সন্ধ্যা ০৬:৩০ ; রবিবার ;  ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯  

প্রসঙ্গ তপন রায়চৌধুরী : মহাশয় পুরাণ || মিহির সেনগুপ্ত || পর্ব : এক

প্রকাশিত:

কথাসূত্র

 

যাঁকে দেখে বা বুঝে তাঁর বিষয়ে পুরাণালেখ্য রচনা করা যায়, তাঁকে ততটা দেখা, বোঝা, জানা বা তাঁর বিষয়ে অধ্যয়ন করা আমার ভাগ্যে ঘটেনি। আমার জানা, শোনা, বোঝার কালটি মাত্র বাইশ বছর কালের মধ্যে সীমিত। তত্রাচ, এই সময়কালটা নশ্বর মানবজীবনের পক্ষে খুব একটা সামান্য সময় নয়। অধ্যাবসায়ী, অধ্যয়নশীল তথা সন্ধিৎসু মানুষ এরই মধ্যে অসাধ্য সাধন করতে পারে। আমি ওই সব গুণবঞ্চিত মানুষ, ফলে, আমার পক্ষে তা হয়নি। এখন তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন। বয়সের জড় আমাকেও উদ্যম, উদ্যোগ এবং বলহীন করে ফেলেছে। এরকম অবস্থায় একমাত্র স্মৃতিনির্ভর সামান্য কিছু গালগল্প বা রঙ্গ-রসিকতার কথকতা ছাড়া, বিশেষ কিছুই পাঠকদের সামনে হাজির করতে পারব না। সেসবও খণ্ডছিন্ন বিক্ষিপ্ত রূপই পাবে। কারণ, চরিত্রগতভাবে আমি অগোছালো। তাই ভাবছি, মহাশয়কে অবলম্বন করে, পুরাণ কথার ঢংয়ে আমার কথন নিবেদন করব। মহাশয়ের নাম তপন রায়চৌধুরী, যিনি সম্প্রতি অন্তর্ধান করেছেন। কোথায়, তা আমরা জানিও না, আন্দাজও করতে পারি না।
তাঁর বিবৃতি মতে, তাঁরা তিন পুরুষের নাস্তিক। নচেৎ বলতে পারতাম, তিনি স্বর্গে গেছেন। কিন্তু যে মানুষটি ঈশ্বর, পরলোক, স্বর্গ, নরক কিছুতেই বিশ্বাসী নন, তিনি সেসব স্থানে কিভাবে যাবেন? নরকে যাবার জন্য অবশ্য এই গ্রহটি ছেড়ে কোথাও যাওয়ার দরকার আছে বলে মননশীল ব্যক্তিদের কেউই বলবেন না। মহাশয় নিজেও বলতেন না। তাই ধরে নিয়েছি তিনি আছেন, শুধু সামনে আর আসবেন না।
মহাশয় অতীব নামী, দামি বিদ্বান এবং ধীশক্তিসম্পন্ন মানুষ বলে সারস্বত মণ্ডলে বন্দিত। তাঁর বিষয় ছিল ইতিহাস নিয়ে অধ্যয়ন, চর্চা এবং অধ্যাপনা। তদ্বিষয়ে ব্যাপক রচনাদি স্বয়ং এবং বিশ্ব-বিদ্বজনদের সমভিব্যাহারে তিনি করেছেন। সেসব ইংরেজি ভাষায় এবং সেখানে দাঁত ফোটাবার সামর্থ্য পুরাণের দেবতা বা জ্ঞানচর্চার দেবী আমাকে দেননি। আমাদের মত নিম্নমেধার প্রান্তিক গোত্রীয় কিছু মন্দভাগ্য জ্ঞান প্রত্যাশী মানুষদের জন্য অনুগ্রহ করে, তিনি মাত্র তিনখানা গ্রন্থ জীবন সায়াহ্নে বাংলা ভাষায় নির্মাণ করে গেছেন। তা-ই আমাদের জন্য অনেক। আমার এই মহাশয় পুরাণের উপজীব্য সেই গ্রন্থতয় অংশ এবং স্বকীয় সদগুরু সঙ্গ জনিত স্মৃতি বিদ্বজ্জনের উদ্গীরণ মাত্র। এর অধিক পাঠক কিছু প্রত্যাশা করবেন না। প্রসঙ্গত আর একটি চেতাবনি দিয়ে রাখি। অধম অতি কথন দোষযুক্ত বাচাল শিরোমণি তথা একই কথনের পুনরাবৃত্তি বিষয়েও বেখেয়াল। তবে কিনা পুরাণ কথনে সাধারণত এটিকে দোষ বলে গণ্য করা হয় না, পরন্তু এটি তার গঠনশৈলি হিসেবেই গণ্য। আরও একটি কথা বলে রাখি, যদিও তিনটি গ্রন্থের উল্লেখ করেছি, কিন্তু সে সবের পাছে অবমাননা হয়, সেহেতু সেখান থেকে সামান্যই সাহায্য গ্রহণ করেছি। মহাশয় শব্দ এবং বাক্যশাস্ত্রের অনন্তসার অতিক্রম করেছিলেন। একই শব্দবাক্য একাধিক মঞ্চে পরিবেশনের একঘেয়েমি ব্যাধিদুষ্ট তিনি ছিলেন না। তাঁর মস্তিষ্ক সীমা সংখ্যাহীন কথা, উপকথা, আকথা, কুকথা তথা মহৎকথার গল্পে ঠাঁসা থাকত। মঞ্চ অনুযায়ী তাঁর ব্যবহারে তিনি পারঙ্গম ছিলেন।
