বিকাল ০৫:০৯ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৩ মে, ২০১৯  

ভারতীয় সিরিয়াল ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি

প্রকাশিত:

মুহাম্মাদ রেজাউল করিম॥


এরিষ্টটলের রাষ্ট্র দর্শন মতে প্রত্যেক পরিবারই একটি রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রে রাজা-প্রজা সবই আছে। আছে রাষ্ট্র চালানোর আইন ও বিধি বিধান। কিন্তু সেই রাষ্ট্রের দিদি-বৌদিদের আছে এক ব্যাধি যা এইডস কিংবা ইবোলার চেয়েও মারাত্মক। আজকের এই কথাগুলো তাদের জন্য বলছি, যারা মূলত এই কঠিন গোপন রোগে আক্রান্ত। কঠিন রোগ সর্বদাই গোপন থাকে। যেমন, মানুষের দেহে এইচআইভি ভাইরাস ১২-২৪ বছর নিরবে থাকতে পারে তারপর সেটা এইডস রূপে প্রকাশ পায়।

ক্যান্সারের ভাইরাস দেহে পাঁচ থেকে ছয় বছর নিভৃতে বসবাস করে কিন্তু যখন সেটা ক্যান্সার রূপে প্রকাশ পায় তখন চিকিৎসা দিয়ে ভাল করা দূরহ হয়ে ওঠে। অথচ দিনের পর দিন মানুষ সেই রোগটিকে নিজের দেহে বয়ে বেড়াচ্ছে কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারেনা আর যখন বুঝতে পারে তখন আর সময় থাকেনা। সুতরাং শুধু রোগ নির্ণয় করলেই হবেনা, চাই সঠিক সময়ে সঠিক রোগের চিকিৎসা। অনেক রোগই নিভৃতচারী কিন্তু এর প্রকাশিত রূপ বড় ভয়াবহ। আমাদের রাষ্ট্রের দিদি-বৌদি, মাসি-পিসিদের সেই মারাত্মক রোগের নাম হলো সিরিয়াল আসক্তি মানে ভারতীয় সিরিয়াল আসক্তি।

এটা এমনই এক আসক্তি যা না দেখলে দিদি-বৌদিদের সংসারের কাজ হয় না, মন উরুউরু করে, অস্থির-অস্থির লাগে, নিজের সম্পূর্ণ দিনটাই অসমাপ্ত মনে হয়। এটা এক ধরণের ছোঁয়াচে রোগ, যা এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে, এক ঘর থেকে অন্য ঘরে ছড়ায়। দিদি-বৌদিরা যে নিজেরাই এ রোগে আক্রান্ত শুধু তাই নয়, তারা তাদের শিশুদেরও এই মূল্যবোধে দীক্ষিত করছেন। ঘরের সবাই মিলে, এমনকি বাসার কাজের বুয়ারাও অন্যকিছু হোক বা না হোক এই বিনোদন থেকে বঞ্চিত হন না। অন্যকিছুতে অধিকার থাক বা না থাক সিরিয়াল দেখার অধিকার আছে সবার। আমাদের সংসার সমেত রাষ্ট্রে এই হলো নীতির হালচাল।

বিশ্বায়নের যুগে সৃষ্টি হয়েছে মুক্ত বাজার অর্থনীতি অর্থাৎ বর্ডার লেস মার্কেট। আর সেই নীতিতে নিষ্পেষিত হচ্ছে বাংলাদেশের মত দরিদ্র দেশ। এখন ভারতীয় সিরিয়াল আর কোনও বিনোদনের খোরাক নয়, এটি এখন পণ্য। শুধু পণ্যই নয়, এটি রমরমা একটি ব্যবসার নাম যা বাংলার গন্ডমূখ্যরা বুঝতে পারেনা। এখন প্রশ্ন হলো ভারতীয় সিরিয়াল কি শুধুই বিনোদনের খোরাক নাকি পণ্য? আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি এগুলো কখনও বিনোদনের খোরাক নয় এটি পণ্য। কারণ, আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন যখনই ভারতীয় সিরিয়ালের যেই চরিত্রটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, ঐ চরিত্রটি যেই পোশাক, যেই অর্নামেন্টস পরে অভিনয় করে সেই পোশাক, সেই অর্নামেন্টসগুলোই তখন আমাদের মার্কেটে পাওয়া যায়। যেমন: আনারকলি, মাসাক্কালি, সানিয়ামির্জা, ঝিলিক, আশকারা, খুশি, প্রতিজ্ঞা, পাখি নামক ড্রেসে বাংলাদেশের বাজার ছেয়ে গেছে। সর্বস্তরে এদের প্রচুর চাহিদাও রয়েছে। এখন খুব কম সংখ্যক মানুষ আছেন যারা সেলওয়ার কামিজ কিংবা দেশীয় শাড়ি কেনেন। অনেকে আবার বেশি বিক্রিয় জন্য দোকানের নাম দিয়েছেন স্টার প্লাস কিংবা জি বাংলা। এতে করে ফুলে ফেপে আস্ত দানব হচ্ছে অন্য দেশ আর আমরা নিতান্তই মুমূর্ষু হয়ে পড়ছি।

