনি ‘আছেন’, এটাকেই ধ্রুব করে রাখা ভাল। একথা সত্য যে ধ্রুব বা শাশ্বত বলে সৃষ্টিতে কিছু থাকে না। তবু আমরা নিয়ত কতকিছুকেই তো ধ্রুব বলে মনে করি। এক্ষেত্রে না হয় তাঁর ‘আছেন’ ব্যাপারটা আমরা ধ্রুব বলে ধরেই নিলাম। এই এতক্ষণ তাঁর বিষয়ে নানান কথা যে বললাম, তার কারণ তো এই যে আমাদের কাছে তপনদা ভীষণভাবে অস্তিত্ববান। তবে, কথা হচ্ছে, তিনি কলকাতায় এবার আসেননি এবং আর কোনও দিন আসবেনও না। তা না আসুন। তার অর্থ তো আর ‘না-থাকা’ নয়। ধরে নেওয়া যাক, তিনি কলকাতার উপর রাগ করেছেন। কত লোকই তো এরকম রাগ করে কলকাতায় আসেন না। সে কথা থাক।
আমার সমস্যা এই যে আমি কোনও অর্থেই একজন সারস্বত মনুষ্য নই। যাঁরা তপনদার সারস্বত সহচর তথা শিষ্য, তাঁরা আজ তাঁকে নিয়ে নানাভাবে বলছেন, লিখছেন। আমার সে রকম কোনও পুঁজিপাটা নেই। সেই পরচরিত চর্চার আসল থেকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, যে পরিচয়ের সূত্র আমার একখানি চিঠি। আমার সারস্বত কর্মের মধ্যে শুধু ওই। তার কিছু বিস্তার পরবর্তীকালে ঘটেছে। তাতে বড়জোর নিজেকে একলব্য বলে পরিচয় দিতে পারি। বাকিটা সবই ব্যাপক অর্থে পরচরিত চর্চা।
তিনিও বাঙাল, আম্মো বাঙাল। স্বভাবতভাবে তাই উভয়েই আড্ডা-রঙ্গ-রসকরা, তৎসহ সমাজের গায়ে চিমটিটা খামচিটা দেওয়া জীবনের অন্যতর মহতী কর্তব্য বোধেই পছন্দ করি। এ কালে ঠাকুর রামকেষ্ট বেঁচে নেই, থুক্কুরি- দেহে নেই। পরম আড্ডাময় সেই পরম ভাগবত বেঁচে থাকলে, আমাদের আড়ম্বর করে তাঁর আড্ডাখানায় নিয়ে সম্মানজনক আসন দিতেন। অথবা আমরা নিজেরাই যেতাম- আড্ডাবাজেরা যেমন করে। সেই ১৯৯৫ এ যেমনটি আমাদের হয়েছিল। সুপ্রিয় সেতনামে এক ভদ্রলোক দেশভাগ বিষয়ে একটি ডকু-ছবি দেখাবার আমন্ত্রণ করেছিলেন। সুপ্রিয় এক অর্থে আমার কাজিন-ফ্রেন্ড। তাঁকে বলে কয়ে তপনদা, সমীরদা (সমীর দাশগুপ্ত-শিল্পী) এবং ইলিয়াসদাকে নিয়ে গিয়েছিলাম নন্দনে। চা-কফির বন্দোবস্ত ছিল এবং তৎসহ ছবি দেখা, তৎপর আড্ডা। তেহিনো দিবসা গতা। বলতে চাইছিলাম, আড্ডার গন্ধে আড্ডাবাজেরা কী না করে। কিভাবে কিভাবে যে এসে সব জুটে যায়, তা সেবার দেখেছিলাম। তপনদা আমার আড্ডাবাজ বাছাই এর অশিক্ষিত পটুত্ব দেখে বলেছিলেন, ‘বড় দেরী করে জন্মেছ বৎস।’ তা আর কী করা যাবে। বলেছিলাম, ‘আপনাদের মত পারব কী করে বলুন? আপনারা সব মহদালয় ব্যক্তি, কেমন উনবিংশ শতকীয় মনীষীদের অনুসরণে সবাই অতি-অল্প বয়সে জন্মগ্রহণ করেছেন।’
আসলে আমার ‘তপনদা-চর্চা’ এই ধারায়ই একদা শুরু হয়েছিল। তারপর থেকে তাঁর সঙ্গে আহারে বিহারে, সম্ভাষণকালে- তা আর পাল্টায়নি। এমনকি এই সময়টিতে যখন সবাই ভাবছে তাঁর একটা গুরুগম্ভীর অবিচুয়ারি লেখা হোক, আমি সুবিধে করতে পারছি না। আমার পক্ষে তা একেবারেই সম্ভব নয়। অন্যরাও যে সুবিধে করতে পারবেন। এমনও ভাবতে পারছি না- চাইছিও না বোধ হয়। তাঁরা বরং সারস্বত বিষয়ে গুরুগম্ভীর কথা তৎসহ দোশ্রিত কিছু সরস স্মৃতি রোমন্থন করুন। সে সবেরও তো অসদ্ভাব নেই। “তিনি এত সালে জন্মে এত সালে প্রয়াত হয়েছেন” ইত্যাকার বৃত্তান্তটা না হয় তাঁর ক্ষেত্রে উহ্য থাকুক। তাঁর বিষয়ে আলোচনা হবে, অথচ তার মধ্যে রসধিক্য থাকবে না- এটা ভাবা যায় না। তবে সে রসে গ্যাঁজমা ওঠানোর কথা অংশগ্রহণকারীরা ভ্রুণাক্ষরেও ভাবতে পারতেন না, তা তার বিষয়বস্তু, শব্দবন্ধ, বাক্যবন্ধ যাই