সকাল ০৯:১৫ ; রবিবার ;  ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯  

'বিকৃত প্রতিশোধপন্থা ধর্ষণ'

প্রকাশিত:

জাকিয়া অাহমেদ ॥

'Rape is a tool to insult and to control girls' বলেছেন মহিলা পরিষদের সভাপতি অায়েশা খানম। তিনি অারও বলেন, সমাজে নানা ধরনের সহিংসতার একটা বিকৃত প্রতিশোধপন্থা হলো ধর্ষণ। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, যখন কোনও একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে তখন সেই দুর্বৃত্তকে অামরা দোষী বলি না, তাকে অাইনের অাওতায় অানি না, দোষ দেই মেয়েটিকে।

অাশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে নারী নির্যাতন বিশেষত ধর্ষণের ঘটনা। গতবছর অর্থাৎ ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে চার হাজার ৬৫৪জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এ সময় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৩৯টি, গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৫৪টি এবং ধর্ষণের পর ৯৯ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১১৫ জনকে, শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছে ১১৬ জন, যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে আরও ৪৪ জন।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপপরিষদ থেকে এ পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি অায়েশা খানম বাংলা ট্রিবিউনকে অারও বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অামরা অনেক বিষয়ে শুনতে পাই তারা জিরো টলারেন্স ঘোষণা করছে, কিন্তু নারী নির্যাতনের অন্যতম হাতিয়ার ধর্ষণের মতো বিষয়ে কখনোই রাষ্ট্র থেকে অামরা কিছু শুনি না। তার বদলে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের থেকে অামরা শুনি, মেয়েদের প্রভোকেশনের (উস্কানি) ফলেই ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটে।

অায়েশা খানম বলেন, অামরা চাই ধর্ষণের মতো সহিংসতার ক্ষেত্রে 'জিরো টলারেন্স' ঘোষণা করা হোক। ধর্ষণ গত দুই বছরে সাউথ এশিয়ান ফেনোমেনা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। মেয়েরা ঘর থেকে বের হচ্ছে, নারীরা ক্ষমতায়নের জন্য তারা লড়ছে কিন্তু নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর সমান অধিকার এবং নারীর সক্ষমতা বৃদ্ধিকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা এখনও অামাদের গড়ে ওঠেনি।

'শুধু নারীর প্রতি সহিংসতার মানসিকতা থেকেই নয়, যে কোনও বিবাদে একটি পরিবারকে হেনস্তা করার জন্যও এখন ধর্ষণ অন্যতম হাতিয়ার সমাজে,' বলেন অায়েশা খানম।

ধর্ষণ রোধে বাংলাদেশে যেসব বিদ্যমান অাইন রয়েছে সেগুলোর যদি যথাযথ প্রয়োগ করা যেত তাহলে ধর্ষণ অনেক কমে যেত বলে জানান তিনি। কিন্তু নানা কারণে তাদেরকে অাইনের অাওতায় অানা যাচ্ছে না। অাইনের বাস্তবায়ন অামাদের দেশে যথার্থভাবে হচ্ছে না। কারণ, অাইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা অামাদের বলেছেন, তাদের ওপর ওপরের নির্দেশ থাকে মূল অাসামিদের বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দেওয়ার। তারা অামাদের বলেন, 'অামরা অসহায়, অামরা অাদেশ অনুসরণ করি মাত্র।' অাইন নিজের গতিতে চলে বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে অাইন নিজের গতিতে চলে না, চলতে দেওয়া হয় না। এই জায়গাগুলোতে পলিসি মেকার, ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন, ল'মেকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এক হতে হবে।

যথাযথ সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবেও বেশিরভাগ নারী নির্যাতন মামলার দোষীরা খালাস পেয়ে যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইম্যান অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারপার্সন তানিয়া হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পরিবার থেকে যতদিন না সচেতনতা অাসবে ততদিন অামাদের দেশে নারী নির্যাতনের এ চিত্র দেখতেই থাকবো। অার পরিবারকে সচেতন করার দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকে। পরিবার-সমাজ- রাষ্ট্র একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। যখনই এ তিন প্রতিষ্ঠানের সংযোগের অভাব হয় তখনই সমাজে নানা ধরনের অপরাধ বেড়ে যায়।

তানিয়া হক অারও বলেন, রাষ্ট্রকে তার প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নারীর প্রতি যে কোনও ধরনের নির্যাতন রুখতে সামাজিক শ্লোগানগুলোকে অারও দৃঢ় করতে হবে।

এছাড়া, মহিলা পরিষদের ওই বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে নারীর প্রতি সহিংসতার অারও বিভিন্ন দিক উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বছর এসিড দগ্ধের শিকার হয়েছে ৫৫ জন, এর মধ্যে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অগ্নিদগ্ধ ৫৮ জনের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৩৬ জনের। একই বছরে অপহরণের শিকার হয়েছে ১১৮ জন। পাচার হওয়া ৩০ জন নারী ও শিশুর মধ্যে পতিতালয়ে বিক্রি করা হয়েছে ১৯ জনকে। বিভিন্ন কারণে ৮৯৮ জন নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।

এখনও নারী সহিংসতার অন্যতম কারণ যৌতুক। এর জন্য নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪৩১ জন নারী। যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে ২৩৬ জনকে।

মহিলা পরিষদের প্রতিবেদনে অারও জানা যায়, গত বছর গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৮৬ জন এবং হত্যা করা হয়েছে ৩৯ জনকে। নানাভাবে উত্যক্ত করা হয়েছে ৪৬৫ জনকে, এর মধ্যে আত্মহত্যা করেছে ২১ জন।

ফতোয়ার শিকার হয়েছে ২৯ জন। বিভিন্ন নির্যাতনের কারণে ৩৪১ জন আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন এবং ১৮৩ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে।

বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে ৯৩ জন। পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫৩ জন। শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে ২৫৮ জনকে। এছাড়াও এ বছরে মোট ২৭৭টি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় বাড়ি ভাঙচুর, অগ্নি সংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

/টিএন/এফএ

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।