দুপুর ০১:৫২ ; বুধবার ;  ২২ মে, ২০১৯  

বহমান বাংলায় সেলিম আল দীন || তানভীর আহমেদ সিডনী

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

‘রাষ্ট্রের দেহ আছে। মনুষ্যদিগেরও আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের দেহ ছেদবিচ্ছেদে নিত্যই পূর্ণ। যেমন ছোটোকালে পারদ দেখিয়াছিলাম আধুলির সমান। তা কচুপাতায় রাখিলে অখণ্ড আবার কচুপাতা হইতে ঝরিয়া পড়িলে অনতিবিলম্বে বহুসংখ্যক রূপালি বিন্দুতে পরিণত হইয়া বিচ্ছিন্নভাবে সম্পূর্ণতা লাভ করে। রাষ্ট্র সেইরূপ।’


স্বাধীনতা পরবর্তী বাঙালির নাট্যভাবনায় সেলিম আল দীন প্রবল শক্তিতে প্রবহমান। তাঁর নাট্যচর্চায় অনেকগুলো পর্বের চিহ্নায়ন করা যায়। প্রাথমিক পর্বে সদ্য স্বাধীন দেশে মানুষের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ও ক্ষীয়মান রাজনীতির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার দেখা মেলে। ফলে বাস্তবতার ভিন্ন রূপ উপস্থিত হয় তাঁর নাটকে। পাশ্চাত্য বাস্তববাদ, প্রকৃতিবাদ, অভিব্যক্তিবাদ, কিমিতিবাদ- এসব ভাবনায় জারিত হয়ে রচনা করেন ‘সর্প বিষয়ক গল্প’, ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’, ‘সংবাদ কার্টুন’, ‘মুনতাসির’ প্রভৃতি নাটকসমূহ। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। একজন অনুসন্ধানী নাট্যকার হিসেবে পথের সন্ধান করেছেন। এই পথ সন্ধানের ফলস্বরূপ রচিত হয়েছে ‘আতর আলীদের নীলাভ পাট’, ‘চর কাঁকড়ার ডকুমেন্টারি’ ইত্যাদি। তারপর নতুন চিন্তনের পথ খোঁজা, এই পথেই চিন্তনকে রূপায়িত করা হয় সংলাপ আর চরিত্রের চলনে। এই পর্বেই সেলিম আল দীন পুরাণের দিকে দৃষ্টি ফেরান। 
‘শকুন্তলা’ নাটকে পুরাণের বিষয় ভেঙে তাকে প্রতিস্থাপিত করেন পাশ্চাত্য আঙ্গিকে। তাঁর এই নাটককে বলা যায়, পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের মিথস্ক্রিয়া। তাঁর মূল অভিপ্রায় ছিল মানুষের চিন্তনে প্রভাব ফেলা। যা ঘটাতে হবে রঙ্গমঞ্চে। সন্ধান শুরু হয় বাঙালির নাট্য আঙ্গিকের। ‘শকুন্তলা’র পথ বেয়ে ‘কেরামতমঙ্গল’ ও ‘কিত্তনখোলা’য় আসেন। শুরু হয় আঙ্গিকের নিরীক্ষা। মঙ্গলকাব্যধারায় রচিত ‘কেরামতমঙ্গল’ তাঁর নিরীক্ষাপ্রবণতার প্রতীক। তিনি যেন বাঙালির নাট্যরীতির অনুসন্ধিৎসু নাট্যকার। তাঁর চলনও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চলনের অনুরূপ। রবীন্দ্রনাথ প্রাথমিক পর্বের নাটকে তিনি পাশ্চাত্য ভাবনায় জারিত হলেও পরে তিনি আপন শিল্পপথ নির্মাণ করেন। সেলিম আল দীনও ভূমির সঙ্গে আত্মীয়তা করতে চান আর তাঁর দৃষ্টি থাকবে বিশ্বের পানে। তাঁর নাটকে পুরাণ ও জনসংস্কৃতির সংযোগ ঘটে। 