হোক। এই ক্ষমতাটা যেমন তাঁর নিজের ক্ষেত্রে সহজাত ছিল, অংশগ্রহণকারীরা যে যে স্তরেই হোক না কেন, নিজেদের অজান্তেই যেন সেভাবে চালিত হতে বাধ্য হতেন। রুচি ব্যাপারটাকে অন্যের মধ্যে চালান করে দিতে তাঁর সমতুল কাউকে দেখিনি। কথাটা ইলিয়াসদা পরে একদিন একটা চিঠিতে আমাকে লিখেছিলেন। লিখেছিলেন, ‘তুমি আমাকে তপন রায়চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে একটা বড় উপকার করেছ। আমি তোমার কাছে এজন্য কৃতজ্ঞ। বেশ মানুষটি।’ ইলিয়াসদা স্বয়ং কতটা রসিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তাঁর পরিচয়, যাঁরা তাঁর সঙ্গে পরিচিত সবাই জানেন। রুচি ব্যাপারটা, বিশেষ করে অন্যের মধ্যে তা প্রবিষ্ট করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাটা তপনদার যে কী অসাধারণ সেটি ইলিয়াস ওই একদিনের আড্ডায়ই বুঝেছিলেন। তখনও ইলিয়াস অসুস্থ হননি। পরের বছর যখন তিনি সেই মারণ রোগে একখানা পা হারিয়ে কলকাতায় শয্যাশায়ী, আমাকে বলেছিলেন, ‘উনিতো এই সময়টাতেই এখানে আসেন। এবারে এসেছেন কী?’ তপনদা তখন এখানে এসেছেন। কিন্তু আকাক্সক্ষা থাকলেও ইলিয়াসদার উপায় ছিল না, তাঁর সঙ্গে দেখা করার।
এই প্রসঙ্গে একটি স্মৃতির উল্লেখ করছি। সম্ভবত, আমার ইলিয়াসের স্মৃতি-চারণা ‘অন্তরঙ্গ ইলিয়াস’ রেখাটিতে প্রসঙ্গটির খানিক উল্লেখ আছে। ওই বছরই ১৯৯৬ (সম্ভবত সালটা তাই ছিল) এ তপনদা একদিন সন্ধ্যে রাতে টেলিফোনে আমাকে নির্দেশ দিলেন, ‘শোনো, আমি কাল মেয়ের কাছে চলে যাব, হাসিসহ। তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ থেকে আনিস অর্থাৎ আনিসুজ্জামান এসেছেন। তোমার ওই বন্ধুটি, যে অসুস্থ, ও এবার আনন্দ-পুরষ্কার পাচ্ছে। আনিস বলছিলেন, সেটাও নিতে চাইছে না। আনিস পিয়ারলেস ইন এ উঠেছেন। কাল বিকেল চারটায় চলে যাবেন। তুমি তাঁর সঙ্গে দেখা করে কথা বল। ও চাইছেন, তোমার বন্ধু (ইলিয়াস) পুরস্কারটা নিক। আমিও চাই। বইটা (খোয়াবনামা) আমি পড়েছি। চমৎকার কাজ। বন্ধুকে বল, পাগলামি না করতে। টাকাটা তো এখন দরকার।’ আমার অন্য আরেক বন্ধু তরুণ পাইনকে নিয়ে আমি ইলিয়াসদার সঙ্গে প্রায় মল্লযুদ্ধ করেছিলাম পুরস্কারটা গ্রহণ করতে। আনিসুজ্জামান আরও অনেককেই বলেছিলেন। তপনদাই বলেছিলেন, শ্রীপান্থকে ইলিয়াসদার কাছে পাঠাতে। তিনিই সম্ভবত সর্বশেষে সফলকাম হয়েছিলেন। বাকিটা সবাই জানেন। আমি বলছিলাম, তপনদার এই মানবিক দায়িত্বটা পালনের স্বতঃস্ফূর্ততার কথা। মাত্র একদিনের আলাপ! ব্যাপারটা নিয়ে ইলিয়াসদার সঙ্গে আর কথা বলার সুযোগ হয়নি। আমার তপনদার তুল্য তো দূরস্থান, তার কাছাকাছিও স্মৃতি ক্ষমতা নেই তদুপায় এখনতো আবার বাউত্তুরের ধকলের দরজায়। সুতরাং স্মৃতির বিবরণ ধারাবাহিকভাবে, শৃঙ্খলা সহদেব, এমন সম্ভাবনাও নেই। ফলে, আমার বিবরণ যেমন ধারায় চলছে, এরকম খাপছাড়া, এলোমেলোই হবে। অর্থাৎ যে আলোচনা করব, তেমন পড়াশোনা, তথ্যতত্ত্ব বা কোনও রকম পুঁজিপাটা নেই। এই কাঁদুনিটা বারবার আইড়ে একটি এড়াতে চাইছি বটে, কিন্তু তাতে পাঠক ভুলবেন না নিশ্চয়ই। তবে মনে একটা ভরসা আছে, পাঠককে মধ্যে যাঁরা বরিশালিয়া, তাঁরা জঙলা শাকপাতাও দিব্য গিলে নেন, এমন প্রসিদ্ধি আছে। আশা করি তাঁরা আমার এ বস্তুও গিলবেন। (চলবে)

 

পর্ব-২ পড়তে ক্লিক করুন

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।