দুপুর ০২:৩৩ ; সোমবার ;  ২০ মে, ২০১৯  

আমি ও সেলিম আল দীন: একটি অন্যরকম সম্পর্ক

প্রকাশিত:

জব্বার হোসেন॥

সম্পর্ক, শব্দটি খুব চমৎকার। খুব ভালো লাগে আমার। আমার প্রিয় অনেক শব্দের একটি-সম্পর্ক। সম্পর্কই সব। জগৎ এক অর্থে আসলে সম্পর্ক। সম্পর্ক আছে জগৎ আছে, সম্পর্ক নেই জগৎ নেই। সম্পর্ক এক ধরনের সম্পর্ক তৈরি করে। আবার সম্পর্কহীনতাও তৈরি করে আরেক রকম সম্পর্ক। মানুষ-মানুষে, প্রকৃতিতে, বস্তু-অবস্তুতে, বিশ্বাসে, অবিশ্বাসে, কতো সম্পর্কেই না জড়ায়, আবার সেখান থেকে তা ভেঙে বেরিয়েও আসে।

অনেক ধরনের নাম দিই সম্পর্ককে। কখনও কখনও মনে হয়, সম্পর্ককে নামের মোড়কে আটকে ফেলছি না তো? নামের সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রের মধ্যে সম্পর্কের সীমানা কী আটকে রাখা যায়? সম্পর্ক তো ফ্লুইড। পারদের মতো গড়িয়ে এদিক-সেদিক। তাহলে কী করে সীমানায় বাঁধি? কী করে আজ বলবো, সম্পর্কটি কাল কোথায় যাবে, কোন দিকে সম্পর্কের নতুন পথ? তবে কিছু সম্পর্ক ছাঁচে থাকে। কিছু সম্পর্ক হয়তো ছাঁচের দেয়াল ছাদ সব ভেঙেচুরে, চুরে ভেঙে একাকার। যদিও তা নির্ভর করে ব্যক্তিবিশেষের ওপর। তারপরও কারও কারও ক্ষেত্রে, কোনও কোনও সম্পর্কে, ব্যক্তিগত জীবনে এই ফ্রেমবন্দী, সম্পর্কের পোশাকি মোড়ক আমার কাছে বড্ড ক্লিশে মনে হয়েছে।

কোনও মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক। মেয়েটি কে? প্রশ্ন সকলের। স্ত্রী? প্রেমিকা? মেয়েবন্ধু? মেয়েটি হয়তো স্ত্রী নয় প্রেমিকাও নয়, নিছক মেয়ে বন্ধু, তাও হয়তো নয়, তাহলে? আমরা কিছু নির্দিষ্ট ধারণায় বাস করি। ধারণার বাইরে এক বিন্দুও বেরোতে চাই না। মেয়েটি হয়তো প্রেমিকা নয়, প্রেম তার প্রতি আছে, আছে ভালোবাসাও, হয়তো প্রেমিকার চেয়েও বেশি। তাহলে স্ত্রী নয় কেন? স্ত্রী তো একটি আর্থ সামাজিক ক্লিশে কনসেপ্ট। তাহলে পরকিয়া নিশ্চয়? না তাও নয়। কখনও শরীর, কখনও মন, কখনও দুটোই, কখনও একটিও নয়। সম্পর্কের প্রচলিত ধারণা, চেহারা, চরিত্র ভাংচুর করে দিয়েও সম্পর্ক হয়। অন্য এক সম্পর্কে দাঁড়ায়। সে সম্পর্ক অনামা, প্রচলিত সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে, যৌনতা-অযৌনতার হাত ছেড়ে দিয়ে চলে যায় দূর, বহুদূরে।

