বিকাল ০৪:৩১ ; মঙ্গলবার ;  ২৩ এপ্রিল, ২০১৯  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরস্বতী

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মুছাদ্দিক।।

মাঘের ঠাণ্ডা সকাল, তার উপর সারাদেশে হরতাল আর অবরোধ যেন ঠাণ্ডাটাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ফাঁকা রাস্তা দিয়ে চলছি— গন্তব্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল। সামনে সরস্বতী পূজা। হলের গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখা গেল পূজার জোর প্রস্তুতি চলছে। সরস্বতী পূজা সনাতম ধর্মাবলম্বীদের একটি অন্যতম প্রধান মহোৎসব। দেবী সরস্বতী হচ্ছেন শিক্ষা, সঙ্গীত এবং শিল্পকলার দেবী। দেবী দ্বিভূজা বা চতুর্ভূজা মরালে আসীন হয়ে মর্ত্যধামে প্রবেশ করেন। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে দেবীর চতুর্ভূজার রূপ। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতে দেবী দ্বিভূজা। দেবীর এক হাতে থাকে বই আর অন্য হাতে বীণা। বীণা যে সঙ্গীতের প্রতীক আর বই জ্ঞান চর্চার সেটা কে-ই বা না জানে!

প্রত্যেক বছরই সারা দেশ জুড়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মন্দিরে অনেক জাঁক-জমকের সাথে পালিত হয় সরস্বতী পূজা। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল মাঠের পূজা চাকচিক্য ও জৌলুসে যেন সারাদেশের সমস্ত পূজামণ্ডপকে হার মানায়। ছাত্রদের প্রাণের দেবী সরস্বতী হলের মাঠে শত রূপে শত আঙ্গিকে আবির্ভূত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক একটা বিভাগের যেন এক একজন দেবী— সকলেই দেবী সরস্বতী কিন্তু প্রতিটি বিভাগই নিজেদের মনের মাধুরী মিশিয়ে দেবীকে চিত্রিত করেন।

জগন্নাথ হলের মাঠ ঘুরে দেখা গেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ এবং বিভাগের পক্ষ থেকে সর্বমোট ৫৮টি মণ্ডপ স্থাপন করা হয়েছে। বিভাগ অনুষদ ছাড়াও জগন্নাথ হলের কর্মচারীরা বানিয়েছেন আরো ৩টি মণ্ডপ। বরাবরের মতো এবারও হলের পুকুরের ঠিক মাঝখানে শোভা পাচ্ছে চারুকলা অনুষদের সরস্বতী। বাঁশ দিয়ে তৈরি বিশাল প্রতিমাটি পুকুরের পানিতে ভাসমান।

অনুষদ বা বিভাগের সামষ্টিক সরস্বতীতেও যেন কারো কারো মন ভরেনি। এদের কেউ কেউ হলের মধ্যেই নির্দিষ্ট স্থানে তৈরি করছে সরস্বতীকে। আবার কেউ কেউ বাইরে থেকে অর্ডার দিয়ে বানিয়ে আনছে তার ব্যক্তিগত ছোট্ট প্রতিমাটি। প্রতিটি বিভাগ বা অনুষদের হিন্দু ধর্মাবলম্বী সিনিয়র ছাত্ররা তাদের বিভাগ বা অনুষদের পক্ষ থেকে প্রতিমা তৈরির কাজে নিয়োজিত ছিলেন। সবারই ইচ্ছা ছিল ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির। প্রত্যেক বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকদের সহযোগিতায় প্রতিমা তৈরি ও নিমন্ত্রণ কাজে ছিলেন ভীষণ ব্যস্ত। যেন এক মুহূর্তও ফুরসত নেই তাদের। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃরাশ সেরেই শুরু হয় তাদের দায়িত্ব আর শেষ হয় অনেক রাতে। এই ব্যস্ততার মাঝেই তারা সেরে নিচ্ছে তাদের দৈনন্দিন কাজ। সবার উদ্দেশ্যই হলো বিদ্যার দেবীকে খুশি করা। আর দেবী সরস্বতী খুশি হলেই তো বিদ্যাবুদ্ধিতে পাওয়া যাবে দেবীর আনুকূল্য। সরস্বতী পূজা চলাকালীন জগন্নাথ হল জুড়েই ছিল এমন চিত্র।

