সকাল ০৮:১৪ ; রবিবার ;  ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯  

অবরোধের কারণে বাজার মন্দা, জমিতে পড়ে বিষে নীল হচ্ছে আলু

প্রকাশিত:

আলমগীর চৌধূরী, জয়পুরহাট॥

টানা অবরোধে আলুর বাজারে ধস নামায় নতুন কৌশল নিয়েছে জয়পুরহাটের কৃষকরা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জমিতেই আলু রেখে সময় পার করার কৌশল নিয়েছেন তারা। তবে ক্ষেতে মড়ক লেগে সেই আলু যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য জমিতে ছত্রাকনাশক রাসায়নিক দেওয়ারও রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত মাত্রার রাসায়নিকের বিষে খাওয়ার অযোগ্য হয়ে উঠছে বিপুল পরিমাণ আলু।

প্রতিকূল আবহাওয়ায় আলু ক্ষেতের রোগবালাই রোধে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন আলু চাষীরা। প্রতিদিন ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করেও শঙ্কা কাটছে না তাদের। এরই মধ্যে কেউ কেউ এক বিঘা আলুতেই ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করেছেন চার বার। কেউ কেউ তারও বেশিবার। মাঠে গেলে সহজেই চোখে পড়বে চারিদিকে শুধু রাসায়নিক প্রয়োগের দৃশ্য। এমনিতেই দাম নেই। তার ওপর ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করে ক্ষেত বাঁচাতে বিঘা প্রতি চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা বাড়তি খরচে এবার আলু নিয়ে মরণ দশায় পড়েছে জয়পুরহাটের আলু চাষীরা। একদিকে কৃষকদের ওপর বাড়তি খরচের বোঝা আরেকদিকে আলুতে বিষক্রিয়ায় স্বাস্থ্যের ঝুঁকিতে তৈরি হয়েছে মারাত্মক সংকট।

গত বছর মৌসুমের শুরুতে আলুর তেমন একটা দাম ছিল না। তবে মৌসুমের শেষে প্রত্যাশা অনুযায়ী দাম পেয়ে খুশি হন কৃষকরা। ফলে লাভের আশায় এবার বেশি করে আলু চাষ করেছিলেন চাষীরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ সূত্রে জানা গেছে, এবার জেলায় আলু চাষ হয়েছে ৩৯ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। যার মধ্যে ৯ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে আগাম জাতের আলু।

মৌসুমের শুরুতে ঢাকাসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে এক ট্রাক আলুর পরিবহন খরচ ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা পড়তো। কিন্তু অবরোধের কারণে এখন এক ট্রাক আলুর পরিবহন খরচ পড়ছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। তাও ট্রাক মিলছে না।

আলু রোপনের পর মৌসুমের শুরু থেকে আবহাওয়া মোটামুটি ভাল থাকায় এক মাস আগেও প্রতি মণ আলু বিক্রি হয় অন্তত ৬০০ টাকায়। বিঘা প্রতি আলু বিক্রি করে কৃষকের লাভ হয় প্রায় আট হাজার টাকা। কিন্তু অবরোধ শুরুর পর থেকে বাজারে আলুর চাহিদা এবং দাম দুটোই ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। বর্তমানে আলু বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৮০ টাকা মণ দরে। তাও আবার বাকিতে। এ অবস্থায় উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে প্রতি বিঘা আলু বিক্রি করে কৃষকের লোকসান দাঁড়ায় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। আর এই লোকসান পোষাতে সময় ক্ষেপণের জন্য কৃষকরা ক্ষেত থেকে আলু না তুলে ক্ষেতেই পরিচর্যার সিদ্ধান্ত নেন।

কৃষকদের দাবি এক বিঘা জমিতে তাদের আলু রোপনে খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু দফায় দফায় শৈত্য প্রবাহ আর হিমেল বাতাসের কারণে আলুক্ষেত নিয়ে বিপদে আছেন তারা। এ অবস্থায় প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে রোগ বালাই দমনে তারা ক্ষেতে শুরু করেন ছত্রাকনাশক রাসায়নিক প্রয়োগ।

জেলার সদর উপজেলার হিচমি গ্রামের কৃষক মোজাহার আলী জানান, তার চার বিঘা জমিতে আলু উঠানোর সময় হয়ে গেছে। তবে বাজারে আলুর দাম না থাকায় তিনি ক্ষেত থেকে এখনও আলু ঘরে তুলছেন না। অবরোধ না উঠলেও হিমাগারগুলোতে আলু সংগ্রহ শুরু হলেই দাম বাড়তে পারে এই আশায় তিনি ক্ষেত পরিচর্যা করছেন। কিন্তু ঘন কুয়াশা আর হিমেল বাতাসের পাশাপাশি অসময়ে বৃষ্টির কারণে ক্ষেতে রোগের আক্রমণ ঘটতে পারে এমন শঙ্কায় সাত দিন পরপর ছত্রাকনাশক রাসায়নিক প্রয়োগ করছেন।

