বিকাল ০৫:০৭ ; মঙ্গলবার ;  ২১ মে, ২০১৯  

শার্লি আবদো

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

তসলিমা নাসরিন॥

বেশ কয়েক বছর আগে শার্লি আবদোর সম্পাদক এবং এক ঝাঁক কার্টুনশিল্পী আমাকে তাঁদের অফিসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্যারিসের যে কোনও ছোটখাটো পত্রিকা অফিসের মতোই শার্লি আবদোর অফিস। কার্টুনিস্টদের কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। বাক স্বাধীনতার পক্ষে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওদের লড়ে যাওয়াটা অনেকটা আমার লড়ে যাওয়ার মতো। ফতোয়া আসছে, মৃত্যুর হুমকি আসছে, কিন্তু ওঁরা থামছেন না। যা বলতে ইচ্ছে করছে, তা বলছেন। মৌলবাদীরা শাসিয়ে গেছে ইসলাম নিয়ে কোনও কটু কথা বললে ওঁদের জবাই করবে, তারপরও ওঁরা কটু কথা বলছেন। পয়গম্বরের কার্টুন আঁকলে খুন করবে, তারপরও আঁকছেন। আগুন-বোমা পড়লো অফিসে, আল কায়দার ওয়ান্টেড লিস্টে নাম উঠলো, তারপরও ম্যাগাজিন বন্ধ করলেন না। চমৎকার মানুষ ওঁই কার্টুনিস্টরা। হাসাতে যেমন জানেন, হাসতেও জানেন প্রচণ্ড। ওঁরা কেউই ঈশ্বরে, মৌলবাদে, সন্ত্রাসে আর সহিংসতায় বিশ্বাস করেন না। আমি যেমন। ফতোয়া, নিষেধাজ্ঞা, নির্বাসন কিছুই আমাকে ভাঙতে পারেনি। ওঁরা আমার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। ওঁরা বাস করেন সর্বোচ্চ গণতন্ত্রের দেশে, তাই নিজেদের নিয়ে দুশ্চিন্তাটা ওঁদের অতটা ছিল না। আমি কি আর বুঝেছি তখন যে, কোনও একদিন এই অফিসেই বন্দুক হাতে একদল সন্ত্রাসী ঢুকে ওঁদের সবাইকে এক এক করে নৃশংসভাবে হত্যা করবে! আমি কি আর বুঝেছি তখন যে, আসলে পৃথিবীর কোনও দেশই, কোনও অঞ্চলই এখন আর নিরাপদ নয়। সন্ত্রাসীরা সর্বত্র বিরাজ করছে।

আমার কেবল মনে হচ্ছে, ঠিক এভাবে একদিন আমাকেও মেরে ফেলবে ওরা। আমি হয়তো কোনও কবিতা বা উপন্যাস লিখতে থাকবো, আর অতর্কিতে আমার ঘরেও ঢুকে ওরা আমাকে জবাই করবে, নয়তো মাথা লক্ষ্য করে গুলি করবে, ‘আল্লাহু আকবর’ বলতে বলতে।

 

শার্লি আবদো বন্ধ হবে না। বন্ধ হয়ে গেলে বা কার্টুনিস্টরা ভয় পেলেই জিতে যাবে সন্ত্রাসীরা। শুনে ভালো লাগছে যে শার্লি আবদোর পরবর্তী সংখ্যাটা ছাপা হবে দশ লক্ষ কপি। শার্লি আবদোর প্রকাশই মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে এবং ধর্মীয় সন্ত্রাসের বিপক্ষে একটি বিশাল আন্দোলনের মতো। সন্ত্রাসী হওয়ার জন্য দক্ষতার দরকার হয় না। অটোমেটিক রাইফেল চালিয়ে মানুষ মারতে কোনও প্রতিভার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু সাংবাদিক বা কার্টুনশিল্পী প্রতিভা ছাড়া হওয়া যায় না। এতগুলো প্রতিভাকে নিতান্তই অসভ্য, অশিক্ষিত আর বর্বর কিছু লোক হত্যা করেছে তাদের ঈশ্বরকে খুশি করার জন্য, অথবা বেহেস্তবাসী হওয়ার জন্য।