দেবী তিনি জ্ঞান বিজ্ঞান আর কৃৎকৌশলেরও; দেবী তাই ফেসবুকেও। আলোকচিত্র: নাসিরুল ইসলাম

অন্যদিকে পূজা কমিটিরও ছিল না ব্যস্ততার অন্তঃ। অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে সকল কাজ সুষ্ঠ ও সুন্দরভাবে হচ্ছে কিনা সেই দিকেই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। পূজাকালীন হলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল চোখে পড়ার মতো। দেশের চলমান পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে পূজা উদযাপন কমিটি নিরাপত্তার দিকে বিশেষ জোর দিয়েছেন। উদযাপন কমিটির সদস্যরা জানান, দেশের পরিস্থিতি খুবই নাজুক বলে অন্যান্য বারের চেয়ে এবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। এর ফলে সম্পূর্ণ জগন্নাথ হলকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়। জগন্নাথ হলের সামনের এবং পেছনের দিকের গেটে বসানো হয় সশস্ত্র পুলিশী প্রহরা। নিরাপত্তাজনিত কারণেই পূজা চলাকালীন গাড়ি অথবা মোটরবাইক নিয়ে কাউকে হলের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

এবারের সরস্বতীয় পূজার অনুষ্ঠান ৩টি পর্বে সম্পন্ন হয়েছে। ২৪ জানুয়ারি, পূজার প্রথম দিনে হলের শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা সবাই মিলে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালান। এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল জগন্নাথ হল এলাকাকে সম্পূর্ণ আবর্জনা মুক্ত করা এবং করা এবং হলের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা। এই কর্মসূচিতে সকলেই সানন্দে অংশগ্রহণ করেন।

২৫ জানুয়ারি ছিল সরস্বতী পূজার প্রধান দিন। এই দিনটির জন্য হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকে। এ দিন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা দেবীর সামনে সন্তানের হাতেখড়ি দেন।

পূজার সময় কিছু লোকাচার বা বিধিনিষেধ আছে। যেমন পূজার আগে শিক্ষার্থীরা বড়ই খেতে পারবে না এবং কিছু লিখতেও পারবে না। রবিবার দিন সকাল থেকেই পূজার কার্যক্রম শুরু হয়। জগন্নাথ হলের কেন্দ্রীয় উপাসনালয়ে সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে পূজা শুরু হয়। বেলা ১০টায় দেবীকে অঞ্জলি দেওয়া হয়। রবিবার সারাদিন ভক্ত দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকে জগন্নাথ হল। ছাত্রছাত্রীরা নিজ নিজ বিভাগের পূজামণ্ডপ এবং অন্যসব মণ্ডপ ঘুরে দেখে।

এদিন সন্ধ্যা ৬টায় অনুষ্ঠিত হয় সন্ধ্যা আরতি। এতে হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী অনেকেই অংশগ্রহণ করে। এরপর শুরু হয় সঙ্গীতানুষ্ঠান। ধর্মীয় বিভিন্ন সঙ্গীত ভক্তশ্রোতাদের মনে এক গভীর অপার্থিব দ্যোতনা তৈরি করে।

২৬ জানুয়ারি, পূজার তৃতীয় দিনও চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জগন্নাথ হলের পূজা কমিটি কেন্দ্রীয়ভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ এবং ভারতের খ্যাতনামা বড় বড় সঙ্গীত-তারকা সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই শেষ হয় এবারের সরস্বতী পূজা। বিদায় জানানো হয় বিদ্যার দেবীকে। রীতি অনুযায়ী বিদ্যার দেবীকে বিদায় জানালেও দেবী তো থেকেই যান শিক্ষার্থীর সাধনায়।

/এমবিআর/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।