ভোর ০৭:৩০ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮  

আমি আসলে নভেলা ও ছোটগল্পই লিখতে চাই : আমের হুসাইন || দীর্ঘ উপন্যাসের বেশিরভাগই বাহুল্যময় : কাজী আনিস আহমেদ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[গত শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) বিকালে নভেলার শিল্পাঙ্গিক ও সীমা নিয়ে কথাবার্তায় পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক আমের হুসাইন এবং বাংলাদেশের লেখক কাজী আনিস আহমেদের বৈঠকি অনুষ্ঠিত হয় বেঙ্গল লাইটস্ বুকসের মিলনায়তনে। অনুষ্ঠানে সঞ্চালক ছিলেন ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সোবহান। ঘণ্টাখানেকের আলাপচারিতার পর ছিলো প্রশ্ন-উত্তর পর্ব। এর চুম্বকঅংশ নিয়ে লিখেছেন, হামীম কামরুল হক]


অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাফর সোবহান জানতে চান, কখন একটি রচনা নভেলা হয়ে ওঠে। প্রথমে এ নিয়ে কথা বলেন কাজী আনিস আহমেদ। পরে আমের হুসাইন। কাজী আনিস বলেন, সাধারণ অর্থে একটি রচনা যখন ৩০ থেকে ৬৫ পৃষ্ঠার মধ্যে এঁটে দেওয়া হয়, প্রকাশকরা তাকে শর্ট ফিকশান না বলে নভেলা হিসেবে চালাতে চান। নভেলার ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে ইউরোপে রেনেসাঁ-উত্তর বাস্তবতায়। পরবর্তীকালে গোগল, তলস্তয়েরা একদিকে; অন্যদিকে ফ্লবেয়ার এবং আরো পরে লাতিন আমেরিকায় এর চর্চা বিশেষভাবে প্রসারিত হয়। নভেলা সাহিত্যের শক্তিশালী বর্গ বা জাঁর হয়ে ওঠে।
 
আমের হুসাইন পৃষ্ঠা সংখ্যা ও আকৃতির দিক থেকে নভেলা সম্পর্কে আনিস আহমেদের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেন, সেই সঙ্গে তিনি যোগ করেন, প্রবণতার দিক থেকে একটি নভেলা কোথায় শেষ হবে সেটা বলা মুশকিল। এর রচনার সঙ্গে ভৌগোলিক ব্যাপারাদিও আছে। ইতিহাস ঐতিহ্যের যোগ আছে। তবে লেখকের মানসিকতার ওপর নির্ভর করে তিনি আসলে নভেলা লেখার মেজাজ লালন করেন কি-না। যেমন জেমস বল্ডুইনের ‘জিওভন্নিস রুম’কে সেই অর্থে আমরা নভেলা বলব কি-না? তবে সব মিলিয়ে বলা যায় বড়োজোর ৬০ পৃষ্ঠার একটি রচনাকে/ন্যারেটিভকে নভেলা বলতে পারি।

বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে নভেলার বিষয়টি কী রকম পর্যায়ে এসেছে- জাফর সোবহানের এই প্রশ্নের উত্তরে কাজী আনিস আহমেদ বলেন, উনিশ শতকে এসে ইউরোপে নভেলের বা উপন্যাসের আকার-প্রকার প্রায়ই বিরাটাকৃতি ধারণ করে। এর কারণ হল সেসময়ের পত্রপত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে এসব প্রকাশিত হত, অন্যদিকে আকারে বড় হলে লেখকও আর্থিকভাবে লাভবান হতেন। ডিকেন্সের উপন্যাসগুলিকে এদিক থেকে দেখা যেতে পারে। সম্পাদকের তাগাদা আর প্রতি সপ্তাহে লেখকের হাজিরা- এই দিয়ে বেড়ে উঠত উপন্যাস।  ইংরেজিতে এটা চলেছে সেই সময়ে। বাংলায় যেমন শারদীয় সংখ্যা, ঈদসংখ্যা, একুশের বইমেলা নভেলা এবং নভেল চর্চায় ভিন্ন একটা মাত্রায় হাজির হয়েছে। সৈয়দ শামসুল হকের ‘নীলদংশন’, হুমায়ূন আহমেদের ‘শঙ্খনীল কারাগার’, শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’র মতো লেখাগুলি বাংলায় নভেলার ভালো দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে উপন্যাসের চর্চায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস থেকে জাকির তালুকদারের প্রয়াসও লক্ষণীয়। এই দিক থেকে জনপ্রিয়তা ও লেখকের আত্মপ্রকাশের বিবেচনাটাও দেখা দরকার। যেমন গার্সিয়া মার্কেসের প্রথম দিকের প্রায় পাঁচটি বই-ই নভেলা আঙ্গিকের। সেদিক থেকে মনে হয় নভেলা-আঙ্গিকটি লেখককে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্যও করে। লাতিন আমেরিকায় বর্তমানে সবচেয়ে খ্যাতিমান কয়েকজন লেখকের প্রত্যেকেই মূলত নভেলা লিখে পাঠকসমাজে বা সাহিত্যজগতে জায়গা করে নিয়েছেন।

