দুপুর ১২:০২ ; শনিবার ;  ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯  

'ছোট পুকুরের বড় মাছ হতে চাই'

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

তিনি স্বপ্ন দেখেন রাজনৈতিক দল ও মতের ঊর্ধ্বে উঠে নতুন প্রজন্ম তথা দেশের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারিদের শিক্ষা ব্যবস্থা যেন সর্বাধিক অগ্রাধিকার পায়। তার অাহ্বান, রাজনৈতিক মতপার্থক্য যেন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা অগ্রযাত্রায় কখনও বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়।

তিনি রাসেল টি. অাহমেদ, একজন স্বাপ্নিক মানুষ। তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে নিতে তিনি কঠিন ব্রত নিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন টিম ক্রিয়েটিভ। শিক্ষার্থীদের 'চৌকস' করতে তৈরি করেছেন 'স্পেলিং বী' -এর এর মতো প্ল্যাটফর্ম। গড়ে তুলেছেন চ্যাম্পস২১ ডট কম। তার ভাষায়, অামি ছোট পুকুরে বড় মাছ হতে চেয়েছি।

রাসেল টি. অাহমেদ অাইএসপিএ-বি এবং বেসিস'র সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বর্তমানে বেসিসের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি। ভিন্ন ধারার অায়োজন করপোরেট বাজার তার ব্রেইন চাইল্ড।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হিটলার এ. হালিম

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পটি জানতে চাই।

রাসেল টি. আহমেদ: ১২ বছরের চাকরি জীবনে আমি আসলে কোনও দিন চাকরি করিনি। যে চাকরিকে চাকরি মনে করে সে সারাজীবন 'চাকর'ই থাকে। তাই যে প্রতিষ্ঠানের হয়েই কাজ করি না কেন, আমাকে ভাবতে হবে আমি এই প্রতিষ্ঠানকে ‘ওন’ করি। তখন চাকরি আসলে ছকে বাঁধা দায়িত্ব থাকে না। তখনই তাগিদ আসে প্রতিষ্ঠানে কিছু অবদান রাখার।

এই ওনারশিপটাই সাফল্যের দিকে নিয়ে যায়। আমি খুবই সৌভাগ্যবান ছিলাম যে চাকরির মাত্র চতুর্থ বছরে আমার পজিশন 'সি' লেভেল রোলে চলে আসে। এমন অর্জনের পরই মূলত নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস চলে আসে। কর্পোরেট লাইফে থাকাকালীন আমার মনে হয়, এখন নিজের কিছু করার সময় এসেছে।

উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সবচেয়ে যেটা বেশি দরকার তা হলো আইডিয়া এবং ওই আইডিয়া কতটা ভালো বুঝি তার সঠিক ধারণা। আমি আমার আইডিয়া নিয়ে নিশ্চিত হলাম। আমি যেহেতু ইন্টারনেট ভালো বুঝি তাই আমি এদিকেই ভাবলাম। তারপর আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আমি কী পুঁজি নিয়ে শুরু করব?'

চাকরিকালেই কর্পোরেট জগতে বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ভাবলাম এই পরিচিতিটাই আমার পুঁজি। ১২ বছরের চাকরি জীবনে আমি নৈতিকতা ও মূল্যবোধের জায়গায় কখনও কোনও 'কম্প্রোমাইজ' করিনি। এটাই আমার সম্পদে পরিণত হয়েছে।

উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সবচেয়ে যেটা বেশি দরকার তা হলো আইডিয়া এবং ওই আইডিয়া কতটা ভালো বুঝি তার সঠিক ধারণা। আমি আমার আইডিয়া নিয়ে নিশ্চিত হলাম। আমি যেহেতু ইন্টারনেট ভালো বুঝি তাই আমি এদিকেই ভাবলাম। তারপর আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আমি কী পুঁজি নিয়ে শুরু করব?' 

মানুষের মাঝে আমার সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি হয়েছে সেটিকেই পুঁজি বিবেচনা করেই আমি নেমে যাই। বিশ্বাস ছিল, এই মানুষগুলোর কাছ থেকে সহায়তা পাব।

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে কী ধরে নেব, উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য চাকরি করাটা অপরিহার্য?

