রাত ১০:২৭ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৮ এপ্রিল, ২০১৯  

পৃথিবীর একমাত্র হরিণের ক্যাম্পাস

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

লিপটন কুমার দেব দাস।।

কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ। কোনও এক মেঘলা দিনে কৃষ্ণকলির দেখা পেয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এভাবেই তার হরিণ কালো চোখের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন। আর এ কালের জনপ্রিয় উপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ তো বলেই ফেলেছেন, “ভীত হরিণীর চোখ যেমন সুন্দর হয়, ভীত তরুণীর চোখ ও বোধহয় সুন্দর হয়; ভয় পেলেই হয়তোবা চোখ সুন্দর হয়ে যায়।” পাঠক, আপনি রবি ঠাকুর বা হুমায়ূন আহমেদের লেখায় হরিণীর দেখা পেলেও বাস্তবে হয়ত পাননি। সাহিত্যের বহুল ব্যবহৃত উপমার সেই হরিণীর দেখা কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও পাওয়া যায়। বলতে পারেন, হরিণ লালন-পালন করলে তো হরিণের দেখা পাওয়া যাবেই। কিন্তু না চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসই সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই হরিণ চষে বেড়ায়।

এ এক এমন মায়াবী ক্যাম্পাস যেখানে প্রেমিক তার প্রেমিকার চোখে চোখ রেখে বলতে পারে, কাটা পাহাড়ে দেখা ওই হরিণীর মতোই তোমার চোখ দুটো মায়াবী সুন্দর! কিংবা হরিণ নিয়ে গবেষণা করতে এখানকার ছাত্রদের ছুটতে হয় না জঙ্গলের খোঁজে। হরিণ তো তাদের সাথেই ঘুরে বেড়ায় ক্যাম্পাসে। একই ক্যাম্পাসে যাদের পদচারণা— তারা বন্ধু, কিংবা সহপাঠী না হন, সহযাত্রী তো অবশ্যই।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যে হরিণের বিচরণ, তার নাম মায়া হরিণ। এর বাংলা আরেকটি নামও রয়েছে— কাকর হরিণ।

মায়া হরিণ শিকারি প্রাণি দেখলে বা ভয় পেলে কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে।

মায়া হরিণের ইংরেজি নাম বার্কিং ডিয়ার বা Indian Muntjac। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে মায়া হরিণগুলো রয়েছে সেগুলো খর্বকায় ও লাজুক স্বভাবের। এখানের বলে কথা নয়, মায়া হরিণ আসলে সর্বত্রই এ রকম।

১২ হাজার বছর পূর্বে প্লেইস্টোসিন যুগের শেষের দিক থেকে মায়া হরিণের অস্তিত্বের খোঁজ পাওয়া যায়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাটা পাহাড়, বিবিএ ফ্যাকাল্টির পেছনে, ফরেস্টি এরিয়াসহ সারা ক্যাম্পাসেই চোখে পড়ে ছোট আকারে লালচে বাদামী পিঙ্গল রংয়ের এই হরিণের। শরীরে ফোঁটা-বিহীন এ হরিণের চলাফেরা ও জীবনধারণ খুবই চমৎকার।

মায়া হরিণের নাম বার্কিং ডিয়ার হওয়ার একটা মজার কাহিনী আছে। এরা শিকারি প্রাণি দেখলে কিংবা ভয় পেলে কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে!

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু এই এক প্রজাতিরই হরিণ রয়েছে। এই ক্যাম্পাসে ছাড়াও মায়া হরিণের বসবাস দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল অংশ জুড়ে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মায়া হরিণের সংখ্যা জানতে প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গাজী আজমতের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে হরিণের প্রকৃত সংখ্যা তার জানা নেই। আরও কয়েকজন প্রাণী বিশেষজ্ঞও হরিণের প্রকৃত সংখ্যা জানাতে পারেননি। বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।

এই হরিণগুলো আসলে বিশাল এক ইতিহাসের সাক্ষী। জীবাশ্ম বিজ্ঞানীদের মতে, ১২ হাজার বছর পূর্বে প্লেইস্টোসিন যুগের শেষের দিক থেকে মায়া হরিণের অস্তিত্বের খোঁজ পাওয়া যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হরিণগুলোর গড় ওজন ১৭ কেজি ও উচ্চতা ২২ ইঞ্চি পর্যন্ত। পুরুষ মায়া হরিণের এক জোড়া শিং থাকে। শিং জোড়া এক থেকে দুই ইঞ্চি লম্বা। এই শিংয়ে আবার দুই থেকে তিনটি শাখা থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এরা সাধারণত একলা চলাফেরা করে। এখানকার মায়া হরিণ সর্বভুক, ঘাস-লতাপাতা থেকে শুরু করে পাখির ডিম এবং খুদ্র স্তন্যপায়ী প্রাণীও খায়!

মায়া হরিণদের এই বিচরণক্ষেত্রে পুরুষ হরিণের আধিপত্য একচেটিয়া। একটি পুরুষ মায়া হরিণ তার নিজস্ব এলাকার মালিক। সেখানে বসবাস করা সব হরিণী তার অধিকারে থাকে। অন্য এলাকার কোন হরিণ তার এলাকায় প্রবেশ করতে দিতে একদমই অনিচ্ছুক তারা।

কে জানে, কবি-সাহিত্যিকদের মতো হরিণগুলোও হয়তো হরিণীর চোখে চোখ রেখে খুঁজে পায় জীবনের নতুন মানে!

/এমবিআর/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।