বিকাল ০৫:৪২ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৩ মে, ২০১৯  

গণতন্ত্র বনাম মনতন্ত্র

প্রকাশিত:

মুহাম্মাদ রেজাউল করিম॥

এক পাগলা গারদে পাগলদেরকে যে প্লেটে খাবার দেওয়া হয়, তারা সে প্লেটে খাবার না খেয়ে প্লেটের ভাত মাটিতে ফেলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে খায়। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন একটা পাগল সুস্থ হয়ে গেলো। সে প্লেটের ভাত না ফেলে, প্লেটেই খাওয়া শুরু করলো। তখন চার পাঁচজন পাগল এসে তাকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে বলল, এটা পাগলামি করার জায়গা না। সাময়িক সময়ের জন্য একে রম্য বলে মনে হতে পারে কিন্তু এটি কোনও রম্যগল্প নয়।

কারণ জাপানের একজন চলচ্চিত্রকার আকিরা কুরোসাওয়া বলেন,‘পাগলের রাজ্যে পাগলরাই নাকি মানসিকভাবে সবচেয়ে সুস্থ।’ ঠিক যেমনভাবে চোরের রাজ্যে চোররাই সবচেয়ে গুণধর, দুর্নীতির রাজ্যে দুষ্কৃতিকারীরাই সবচেয়ে আদর্শবান, আর ভণ্ডের রাজ্যে ভণ্ডরাই সবচেয়ে অনুসরণযোগ্য, অন্যায়ের রাজ্যে ন্যায় অর্থহীন, অবিচারের রাজ্যে সুবিচার বড় অসহায়, অনিয়মের কবলে আইন পাশ কেটে চলে, অপরাধীদের তোড়জোড়ে নিরপরাধ সারা জীবনই পালিয়ে বেড়ায়।

পঞ্চবটীর বন থেকে রাবন সীতাকে হরণ করেছিল, সেটা ইতিহাস, কিন্তু এই বঙ্গদেশীয় রাবনেরা পঞ্চবটী নয় বরং বঙ্গদেশ থেকেই হরণ করেছে গণতন্ত্র নামক শব্দের ব্যবহার। এখন বঙ্গীয় রাঘবেরা দিশেহারা, গণতন্ত্রের খোঁজে তারা স্বয়ং মেঘনাদকেই হত্যা করছে। এই দুই দলীয় নীতি পৌরণিক কাহিনীতেও যেমন ছিল, বাস্তবেও এরা দৃশ্যমান।

রাঘব বনাম রাবন, বিএনপি বনাম আওয়ামী লীগ। চলছে খেলা, মাঠ গরম, ফাটছে ককটেল-বোমা, পড়ছে হুড়োহুড়ির হিড়িক। এতে কেউ মরছে, কেউ মারছে, কেউ উপরি কামাচ্ছে। যারা মরছে তারাও নিরামিষ, যারা মারছে তারাও নিরামিষ আর যারা কামাচ্ছে তারাই কেবল আমাদের সম্মানিত নেতা। এরাই সেই শ্রদ্ধেয়, গুণধর, আদর্শবান, অনুসরণীয় আর অনুকরণীয় আর এদের দেখানো পথে হাঁটলেই আপনি আঙ্গুল ফুলে বটগাছ হবেন রাতারাতি।

যেখানে অন্যায়ের জোর সবচেয়ে বড়, সেখানে ন্যায়ের কথা বলাটাই অন্যায়। যেখানে অপরাধীরা সাহসী খেতাব পায়, সেখানে নিরপরাধীরাই অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত। হাজার দোষীর ভিড়ে একজন নির্দোষ মানুষ যে দোষী নয়, সেটা কোনও যুক্তিতেই বোঝানো যাবেনা। ধাপ্পাবাজেরা এখন তুলতুলে, নাদুস-নুদুস। চোরেরা এখন সক্রিয়।

এদেশে সত্যের মূল্যায়ন নেই, আছে কেবল মিথ্যার ঝুনঝুনানি। একসময় আমরা পড়েছি সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা কিন্তু এই কলিরকালে রামায়নের সে বাণী যে বিকৃত হচ্ছে হর-হামেশা সেটা আর নতুন কি। এখন অসততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। যারা অসৎ এখন তাদেরই জয়-জয়কার। তাদেরকেই সবাই হরে হরে নমঃ নমঃ স্বরে নমষ্কার জানায়। আর যারা ভাল তাদের দিকে ক্যামেরার ব্যাকসাইড থাকে। অবশ্য থাকবেই তো, ভালদের ওইটাই তীর্থস্থান।

এদেশের মন্ত্রী-এমপিরা ‌অ-যুক্ত সাধারণ। তারা ভিআইপি, তাদের জন্য জনগণ নির্দ্বিধায় সব কষ্টবরণ করতে পারে। তাদের একটি গাড়িকে চলার পথ তৈরি করে দিতে শত শত গাড়ির ভেতর হাজার হাজার মানুষকে রাস্তার অন্য পাশে আটকে রাখা হয়। জনগণের সময়ের আর কি মূল্য? অথচ আমাদের মাননীয়দের প্রত্যেক সময়ের কত মূল্য, সে হিসেব ক্যালকুলেটরেও ধরে না আজকাল।