সমস্যা এই যে তাঁর নিজের বিষয়ে হেন কথা নেই যা তাঁর রোমন্থন, বাঙালনামা এবং প্রবন্ধ সংগ্রহ- এই গ্রন্থত্রয়ে নেই। অতএব তাঁর বিষয়ে ‘পুরাণকথা’ আমাহেন মর্কট আর কতটা বলতে পারব। তবু গোটা বাইশ বছর ধরে, বছরে একবার দুবার সেই সদগুরু সঙ্গের এতো কিছু স্মৃতি প্রবহণ থাকে। তাই সেইসব অবলম্বনে এই পুরাণালেখ্য। সুশীল, সুভদ্র পাঠকদের জানাই, “বুড়ো বয়সে সঙ সেজে রং কত্তে হল। পূজনীয় পাঠকগণ বেয়াদপি মাফ কর্বেন।”
হয়ত, আধুনিক সারস্বত সৃজনশীলদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে কিঞ্চিৎ গ্যাঁজলাধর্মী কথাকথনে মহাশয় বা তাঁর পিতৃপুরুষদের চারিত্রিক ‘এদিক-সেদিকের’ কাণ্ডকারখানা বিন্যাস করতে পারতাম, কিন্তু মহাশয় তাঁর সুভদ্র-নিরুক্তিতে সেসবও যথাযথ কীর্তন করে রেখেছেন। পাঁক ঘাঁটতে হয়নি। আমার পাঠশক্তি শিক্ষার পৌষ্টিকতন্ত্র-সমৃদ্ধ না হলেও গুরুভক্তি প্রবল। গীতায় জ্ঞানানুবাদ আছে, আত্মা- ‘ন মেধা ন বহুশ্রুতেন লভ্য।’ ‘আত্মা’ কথাটিকে সদগুরু ‘রুচি অর্থে গ্রহণ করতে শিখিয়েছিলেন। সেকারণে, রুচি বিসর্জন দিতে পারলাম না।
অতঃপর পুরাণকথা শ্রবণ করুন।

এক.
আমার এক মাস্টার মশাই ছিলেন। তাঁর কাছেই সর্বপ্রথম আমি তপন রায়চৌধুরীদের পরিবার বিষয়ে কিছু তথ্য অবগত হই। সেই তথ্যে তপন বাবুর বিষয়ে খুব বেশি কথা ছিল না। বরং ছিল রোহিনী সেন বা রোহিনী রায়চৌধুরী মশাইয়ের বিষয়ে ব্যাপক উচ্ছ্বাসপূর্ণ কাহিনী। রোহিনী বাবু তপন বাবুর বড় ঠাকুর্দা। মহাশয় নানা গুণে গুণবান এবং একজন প্রকৃতই বিদ্বজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু তপন বাবু তাঁর বিষয় খুব বেশি কিছু তাঁর লেখায় উল্লেখ করেননি। আমার এই রচনাটিতেও তাঁর ভূমিকা তেমন নেই। তবে মাস্টার মশাইয়ের কাছ থেকে বাল্য কৈশোরে যেসব তথ্য পেয়েছিলাম, তপন বাবুর সম্পর্কে লিখতে বসে সেসব প্রাসঙ্গিকভাবেই আসছে। যদিও আমি চাইছি তপন বাবুর উপর একটি ব্যক্তিগত রচনা নির্মাণ করতে, কিন্তু সেই সূত্রে মাস্টার মশাই এবং রোহিনী কুমারের প্রসঙ্গ এসেই গেল।
মাস্টার মশাই অশ্বিনী কুমার দাশগুপ্ত ছিলেন আমাদের এই অঞ্চলের সবচেয়ে একজন বিদগ্ধ ব্যক্তি। ইতিহাস, সংস্কৃত এবং ইংরেজি- এই তিনটি বিষয়ে তিনি সেই যুগে এম.এ পাস তথা সুপণ্ডিত ছিলেন। আমাদের ইস্কুলের রেক্টর ছিলেন তিনি। বস্তুতই আমাদের বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থানটি ছিল অধিশিক্ষক বা অধিপুরুষ হিসেবেই। চিরকুমার। একমাত্র জ্ঞানচর্চা বা শিক্ষকতা ব্যতিত অন্য কোনও কর্মেই তাঁর রুচি ছিল না। ইস্কুলের কাছ থেকে তিনি কোনও পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন না। কিছু পৈত্রিক জমিজমা ছিল। তার ফসলে, একা মানুষ, মাস্টার মশাইয়ের দিব্য চলে যেত। তাঁর একমাত্র কাজ ছিল অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা।
১৯৬২ সালের এক প্রলয়ংকরী ঝড়ে আমাদের এই বিদ্যালয় ভবনটির কাঠ ও টিনের তৈরি তিনটি ঘরই ধুলিস্যাৎ হলে, ইস্কুলটি সাময়িকভাবে তপন বাবুদের প্রাসাদের একটা অংশে স্থানান্তরিত হয়। প্রাসাদের যে অংশে ইস্কুলটি নেওয়া হয়েছিল সেটি পিছনের দিক এবং অপেক্ষাকৃত নতুন। সেই অংশটিই তপন বাবুদের বাসস্থান ছিল, যদিও তাঁদের পরিবার সেখানে নিয়মিত বসবাস বিশেষ কোনও কালেই করতেন না। তাঁরা থাকতেন বরিশাল শহরের পূর্ব উপান্তের স্টিমার ঘাটের কাছে তাদের বিখ্যাত লজ-এ। এসব বৃত্তান্ত তপন বাবুর লেখা বাঙালনামায় সবাই পাবেন। তথাপি আমার দেখা মত খানিক বলছি।