‘কেরামতমঙ্গল’ নাটকে দাঙ্গা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, মুক্তিযুদ্ধ- বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক ইতিহাসের পথ বেয়ে তিনি মানবিক উচ্চারণ করেন। এই মানবিক উচ্চারণ মানেই ভ্রুণ হত্যা নয়। অনাগত প্রাণকে যত্নে বড় করে তোলার আকাঙ্ক্ষা শিল্পশরীরে রূপ পায়। গণমানুষের জীবনের পথে চলে কেরামত, আর সেখানে নানা বাঁকের পথ পেরিয়ে বাঙালির জীবন-ইতিহাস-বিশ্বাস এই ত্রয়ীর সঙ্গম ঘটে। পেশার বদল অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। শিল্পবিপ্লব পেশাজীবীদের পরিবর্তনের পথ তৈরি করে দিয়েছিল। বাংলা অঞ্চলেও ইংরেজদের আগমন ও তৎপরবর্তী আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ফলে বাঙালি সমাজেও বদল শুরু হয়। ‘কিত্তনখোলা’ নাটকে দেখা যায়, পেশাবদলের বেদনা চরিত্রগুলো বহন করছে। বনশ্রীবালার জন্যে নাট্যকারের বুকে যে বেদনা তা ঐতিহ্যমুখীন একজনের বুকে জমে থাকা কষ্ট। ‘কিত্তনখোলা’ প্রসঙ্গে নাট্যকারের বক্তব্য, “এর অনুপ্রেরণা এসেছে মানুষের জীবনের মহাকাব্যিক চেতনা থেকে- কোনো বিশেষ মহাকাব্য থেকে না, মহাকাব্যিক চেতনা থেকে এবং সাধারণ মানুষের ভেতরে এই মহাকাব্য লুকিয়ে আছে।”
তিনি বাংলার নদী, জল, পাখি আর পূর্ণিমায় বড়ো হয়েছেন। তাই বাংলায় মুখ ডুবে থাকেন। বিষয়ের দিক থেকে প্রাচ্যবাদী নাট্যকার পুরাণের ভাবনা অন্তরে ধারণ করে সমকালীনতার পোশাক পরিধান করেন। তাই তাঁর নাটক ঐতিহ্যের ধারায় সমকালীন। পুরাণ যেন তার করতলে বসবাস করে। তাই ‘হাত হদাই’ নাটকে সমুদ্রভ্রমণের পুরাণ তৈরি করে পাঠক-দর্শকসহ সেই পুরাণে ডুব দেন। তিনি এই পর্বে বাঙালির নাট্যকাঠামো নিয়ে নিরীক্ষাপ্রবণ, পথ সন্ধান করেন। এই পথ সন্ধানেই তিনি বাঙালির চিরায়ত আঙ্গিকের ছায়া লাভ করেন। পাশ্চাত্যের মতো টান টান উত্তেজনায় একটি ঘটনা সমাপ্ত হলো- ব্যাপারটি তেমন নয়। তিনি ডুব দেন খণ্ড খণ্ড ঘটনার বিন্যাসে। বাঙালির গল্প উপস্থাপনের মতো কাহিনী, উপকাহিনীর আশ্রয়ে এক গীতল উপস্থাপনার সঙ্গে সংযোগ ঘটানো।
