রাত ০৩:৫০ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৭ অক্টোবর, ২০১৯  

সাকেশ্বর অশোক স্তম্ভের খোঁজে

প্রকাশিত:

রেজাউল করিম নোমান॥

‘গাজীপুর’ লিখে গুগল সার্চ করলে দর্শনীয় স্থানের ক্যাটাগরিতে আবশ্যিক কতগুলো নাম ভেসে ওঠে। এর মধ্যে কালিয়াকৈরের সাকেশ্বর অশোক স্তম্ভ একটি। মৌর্য শাসন আমলে মহামতি সম্রাট অশোক নির্মিত ৮৪ হাজার স্তম্ভের একটি। প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে তৈরি মৌর্য আমলের সূচনা স্তম্ভ।

দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য উপরের সংক্ষিপ্ত বিবরণই যথেষ্ট। কিন্তু ঠিকানাটা যথার্থ নয়। এ কারণে কালিয়াকৈরের বহু মানুষের কাছে জানতে চেয়েও জায়গাটা খুঁজে পাওয়া যায়নি। কালিয়াকৈর তো বটেই গুগল ম্যাপেও পাওয়া গেলই না। কারণ জায়গাটা আদৌ কালিয়াকৈরে নয়, কোনাবাড়ি এলাকা থেকে প্রায় ৭/৮ মাইল উত্তরে। একবার শুনেছিলাম এখানে সাকাশ্বর নামে একটা গ্রাম আছে, তবে অশোক স্তম্ভ নামে কোনকিছুর পাত্তা পাইনি। এর মধ্যেই যাবো যাবো করেও আর যাওয়া হয়ে উঠছিল না। কিন্তু সেদিন সেভ দ্যা হেরিটেজ অব বাংলাদেশের সাজ্জাদুর রাশেদ ভাইয়ের গাজীপুর হেরিটেজ এর ছবি দেখে উৎসাহ পেয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম শিগগিরই যেতে হবে।

জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে চন্দ্রা চৌরাস্তার মাঝে অর্থাৎ গাজীপুর থেকে টাঙ্গাইল রুটের কোনাবাড়ি বাসস্ট্যান্ড নামতে হবে। এখান থেকে একটা শাখা রাস্তা চলে গেছে উত্তর দিকে। এ পথেই সাকাশ্বর গ্রাম। টেম্পু আর সিএনজি অটোরিক্সা পাওয়া যায়। প্রতিজন ২০ টাকা ভাড়ায় নামলাম সাকাশ্বর বাজার এর চার রাস্তার মোড়ে। কোনাবাড়ি স্ট্যান্ড থেকে সময় লাগল ৩০-৪০ মিনিট। সাকাশ্বর বাজারের আশেপাশের হোটেল, চা দোকানী কেউই বলতে পারছিল না পুরনো কোন মন্দির বা স্থাপনার কথা। তবে নিরাশ হতে দিলেননা পাশের একটা ঝুপড়ি হোটেলের নিমকির কারিগর। বললেন নদীর ধারে মাধব মন্দির আছে, ওখানে গিয়ে দেখেন। জানতে চাইলাম দেবীর মুর্তি নাকি মাধব মন্দিরে? জবাবে না বোধক ইশারা দিয়ে শুন্যে হাতে আকার দিয়ে পিলারের মতো দেখাতেই আমার মনের চোখ চকচক করে উঠল।

বাজার মোড় থেকে কিছুটা পূর্ব দিকে নদীর পাশেই ছোট পাকা করা ঘর। গ্রীলের দরজায় আটকানো সেই আবছা অন্ধকার ঘরে পুরনো পাথরের একটি স্তম্ভ। কালো রঙের পাথর, লম্বায় প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার ফুট হবে। পেছন দিকে একটু হেলানো, সিমেন্টের ফ্লোর এর মাঝে আটকানো। এটাই কি সম্রাট অশোকের স্তম্ভ! কিন্তু স্থানীয় ভাবে এটি মাধব মন্দির নামে পরিচিত কেন? অষ্পষ্ট ক্ষয়ে যাওয়া সেই পাথরের উপরের অংশে হালকা ঝাপসা হয়ে যাওয়া খোদাই করা দেবী মুর্তি। অনুমান করা যায় সেটি নৃত্যরত কোন দেবী মুর্তি।

