রাত ১০:৫৪ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৮ এপ্রিল, ২০১৯  

ঢাকার ছেলে হারতে পারবা না (ভিডিওসহ)

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মাহাবুব রাহমান।।

মোশাররফ খান ইয়াফির অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় আছে। কিন্তু মীরাক্কেলের একজন পারফরমার হিসেবেই তিনি পাবলিকের কাছে বেশি পরিচিত। মীরাক্কেলে অংশ নিতে ইয়াফি গেছেন কলকাতায়। তখন এক মহিলা তাকে বললেন, ঢাকা আমাদের গর্ব— ঢাকার ছেলে তুমি হারতে পারবা না...।

২০১০ সালে তিনি জি বাংলার বিখ্যাত কমেডি শো মীরাক্কেল-এ অংশ নেন। তখন আইপিএলের খেলা চলছিল। ইডেন গার্ডেনে কলকাতার সাথে কোনও একটি দলের খেলা। মাঠ উপচে পড়া ভিড়। মীরাক্কেলের বন্ধুদের সাথে ইয়াফিও গেছেন খেলা দেখতে। প্রবেশপথে বিশাল লাইন। বন্ধুরা গেছেন টিকেট কাটতে। ইয়াফি একটা জায়গায় একা দাঁড়িয়ে।

: তুমি ইয়াফি না, তুমি ঢাকার ছেলে না? পঞ্চাশ-ষাটের কাছাকাছি একজন মহিলা জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কী মীরাক্কেলে পারফরম করো না? ইয়াফির সম্মতিসূচক উত্তর শুনে বললেন, আমার বাবা মারা গেছেন ৭-৮ বছর আগে। তিনি ছিলেন পুরান ঢাকার বাসিন্দা। মীরাক্কেলে তুমি যখন পারফরম করছিলে আমি চোখ বন্ধ করে বাবার ওই উচ্চারণ শুনতে পাই। আমার বাবা যেভাবে কথা বলতেন, অনেক অনেক দিন বাদে আমি কথার ওই টানটা অনুভব করি। আঁচল দিয়ে চোখ মুছে মহিলাটি জেদি ভঙ্গিতে বললেন, আমরা ঢাকার মানুষ, ঢাকার ইজ্জত মানসম্মান তোমার হাতে— ঢাকা আমাদের গর্ব— ঢাকার ছেলে তুমি হারতে পারবা না। ঢাকার পতাকা যেন না নামে ….

এবং এই তুমুল ট্রাজেডির জগতে মোশাররফ খান ইয়াফি কমেডি করেন। ‍"আমি মূলত স্যাটায়ার করি। কোনও একটা বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, শ্লেষ। যেমন আমার টপিক পরচর্চা, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা, সামাজিক অসঙ্গতি, অনাচার ও বৈষম্য"। বললেন মোশাররফ খান ইয়াফি।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে থাকতেই ইয়াফি 'থিয়েটার'-এর সাথে জড়িয়ে পড়েন। সেখানে আবদুল্লাহ আল মামুন, রামেন্দু মজুমদার, তৌকির আহমেদের মতো শিল্পীরা ছিলেন। ইয়াফি ৩ বছর থিয়েটারের সাথে ছিলেন। এরপর ভর্তি হলেন ঢাকা কলেজে। পড়ালেখার চাপে থিয়েটার করার আর ফুসরত কই। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হলেন, নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে নাটকের ক্লাব ছিল। সুতরাং সুযোগ পেয়ে আবার নিয়মিত অভিনয় করা শুরু করলেন। সেখানে যোগ দেন 'নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি সাংস্কৃতিক সংগঠনে'। এই ক্লাব থেকেই উঠে এসেছেন, এলিটা, ব্ল্যাকের টনি, জন— এরা। সেখানে ইয়াফি নিজেই স্ক্রিপ্ট লিখে পারফরম করতেন। একদিন তাদের এক বিদেশি শিক্ষক তাকে বললেন, "তুমি যেটা ক‌‌‌রো বিদেশে এটাকে স্ট্যান্ডআপ কমেডি বলে। আমেরিকায় এটা খুব পপুলার"। শুনে ইয়াফি বইপত্র পড়ে স্ট্যান্ডআপ কমেডি সম্পর্কে একটা ধারণা পেতে চেষ্টা করেন।

২০১০ সালের ঘটনা। অডিশন নিতে মীরাক্কেলের লোকজন ঢাকায় এসেছেন। চ্যানেল আই ভবনে অডিশন হচ্ছে। ইয়াফি গিয়ে পৌঁছলেন সন্ধ্যা ৬টার দিকে। তাকে জানানো হলো, এখন আর অডিশন নেয়া হবে না। ইয়াফি বললেন, দেখেন ভাই অফিস করে আসলাম। শুনে তাকে অডিশনের সুযোগ দেয়া হল। সেখানে ছিলেন নবনীতা চক্রবর্তী ও অরিন্দম নামে এক ভদ্র লোক। ইয়াফির উপস্থাপনা শুনে তারা বললেন, আপনার কনসেপ্ট খুব শার্প কিন্তু ডেলিভারিটা ঠিক কমেডি হয় নাই। ইয়াফি তখন গ্রামীণফোনের কর্মকর্তা। বিশাল একটা প্রোজেক্টের বাজেট নিয়ে কাজ করছেন। সেই ঝামেলায়ই ডেলিভারিটা ভালো হয়নি। ১৫ মিনিট পর আবার অডিশনে অংশ নিলেন। এবার তার উপস্থাপনা দেখে ক্যাপ্টেন অব মিরাক্কেল শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায় লাফিয়ে উঠলেন: আপনি আমাদের সাথে কলকাতায় যাচ্ছেন— সোমবার আপনার শুটিং।