এই পথ চলতে চলতে তিনি প্রবেশ করেন নতুন ভূমিতে, যাকে নিজেরই নামকরণ করেছেন বর্ণনাত্মক রীতি শিরোনামে, আর নাটকের কাঠামোকে বলেছেন ‘কথানাট্য’। একাত্তরে বাংলাদেশ রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করলেও চিন্তনে ও মননে স্বাধীনতা লাভ করেনি। কেননা বাঙালির রুচি, শিল্পবোধ সর্বত্রই পাশ্চাত্য প্রভাব প্রবলরূপে দৃষ্ট। তিনি এই চিন্তনের জগতে আঘাত হেনেছেন। স্বাধীনতার নানা বিতর্কেও এই রাষ্ট্রে তিনি স্বভূমিজ শিল্পরীতির কথা বলেছেন। তাই ‘চাকা’ নাটকে বিষয় ও আঙ্গিক সকল ক্ষেত্রেই দেশজ ধারার দিকেই পক্ষপাত। ‘চাকা’ রচনাকালীন সময়ে বাংলাদেশে সামরিক বুটের দাপট। সেই সময়ে গণতন্ত্রের জন্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র, পেশাজীবীরা প্রাণ দিচ্ছে। বুকে-পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগান লিখে নুর হোসেন রক্ত দেয়। এছাড়া অনেক অজ্ঞাত মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয় ক্ষমতাসীনদের হাত। নাট্যকার এই অজ্ঞাত মানুষকে পৌঁছে দিতে চান জ্ঞাত ঠিকানায়। কিন্তু পথ চলতে চলতে দেখা যায় মরদেহ মানুষের বুকে স্বজন হারানোর বেদনা জাগিয়ে তোলে। পাঠক-দর্শককে স্মরণ করিয়ে দেয়, রাষ্ট্র যখন বিশেষ বাহিনীর হাতে পরিচালিত সেই সময়ে সাধারণ মৃত্যুর উৎসবেই জীবনের মানে খোঁজে। একইভাবে মৃত্যুর মিছিলে মুক্তি সন্ধান হয়।
সেলিম আল দীন ‘চাকা’ কথানাট্যে বর্ণনা ও সংলাপের ক্ষেত্রে এক নতুন রীতি সৃজন করেছেন। বাঙালির ঐতিহ্য সন্ধানী নাট্যকার মধ্যযুগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সে সূত্রে তিনি মধ্যযুগের ভাষারীতিকে অবলম্বন করেননি। বরং তিনি বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেই এক নতুন ভাষারীতি নির্মাণ করেছেন। নিশ্চিতরূপেই তা বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে ভিন্নতর অভিজ্ঞতা। তাঁর নাটকে বর্ণনা ও সংলাপে এক কবির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় যিনি অনবরত কবিতা লিখে চলেছেন। এই কবিতার পথেই সেলিম আল দীন ‘চাকা’ নাটকে রচনা করেন, ‘যুবক পইরাতের নাম শুকুরচান ॥ তার হৃদয় কতনা জানা অজানা স্বপ্ন বসন্ত বাউরী’ তার তো সেই বয়স যে বয়সে গভীর নিশীথে তশতরী ঠুনকী শরবতীদের কাঠবাদামের গাছের নিচে বাঁশী বাজাতে ভালো লাগে’, ‘যে বয়সে চাঁদের রাতে বাঁশী বাজাতে বাজাতে ভাবে কোন সে মোহিনী সাপিনী তার সুরের টানে আঁকা বাঁকা পথে তারই কাছে চলে আসবে’