অশোক স্তম্ভ তো অন্যরকম। অশোক স্তম্ভ চারটি সিংহের মুখযুক্ত একটি একক মূর্তি। এই সিংহ চারটির পশ্চাৎ অংশ যুক্ত থাকে এবং মুখগুলো চারটি দিকে নির্দেশ করে। এর ফলে যে কোন দিক থেকে তিনটি সিংহের মুখ একবারে দেখা যায়। এই চারটি সংযুক্ত সিংহমূর্তি একটি একটি উল্টানো পদ্মফুলের উপরে বেদীটি স্থাপন করা থাকে। এছাড়া আরো কিছু স্তম্ভকে অশোক স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় সেগুলোর মধ্যে বুদ্ধমূর্তি অংকন করা থাকে।

রাতে ফিরে আরও কিছু জানা যায় কিনা ভেবে নেটে খুঁজতে গিয়ে সোহেইল জাফর নামের একজন ভদ্রলোকের যুঁথচারী ব্লগে ধামরাইয়ের কাঁসা পিতল শিল্প নিয়ে একটি লেখায় এই সাকেশ্বর স্তম্ভের কিছু বিবরণ পেলাম, যা আমার কাছে অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত মনে হল। ব্লগ বলছে:

“বীরেন্দ্রনাথ বসু ঠাকুরের পূর্ব্ববঙ্গের পাল রাজাগণ বইয়ে ধামরাইয়ের অশোক স্তম্ভ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ধামরাইয়ের পার্শ্ববর্তী শাকাসর নামক গ্রামের একটি স্তম্ভকে অশোক স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বইটি প্রকাশিত হবার পর, স্টেপলটন সাহেবের কাছে সংবাদ পেয়ে তিনি ঐ স্তম্ভটি দেখতে যান। স্তম্ভটি দেখার পর তিনি ঐ বইয়ের পরিশিষ্টে সংশোধনী আকারে ধামরাইয়ের তথাকথিত অশোক স্তম্ভ সম্পর্কে তার নতুন অবস্থান ব্যক্ত করেন। মূল বইয়ে তিনি যেখানে স্তম্ভটিকে অশোক নির্মিত বলে মন্তব্য করেছিলেন, পরিশিষ্টে এটাকে তিনি পরবর্তী পাল-যুগের কোনো রাজাদের নির্মিত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন।”

ব্লগের ভাষ্য যদি সত্য হয় তবে এই লেখার ভূমিকায় যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তার কোন ভিত্তি না থাকারই কথা! সম্ভবত উপর্যুপরি কপি পেষ্ট করতে করতেই পুরো গাজীপুর সংক্রান্ত ইনফোতে ছড়িয়ে পড়ছে, যার কোনও সত্যতা কিংবা ভিত্তি নেই। কারণ ওই গ্রামে এই একটি স্তম্ভ ছাড়া পুরনো আর কিছু নেই।

তবে নিতান্ত অনাদরে আর অবহেলায় সাকেশ্বরে নদীর খাড়া ঢালের ধার ঘেঁষে যে স্তম্ভ পড়ে আছে দেখে আসলাম তা অবশ্যই মহামূল্যবান, ইতিহাসের এক অনন্য বিষয় এতে কোন সন্দেহ নেই। এর যথাযথ সংরক্ষণ জরুরি। আগ্রহীরা এখনই ঘুরে আসতে পারেন। যাওয়া আসা আর যাতায়াত ভাড়া উপরে রয়েছে।

আগ্রহীদের জন্য -

GPS Coordinate: 24.056624, 90.334064

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।