রাত ০৪:১২ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৭ অক্টোবর, ২০১৯  

রূপসী রাতারগুলে

প্রকাশিত:

ওয়াজেদ মহান॥

জনমানবহীন একটি খেয়া ঘাট, ঘাটে বাধা সারি সারি ডিঙ্গি নৌকা। ঘাটের সঙ্গে উপরে নীল আকাশকে নিয়ে মিতালী করেছে শস্যখেত। ঘাটে বাধা ডিঙ্গি নৌকোগুলোর অদুরেই ছোট্ট এক কাশবন। বর্ষার নতুন পানিতে সবুজ সতেজ। বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দোল খাচ্ছে আপন মনে। শরতের গন্ধ নাকে নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করছে সাদা ফুলে সাজানোর প্রতিক্ষায়।

হঠাৎ করেই পেছন থেকে মানুষের পায়ের আওয়াজ শোনা যায়। বাতাসে ভেসে কানে পৌছায় এক অচেনা কিশোরের হাঁক 'বনে যাবেন? নৌকা লাগবো'? কথার উত্তর দিতে না দিতেই দৌড়ে ছুটে আসে আরেকজন। দরদাম শেষে আমরা উঠে পড়ি ছোট্ট কিশোরের প্রায় তলাহীন ডিঙ্গি নৌকোয়। অগভীর পানিতে নৌকো দুলে উঠে ক্ষণে ক্ষণে। কাশবন মাড়িয়ে ছুটতে শুরু করে রূপসী রাতারগুলের উদ্দেশ্যে।

অনিন্দ্য সুন্দর বিশাল এ বনের গাছ-গাছালির বেশিরভাগ অংশই বছরে চার থেকে সাত মাস থাকে পানির নিচে। আমরা এসেছি ভরা বর্ষায়। রাতারগুলের গাছগুলোগলা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পানিতে, কেউ আবার কোমর পানিতে ঠায় দাঁড়িয়ে অর্ধস্নানে মগ্ন। বনের ঘোলা পানিতে চোখ ফেলেই বুঝে নিলাম সকালে বৃষ্টি হয়েছে।

বনের ভেতরে ঢুকছি একটু একটু করে। নৌকোর বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ নির্জন বনের অধিবাসীদের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়। বিরক্ত হয়ে পাখিদের কেউ কেউ উড়ে যায় আরেকটু নির্জনতার খোঁজে এ গাছ থেকে ও গাছে, নিজেদের মধ্যে পরম ভালবাসা বিনিময়ে ব্যাস্ত গাছগুলোর অনেকেই একে অপরের সঙ্গে গলাগলি করে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রকৃতির সৌন্দর্যে পাগলপ্রায় হয়ে উঠা আমাদের উচ্ছাস আর চিৎকার ওদের কানে পৌছায় না।

একটু একটু করে আমরা ঢুকে পড়লাম গভীর বনে। আমাদের অনেকেই যখন বন দেখা শেষ মনে করতে শুরু করেছি, তখনই কিশোর মাঝির অবাক করা তথ্য। আমরা নাকি বনের দশ ভাগ ও দেখিনি এখনো। আমরা ছুটে চলেছি জলাবনের ধার দিয়ে গোয়াইন নদীর তীরে গড়ে উঠা ঘাটকে কেন্দ্র করে। পথের মাঝে চোখে পড়ল নির্মীয়মাণ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, টাওয়ারের উপর পর্যটকদের অনেক ভিড় তখন।

বড়ই অদ্ভুত এই জলের রাজ্য। কোনও গাছের হাঁটু পর্যন্ত ডুবে আছে পানিতে। একটু ছোট যেগুলো, সেগুলো আবার শরীরের অর্ধেকই ডুবিয়ে আছে জলে। কোথাও চোখে পড়বে জেলেদের পাতা মাছ ধরার জাল । ঘন হয়ে জন্মানো গাছপালার কারণে কেমন অন্ধকার লাগবে পুরো বনটা। মাঝেমধ্যেই গাছের ডালপালা আটকে দিবে পথ। হাত দিয়ে ওগুলো সরিয়ে তৈরি করতে হবে পথ। নীরব জলাবনে বড় কোন পাখির উড়ে যাওয়ার ঝপাৎ শব্দে আতঙ্কে নৌকো দুলিয়ে পানিতে লাফ দেবেন না যেন। দুপাশের ছোট করচ গাছ গুলিকে এড়িয়ে চলতে হবে খুব সাবধানে। কারণ আগে থেকেই জেনে এসেছি, রাতারগুল হচ্ছে ভয়ানক কিছু সাপের আখড়া। বর্ষায় পানি বাড়ায় সাপেরা ঠাঁই নেয় গাছের ওপর। যদিও পুরো বন ঘুরে একটি বিছা ছাড়া আর কোন প্রাণীই চোখে পড়েনি। সে আমাদের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে।