সেলিম আল দীন

‘চাকা’ কথানাট্যের মাধ্যমে বাংলা নাটকে নতুনতর রীতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাই নাটকের কথাপুচ্ছে রচনা করেন,  ‘চাকাকে কেউ যদি কাব্য বলেন আপত্তি করব না, গল্প বললে অখুশী হব না। আমি সবসময় চেয়েছি আমার লেখা নাটকগুলো নাটকের বন্ধন ভেঙে অন্যসব শিল্পতীর্থগামী হোক।’ এই সূত্রেই তাঁর নব্যজাতিগত থিয়েটারের দিকে দৃষ্টিপাত করা যায়। ‘কেরামতমঙ্গল’-এ আদিবাসী গারো আর রাখাইনদের সঙ্গে পরিচয় হয়। ‘চাকা’ নাটকে সাঁওতাল ডোম আর তার সঙ্গে সাওতালি মিথে ভ্রমণ করতে করতে তৈরি হয় ‘একটি মারমা রূপকথা’। স্বর্গ থেকে নেমে আসা মুনরি, প্রাণের ভেতর ধুকপুক করে। মারমা সমাজের সঙ্গে পরিচয় হয় বাঙালির। উল্লেখ্য, সামরিক শাসনের দগদগে ঘা নিয়ে বাঙালি সমাজ উড়ে গিয়ে জুড়ে বসেছে। অতপর সে সমাজ নিপীড়ন চালায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপর। এখানে বলা যায়, ‘একটি মারমা রূপকথা’ রচনাকালীন সময়ে পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। একদিকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীসমূহ অন্যপক্ষে অস্ত্রহাতে বিদ্রোহীরা। ফলে অস্তির পার্বত্য অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে নাটকটি রচিত হয়েছে নাটকটি। যা একই সঙ্গে আত্মপরিচয়ে দাঁড়ানো একটি জাতির মুখ। সেলিম আল দীন খনন করতে চেয়েছেন এ ভূমির জীবন ও সংস্কৃতি। তাই বাঙালি হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিসত্তার প্রতি পক্ষপাত নয়। এখানে ভুলে গেলে চলবে না যে তিনি বাঙালি হওয়ার পরও তাঁর শিল্পের জমিনে বুনেছেন আদিবাসী জীবন ও সংস্কৃতির কাব্য। মারমাদের পথ বেয়ে তিনি মান্দাই জীবন ও সংস্কৃতির দিকে তাকিয়েছেন। অনিল ও সুকির বেদনা পাঠক-দর্শক হৃদয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল। বাঙালির অহং আর ভূমি গিলে খাবার ছবিটি সযতনে তুলে এনেছেন শব্দের বন্ধনীতে।
আঙ্গিক নিয়ে নিরন্তর গবেষণা করেছেন সেলিম আল দীন। একই সঙ্গে আঙ্গিক বিলোপের মধ্য দিয়ে বাঙালির শিল্পরীতি নির্মাণের পথে অবিরত চলেছেন। এমনি করেই রচিত হয়েছে ‘হরগজ’, ‘প্রাচ্য’, ‘বনপাংশুল’, ‘ধাবমান’ হয়ে ‘নিমজ্জন’।  হাজার বছরের বাঙলা নাট্যরীতি সন্ধানে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন সমকালীন শিল্পরীতি, ইতিহাস থেকে তুলে এনেছেন বাঙালির নাট্যরীতির নন্দনভাবনা। একটি নতুন বিশ্বাসে এই বলে উপনীত হয়েছেন যে বাঙালির নাট্যরীতি নৃত্য-গীত-সংলাপের আশ্রয়ে নির্মিত। শিল্পের এই আঙ্গিক নির্মাণের পথে ভুলে যাননি রাষ্ট্র ও রাজনীতির সূত্র সমীকরণ। তেমনি একটি সূত্র লিপিবদ্ধ করেছেন ‘নিমজ্জন’ নাটকে, ‘রাষ্ট্রের দেহ আছে। মনুষ্যদিগেরও আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের দেহ ছেদবিচ্ছেদে নিত্যই পূর্ণ। যেমন ছোটোকালে পারদ দেখিয়াছিলাম আধুলির সমান। তা কচুপাতায় রাখিলে অখণ্ড আবার কচুপাতা হইতে ঝরিয়া পড়িলে অনতিবিলম্বে বহুসংখ্যক রূপালি বিন্দুতে পরিণত হইয়া বিচ্ছিন্নভাবে সম্পূর্ণতা লাভ করে। রাষ্ট্র সেইরূপ।’ এমনি করেই শিল্প ও রাজনীতিকে একীভূত করেছেন তার শিল্পভাবনায়।

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।