যখনকার কথা বলছিলাম তখন আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেছে। ফল বেরোয়নি। মাঝে মাঝে মাস্টার মশাইদের কারুর অনুপস্থিতি ঘটলে দুএকটা ক্লাস নিতাম। এরকম এক দিনে, শুনলাম, পাশের ক্লাসটিতে উচ্চঃস্বরে মাস্টার মশাই হেমচন্দ্র আবৃত্তি করে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াচ্ছেন। নিজের ক্লাস ছেড়ে তাঁর ক্লাসে গিয়ে বসে পড়লাম। সম্প্রতি অতিক্রান্ত বৃদ্ধ মহা খুশি। বললেন, হেমচন্দ্র শুনতে এসেছ? বড় ভাল- বেশ ভাল। আসলে এদের বলছিলাম কী জান? বলছিলাম, এই প্রাসাদের দোতলায় এইসব ঘরে কোনওদিন ক্লাস করব এমন ভাবিনি। কি ছিল, আর কী হল:
দোর্দণ্ড প্রতাপ আজি কোথায় সে রোম
কাঁপিত যাহার তেজে মহীসিন্ধু ব্যোম-
...গিরিস আঁধারে আজ পোহাইছে রাতি,
এই কী কালের গতি, এই কী নিয়তি?
তবে এই ঘরের বাসিন্দা কেউ কেউ জ্ঞানচর্চার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব বলে জানি। তাই প্রবেশ হল।’ মাস্টার মশাইয়ের আগ্রহাতিসয্যেই রোহিনী বাবুর লাইব্রেরি কক্ষ থেকে ততদিনে আমাদের ইস্কুল লাইব্রেরিতে স্থানান্তরিত তাবৎ গ্রন্থাদির সঙ্গে গিবন্স-এর Fall of Roman Empire-এর খণ্ডগুলোর সঙ্গে আমাদের কারুর কারুর পরিচয় ঘটেছিল। মাস্টার মশাইয়ের হেমচন্দ্র উচ্চারণ, ক্লাস কক্ষটির প্রাক্তন নিবাসীদের বিষয়ে নানান স্মৃতি আলোচনা, রোহিনী কুমারের নানা কীর্তি কাহিনী এবং জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন অভিজ্ঞানের উপস্থিতি- সব মিলে কী রকম যেন আচ্ছন্ন লেগেছিল সেদিন। মাস্টার মশাইয়ের কাছে সর্বক্ষণের গুরুগৃহবাসের সৌভাগ্য ঘটেছিল আমার অন্তত দুই বছর কাল। ক্লাস নাইন এবং টেনে পড়াকালীন। মেট্রিক ফাইনাল পরীক্ষার কয়েক দিন মাত্র আগে চলে এসেছিলাম বাড়ি। পরীক্ষার পরেও, মাঝে মাঝে তাঁর বাড়িতে দু’একদিন কাটিয়ে আসতাম। উদ্দেশ্য নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা। তার মধ্যে কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ির ইতিকথা বিষয়ক নানান বৃত্তান্তও তিনি খুব বলতেন। তপন বাবুর প্রসঙ্গ তখন তেমন ওঠেনি। উঠেছে তাঁর বাবা চাঁদ বাবু অর্থাৎ অমিয় বাবুর কথা, তাঁদের বংশের কথা। ইতিহাস এবং কিংবদন্তির মিশ্রণে সেই বংশকথা ব্যাপক তথা রোমাঞ্চকর।
ইস্কুল শেষে মাস্টার মশাইয়ের আগ্রহে সেদিন তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলাম। অনেক পুরোনো কথা হয়েছিল। মাস্টার মশাইয়ের কাছে তপন বাবুর ঠাকুর্দা বিনোদ কুমার, বাবা অমিয় বাবু এবং সবচাইতে বেশি তপন বাবুর বড় ঠাকুর্দা রোহিনী কুমারের জ্ঞান চর্চার নানান বৃত্তান্ত শুনেছিলাম। তপন বাবুর ঠাকুর্দায়েরা চার ভাই ছিলেন। চার ভাইয়ের মধ্যে জ্ঞানচর্চার জন্য স্বল্পজীবী রোহিনী কুমারই মাস্টার মশাইয়ের বিশেষ শ্রদ্ধাভক্তির পাত্র ছিলেন। মাত্র সাঁইত্রিশ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তাঁর পিতা প্রসন্নকুমার একটি মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। রোহিনী কুমার সেই বিদ্যালয়টিকে ১৯০৫ খ্রি. উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে উন্নীত করেন। শিক্ষা বিস্তারের ব্যাপারে তিনি সেই যুগে ওই রকম গ্রামীণ পরিবেশে যে তৎপরতা দেখান, তা রীতিমত শ্লাঘার বিষয়। তখনও টোল চতুষ্পাঠির যুগ। রোহিনীবাবু আশপাশ বহু গ্রামের টোল, চতুষ্পাঠির উন্নতিকল্পেও পণ্ডিতদের প্রতিপালনের নিয়মিত বন্দোবস্ত করেছিলেন।