বঙ্কিমচন্দ্রের কথার মতো এখন বলতে হয়, এদের সময়ও মিনিটে মিনিটে টাকা প্রসব করে। কিন্তু আমরা যারা আমজনতা তারা সবসময় অ-বর্জিত সাধারণ। দলীয় কার্যসিদ্ধির জন্য কী রাস্তা, কী বাড়ি সবকিছুই এদের ভোগ করার অধিকার রয়েছে। তাতে কেউ বাধ সাধলে তার আর রক্ষা নেই। তখন গণতন্ত্র সমুন্নত করার অঙ্গীকার আর গণতন্ত্র থাকেনা, সেটা মনতন্ত্রে রূপ নেয়।

বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের অপরাধ পরিসংখ্যান ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমআরটি’র রিপোর্টে বলা হয়, ‘দেশে সংগঠিত অপরাধগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতাসীনদের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি।’

আর মনতন্ত্রে প্রথম কথা হলো মন যা চায় তাই করো। ব্যাপারটা তারা করে দেখাচ্ছেনও বটে। শিক্ষকের ওপর নির্যাতন, খুন, গুম, লুট, ধর্ষণ সবকিছুতেই এদের হাত ভাল ও পাকাপোক্ত। যা পারছেন যেভাবে পারছেন হাতিয়ে সাবাড় করছেন সবকিছু। এই নজির আমাদের চোখের সামনে অহরহ আছে। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের অপরাধ পরিসংখ্যান ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমআরটি’র রিপোর্টে বলা হয়, ‘দেশে সংগঠিত অপরাধগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতাসীনদের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি।’

অন্যদিকে টিআইবির রিপোর্টে বলা হয়, ‘দুর্নীতিতে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ।’ এইতো খুশির খবর এসে গেছে। একদিকে কর্ম হচ্ছে, অপর দিকে রেকর্ড। কী গর্ব এ জাতির, কী প্রাপ্যই না আমরা পাচ্ছি! অতএব এটা নিশ্চিত হওয়া গেলো আমাদের সরকার কোন কিছুতেই আর পিছিয়ে নেই।

ক্ষমতার কাঠি যার হাতে, তারাই ধরাকে সরাজ্ঞান করতে পারেন। যেমনটা জোর যার মুল্লুক তার এই কথাটার ক্ষেত্রে খাটে।

দুর্নীতির রাজ্যে ন্যায়ের খ্যাতি নেই, আছে কুখ্যাতি। সুখ্যাতির আড়ালে আছে, মুখোশধারীরা। তারা আড়াল হলেই ছোঁ মারে। মারে তো মারে যার আর কোনও চিহ্ন রাখে না। আর জনতার সামনে তারা চিরকালই ভাল বনে যান। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘যে মানুষ অনেক দেবতার পূজারি, আড়লে সব দেবতাকেই সে সব দেবতার চেয়ে বড় বলে স্তব করে। দেবতাদের বুঝতেও বাকি থাকেনা, অথচ খুশিও হন।’ নেতাদের কাছে আমরাই সেই দেবতা সমতূল্য তবে সেটা শুধুমাত্র ভোটের বেলায়। আর দেবতাদের সঙ্গে আমাদের তফাৎ শুধু এইটুকুতেই যে দেবতারা যা বোঝেন সঠিকটাই বোঝেন। আর আমরা সবই বুুঝি কিন্তু কী যে বুঝি সেটাই বুঝি না। আমরা দেখি ফার্নেস তেলে ভেসে যায় সুন্দরবন, আমরা দেখি পরিত্যক্ত পাইপের তলানিতে পড়ে মৃত্যু হয় শিশু জিহাদের, আমরা দেখি একজন দুর্নীতিবাজ আমলাকে বাঁচানোর জন্য সরকারের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বেষ্টনী, আমরা দেখি খালেদা জিয়ার বাসার সামনে ইট-বালুর ট্রাক, আমরা দেখি ১৪৪ ধারার মধ্যেও ছাত্রলীগ মিছিল করে অথচ প্রশাসন নির্বিকার, আমরা দেখি সরকারি দলের অবরোধে কোন গাড়ি রাস্তায় চলতে দেওয়া হয় না, আবার বিরোধীদলের অবরোধে সরকারই জোর করে রাস্তায় গাড়ি নামায়, এতকিছু দেখেও আমরা কিছুই বলতে পারিনা। কারণ ক্ষমতার কাঠি যার হাতে, তারাই ধরাকে সরাজ্ঞান করতে পারেন। যেমনটা জোর যার মুল্লুক তার এই কথাটার ক্ষেত্রে খাটে।

বিজিএমইএ-এর এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৩ সালে বিএনপির ডাকা টানা নয় দিনের অবরোধে দেশের ২১টি গার্মেন্টসের ২৪ লাখ ৬৭ হাজার ৮৫৬ ডলারের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়, নাশকতায় ক্ষতি হয় ১৯ লাখ ৪ হাজার ৮৯০ ডলার