রাসেল টি. আহমেদ: না, অপরিহার্য নয়। তবে এটা সহায়ক। শর্ত হচ্ছে চাকরি করতে হবে চাকরের মানসিকতায় নয়। দায়িত্ব নিয়ে নিজের জায়গা থেকে কোম্পনিকে নিজের ভেবে কাজ করতে হবে। এটা মাথায় রাখতে হবে, আপনি সরাসরি উদ্যোক্তা হন বা চাকরি করে হন, এটি একমুখী পথ। একবার পা বাড়ালে ফিরে আসা কঠিন। সামনে তাকালে পেছনে ফেরার সুযোগ নেই বা থাকলেও ফেরা উচিত নয়। ওই জায়গাগুলো ভেবেই উদ্যোক্তা হওয়া উচিত।

শর্ত হচ্ছে চাকরি করতে হবে চাকরের মানসিকতায় নয়। দায়িত্ব নিয়ে নিজের জায়গা থেকে কোম্পনিকে নিজের ভেবে কাজ করতে হবে। এটা মাথায় রাখতে হবে, আপনি সরাসরি উদ্যোক্তা হন বা চাকরি করে হন, এটি একমুখী পথ। একবার পা বাড়ালে ফিরে আসা কঠিন। সামনে তাকালে পেছনে ফেরার সুযোগ নেই বা থাকলেও ফেরা উচিত নয়। ওই জায়গাগুলো ভেবেই উদ্যোক্তা হওয়া উচিত। 

বাংলা ট্রিবিউন: চাকরি জীবন থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে মূল প্রেরণা কী ছিল?

রাসেল টি. আহমেদ: আমি যখন 'সি' লেভেলে কাজ করি, তখন আমার অধীনে প্রায় ২০০ কর্মী ছিল। ওখান থেকেই সাহসটা এসেছে। আমি পরিকল্পনা করতে পারতাম, ব্যবস্থাপনাটা জানতাম, আমি পরিচালনা করতে জানতাম, শুধু বিনিয়োগটা এসেছে অন্যের পকেট থেকে। এটুকুই ছিল আমার সীমাবদ্ধতা।

চাকরি থেকে উদ্যোক্তা হওয়াটা আসলে কিছুটা কঠিনই বটে। দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করলে চাকুরিই অবলম্বনের মতো হয়ে যায় বা একটা নির্ভরতার জায়গা তৈরি হয়। এটা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। কারণ তখন পরিবার নিয়েও ভাবতে হয়। সুতরাং আমি প্রথমেই পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করি। আমি আমার লাইফস্টাইলের সঙ্গে 'কম্প্রোমাইজ' করব না। লক্ষ্য ছিল, ছয়মাসের মধ্যেই আমার লাইফস্টাইল বা জীবনযাপনের খরচের একটা বন্দোবস্ত করে ফেলব। বাকি কি আসবে না, বা আসবে তা সময় বলে দেবে।

বাংলা ট্রিবিউন: এতকিছু থাকতে আপনি কনটেন্টর দিকে কেন গেলেন?

রাসেল টি. আহমেদ: আমি যখন আইএসপিতে কাজ করি (রাসেল টি. অাহমেদ আইএসপি অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক) তখন তাদের অনেকেরই একটা কমন প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশে মোবাইল ব্যবহারের হার এত দ্রুত বাড়ছে কিন্তু ইন্টারনেট কেন বাড়ছে না?

অনেকে এটার আবার ব্যাখ্যা দিত এভাবে, ইংরেজি শিক্ষার অভাবে ইন্টারনেটের ব্যবহার কমে আছে। ব্যপারটা আসলে পুরোপুরি ভুল। আমরা যদি বিশ্বে সর্বোচ্চ ইন্টারনেট পেনিট্রশেনের চিত্র দেখি। প্রথম স্থানে তখন কোরিয়া, দ্বিতীয় হংকং, তৃতীয় ছিল রাশিয়া এবং চতুর্থ ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং এরপর চায়না।

তো সর্বোচ্চ ইন্টারনেট পেনিট্রেশনের পাঁচটি দেশের প্রথম তিনটিতেই ইংরেজিতে কোনও কথা হয় না। ওদের প্রধান কারণটাই ছিল লোকাল কনটেন্ট। কনটেন্টের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি হচ্ছে লোকাল কনটেন্ট, অপরটি হচ্ছে কনটেন্টটা জীবনের জন্য কাজে লাগাতে হবে। ওই জায়গাটা বাংলাদেশে মিসিং ছিল। আমার কাছে মনে হয়েছে ওই জায়গাটায় কাজ করা সম্ভব।