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে রোহিনী কুমার ইতিহাস এবং সাহিত্যচর্চা, ফটোগ্রাফি চর্চা, একটি অসামান্য পুস্তকালয় প্রতিষ্ঠা তথা নানা জনহিতকর কর্মে যশশ্বী হয়েছিলেন। মাস্টার মশাই বলেছিলেন যে তৎকালীন ধর্ণাঢ্য জমিদার পরিবারের ব্যক্তিরা প্রায়শই বিলাসী এবং ইন্দ্রিয়পরায়ণ হয়ে অকালে গতায়ু হতেন। রোহিনী কুমার কিন্তু বিলাসী ছিলেন না। তিনি প্রকৃতই একজন ব্যতিক্রমী মানুষ ছিলেন। জ্ঞানচর্চায়ই মূলত, তাঁর প্রধান বিলাস ছিল।
তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে ‘বাকলা’ নামক বরিশালের ইতিহাস গ্রন্থটি স্থানীয় ইতিহাস চর্চার একখানি আকরগ্রন্থ হিসেবে আজও গ্রাহ্য। এছাড়া বঙ্কিমি ধারায় তাঁর বেশ কয়েকখানি উপন্যাসও আমরা সেকালে আমাদের ইস্কুলজীবনে পড়েছি। তার মধ্যে হেমলতা, নরেন্দ্রনন্দিনী, চণ্ডিবিক্রম, প্রমোদবালা, চিতোর উদ্ধার ইত্যাদির নাম আজও মনে আছে। এছাড়া পারিবারিক ইতিহাস হিসেবে ‘আমার পূর্বপুরুষ’ গ্রন্থখানিও সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তবে সেই বইটি আমার দেখার সৌভাগ্য হয়নি।
তপন বাবুর বিষয়ে এই লেখাটি লিখতে গিয়ে এই প্রেক্ষাপটটি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলাম। আমার মনে হয়, তপন বাবু তাঁর বাঙাল নামায় যদিও তাঁর পিতামহ বিনোদ কুমারের সবিশেষ উল্লেখ ও আলোচনা সঠিকভাবেই করেছেন, কিন্তু রোহিনী কুমার সম্ভবত তাঁর ইতিহাস বিদ্যা চর্চার আগ্রহের প্রধানতম বীজপুরুষ। শুধু ইতিহাস চর্চারই নয়, বিবিধ জ্ঞানচর্চার স্বভাবচিত্ত মনে হয় তপন বাবু তাঁর বড় ঠাকুরদার কাছ থেকেই উত্তরাধিকার সূত্র হিসেবে লাভ করেছেন। সেটা রোহিনী কুমারের পুত্রদের বা সরাসরি প্রপৌত্রদের বিষয়ে শুনিনি। অবশ্য আমি তাঁদের বিষয়ে বিশেষ কিছু জানিই না।

দুই.
এবার সরাসরি তপন বাবুর বিষয়ে আসি। শুরুতেই বলে রাখা ভাল, এই বিষয়টি নিয়ে আমি একটু লঘুছন্দে বিচরণ করতে চাই। মহাশয় মানুষ তিনি, তাদৃশ ব্যক্তিদের বিষয়ে লিখিত দু’কথা নিবেদন করতে হলে, পেটে বেশ খানি এলেম রাখতে হয়। কিন্তু গরীবের ছেলে, তালেব এলেম নিয়ে কোনও কালে মাথা ঘামাইনি। লোকমুখে বা কপালগুণে কোনওভাবে ব্যক্তিগত সংযোগ হলে, দুচার কথা জেনে ফেলি। লোকমুখে শুনেছিলাম, তপন বাবু তাবড় তাবড় বই লিখেছেন ইতিহাস বিষয়ে। কিন্তু সেসব ইংরেজি ভাষায়। ফলে, তা নিয়ে মাথা ঘামাইনি। সাধ করে কে আর কষ্ট সহ্য করতে যায়। ইতিহাস কোনওকালে আমার বিষয় নয়।