দেশের রাজনৈতিক এমন পরিস্থিতির কারণে বেহাল দশায় পড়েছে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষাখাত, পর্যটনখাত, কৃষিখাত ও আবাসনখাত। বিএনপির ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধে প্রতিদিন অন্তত ১৬শ' থেকে ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষয় ক্ষতি হচ্ছে। টানা অবরোধের কারণে কৃষিখাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২শ ৮৮ কোটি টাকা, আবাসন খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় আড়াইশ' কোটি টাকা, পর্যটন খাতে ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে পাঁচশ' কোটি টাকার বেশি, আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে প্রতিদিন ক্ষতির পরিমাণ প্রায় আড়াইশ' কোটি টাকা, গার্মেন্টস খাতে এই ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে তিনশ' থেকে ৫শ' কোটি টাকার মত (তথ্য: বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১২ জানুয়ারি ২০১৫)। বিজিএমইএ-এর এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৩ সালে বিএনপির ডাকা টানা নয় দিনের অবরোধে দেশের ২১টি গার্মেন্টসের ২৪ লাখ ৬৭ হাজার ৮৫৬ ডলারের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়, নাশকতায় ক্ষতি হয় ১৯ লাখ ৪ হাজার ৮৯০ ডলার (তথ্য: প্রথম আলো, ১১ ডিসেম্বর ২০১৩)।

ইউএনডিপি ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স-এর এক রিপোর্টে বলা হয়, ২০১৩ সালের ৫২ দিনের হরতালে ও ৯ দিনের অবরোধে দেশে মোট ক্ষতির পরিমাণ ১২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা দ্বারা ৪টা পদ্মা সেতু তৈরি করা যেত (তথ্য: ডেইলি স্টার)। রাজনৈতিক এমন বেহালদশার কারণে এভাবে করেই কি অচলায়তনে চলে যাবে দেশের অর্থনীতি?

রাবন-রাঘবেরা দেশে গণতন্ত্র রক্ষার জন্য আন্দোলন করছে কিন্তু এই গণতন্ত্রের আড়ালে লুকায়িত শব্দটির নাম মনতন্ত্র। রাজনীতি নামক চেক ভাঙিয়ে অনেকে পেটনীতিও করেন। দু'দলই জনগণের জন্য কাজ করছে, জনতার গণতন্ত্র রক্ষা করছে। কেউ জনগণের সেবার নামে চিরকালের জন্য ক্ষমতায় এসে বসেছে আর কেউ ক্ষমতা পেতে জনগণের কাঁধে পা রাখছে।

কেউ গণতন্ত্রের জন্য পুলিশ দিয়ে জনতাকে ঠেঙাচ্ছে আবার কেউ গণতন্ত্রের জন্য সাধারণ মানুষের বাড়ি-গাড়ি ভাঙছে। তখন আমার মনে প্রশ্নটা জাগে যে ‘জনগণ কাকে বলে?’

স্বাধীনতার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের প্রশ্ন করেছিলেন,‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ বঙ্গবন্ধুর সেই একই প্রশ্ন স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও সমুন্নত রেখেছেন তার উত্তরসূরীরা।

স্বাধীনতার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের প্রশ্ন করেছিলেন,‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ বঙ্গবন্ধুর সেই একই প্রশ্ন স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও সমুন্নত রেখেছেন তার উত্তরসূরীরা। একদিকে একদল গণতন্ত্র সমুন্নত করার জন্য মনতন্ত্রের নীতিতে অটল, আরেকদল নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। যারা দলবাজি করেন তাদের দল আছে, আছে স্বার্থ, আছে ফার্স্ট-সেকেন্ড-থার্ড হোম কিন্তু এদেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের আছে কেবলই সংসার-সঙ্কট-স্বপ্ন ও স্বদেশপ্রেম।

তাদের একটাই দেশ, একটাই ভূমি। তাদের কাছে কোনও রকম বেঁচে থাকাটাই হলো জীবনের সার্থকতা। কিন্তু রাজনৈতিক রোষানলের আগুন যখন একজন ট্রাকচালকের জীবন কেড়ে নেয়, যখন একজন সিএনজি অটোরিক্সাচালকের শেষ সম্বলটুকুও পুড়িয়ে দেয়, যখন পুলিশের গুলিতে বিধ্বস্ত হয় অসহায় কিশোরের শরীর তখন কবির ভাষার মত সাধারণ মানুষেরাই হুঙ্কার দিয়ে বলে, 'কাঁদতে আসিনি কুত্তার বাচ্চা, বিচার চাইতে এসেছি'।

জ্বলছে আগুন, মরছে মানুষ কিন্তু এই অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতির দায়ভার কোনও দলই নেবেন না। এ দল ও দলকে, আর ও দল এ দলকে দোষারূপ করে যাবেন সারাজীবন। এ যেনো রঙ্গমঞ্চে আরেক রঙ্গ। কিন্তু যতোদিন গণমানুষ তার অধিকারের জন্য সজাগ না হবেন ততোদিন এই তামাশা দেখতেই হবে আর সবকিছু বুঝেও না বুঝার ভান করে থাকতে হবে।

লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।