বাংলাদেশের সব বনের থেকে রাতারগুল একেবারেই আলাদা। ঘন গাছের সারি। সবুজ বনের ফাক গলে মাঝে মাঝেই চোখে পড়বে নীল আকাশ। ঘন পাতার মধ্য দিয়ে ঢুকে পড়া সূর্যের আলো আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিবে অদ্ভুত এক সৌন্দর্যের সঙ্গে। বড় বড় গাছের ছায়ায় ঘুরতে ঘুরতে মাঝে মাঝেই আপনি চোখ ঢেকে ফেলবেন ঠিকরে আসা সে আলোয়। ছোট গাছ গুলোর মধ্যে করচই বেশি। হিজলে ফল ধরে আছে শয়ে শয়ে।

এতো গেল বর্ষার রূপসী রাতারগুলের কথা। বন এভাবে জলে ডুবে থাকে বছরে চার থেকে সাত মাস। বর্ষা কাটলেই দেখা যাবে অন্য চেহারা। শীতের আনাগোনা শুরু হলেই রাতারগুল তার চেহারা পাল্টায়। অতিথি পাখির কিচির মিচির শব্দে মেতে ওঠে রাতারগুলের চারপাশ। বনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া লেকে চলে পাখির ‘ডুবো খেলা’। বনজুড়ে চড়ে বেড়ায় নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। সন্ধ্যা হওয়ার অনেক আগেই এখানে শীত জেকে বসে। বনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া লেকগুলো খুজে পায় আলাদা এক সৌন্দর্য। বনের ভেতরের ছোট নালাগুলো পরিণত হবে পায়ে চলা পথে।

হাওরের স্বচ্ছ পানির নিচে বনগুলো দৃশ্যমান থাকায় বর্ষাকালে অনেক পর্যটকের সমাগম ঘটে এখানে। তো এখনই করে ফেলুন রাতারগুল ঘুরে যাওয়ার প্ল্যান। বোনাস সৌন্দর্য হিসেবে পাবেন গোয়াইন নদী দিয়ে রাতারগুল যাওয়ার অসাধারণ সুন্দর পথ, বিশেষ করে বর্ষায়। নদীর চারপাশের দৃশ্যের সঙ্গে উপরি হিসেবে দেখবেন দূরে ভারতের উঁচু উঁচু সব পাহাড় , বিছানাকান্দির অপরুপ ছায়ামূর্তি।

কিভাবে যাবেন

রাতারগুল দেখতে হলে প্রথমে যেতে হবে সিলেট শহর। সড়ক, রেল ও আকাশ পথে ঢাকা থেকে সরাসরি সিলেট যেতে পারেন। সিলেট শহর থেকে কয়েকটি পথে আসা যায় রাতারগুল। সবচেয়ে সহজ পথটি হল— শহর থেকে মালনিছড়ার পথে ওসমানী বিমান বন্দরের পেছনের সড়ক ধরে সোজা সাহেব বাজার হয়ে রাতারগুল যাওয়া। শহরের যে কোন প্রান্ত থেকে সিএনজি ভাড়া করতে পারেন সাহেব বাজার হয়ে রাতারগুল পর্যন্ত । ভাড়া ৩০০-৩৫০ টাকার মধ্যে।

সারাদিন ভ্রমণের জন্য জায়গাটিতে পাওয়া যাবে ছোট ছোট খোলা নৌকা। এক বেলা জঙ্গলে বেড়ানোর জন্য প্রতিটি নৌকার ভাড়া ৩শ’ থেকে ৭শ’ টাকা। সিলেটের আম্বরখানা, শাহজালাল মাজার থেকে সাহেব বাজার কিংবা চৌমুহনী লোকাল অটো রিকশা যায়। জনপ্রতি ভাড়া ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা।

কোথায় থাকবেন

সিলেট শহরে থাকার জন্য বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল আছে। এসব হোটেলে ৫শ’ থেকে ৪ হাজার টাকায় রাত যাপনের ব্যবস্থা আছে।মনে রাখবেন, রাতারগুলে ভাল কোন খাবার রেস্তোরা নেই। তাই দুপুরের খাবার আপনাকে সঙ্গে নিয়েই যেতে হবে। ওহ হ্যা ঘোরাঘুরি কিন্তু দিন থাকতে থাকতে শেষ করাই শ্রেয়।

/এফএএন/  

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।