এ পর্যায়ে জাফর সোবহান জানতে চান, সাগা বা দীর্ঘকাহিনি থেকে নভেলা কতটুকু নিচ্ছে বা এতে প্রাচীন ধরনের ওই লেখার প্রভাব কতটা? উত্তরে আমের হুসাইন বলেন, দীর্ঘ রচনাগুলি দীর্ঘই। সম্প্রতিককালে পিটার ক্যারি বা তার আগের মার্গারেট অ্যাটউড প্রমুখের লেখা থেকে দেখা যায় দীর্ঘ উপন্যাসের চর্চা যেমন চলছে, তেমনি নভেলার চর্চাও। এটা চলতেই পারে। গত চল্লিশ বছর ধরে তারপর আগের মতো দীর্ঘ উপন্যাসগুলি ক্রমে ছোট হয়ে আসছে। পশ্চিমে এখন ১৫০ পৃষ্ঠা থেকে ২৫০ পৃষ্ঠার ভেতরেই উপন্যাসকে এঁটে যেতে দেখছি।

আনিস আহমেদ বলেন, আসলে আগের দীর্ঘ উপন্যাসের বেশিরভাগই অনেকটা বাহুল্যময়। সেসব শক্তিশালী ও নির্মম সম্পাদকের হাতে পড়লে এর কোনো কোনোটা দুর্দান্ত নভেলাতে পরিণত হতেও পারতো। এটা ঢোলা কাপড়ের বদলে সুন্দর করে ইংলিশ স্যুট তৈরি করার মতো ঘটনার হতে পারত। সাম্প্রতিককালের ইংরেজ লেখকদের মধ্যে আমার প্রিয় ইয়ান ম্যাকওয়ানের ভালো লেখাগুলি আসলে নভেলা। তার ‘দ্য সিমেন্ট গার্ডেন’ বা ‘দ্য কমফোর্ট অব স্ট্রেইঞ্জারস’-এর মতো লেখাগুলি তো সেরকমেরই। জাপানের জুনিচারি তানিজাকি বিরাটাকারের উপন্যাস লিখেছেন, কিন্তু তার ছোটগল্প ও শর্ট ফিকশানগুলি বেশি পাঠকপ্রিয়।

দর্শকদের এক অংশ। আলোকচিত্র : পুষ্পিতা আলম

আমের বলেন, নভেল ও নভেলা দুই-ই আছে। কে কোনটার চর্চা করবে সেটা তো কেউ ঠিক করে দিতে পারে না। আনিস বলেন, সেটি স্বীকার তো করতেই হয়। জাপানে শগুন যুগে কথাকাহিনি, পরের দিকে সাইকোসেক্সুয়াল কাহিনিগুলি, কারো কারো এক একটা ম্যাগনাম ওপাস লেখার তাড়না এবং কেউ কেউ মনে করে দশ বছর ধরে একটা উপন্যাস লেখার মাঝে নভেলা লেখাটা, লেখকের পাঠকের কাছে হাজিরার মতো থাকে, কেউ কেউ বড়সড় কোনো উপন্যাস লেখার পর ক্লান্তি কাটানোর জন্য, লেখায় তাজাভাবে ফিরে আসার জন্য নভেলা লেখেন। যেমন টমাস মানের নভেলাগুলি সেরকম মেজাজ থেকে লেখা। বড় উপন্যাস লিখে পরে রিফ্রেশড হওয়ার জন্য লেখা। তারপরও এখন বংশের পর বংশের বর্ণনা দিয়ে উপন্যাস লেখার চল প্রায় চলে যাচ্ছে। ‘ওয়ার অ্যান্ড পিসে’র চরিত্রগুলির ক্রম বিকাশগুলি খেয়াল করলে বোঝা যায় ওভাবে এখন উপন্যাস লেখাটা প্রায় বিরল হয়ে এসেছে।

এরপর পাঠকের প্রশ্ন-উত্তর পর্ব শুরু হয়। নানান ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তর দেন দুই লেখক। কাজী আনিস বলেন, ছোট হলেই তো নভেলা হবে না। এর উপন্যাসগুণ থাকার দরকার। হোসে সারামাগোর উপন্যাসগুলি যতটা বড় সেসব আকারে ছোট হতেই পারতো। তিনি আমার মতে অতি-মূল্যায়িত, অন্য দিকে টমাস বার্নহার্ড-এর মতো লেখক যতটা মূল্যায়ন পাওয়ার দরকার ছিল সেটি পাননি। বার্নহার্ড কিন্তু নভেলা ফরমের সবচেয়ে ভালো দৃষ্টান্তগুলি তৈরি করেছেন। সম্পর্কের বুনন, বিচিত্র মাত্রা ও স্তরে জীবনকে দেখার জায়গা থেকেও সেসব বিচার করলে এটা বোঝা যাবে।
আমের হুসাইন বলেন যে তিনি নিজে আসলে নভেলা ও ছোটগল্পই লিখতে চান। তার গুলমোহর ট্রি বা আরো যে রচনাগুলি আছে সেসব এ জাতীয় লেখা। নভেলা লেখার সামর্থ্য তার নেই।
কাজী আনিস আহমেদ পাঠকের প্রশ্নের উত্তরে ফ্ল্যাশফিকশান ও হাইপার-টেক্সট নিয়ে কথা বলেন। গল্প তার আঙ্গিক ঠিক করে নিতে কী রকম হয়ে এটাও বিবেচনা করতে হয়। কিন্তু অনেক সময় প্রকাশক ও পাঠকের চাপের কাছে লেখক নতি স্বীকার করলেও এর আকার বদলে যেতে পারে।
আমের হুসাইন আবারও বলেন, তিনি নিজে সংক্ষিপ্ততারই চর্চাকারী। নভেলা মাধ্যমেই তিনি সেটির চর্চা করে আসছেন।

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।