কোন ধরনের কনটেন্ট নিয়ে কাজ করব ওই চিন্তা থেকে আমি শিক্ষার্থীদের বিষয়ে এলাম। কারণ, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের পরবর্তী জেনারেশনকে কাজে লাগতে হবে।

ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই আমি নিজেকে ১০ বছর পর কোথায় দেখতে চাই তা নিয়ে নিশ্চিত ছিলাম। মাঝে মাঝে নিজেকে জিজ্ঞাসা করতাম আমি সঠিক পথে আছি কি না।

তো সর্বোচ্চ ইন্টারনেট পেনিট্রেশনের পাঁচটি দেশের প্রথম তিনটিতেই ইংরেজিতে কোনও কথা হয় না। ওদের প্রধান কারণটাই ছিল লোকাল কনটেন্ট। কনটেন্টের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি হচ্ছে লোকাল কনটেন্ট, অপরটি হচ্ছে কনটেন্টটা জীবনের জন্য কাজে লাগাতে হবে। ওই জায়গাটা বাংলাদেশে মিসিং ছিল। আমার কাছে মনে হয়েছে ওই জায়গাটায় কাজ করা সম্ভব।

আমি আমি স্নাতক সম্পন্ন করি ১৯৯৯ সালে। আমার ভিশন ছিল টপ লেভেলে কাজ করার। আমি সৌভাগ্যবান ছিলাম যে আমার সময়ে গ্লোবাল ট্রেন্ডটা ছিল ইয়ুথের। আমি আইবিএ (ঢাবি) থেকে স্নাতক ও এমবিএ করি।

বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করার সময় আমি দেখলাম এটিতে ধীরে উন্নতি হয়। আমি অনুভব করলাম এটাতে হবে না। আইটিতে নিজে কিছু করলে অন্তত আমি 'ছোট পুকুরের বড় মাছ হতে পারব।' ওই চিন্তা থেকেই আইটিতে আসা। স্বাভাবিকভাবে যখন একজন সর্বোচ্চ লেভেলে কাজ করে তখন তার আয় মোটামুটি বেশি হয়। যখন ব্যবসার দিকে যাই তখন পরিবার থেকেই আমি প্রথম প্রশ্নের সম্মুখীন হই, 'হঠাৎ চাকরি ছেড়ে কেন ব্যবসা?' এই প্রশ্নের জবাব সবার আগে আমার নিজেকে দেওয়ার দরকার ছিল। আবারও আমি একইভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করলাম যে, আমি ১০ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চাই।

আমার কাছে ওই লক্ষ্যটা ছিল 'আমি মরার পরে বাঁচতে চাই।' আমার কাছে মনে হয়েছে আমি যদি শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু করতে পারি তাহলে আমার নামটা বেঁচে থাকবে। টাকা আসবেই। আমি টাকার পেছনে ছুটিনি। ব্যবসায়ের শুরুতেই আমার এটাই ছিল লক্ষ্য।

বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করার সময় আমি দেখলাম এটিতে ধীরে উন্নতি হয়। আমি অনুভব করলাম এটাতে হবে না। আইটিতে নিজে কিছু করলে অন্তত আমি 'ছোট পুকুরের বড় মাছ হতে পারব।' ওই চিন্তা থেকেই আইটিতে আসা। স্বাভাবিকভাবে যখন একজন সর্বোচ্চ লেভেলে কাজ করে তখন তার আয় মোটামুটি বেশি হয়। যখন ব্যবসার দিকে যাই তখন পরিবার থেকেই আমি প্রথম প্রশ্নের সম্মুখীন হই, 'হঠাৎ চাকরি ছেড়ে কেন ব্যবসা?' এই প্রশ্নের জবাব সবার আগে আমার নিজেকে দেওয়ার দরকার ছিল। আবারও আমি একইভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করলাম যে, আমি ১০ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চাই। 