মহাশয় একখানা গদ্য রচনা করেছিলেন বাংলায় ১৯৯২ এর শারদীয়া দেশ পত্রিকাটি যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা যে সেই রচনাটি আস্বাদ করেছেন, সে বিষয় সন্দেহ নেই। সেই লেখাটি পড়ে বড় আমোদ হয়েছিল। কিন্তু লেখাটি কী রকম যেন পোঁচোয় পাওয়া মনে হয়েছিল। এসব ক্ষেত্রে যে ‘ভালর অল্পও ভাল’ প্রবচনটি খাটে না, রসিকজন নিশ্চিতই তা স্বীকার করবেন। মনে হয়েছিল যেন নেমন্তন্নো করে ভোজনের আয়োজনটা সিন্দাবাদের ভোজের গল্পের মত সারলেন। নেমন্তন্নো বাড়িতে পরিবেশনে যে ‘যাচাই’ করা বলে একটি রীতির চল আছে, সেটি যেন তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন। অতৃপ্তি থেকে গিয়েছিল। তবে কয়েকদিন পরে, সে খেদ ঘুচল। ওই রচনার একাংশ একদা আনন্দবাজার পত্রিকার এক রবিবাসরীয়তে প্রকাশিত হয়। পরে কিছু কালের মধ্যেই গোটা রচনাটিই একটি নিটোল তন্বী পুস্তক গতর পায়। নাম দেওয়া হয় ‘রোমন্থন অথবা ভীমরতি প্রান্তর পরচরিত চর্চা’। অতঃপর, অহো! মহাশয় অচিরে কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলে, পুস্তক বিক্রেতাদের কল্যাণে স্বয়ংই ভীমরতিপ্রাপ্ত উপাধিটি অর্জন করেন। পুস্তকখানি তাঁর প্রথম বাংলা রচনার প্রচেষ্টা এবং প্রথম ব্যাটিংয়েই ছক্কা। পরে দেখেছি, ছক্কা মারতে তিনি সেলিম দুররানি।
শারদ সংখ্যা দেশের ধরতাইটি পড়েই আমরা সদলে ধরাশায়ী হয়ে পড়েছিলাম। বই হয়ে তা যখন আবির্ভূতা হল, আমরা যেন এক নব্য তনুর আঁটোসাঁটো যুবতী সরস্বতীর সাক্ষাৎ পেলাম। সেই সময়, আমরা যারা মহাশয়ের ন্যাওটা তথা অযোগ্য ছাওয়াল, তারা গৌড়জনেদের তথা চন্দ্রদ্বৈপায়নেদের অসামান্য ‘কাউকানো’ (উল্লাস) উপভোগ করেছি।
যে মানুষ মহাজন, সাধক বা তপস্বী, তাঁদের নাকী স্ব স্ব সাধনা অনুযায়ী ‘ত্ব’ প্রাপ্তি ঘটে থাকে। যেমন ধরুন না কেন, কৃষ্ণত্ব, শিবত্ব, গোপীত্ব, রাধাত্ব বা এই সেদিনের পরমহংসত্ব ইত্যাদি। উনিশ শতক পর্যন্ত এরকম ত্ব-প্রাপ্ত অনেক মহাপুরুষের নমুনা পাওয়া গেছে। বিশ শতকে একমাত্র রবিঠাকুর আর গাঁধি ছাড়া কেউ কোনও রকম ত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন- এরকম দেখি না। অবশ্য রবিঠাকুরের বাপও ‘মহর্ষিত্ব’ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তবে তা উনিশ শতকের শেষের দিকের ব্যাপার এবং ব্যাপারটাতে তেমন সেকটেরিয়ানিজম এর গন্ধ থাকায় ওটা ঠিক সার্বজনিক হয়নি। তাছাড়া ভদ্রলোক সন্তান প্রজননে নাকি প্রায় ধৃতরাষ্ট্র। সুতরাং তাঁকে পূর্ণ মহর্ষিতে ত্ব যুক্ত করা যায়নি। ‘ত্ব’ প্রাপ্তির শর্ত হিসেবে সার্বজনীনতা অবশ্যই কাম্য। সেজন্য পৃথক এলেম দরকার। দেবেন বাবু তাঁর বাপের চরিত্রগত ইদিক-সিদিকের জন্য তা রপ্ত করতে পারেননি। তা বাপের দোষ থাকলে আর কী করা যাবে।
সুধীজন জানেন, রবিঠাকুর এবং মোহনদাস করমচাঁদ গাঁধির শুর্দ্ধেবত্ব এবং মহাত্মাত্ব প্রাপ্তির পশ্চাতেও নাকি পারস্পরিক পৃষ্ঠকন্তুয়ন যজ্ঞের বেশ বন্দোবস্তো ছিল। এই ব্যাপারটা একটা মস্তো এলেম। অবশ্য এসব কু-লোকে বলে। আমরা ‘পোলাপান’ মানুষ, অনেক দেরিতে পয়দা হয়েছি, সঠিক বলতে পারব না। আমাদের কালে এই প্রথম জ্ঞাত হলাম বা বলা ভাল প্রত্যক্ষ করলাম যে একজন ‘নেগাবান’ আদমজাদা একটা ‘ত্ব’ প্রাপ্ত হলেন।
বস্তুত, এই উপলক্ষ্যে, ১৯৯২ এর শরত চন্দ্রদ্বৈপায়নদের ‘বরিশালজাত’, তথা তাবৎ ‘বঙ্গাল বঙ্গীয়’দের সারস্বত দিদ্বিজয়ের শরত এবং মহাশয় সেই দিগ্বিজয়ের বীর বিক্রম কেশরী তথা বীজপুরুষ। নতুবা, একখানা মাত্র বাংলা কিতাব রচনার সাধনায় কারুর ত্ব-প্রাপ্তি ঘটে? এখন কথাটা হল, তাঁর ‘ত্ব’টা কী? সংক্ষেপে জানাই, ‘ত্ব’টা হচ্ছে ভীমরতি-ত্ব।
