রাত ১০:১৩ ; শুক্রবার ;  ১৮ অক্টোবর, ২০১৯  

খালেদ হোসাইন-এর ‘কবিতাসমগ্র’: ব্যক্তি ও সমষ্টির অনুভব

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

এ বছর একুশে বই মেলায় প্রকাশিত হয়েছে আশির দশকের অগ্রগণ্য কবি খালেদ হোসাইনের ‘কবিতাসমগ্র’। এই গ্রন্থ সম্পর্কে   পাঠকের সঙ্গে অভিজ্ঞান বিনিময় করেছেন রহমান মতি

কবি খালেদ হোসাইনের আটটি কাব্যগ্রন্থের নিবিড় সংগ্রহ নিয়ে তাঁর ‘কবিতাসমগ্র’। উৎসর্গ পত্রে খঁচিত জীবনের কোল ঘেঁষে আসা শেকড়ের আকুতিতে কিছু পংক্তিমালায়- “আমার মাকে নির্মাণ করা হয়েছিল নৈঃশব্দ্য দিয়ে” বা “ আমার বাবা ছিলেন মেঘময় বৃক্ষ, যাবজ্জীবন রক্তসিঁড়ি” মনকে দখল করে নেবে। আটটি কাব্যগ্রন্থ যথাক্রমে- ইলামিত্র ও অন্যান্য কবিতা, শিকার যাত্রার আয়োজন, জলছবির ক্যানভাস, পাতাদের সংসার, এক দুপুরের ঢেউ, পায়ের তলায় এসে দাঁড়িয়েছে পথ, চিরকাল আমি এখানে ছিলাম, পথ ঢুকে যায় বুকে।

প্রতিটি কাব্যে পাঠক উপলব্ধি করবেন কবির ‘ব্যক্তি আমি ও সামষ্টিক আমি-কে’। যে আমি অনেকের সংস্পর্শে টিকে আছে। অভিজ্ঞতাময় বাস্তবতায় অতীত দেখে কবির বর্তমান প্রাঙ্গণ গঠিত হয়েছে এবং তাতে তিনি আস্থাশীল। সময় কথা বলেছে প্রতিটি কাব্যে, অভিজ্ঞতার যোগস্পর্শে। ‘ইলামিত্র ও অন্যান্য কবিতা’ কবির শুরুর বাঁককে প্রতিষ্ঠা করেছে। ইতিহাস, ব্যক্তি স্মৃতি, স্বকালের চিত্র কাব্যটির অন্বেষণ। ‘শিকার যাত্রার আয়োজন’ গদ্যভঙ্গির কবিতায় অন্যস্বরে খচিত। পাঠক টের পাবেন কবি তার স্বর বদল করে প্রথম কাব্য থেকে এখানে স্বাতন্ত্র্য সন্ধানে ব্রতী হয়েছেন। প্রকৃতি এ কাব্যের প্রাণ। একান্ত স্বরে বলেন- “এই শাওনে আমি প্রকৃতির মতোই নিঃস্ব হলাম”। কবিমনে ‘আমি’-কে খোঁজার যে বাসনা এ কাব্যে ‘তুমি’ হয়ে তার ছড়ানো ‘আমি’র বসবাস মুগ্ধ করার মত। ‘জলছবির ক্যানভাস’ দৃশ্যকল্পের কবিতা। ক্যানভাসে যেমন কবিতা সন্ধানী হয়ে কবি বলেন- “কবিতা বিষয়ে আমার কথাগুলো/ সবচেয়ে ভাল বলতে পারবে/ আমার কবিতা” তেমনি আরও বলেন- “দেখো, আমরা কেমন রচনা করেছি এক গল্পজীবন। পাশাপাশি দীর্ঘ কবিতার নিরীক্ষায় আমির সঞ্চালন ও স্মৃতিতে শৈশবে সে বিহবল করার অনুভূতিও অসামান্য”। ‘পাতাদের সংসার’ সনেটের শৈল্পিকতায় প্রকৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যের হৃদয় নিঃসৃত কবিতা। বাঙালি ও বাংলার রূপ যথার্থ এতে। ‘এক দুপুরের ঢেউ’, ‘পায়ের তলায় এসে দাড়িয়েছে পথ’ দুটি কাব্যই নান্দনিক পথে জীবনকে আহ্বান করেছে। যাপিত জীবনাভিজ্ঞতায় অন্য সত্তার উপরে নির্ভর করে নিজেকে খোঁজা এবং সামষ্টিক প্রবাহে মিশে যাওয়া দুটি দিকেই নান্দনিক। এ নন্দনে সফল নিয়ন্তা প্রকৃতি। কবি ও কবিতার ঘনিষ্ঠতা যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে তাকে ভালোবেসে গভীরতার ডাক আসে এবং কবি খালেদ হোসাইন বলেন- “চিরকাল আমি এখানে ছিলাম। একটি কবিতা কেন আমাকে অনন্তকাল টানে?” কবিতা লেখার ইচ্ছার চিরান্তনতা কবিকে এখানেই একাত্ম করে যখন তিনি স্থানিক প্রণয়ের স্বরগ্রামে অসাধারণ। ‘পথ ঢুকে যায় বুকে’ কাব্যের প্রথম কবিতার শেষ পংক্তিতে “কার মুখচ্ছবি পৃথিবীর অন্তিম দৃশ্য”পড়ে পাঠক ঢুকে যাবেন আরও এক ‘আমি’র পৃথিবীতে। যে শেকড়কে কবি হন্যে হয়ে খোঁজেন, পান আবার হারান তার নির্মিতি কবিতাগুলোকে অন্তর্লীন করেছে। আটটি কাব্যগ্রন্থের কবিতাসমগ্রে খালেদ হোসাইন জীবনকবি। কবিতার সুদূর আহ্বানে আকুলতা থাকলেই বরং এমন জীবনশিল্পী হওয়া যায়। বইটি পাঠকে ঋদ্ধ করবে।

কবিতাসমগ্র। খালেদ হোসাইন। প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি, ২০১৪। প্রকাশক : অনিন্দ্য প্রকাশ। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। মূল্য : ৫০০ টাকা।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।