যদি খেয়াল করি গত তিন চার বছরে ইন্টারনেটের অগ্রগতি অনেক বেশি। এই অগ্রগতির বেশিরভাগ অংশ আসে মোবাইল ইন্টারনেট থেকে। তারা আসলে কি করে? ফেসবুক ব্যবহার করে। মোদ্দাকথা, এটা ফেসবুক চালিত অগ্রগতি। যদি এটা এখন ফেসবুকের কারণে হয়ে থাকে তাহলে কাল যে অন্য কিছু চালিত হবে না তা তো বলা যায় না।

আমি শিক্ষাক্ষত্রে যে কাজ করতে চাই সেখানে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। একটা হচ্ছে অবকাঠামোগত। যেখানে আমার কিছুই করার নেই। এখনও বেশিরভাগ পরিবারে ইন্টারনেট নিয়ে জুজুর ভয় আছে। ছাত্রদের আমরা ইন্টারনেট দেব কি দেব না তা নিয়ে জুজুর ভয় কাজ করে। ইন্টারনেট থেকে সেবা নেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই।

আমি শিক্ষাক্ষত্রে যে কাজ করতে চাই সেখানে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। একটা হচ্ছে অবকাঠামোগত। যেখানে আমার কিছুই করার নেই। এখনও বেশিরভাগ পরিবারে ইন্টারনেট নিয়ে জুজুর ভয় আছে। ছাত্রদের আমরা ইন্টারনেট দেব কি দেব না তা নিয়ে জুজুর ভয় কাজ করে। ইন্টারনেট থেকে সেবা নেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই।

ই-কমার্স মাত্র শুরু হয়েছে। তার মানে এর জন্য শিক্ষার খুব দরকার। তাই এসব জায়গায় যারা ব্যবসা করতে আসবে তাদের দীর্ঘ মেয়াদে চিন্তা করেই আসতে হবে। এগুলো খুব কম সময়ের মধ্যে লাভ দেবে না। সমস্যাটা হচ্ছে, যারাই এই সেক্টরে আসে তারাই ভাবে, একটা ওয়েবসাইট বানিয়ে দিলাম আর আমার কাজ শেষ। কোনও কিছুই আসলে এতটা সহজ নয়। এখানে নিজের জায়গাটা বুঝতে হবে, ডেডিকেশন থাকতে হবে। ফল আসবেই।

বাংলা ট্রিবিউন: চ্যাম্পস২১ ডট কম নিয়ে অাপনার পরিকল্পনা জানতে চাই।

রাসেল টি. আহমেদ: চ্যাম্পস২১ ডট কম মূলত দু'টি কাজ করে। এটি ছাত্রদের জন্য ফ্রি পোর্টাল। আমি এবং আমরা সবাই আজ যে জায়গায় তা স্থানীয়ভাবে প্রতিযোগিতা করেই এসেছি। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের মত ভাগ্যবান হবে না। আমাদের সন্তানদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে তারা কি এটার জন্য রেডি? আমাদের সন্তানরা পাশের দেশের ছেলেমেয়েরা যে সুযোগ পায় তা কি পাচ্ছে? আমাদের সন্তানদের ২১ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তৈরি করে দিতে চ্যাম্পস২১ ডট কম কাজ করছে। 'চ্যাম্পিয়নস ফর টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি' থেকেই চ্যাম্পস২১ ডট কম নামটা এসেছে।

পাশাপাশি আমাদের একটি স্কুল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার রয়েছে। যার নাম ডায়েরি২১। এটা চ্যাম্পস২১ -এর পণ্য। আমরা শিশুদের স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে কী খাবে সব বিষয়ে কথা বলি। এই প্রজেক্ট নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে গ্লোবালই যাওয়ার। আমরা ইতিমধ্যে অনেকগুলো দেশের সঙ্গে কথাও বলছি। খুব শিগগিরই হয়তো আমরা দেশের বাইরে কার্যক্রম শুরু করব। ইউরোপ, আমেরিকাকে মাথায় রেখে এগুচ্ছি।

এই প্রজেক্টে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, বাংলাদেশে যেহেতু এমন কাজ কেউ করছে না তাই কোথাও থেকে শেখার কোনও সুযোগ ছিল না। যা করছি তা নিজেই। তাই আমরা গ্লোবাল কার্যক্রমকেই আইডিয়াল হিসেবে নিয়েছি। আমাদের ডায়েরি২১ একটি 'গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড প্রোডাক্ট' হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এটি নিয়ে অামরা আত্মবিশ্বাসী। চলতি বছরেই এটি কম খরচে স্থানীয় বাজারে পাওয়া যাবে।