বাঙালির ‘ত্ব’ প্রাপ্তি বড় সহজ কথা নয়। তার উপর যদি তা আবার বাঙালের ক্ষেত্রে হয়, তাহলে তো কথাই নেই। ইতিহাস সাক্ষী বাঙালির প্রথম ত্ব প্রাপ্তি ঘটেছিল গোপালের সময়, যিনি পালদের ‘গোদা’ অর্থাৎ প্রথম উল্লেখযোগ্য বংশপুরুষ। জানা নেই ব্রাহ্মণ্য জাতি-বিন্যাসে তিনি তেলি পাল না কুম্ভকার পাল। তবে কার্যগতিকে মনে হয়, তাঁর অবস্থান ছিল ক্ষত্রিয় চরিত্র চর্যায়। তথাকথিত ক্ষত্রধর্মাশ্রয়ী মাৎস্যন্যায়ী সামন্তবর্গের কদাচারে তদানীন্তন বাঙালি প্রকৃতিপুঞ্জ নাকি গোপালকে মহারাজত্বে নির্বাচিত করে। সুতরাং বলা যায়, এ গোপাল অতি শিষ্ট ছাওয়াল ছিলেন না। তিনি বিদ্যাসাগরী বিধানে যা পেতেন, তাই খেতেন না, যা জুটত তাই পরতেনও না। তাঁর শরীর গতিক পোষ্টিকতন্ত্র এবং মনমানসিকতা দিব্য তন্দুরস্ত ছিল। সুতরাং সেই মহাশয় রীতিমত কর্ম এঁটে, খড়গ চর্ম ধারণ করে মাৎস্যন্যায়ী সুমুন্দির পো’য়েদের দেবস্থানে অর্থাৎ ‘সোগায়’ ‘চোতরা পাতা’ (বিচুটি) ঘষে দেওয়ার সুবন্দোবস্তো করে, তৎপর শিষ্ট হয়েছিলেন। তখন সেই বংশের প্রারম্ভিক শাসনকাল। সুতরাং এই গোপালের রাখালদের সঙ্গে বিলক্ষণ মাখামাখি ছিল। নচেৎ এমত প্রতাপ সম্ভবে না। ধর্মপাল, দেবপাল পর্যন্ত এই আত্মিক সম্পর্কটা প্রকৃতিপুঞ্জের সঙ্গে বজায় থাকার কারণে, পরবর্তীকালীন বোগদা-বিলাসী এবং অলস পালগোষ্ঠীরা করে খেতে পেরেছিল। জনগণসহযোগী থাকলে যা হয়। গৌড় বঙ্গের আদি ভূমি-পুত্র ধীবর কৈবর্তদের পোঁদে লাগতে গিয়ে পরবর্তী পালেরা যে গুখোড়িটা করল, তাই-ই তাদের ‘তিরপুনি’র ঘাটে পৌঁছে দিল। ‘তিরপুনির’ ঘাট বলতে, ত্রিবেণীর ঘাট- যেখানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। কিন্তু এইসব বাক্-বাত্তেল্লা নিছক আশকথা পাশকথা, বাহ্যকথা। মহাশয়ের বিষয়ে যখন এই বাচলামি, তখন ইতিহাস কথাকে এই আলোচনার উপজীব্য করা নিছক পাঁঠামো। শুধু গোপালের সঙ্গে মহাশয়ের একটি তাৎপর্যগত সিমিলি দেবার ঝোঁকেই এতসব বেসামাল বাকওয়াস।
সিমিলি তো শয়ে হাজারে কতই ছিল। ‘অলীক কুনাট্য রঙ্গ’, ‘চন্দ্রচুড় জটাজালে আছিলা যেমতি জাহ্নবী’ বলা যেত, ওগড়ানো যেত রবিঠাকুরের জুৎসই নানান পঙক্তি। কিন্তু সেসব দিকে যাওয়া সমীচীন বোধ হল না। মস্তিষ্কে গোপালদের এবং মহাশয়ের ভাবমূর্তি এমন effectually clustered হয়ে গেল যে ধর্মকর্ম খড়গের সিমিলিটাই আগে মনে এল। পাঠক, মহাশয় জাত্যংশে বাঙালস্য বাঙাল। আত্মজৈবনিক মহিমালিপির সূত্রে প্রথমেই ‘জাবর কাটা’ দিয়ে আরম্ভ করেছেন। প্রথমে খেয়াল ছিল না যে বিলেত প্রবাসী হওয়া সত্ত্বেও গেটের পাকস্থলিতে শাক-পাতা, কচু-ঘেচু, হাবড়-জাবড় মেলাই আছে। রোমন্থন বা জাবরকাটা ব্যাপারটা এমনিতেই সংক্ষেপে কারুরই হয় না, এতো বাঙ্গালের রোমন্থন- যার নির্গলিতার্থের রসকড়া ভাষ্য হিসেবে তিনি ‘পরচরিত’ চর্চা কথাটিও ব্যবহার করেছেন। তদুপরি ‘ভীমরতি প্রাপ্ত’ পদবিটাও স্বয়ংই ঘোষণায় রেখেছেন। সংক্ষেপ হবে কী করে? সুতরাং কালে-দিনে অন্তর্জগতে কুলকুন্তলিনী তথা বহিরঙ্গে রসলোলুপ জনগণ বাঙালকে বাঙালনামা নির্মাণ করতে বাধ্য করল। এবং ভো ভো পাঠকবৃন্দ, Lo and behold, মহাশয়ের পশ্চাদ্দেশে পাশ্চাত্য যতই ঘেঁটে থাকুক না কেন, ‘বঙ্গাল’ তথা বরিশালবৃত্তি সেই পাশ্চাত্যকে বিশ্ব-বাঙালায়িত করে ছাড়ল। বাঙাল-নামা ‘জাবরকাটতে কাটতে বা রোমন্থনের মাধ্যমে কীভাবে দুনিয়ানামা হল, সবাই তো প্রত্যক্ষ করলেন।