ক্ষেতলাল উপজেলার শিশি নাজিরপাড়া গ্রামের কৃষক রেজাউল ইসলাম জানান, দুই বিঘা গ্যানোলা ও দুই বিঘা এ্যাস্টেরিক জাতের আলুর জমিতে এ পর্যন্ত চারবার ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করেছেন। যার জন্য আলুর গাছ ভাল আছে। বেলগাড়ি গ্রামের কৃষক আব্দুল আলিম জানান, চারবার ছত্রাকনাশক প্রয়োগের পরও তার ক্ষেতের কিছু গাছের পাতা মরে গেছে। একই কথা জানালেন সাগরামপুর, মুন্দাইল, ভাশিলা, তেলাল গ্রামসহ আশপাশের এলাকার শতাধিক কৃষক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদর উপজেলা কৃষি বিভাগের কয়েকজন মাঠকর্মী জানান, অবরোধে আলুর দাম না থাকায় অনেক কৃষকই জমির ক্ষেত থেকে আলু তুলছেন না। তারা বলেন, আলু পরিপক্ক হয়ে ক্ষেতে গাছ মরে যাচ্ছে এমন পরিস্থিতিতেও কৃষকরা আলু তোলা থেকে বিরত আছেন। তবে অবরোধ শেষ না হলেও কয়েকদিনের মধ্যেই হিমাগারে আলু সংগ্রহ শুরু হলে এ অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটবে।

কীটনাশক ঔষধ ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার তাদের ব্যবসা ভাল হয়েছে। ইটাখোলা বাজারের কীটনাশক ঔষধ ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান চৌধূরী জানান, এবার আলু মৌসুমে সবচেয়ে বেশি বিক্রি করেছেন ছত্রাকনাশক ঔষধ। ক্ষেতে ছত্রাকের আক্রমণ রোধে কৃষকরা আগাম ঔষধ প্রয়োগের ফলেই এর চাহিদা ও বিক্রি এবার বেড়ে গেছে।

স্থানীয় হাটশহর গ্রামের আলু ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান জানান, মৌসুমের শুরুতে ঢাকাসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে এক ট্রাক আলুর পরিবহন খরচ ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা পড়তো। কিন্তু অবরোধের কারণে এখন এক ট্রাক আলুর পরিবহন খরচ পড়ছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। তাও ট্রাক মিলছে না। এ অবস্থায় কম দামের আলু তারা বিভিন্ন জেলায় পৌঁছাতে না পেরে আলু কেনা বন্ধ রেখেছেন।

কুশুমশহর গ্রামের আলু ব্যবসায়ী কাশেম আলী বলেন, আলুর দাম কম হলেও পরিবহন খরচের কারণে তারাও লাভ করতে পারছেন না। ফলে কৃষকের পাশাপাশি তারাও লোকসানে আছেন।

ক্ষেতলাল উপজেলার বটতলী, ইটাখোলা, নিশ্চিন্তা ও ফুলদীঘিসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে বিভিন্ন কীটনাশক ঔষধ ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার তাদের ব্যবসা ভাল হয়েছে। ইটাখোলা বাজারের কীটনাশক ঔষধ ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান চৌধূরী জানান, এবার আলু মৌসুমে সবচেয়ে বেশি বিক্রি করেছেন ছত্রাকনাশক ঔষধ। ক্ষেতে ছত্রাকের আক্রমণ রোধে কৃষকরা আগাম ঔষধ প্রয়োগের ফলেই এর চাহিদা ও বিক্রি এবার বেড়ে গেছে।

বটতলী বাজারের কীটনাশক ঔষধ বিক্রেতা দুলাল হোসেন বলেন, তাঁর এলাকায় এমন কোন আলু ক্ষেত নেই যেখানে ছত্রাকনাশক প্রয়োগ হয়নি। এবার ব্যাপক চাহিদার কারণে ঔষধ বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ইতিমধ্যেই পূরণ হয়েছে।

জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক এ জেড এম সাব্বির ইবনে জাহান জানান, এবার জয়পুরহাটে ৩৯ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। যা অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আলু ক্ষেতে ছত্রাকনাশকের ব্যবহার সম্পর্কে তিনি বলেন, ক্ষেত ভাল থাকলেও কৃষকরা আতঙ্কে ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করছেন। তবে কৃষি বিভাগ থেকে এ ব্যাপারে তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

/এফএস/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।