বাংলা ট্রিবিউন: 'স্পেলিং বী' বিষয়য়ে জানতে চাই।

রাসেল টি. আহমেদ: 'স্পেলিং বী' শুরু করি ২০১২ সালে। মানুষ আমাকে প্রশ্ন করেছে, আপনি আমেরিকান ফরম্যাটে করছেন, আমাদের বাচ্চারা কী পারবে? কিন্তু ফলাফল এখন সবার সামনে।

আমাদের বাচ্চারা খুব ভালো পারে। এটা ইংরেজি শেখার কোনও ফ্ল্যাটফর্ম নয়। এটি লিডারশিপ স্কিলকে ডেভেলপ করে। একটি বাচ্চা এত ক্যামেরা, এত মানুষের সামনে সময় মতো জবাব দিতে পারছে কি না তা ডেভেলপ করে।

আমাদের সময়ে আমরা যেমন বিভিন্ন শিক্ষণীয় টিভি প্রোগ্রাম পেতাম, বিতর্ক প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে নানান ধরনের অনুষ্ঠান হতো। এখন এসব নেই বললেই চলে। ওই চিন্তা থেকে 'স্পেলিং বী' করা হয়েছে। এর সাফল্য অসাধারণ। সবাই এটাকে খুব ভালোভাবে নিয়েছে।

স্পেলিং বী যখন টিভিতে দেখানো হয় তখন নিউজের পরেই এটার টিআরপি থাকে। এটা স্কুলের বাচ্চাদের কাছে খুব সমাদৃত। আমার সবচেয়ে বড় সাফল্য মনে হয়, বেশ কিছু স্কুলে এখন পরবর্তী স্পেলিং বী’কে সামনে রেখে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

প্রথম বছর স্পেলিং বী'তে অংশ নেয় ৯৫ হাজার, দ্বিতীয় বছর ২ লাখ দুই হাজার, তৃতীয় বছর ২ লাখ ৭৬ হাজার ছাত্র-ছাত্রী। এই পুরো গ্রুপটাকেই প্রথমে চ্যাম্পস টোয়েন্টি২১ ডটকমে এসে একটা 'স্পেলিং গেম' খেলতে হয়। মানে হচ্ছে, তিন লাখ শিক্ষার্থী চ্যাম্পস২১ ডট কমে আসে। এমনও উদাহরণ আছে আমাদের কাছে যে, বাচ্চারা সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে গেমটা খেলে। বাবা-বা তাদের সারা বছর ইন্টারনেট দেয় না। ওই একমাসের জন্য দেয় যাতে সে ওই গেমটা খেলতে পারে। আমরা কিন্তু ফরমভিত্তিক রেজিস্ট্রেশন করিনি। আমরা ইন্টারনেটভিত্তিক রেজিস্ট্রেশন করেছি। এভাবেই চ্যাম্পস২১ ডট কম কাজ করে।

প্রথম বছর স্পেলিং বী'তে অংশ নেয় ৯৫ হাজার, দ্বিতীয় বছর ২ লাখ দুই হাজার, তৃতীয় বছর ২ লাখ ৭৬ হাজার ছাত্র-ছাত্রী। এই পুরো গ্রুপটাকেই প্রথমে চ্যাম্পস টোয়েন্টি২১ ডটকমে এসে একটা 'স্পেলিং গেম' খেলতে হয়। মানে হচ্ছে, তিন লাখ শিক্ষার্থী চ্যাম্পস২১ ডট কমে আসে। এমনও উদাহরণ আছে আমাদের কাছে যে, বাচ্চারা সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে গেমটা খেলে। বাবা-বা তাদের সারা বছর ইন্টারনেট দেয় না। ওই একমাসের জন্য দেয় যাতে সে ওই গেমটা খেলতে পারে। আমরা কিন্তু ফরমভিত্তিক রেজিস্ট্রেশন করিনি। আমরা ইন্টারনেটভিত্তিক রেজিস্ট্রেশন করেছি। এভাবেই চ্যাম্পস২১ ডট কম কাজ করে। 

বাংলা ট্রিবিউন: আমাদের দেশে যেসব কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে এগুলোর আন্তর্জাতিক চাহিদা কেমন?