আমাদের দেশীয় ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য বিক্রি না হওয়ায় হারাচ্ছেন দেশীয় পণ্য তৈরিতে মনোযোগ এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। অন্যদিকে বিদেশী পণ্যের তোড়জোড়ে ঢাকা পড়ছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও সত্ত্বা। একদিকে ভারতীয় সিরিয়ালের আগ্রাসনী কলাকৌশল বুঝতে না পারা অন্যদিকে আমাদের দেশপ্রেমের ঘাটতি এই দুইয়ের স্বমন্বয়ে আমরা দিন দিন হারিয়ে ফেলছি আমাদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ। বিজাতি সংস্কৃতি এখন আমাদের মাথার উপর সাপের বিষ ফেনা ঢালছে। মাথা বেয়ে সে বিষ যখন মুখে এসে পড়বে তখনই মৃত্যু অবধারিত। সে মৃত্যু আমাদের দৈহিক নয়, সে মৃত্যু নৈতিকতার, সে মৃত্যু মানসিতার, সে মৃত্যু আত্মিক, সে মৃত্যু বাংলাদেশি সত্তার। আর একটি জাতিকে ধ্বংস করা মানেই হলো তার সংস্কৃতি, কৃষ্টি কালচারকে ধ্বংস করার পূর্বশর্ত। সৃষ্টির আদি লগ্নে মানুষ তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধ করেছে খাদ্যের জন্য। খাদ্য চাহিদা নিবারণ হওয়ার পর মানুষ যুদ্ধ করল ভূখন্ডের জন্য অর্থাৎ রাষ্ট্রের জন্য। সেই চাহিদা নিবারিত হওয়ার পর মানুষ এখন যুদ্ধ করছে আধিপত্য, অর্থ আর সম্পদের জন্য। সে সময় যুদ্ধ হতো সরাসরি আর এখন যুদ্ধ হয় কৌশলে, কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায়। এখনকার যুদ্ধের নাম হলো মেধার লড়াই, বুদ্ধির মাইর। অতঃপর এটাতো আমরা বুঝতে পারলাম যে, ভারতীয় সিরিয়াল কোনও বিনোদনের খোরাক নয়, এটি এক প্রকার পণ্য।

তাহলে আমরা এসব কেন দেখছি? এই প্রশ্নটার উত্তর খোঁজা প্রয়োজন। বাংলাদেশী চ্যানেলের অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন বিরতির কারণে অনেক দর্শকই বাংলাদেশি নাটক দেখার প্রতি তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এটা একটা কারণ হতে পারে। অন্যত্র ভারতীয় সিরিয়ালে অতিরঞ্জিত সাজসজ্জা, পোশাক পরিচ্ছেদের ব্যবহার অনেককে আকর্ষণ করে। সেখানে বিজ্ঞাপনের অত্যাচার কম। কিন্তু তাদের পুরো সিরিয়ালটাই যে বিভিন্ন পোশাক আর গহনার বিজ্ঞাপন সেটা আমরা বুঝতে পারিনা। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে যদি বিজ্ঞাপনের কারণেই আমাদের দর্শক কম হয় তাহলে বাংলাদেশি চ্যানেল এত বেশি বিজ্ঞাপন দেয় কেন? এবার এই উত্তরটা খুঁজব। বাংলাদেশের দর্শক পরিধি, দেশের আয়তন ও বিজ্ঞাপন বাজার অনুপাতে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল থাকা দরকার ছিল ১০-১২টি। কিন্তু সেখানে বর্তমান হিসাব মতে চ্যানেল সংখ্যা প্রায় ২৪-২৫টি। এতে করে বিজ্ঞাপন দাতারা আরগুমেন্ট ক্রিয়েট করছেন এবং অধিক চ্যানেল থাকার কারণে তারা বিজ্ঞাপন রেটও কমিয়ে দিচ্ছেন।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে টিভি দর্শকের সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি ১২ লাখ যাদের প্রত্যেকের বয়স ১৫ বছরের উর্ধ্বে। এই জরিপে বলা হয়, এসব দর্শক প্রতি ১০০ মিনিটে ২৫ মিনিট দেখেন বাংলাদেশি চ্যানেল আর বাকী ৮০ মিনিট দেখেন অন্যান্য বিদেশী চ্যানেল। তার মধ্যে শুধুমাত্র ভারতীয় চ্যানেল দেখেন ৪৫ মিনিট আর বাকী ১৫ মিনিট দেখেন আরবি, পাকিস্থানি, ও ইরেজি চ্যানেল।