কোনও একটি ছেলে আমার বন্ধু। শুধু বন্ধুত্বের মধ্যেই থাকে না সম্পর্কটি। কখনও কখনও বন্ধুটি শুধু বন্ধু নয়, ভাই হয়ে ওঠে। ভাইয়ের অধিক কখনও, কখনও বন্ধুর অধিক। কখনও কখনও দুটোই। কখনও অন্য কোনও, নতুন কোনও পরিচয়, নতুন কোনও সম্পর্ক এসে দাঁড়ায়, পুরনো চলমান সম্পর্কের অবয়ব বদলে। প্রচলিত, প্রথাগত কোনও শব্দই হয়তো যথার্থ নয়, সম্পর্কটির যর্থাথতা বোঝাতে।

এমন সম্পর্ক আমার অনেক হয়েছে। অনেকের সঙ্গে হয়েছে। অনেক, একের অধিক অর্থে। একের অধিকই তো একাধিক। একাধিক এক অর্থে, অনেক। নারীর সঙ্গে, পুরুষের সঙ্গে। নারী-পুরুষ। পুরুষ-নারী এমন যোনিশিশ্নের লিঙ্গ নির্ভর ধারণার বাইরে এসে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানুষ এই মানবিক ধারণাটি বরাবরই অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে আমার কাছে।

আমি ও সেলিম আল দীন, অন্যরকম সম্পর্কের গল্প। ছাত্র ছিলাম। শুধু কী ছাত্রই ছিলাম? পুত্র বলে ডাকতেন। পুত্রই কী শুধু নাকি পুত্রের অধিক? শ্রেণিকক্ষে একরকম, শ্রেণিকক্ষের বাইরে অন্যরকম। কে আমাকে অমন করে প্রকৃতি বোঝাবে? মানুষ বোঝাবে? মানুষই সব। জগৎ আসলে মানুষই। প্রেম খুব জরুরি। বাধ্যতামূলকভাবে। প্রেমে পড়তে বলেছিলেন, কারও না কারও, কিছু না কিছুর। বস্তু বা অবস্তুর। মানুষ বা প্রকৃতির। কাম ও প্রেমকে ভিন্ন করেছিলেন, অন্যদের চেয়ে ভিন্ন ভাবে, কাম হচ্ছে একটি তাৎক্ষণিক উত্তেজনা ও ঝড়, প্রেম নিরন্তর। ‘আকর্ষণ’ যে প্রেম নয়, তার কাছেই বুঝেছিলাম, জেনেছিলাম প্রথম। প্রেম আসলে হাহাকার। শূন্যতা।

কবিতা লিখে দিয়েছিলেন ‘ভালোবাসা’। পত্রিকার জন্যে নয়, কাউকে দেবার জন্য নয় সেই চির চেনা হাসি তার মুখে, তোর জন্য।

শ্রেণিপাঠ বরং কমই হয়েছে আমার। বরং যা কিছু অপাঠ্য, জাগতিক ভাবে অদরকারী, অপ্রয়োজনীয় আলোচনা বলে বিবেচিত ও চিহ্নিত, সেসব নিয়ে বরাবর আমার কৌতুহল। সেই কৌতুহলের পুরোটা না হলেও অনেকটাই মিটিয়েছেন তিনি। সিরিয়ার তহমিনা থেকে টলস্টয়ের আন্না কারেনিনা, ফ্রয়েডীয় যৌনতা থেকে স্টারডাস্ট এডিটর শোভাদের যৌন উপন্যাস, মহাভারত থেকে মধুসুদনের এপিকফর্ম, ব্ল্যাক ম্যাজিক থেকে প্ল্যানচেট, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ থেকে সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামের উপন্যাস, রঁদ্যা থেকে সুলতান, সুরিয়েলিজম থেকে ফোররিয়েলিজম, রিলিজিওন থেকে ননরিলিজিওন, অড্রে হেপবার্ন থেকে শাবনূর, সম্রাট হাইলেস থেকে সাদ্দাম হোসেন, ফ্রাংকো থেকে এরশাদ, লোরকা থেকে ফরহাদ মজহার- এমন কোনও বিষয় নেই, যা নিয়ে আলোচনা হতো না। বরং বৃত্ত ভাঙা আলোচনা, সম্পর্কের বৃত্তকেও ভেঙে চুরচুর করে দিয়েছিলেন অনেক আগেই।

অথচ ব্যক্তিগত কিছু কখনোই জানতে চাওয়া হয়নি। জানতে ইচ্ছেও করেনি কখনও আমার। একটা সময়ে ভুলেও গিয়েছিলাম, তার শ্রেণিপাঠের কথা, শিক্ষক আমার সে কথা। কখনও বাবার মতো মনে হয়েছে, বাবাই তো।

প্রতিরাতেই ফোন, মাঝ রাতেও ফোন, ‘চরিত্রটা তো মরছে না। তবে ভয়ংকর মৃত্যু যন্ত্রণা, কাতরাচ্ছে।’ ঘুম ঘোর কেটে কেমন শিউরে উঠি। বাবা বলে বুকের কাছে মুখটা টেনে নিতে গিয়ে দেখি, ফোন হাতে আমি। কখনও কখনও তাকেই মনে হয়েছে সন্তান আমার। এক রাতে কাউকে কিছু না বলে, সম্ভবত স্ত্রীকেও না বলে চলে আসেন লালমাটিয়া। সে রাতে বাড়ি ফিরতে চাননি। কাছে থাকি আমি। তার খুব কাছে। যতটা কাছে থাকা যায়। নিঃশ্বব্দ রাত। নিঃস্তব্ধ রাত। এত কথা হয় দুজনে অথচ সে রাতে কোনও কথা হয়নি। সে রাতের কথা জানতেও চাওয়া হয়নি পরে আর কোনদিন। কেন এসেছিলেন তাও না, একটিবারের জন্যও না।

জানতে আমার চাওয়া হয়নি অনেক কিছুই। প্রথম দেখা যেদিন, হলভর্তি মানুষ। একে একে নাম ডাকা হচ্ছে। নামটি শুনবার অপেক্ষায় আমি। জব্বার হোসেন। ভেতরে সেলিম আল দীন। কোন কিছু জানতে না চেয়েই শুধু বললেন, তোমার হাতটি দেখি। বাড়িয়ে দেই কম্পমান হাতটি আমার। দৃষ্টিতে কেমন ঘোর। হাতটি ধরে কিছুক্ষণ, কী যেন ভাবেন, ছেড়ে দেন হাতটি। আর কিছুই জানতে চান না।

জানতে আমার আরও অনেক কিছুই চাওয়ার ছিল। আরও আরও আরও অনেক কিছু। জানতে চাওয়া হয়নি কিছুই। ‘ভাঙ্গা প্রেম অশেষ বিশেষ’ উৎসর্গ করেছিলেন আমাকে। চমকে উঠি যখন বইটি পড়তে পড়তে শেষের দিকে যাই। তবে কী তিনি মৃত পুত্রের কোনও প্রত্ন আদল দেখেছিলেন আমারই মুখে। হায়! তবে কী আমিই তার সেই মৃত পুত্র!

সেলিম আল দীনের মুখটি কেমন চোখের ঝাপসা হতে থাকে, ঝাপসা হতে থাকে চোখের জলে। সে আমার কে ছিল? ছিল না কে সে আমার? আমি কোনও নাম দিতে চাই না, এই সম্পর্কের। নামের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে সব সম্পর্ককে আটকে ফেলা অন্যায়। আমার জানা নেই, এই সম্পর্কের কোনও নাম। নাম হয় না সব সম্পর্কের। অজানা সম্পর্কে ভালবাসায় এক অদ্ভুত জড়িয়ে যাওয়া, জড়িয়ে থাকা।

ভালোবাসা। সত্যিই বড় অদ্ভুত। এক আশ্চর্য জীবনে। শুধু বোঝা যায়, বোঝানো যায় না কাউকেই!


লেখক :সদস্য, ফেমিনিস্ট ডট কম, যুক্তরাষ্ট্র
পরিচালক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশন
সম্পাদক, সাপ্তাহিক কাগজ ও মিডিয়াওয়াচ

jabberhossain@gmail.com

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।