রাসেল টি. আহমেদ: বাংলাদেশ নিজেই অনেক বড় একটা মার্কেট। ১৬ কোটির দেশে যদি ৩-৪ কোটিও নেট ব্যবহার করে তাহলেও তা অনেক বড় মার্কেট। যে উদ্যোক্তাই আসুক, তারা এই মার্কেটের কথাই ভাবে। আর বাংলাদেশের মার্কেট যেকোনও অন্য মার্কেটের চেয়ে বড়।

গ্লোবাল মার্কেটে যখন যেতে হবে তখন তাকে আসলে প্রথম থেকেই গ্লোবাল-ই ভাবতে হবে। আমরা চ্যাম্পস২১- এ প্রথম থেকেই তিনটি বিষয়ে কাজ করছি। বিজ্ঞান গণিত অার ইংরেজি। এই তিনটিই বৈশ্বিক বিষয়। আপনি সব জায়গাতেই এগুলো পাবেন। আমি কাজগুলো এভাবে ডেভেলপ করেছি, আমি যখন যে মার্কেটে যাই না কেন আমি পুরো সিস্টেমকে ওই ভাষায় কনভার্ট করে ফেলতে পারব। আমরা গ্লোবাল-ই যাব। সেটা ২ বছর পর হোক আর ১০ বছর পরে হোক আমরা যাচ্ছি। আমরা আসলে প্রথম থেকেই গ্লোবাল-ই কনসার্ন ছিলাম।

বাংলা ট্রিবিউন: কনটেন্ট নিয়ে যারা কাজ করে তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

রাসেল টি. আহমেদ: এমন কিছু নিয়ে কাজ করেন যা আপনি পুরোপুরি বোঝেন। 'টেকনোলজি'তে উদ্যোক্তা দুই ধরনের হয়। এক. যিনি নিজে টেকনোলজি বোঝেন। দুই. যিনি ব্যবসায়ী। আমি সবসময় টেক মার্কেটিং-ই করেছি। যখন আমার সঙ্গে ১৫ জন প্রোগ্রামার কাজ করে তখন আমি প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজটা লিখতে না পারি বুঝতে কিন্তু অামাকে হবেই।

আমাকে প্রোগ্রামারদের সাইকোলজি বুঝতে হবে। টেকনোলজিতে উদ্যোক্তা যিনিই হবেন, তিনি 'টেক'র হলে তাকে মার্কেটিং বুঝতে হবে আর ব্যবসায়ের হলে টেকে কতটা বোঝেন তা জানতে হবে। যে জায়গায় কাজ করবেন সেটা সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান থাকতে হবে। জানতে হবে টার্গেট মার্কেট, প্রতিযোগী কে কে। এসব বিশ্লেষণ করে ফেলা উচিত।

অার উদ্যোক্তা বই পড়ে হওয়া যায় না। আমি চলমান উদ্যোক্তা গড়ার প্রক্তিয়াগুলোর বিরুদ্ধে। উদ্যোক্তা হলো প্রাকৃতিক। জোর করে উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করে যদি আপনি দুই তিন বছর পরে ফেল করেন তাহলে আপনাকে কেউ চাকরিতে নেওয়ার আগে তিনবার ভাববে। তাই যারাই এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি একটা প্রজন্ম নষ্ট করবেন না।

কারণ একবার ব্যবসায়ের ক্ষতি জীবনকে ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেয়। শুরুটা তাকেই করতে দেন। প্রাকৃতিকভাবে ব্যবসা করার সাহস থাকলে একটা লেভেল পর্যন্ত নিজেকেই আসতে দেন। তারপর সহায়তার মাধ্যমে তাকে এগিয়ে নিন।

অার উদ্যোক্তা বই পড়ে হওয়া যায় না। আমি চলমান উদ্যোক্তা গড়ার প্রক্তিয়াগুলোর বিরুদ্ধে। উদ্যোক্তা হলো প্রাকৃতিক। জোর করে উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করে যদি আপনি দুই তিন বছর পরে ফেল করেন তাহলে আপনাকে কেউ চাকরিতে নেওয়ার আগে তিনবার ভাববে। তাই যারাই এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি একটা প্রজন্ম নষ্ট করবেন না। 

বাংলা ট্রিবিউন: সবার জন্য ব্রডব্যান্ড- কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হবে?