ভারতীয় চ্যানেলে ৪৫ ভাগ সময় তারা ব্যয় করছেন বিভিন্ন সিরিয়াল, সিনেমা, গান আর রিয়েলেটি শোগুলোর মাধ্যমে। ক্যাবল সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে দেখা যায় মোট ২৭২টি চ্যানেল। ন্যাশনাল মিডিয়া সার্ভের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দর্শকরা বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বাংলাদেশি চ্যানেল বেশি দেখেন। এ সময় হিন্দি চ্যানেলগুলোতে দর্শক সংখ্যা কম থাকে। সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত হিন্দি চ্যানেলগুলোর দর্শক সংখ্যা বেশি থাকে। এ সময় চ্যানেলগুলোতে সিরিয়াল ও রিয়েলিটি শো দেখানো হয়।

সম্প্রতি পাখি ড্রেসের ঘটনা সবারই জানা। গাইবান্ধার কিশোরী নুরজাহান খাতুন ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কিশোরী হালিমা খাতুনের আত্মহত্যার মূল কারণ শুধু মাত্র পাখি ড্রেস। এমন কি খুলনার পাইকগাছা গদাইপুর গ্রামের গৃহবধূ শারমিন আক্তার পাখি ড্রেস কিনে না দেওয়ার কারণে তার স্বামী সাইদুল ইসলামকে তালাক পর্যন্ত দিয়েছেন।

মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে বাংলাদেশে চলছে প্রায় অর্থশতাধিক ভারতীয় চ্যানেল অথচ ভারতে বাংলাদেশের একটি চ্যানেলও চলার অনুমোদন পায়না। তাহলে এখানে মুক্তবাজার নীতির অসমতা প্রকাশ পায়। যদি ভারতই শুধু তাদের সংস্কৃতি আমাদের দেশে প্রবেশ করানোর অনুমোদন পায় তাহালে আমাদের চ্যানেলগুলোকেও ভারতে চলার জন্য অনুমোদন দিতে হবে। আর যদি সেটা করা সম্ভব না হয় তাহলে সরকারকে ভারতীয় চ্যানেল বন্ধের যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। অসম মুক্তবাজার ব্যবস্থা চলতে পারেনা।

দেশীয় শিল্পের প্রতি সরকারকে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক অভিলাষে যেন আর কোনও টিভি চ্যানেল সৃষ্টি না হয়। এতে করে বজায় থাকবে শিল্পের মান। ভাল অনুষ্ঠান তৈরিতে প্রতিযোগীতামূলক বাজারের সৃষ্টি হবে। কিন্তু আমরা সচেতন না হলে, আমরা পরিবর্তন না হলে কোনও উদ্যোগই বাস্তবায়ন হবে না। আমরা কতই না বোকা, সম্পদ রক্ষা করার জন্য ঘরে তালা লাগাই, আলমারিতে সবকিছু পুরে রাখি তারপর দিন-রাত সেগুলোকে পাহারা দেই যাতে চোর তা চুরি করতে না পারে অথচ আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের মূল্যবোধ, শ্রদ্ধা, ভক্তি ও নৈতিকতাগুলো যে দিন দিন বিজাতি সংস্কৃতির আগ্রাসনে চুরি হয়ে হচ্ছে সে জন্য আমাদের কোনও পাহারা নেই। আমরা এখন নির্বিকার, দিধাগ্রস্থ ও প্যারালাইসড। একটা জাতির ধ্বংসের এটাই হলো প্রাথমিক নিদর্শন।

লেখক: কবি

eadrito@yahoo.com

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।