বাংলা সারস্বত সরসীতে, বিশেষত, ‘দেশ’ পত্রিকা নামক সাহিত্য সরোবরে বহুকালব্যাপী সাতিশয় মাৎস্যন্যায় চলছিল। সেই খোড় ছেচকি থোড়ের বড়া, চালতের অম্বল- (শ্লীলতার স্বার্থে পাদপূরণটি করলাম না) ইত্যাদির ক্রমান্বয়। সেই এক নারী, অগণ্য উপনারী, দ্বিকোণ্, ত্রিকোণ, চতুষ্কোণ প্রভৃতি প্রেমময় কাহিনী এবং গল্পের শেষে সুখ-শান্তি, তা যেন আর থামছিল না। এমত সময় বাংলার পাঠককুল একটা সাময়িক রিলিফ যেন পেলেন। প্রকৃতিপুঞ্জ মহাশয়কে নির্বাচিত করে প্রবল পিচ্ছিকা প্রহারে সারস্বত উদ্যানটিকে অনেকটাই জঞ্জালমুক্ত করার পথে এগিয়ে দিয়ে হুঙ্কার দিল- ‘বোচা মূহু কম্পিত দেবদারু’ বিনাদে।
কিন্তু বুদ্ধিজীবীরা অর্থাৎ বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা যেন ‘পোলাপানের ল্যাহান, অসতের ভাণ্ড।’ তাই পিছিকা, অর্থাৎ বরিশালি বিক্রমশালি ‘পিছা’ বা সম্মার্জনীও তাদের দুরন্ত করতে পারে না। সে কারণে তাঁরা খ্যাতামি করেই যাচ্ছেন। তাঁরা যেন সদলে মাৎস্যন্যায়ের ঠিকেদারি নিয়েছেন এবং গাঁধি মহারাজের কায়দায় খ্যাতামি জারি রেখেছেন। বুধজন (বুদ্ধিজীবী অর্থে নয়) জানেন, খ্যাতামি লড়াইয়ের একটা কৌশল। মহাশয় ক্ষাত্রবীর্যের লোক, খ্যাতামির কৌশল বিষয়ে প্রাকচিন্তা করেননি। তাই তাঁর প্রচেষ্টাটি সার্বিকভাবে ফলপ্রসূ হবার আগেই কাল তাঁকে হরণ করল। কর্মশালা কালকে ধিক।
কিন্তু মানুষ কিছু একা লড়াই করে না। এমনকি যাঁদের ভগবান বলে প্রচার করে আমরা গলা ফাটাই বা দাঙ্গা করি, সেই ভগবানেরা পর্যন্ত কালের প্রতিস্পর্ধী হবার জন্য সামান্য সাধারণের সহায়তার প্রত্যাশী হন। বিশ্বাস না হয়, রামায়ণ পড়ে, কাঠবিড়ালীর শ্রমটা দেখুন। রামবাবু সমুদ্রবন্ধনে তাদের সাহায্যও গ্রহণ করেছিলেন। নইলে অতবড় একটা ব্রিজ, তার আনাচ কানাচে, খোপে-খাপে কোথায় নাটবল্টু টাইট দিতে হবে, পারতেন কী করে? আমরা কাঠবিড়ালি দেখি, কী করা যায়। মহাশয়কে বীজপুরুষ ধরে আমরা তাই আরেকটি সাহিত্য প্রচেষ্টায় প্রয়াসী হয়েই দেখি না কেন?
ভাবলাম, মহাশয়ের যদি সত্যি সত্যি ‘ভীমরতিত্ব’ প্রাপ্তি ঘটেই থাকে তো উত্তম। ভীমরতিত্ব প্রাপ্তিও ত্ব-প্রাপ্তি বিষয়ে খুব সাধারণ কথা নয়। এর বিলক্ষণ একটা ব্যাপক ভবিষ্যৎ আছে। এই পন্থা অনুসরণে যদি একটা নতুন schooling গড়েও ওঠে, তা হয়ত কালে দিনে দিব্য একটা ‘বাদ’ হবে। বাদ বা ইজম্ ছাড়া তো আবার বিদ্বজ্জনদের চলে না। পোস্ট মডার্নিজম ব্যাপারটা তো এভাবেই পোস্ট অফিস মারফত বাংলায় এসেছিল। ভুল পোস্ট অফিসে পোস্ট হওয়ার জন্যই না সঠিক ঠিকানায় পৌঁছোতে পারল না। এটাকে আমরা ‘বাঙাল’রা একটু ঠিকঠাকভাবে পোস্ট অফিসগস্ত করেই দেখি না। এর সুবিধে নেহাৎ কম নয়। প্রথমত, ভীমরতি প্রাপ্তরা যা খুশী তাই বলতে পারেন, মানুষ কিছু মনে করে না। তাই এই সুযোগে ভীমরতি-প্রাপ্তরা বেমতলব খামার-খিস্তি কিছু দিয়েই দেখুক না, বঙ্গ তনয়-তনয়াদের কিছু জ্ঞানগম্যি গজায় কী না। দ্বিতীয়ত, মহাশয়ের ত্ব-প্রাপ্তির কারণে আরও একটি আহ্লাদের হেতু আছে। সেটি গূঢ় চিন্তায় মাথায় এল। ভীমের সঙ্গে রতির সম্পর্কটা ঠিক খাপ খায় না। কারণ ভাবমূর্তিগত বৈষম্য। আবার পুরাণমতেও তা সিদ্ধ নয়। রতিদেবী, সবাই জানেন, ভগবান অতনুর পত্নী। পক্ষান্তরে ভীমকে আর যাই বলা যাক, তনুহীন বলা যাবে না। তাঁর শালপ্রাংশু ভুদ্ধদ্বয় এবং শাল্মলী বৃক্ষসদৃশ দেহের বর্ণনা মহাভারতের পাতায় পাতায়। তাঁর সঙ্গে হিড়িম্বার সম্পর্ক অনেক নিকট। এমনকি অঙ্গাঙ্গী। সেই হেন ভীমের যদি রতিপ্রাপ্তি ঘটে, তো অহোভাগ্যম্। কিন্তু রত্যাদি বিষয়ে অধিক কথন সঙ্গত হবে না। এই বয়সে রতিপতিকে বিরূপ করে দ’য়ে পড়ার ইচ্ছে নেই। দেবাদিদের তাঁকে ভস্ম করে এমনভাবে ছড়িয়ে রেখেছেন যে চিতেয় চড়তে যাওয়া ঘাটের মড়াও তাঁর হাত থেকে নাকি রেহাই পায় না।
যাই হোক, মহাশয়ের উক্ত পুস্তকটি তনুপ্রান্ত হলে, আমরা তাঁর ‘গুড়া-গ্যাদা’ ছাওয়াল-পানেরা বই পাড়ায় বিলক্ষণ ‘দেউলা’ অর্থাৎ দেবলীলা শুরু করলাম। আমাদের যাতনা এবং পোঙটামোতে সেখানের তাবড় তাবড় ধুরন্ধয়েরা পর্যন্ত প্রমাদ গুণতে শুরু করলেন। ইতোমধ্যে মহাশয় ১৯৯৩ এর এক নিদাঘ মধ্যাহ্নে মদীয় কর্মস্থলে দর্শন দিয়ে খানিক আলাপ আলোচনা তথা ভবিষ্যৎ কর্ম বিষয়ে কিছু উপদেশাদি দানে অধমকে মথিত এবং ধুরন্ধরদের ব্যথিত করে, নিঃশব্দে বছর খানেকের জন্য পুনরায় অক্সফোর্ডবাসী হলেন।
মহাশয়ের ইদৃশ আচরণের একটি বিশেষ হেতু ছিল। রোমন্থন ইত্যাদি পাঠ করে অধমের মস্তিষ্কে বাঙাল-বায়ু কুপিত হয়েছিল। সে কারণে পূর্বাপর ভালমন্দ কিছু না ভেবে মহাশয়ের কাছে একখানা বিরাশি পৃষ্ঠার পত্র লিখেছিলাম। বিরাশি পৃষ্ঠার জবাব উনি বিরাশিটারও কম শব্দে দিয়ে ওয়াদা করেছিলেন, ‘আগামি বছর জুন মাসে একবার কলকাতা যাবার ইচ্ছে আছে। তখন দেখা হবে।’ ভাবলাম, বিরাশি পৃষ্ঠার জবাবটা নিশ্চয়ই বিরাশি সিক্কার একটি চপেটাঘাতে দেবার বাসনায়ই সম্ভবত ‘দেখা হবার’ প্রস্তাব। নইলে এক ডিসেম্বরে লেখা পত্রের ওয়াদা পরের বছর জুনে পূর্ণ করা বরিশালিয়া আল বেরাদরি হতে পারে না। হয়ত মহাশয় তাঁর ‘নসাকাকার’ মতই ‘একটু ইনডাইরেক্টলি দেইখ্যা লইবার’ প্রত্যাশায়ই ওরূপ লিখেছিলেন। কিন্তু কার্যত তাই ঘটল।
নগর ধুরন্ধরদের ব্যথিত বিস্ময়ের সম্যক কারণ ছিল। আমি তাঁর বিষয়ে ‘অনপট’ অজ্ঞ, ‘লা-খবর’ হলেও তাঁরা তো সরস্বতীর পুষ্পোদ্যানের ঔদ্যান বিশারদ তথা সুযোগ্য মালি। তাঁরা জানেন, মহাশয় ইতিহাস বিষয়ে প্রাজ্ঞপুরুষ। বিশেষতঃ উনবিংশ শতকীয় সমাজ-ইতিহাস বিষয়ে তথা তৎকালীন যুগন্ধরদের নিয়েও তাঁর তাবড় তাবড় কিতাব আছে। আছে আকবর-জাহাঙ্গীরের আমল নিয়ে এ্যাব্বড় খান ইষ্ট- যা তখন পর্যন্ত আমার নয়ন গোচরই হয়নি- পড়া তো দূরস্থান। যাঁরা তাঁর লেখাপত্তর নিয়ে ভাবিত, তাঁরা পর্যন্ত প্রায়শই সেই সব চর্চা বা পাঠকালে অসুস্থ হয়ে, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস নিতে পারেন না। এহেন ব্যক্তি এক অজ্ঞাত কুলশীল, ভোঁভ্রা পাঁঠার দফতরে হাজির হয়ে দুদণ্ড রসালাপ করবেন, এ নিয়ে ধুরন্ধরদের হাড় মুড়মুড়ি ব্যথা হতেই পারে। তবে সে কারণে আমি যে খুব একটা সুড়সুড়ায়িত হয়েছিলাম এমন প্রমাণাভাব। আমার আনন্দ হয়েছিল একথা ঠিক। তবে তার পিছনে কোনও সারস্বত কারণ ছিল না। যে কারণসমূহ ছিল, তার বিন্যাস করণের জন্য এই আলেখ্য। পাঠকবৃন্দ, শ্রবণ করুন। (চলবে)

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।