রাসেল টি. আহমেদ: আজ থেকে সাত বা আট বছর আগে আমরা ইন্টারনেটে কী করতাম? ই-মেইল আর গুগলিং। অাপনি হয়তো বাসায় ইন্টারনেট নিতেন না। কারণ ই-মেইল আর গুগল আপনার বাসায় প্রয়োজন ছিল না।

আপনি বাসায় ইন্টারনেট নেওয়া শুরু করলেন অনেক পরে এসে। আপনি নিয়েছেন কারণ আপনার কমিউনিকেশন ডেভেলপ করেছে। আপনি এখন মোবাইলে নিয়েছেন কারণ আপনার যোগাযোগ আরও দ্রুত দরকার হয়েছে। নতুন তো এসেছে ফেসবুক।

আজকে যে ছাত্রের চাকরির দরকার হয় সে বাসায় ইন্টারনেট রাখে কারণ তাকে চাকরি অনুসন্ধানের সাইটে যেতে হবে। আজকে যদি ছাত্ররা উপলব্ধি করে 'আমাকে লেখাপড়ার জন্য চ্যাম্পস২১ ডট কমে যেতে হবে' আপনি তাকে আটকাতে পারবেন না। ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়বে অভাব বা প্রয়োজন থেকে।

আজ থেকে কয়েক বছর আগেও আমাদের নারীরা বাসায় ইন্টারনেট ব্যবহার করত না। কারণ তার প্রয়োজন ছিল না। এখন তার ঘরে বসেই জিনিসপত্র কেনার জন্য ইন্টারনেটের দরকার। সামাজিক যোগাযোগের জন্য একজন মানুষের ইন্টারনেট প্রয়োজন। সবাই ফেসবুকে আছে- আমি নেই, এই অভাব থেকে ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে। এখানে কাজ হচ্ছে কনটেন্টের।

আপনি জীবনের জন্য দরকারি কনটেন্ট দিতে পারছেন কি না তা ভাবতে হবে। প্রয়োজন তৈরি করতে হবে। সে যা-ই হোক না কেন। কনটেন্ট কোম্পানিগুলোকে এ বিষয়ে অনেক উদ্ভাবনী ও দুরদর্শী হতে হবে। প্রয়োজন তৈরি করতে পারলে সরকার স্কুল পর্যন্ত ইন্টারনেট দিয়ে আসতে বাধ্য।

বাংলা ট্রিবিউন: কেমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন?

রাসেল টি. আহমেদ: আমি ভীষণ আশাবাদী মানুষ। গত ৪০ বছরে বাংলাদেশ যে জায়গায় এসেছে সেটা নিয়ে আমি অনেক খুশি। সবার নিজেকে জিজ্ঞাসা করা উচিত ৪০ বছরে বাংলাদেশ কোথায় যেতে পারত। তবে আমি আগামী ১০ বছরে গত ৪০ বছরের দ্বিগুন উন্নতি দেখতে চাই। এটা সম্ভব।মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ দেখতে চাই। জিডিপি ডাবল দেখতে চাই। বাংলাদেশ থেকে এমন কিছু পণ্য তৈরি হতে দেখতে চাই যেগুলো বিশ্বে নেতৃত্ব দেবে।

আমি ভীষণ আশাবাদী মানুষ। গত ৪০ বছরে বাংলাদেশ যে জায়গায় এসেছে সেটা নিয়ে আমি অনেক খুশি। সবার নিজেকে জিজ্ঞাসা করা উচিত ৪০ বছরে বাংলাদেশ কোথায় যেতে পারত। তবে আমি আগামী ১০ বছরে গত ৪০ বছরের দ্বিগুন উন্নতি দেখতে চাই। এটা সম্ভব।মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ দেখতে চাই। জিডিপি ডাবল দেখতে চাই। বাংলাদেশ থেকে এমন কিছু পণ্য তৈরি হতে দেখতে চাই যেগুলো বিশ্বে নেতৃত্ব দেবে।

বাংলা ট্রিবিউন: সময় দেওয়া এবং তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখানোর জন্য অাপনাকে ধন্যবাদ।

রাসেল টি. আহমেদ: বাংলা ট্রিবিউনকেও অনেক ধন্যবাদ।

শ্রুতিলিখন: এম. এম. রহমান 

/এইচএএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।