কিন্তু তার তো কর্পোরেট জীবন। যেতে পারবেন কি পারবেন না দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। কিন্তু ঊর্ধ্বতনরা বেশ আনন্দের সাথেই তাকে অনুমতি ও উৎসাহ দিলেন: "হ্যাঁ ইয়াফি তুমি যাও। মানুষ হাসানো সহজ কাজ নয়। সবাই মানুষ হাসাতে পারে না, তুমি পারো।"

নিজের বই হাতে মোশাররফ খান ইয়াফি। আলোকচিত্র: নাসিরুল ইসলাম

দুই সপ্তাহ পর ইয়াফি মীরাক্কেলে যোগ দেন। সেখানে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় এপিসোডে বেস্ট অলরাউন্ডার হলেন। মীরাক্কেলের অভিজ্ঞতটা তার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিভাবে হাস্যরস তৈরি করতে হয়, উপস্থাপন ও স্ক্রিপ্ট লেখার কলাকৌশল সবই তিনি শিখেছেন মীরাক্কেলে। শুধু কলাকৌশল শেখাই নয়— পেশাদারিত্ব, মানবিক সম্পর্ক ও সম্পর্কের ভারসাম্য— এর অনেক কিছুই তিনি সেখান থেকে শিখেছেন। ইয়াফির স্মৃতিচারণ থেকে জানা গেল শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, সৌরভ পালোধী, রূপক মজুমদার ছিলেন খুবই অমায়িক এবং আন্তরিক। ইয়াফিদের মেন্টর সৌরভ পালোধী অসম্ভব আত্মবিশ্বাসী মানুষ। সবাইকে নিয়ে তিনি অনেক খাটাখাটনি করতেন। কিন্তু ইয়াফিকে নিয়ে তেমন কষ্ট করতে হত না। তিনি ইয়াফিকে বলতেন, দাদা তুমি এমনিতেই পারবা। একদিন রাত সাড়ে বারটায় শুটিং শেষে পরের দিনের জন্য তিনি লিখতে বসে গেলেন। রাত তখন তিনটা। ঘুম ঘুম অবস্থা। তিনি এসে ইয়াফিকে ধাক্কা দিয়ে উঠালেন: ওঠ দাদা, এটা তোকে শেষ করতে হবে। কালকে যদি তুই বাদ পড়ে যাস তবে আমার খুব খারাপ লাগবে। এই হৃদ্যতার বিষয়টা ইয়াফি এখনও খুব অনুভব করেন।

মীরাক্কেলে তিনি ইচ্ছা করেই কঠিন বিষয় বাছাই করতেন। আর তিনি নিজের স্ক্রিপ্ট নিজেই লিখতেন। অনেকে যেমন বইপত্র ইন্টারনেট ঘেটে জোকস কালেক্ট করে, ইয়াফি তা করতেন না। তিনি তার অবজারভেশন থেকেই লিখতেন। তিনি যে ধরনের কমেডি করেন তাকে বলা হয়, পর্যবেক্ষণমূলক কমেডি।

এধরনের কমেডি প্রসঙ্গে তিনি জানালেন নাভীদ মাহবুবের কথা। বললেন, নাভীদ ভাইয়ের কমেডির যে উচ্চতা সে উচ্চতার কমেডি শুনতে আমাদের দর্শক হয়ত এখনও যথেষ্ট প্রস্তুত নয়।

মীরাক্কেলে থাকা অবস্থায়ই নাভীদ মাহবুব তাকে ইমেইল করেন। সেই থেকে তিনি নিয়মিত চেষ্টা করেন নাভীদ'স কমেডি ক্লাবে পারফরম করতে। কিন্তু যেহেতু রবির মতো একটি বিশাল কর্পোরেট ঊর্ধ্বতন কর্মকতা হিসেবে কাজ করছেন তাই অনেক সময়ই পারফরম করার সময় পান না। তবুও সুযোগ পেলেই চলে যান পারফরম করতে। কেননা অন্যায়, অন্যায্য, অসঙ্গতিতে ভরপুর এই বিশাল ট্রাজেডির জগতে কমেডিও হতে পারে একটি মোক্ষম জবাব।

একনজরে মোশাররফ খান ইয়াফি
ফেসবুক পেইজ: https://www.facebook.com/makyaafi
লিংকডইন প্রোফাইল:http://goo.gl/OrxAHV
গ্রন্থ: জোকস বক্স (বইমেলা ২০১৪), সলিড পাঞ্চ (বইমেলা ২০১৫)

 

/এনবিআর/

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।