শার্লি আবদোর কার্টুনিস্টদের মেরে ফেলেছে ইসলামি সন্ত্রাসীরা, এই খবর পাওয়ার পর থেকে আমি শোকস্তব্ধ বসে রয়েছি। আমার কেবল মনে হচ্ছে, ঠিক এভাবে একদিন আমাকেও মেরে ফেলবে ওরা। আমি হয়তো কোনও কবিতা বা উপন্যাস লিখতে থাকবো, আর অতর্কিতে আমার ঘরেও ঢুকে ওরা আমাকে জবাই করবে, নয়তো মাথা লক্ষ্য করে গুলি করবে, ‘আল্লাহু আকবর’ বলতে বলতে। কেবলই মনে হচ্ছে, প্যারিসের মতো শহরে নিরাপত্তারক্ষী থাকার পরও যদি খুনের ঘটনা ঘটে যায়, তাহলে দিল্লিতে না ঘটার কোনও তো কারণ নেই। যত দুশ্চিন্তাই করি না কেন, আমার লেখা কিন্তু বন্ধ হবে না। ঠিক যেভাবে শার্লি আবদোর কার্টুনের মতো কার্টুন আঁকাও বন্ধ হবে না।

পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবীদের বেশিরভাগই বেশিরভাগ সময় মুসলিমদের পক্ষ নিয়ে কথা বলেন, যতই সন্ত্রাস মুসলিমরা করুক না কেন। পাশ্চাত্যের লিবারেল ট্রাডিশান রক্ষা করাটা তাঁদের দায়িত্ব বলেই মনে করেন। মুসলিমরা সংখ্যালঘু বলে আফগানিস্তানে, ফিলিস্তিনে, ইরাকের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে মুসলিমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে, সম্ভবত একটা সহানুভূতি কাজ করে। শার্লি আবদোর বুদ্ধিজীবীরা এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। ওঁরা কিন্তু কারও সঙ্গে আপস করেননি। কোনও রাজনীতিবিদ, কোনও ধর্মগুরু, কোনও পয়গম্বর- কারও সঙ্গেই নয়। ক্রিশ্চান ধর্ম বা ইহুদিধর্ম নিয়ে যেমন কটাক্ষ করেছেন, ইসলাম ধর্ম নিয়েও করেছেন। মাঝে মাঝে কার্টুন শিল্পীরা যিশু, মুসা এবং অন্যান্য পয়গম্বর নিয়ে কৌতুক করতেন, ইসলামের পয়গম্বর নিয়েও করতেন। বেশ বুদ্ধিদীপ্ত সেসব কৌতুক।

ইসলামি মৌলবাদী কোনও ছোটখাটো সমস্যা নয়। এই বড় সমস্যার সমাধান করতে হলে আগে মূলে যেতে হবে। মত প্রকাশের অধিকারের বাণী শুনিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। সন্ত্রাসীরা কী মন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, কী মন্ত্র তাদের শেখাচ্ছে অস্ত্র হাতে নিতে, মানুষ খুন করতে, জানতে হবে।

 

জানি প্রচুর লোক আজ শার্লি আবদোর পক্ষে দাঁড়াবে। তারা খুনিদের দিকে নিন্দা ছুড়বে এবং বলবে খুনিদের ইসলাম সত্যিকারের ইসলাম নয়। সত্যিকার ইসলাম কোনও বিধর্মীকে বা নাস্তিককে খুনের ইন্ধন জোগায় না। ইসলাম শান্তির ধর্ম ইত্যাদি। কেউ কিন্তু বলবে না, কোরানের সুরা আল বাকারা, আল নিসা, আল আনফাল, আল তওবা এরকম অনেক সুরায় ইসলামে-অবিশ্বাসীদের কতল করার কথা বলা হয়েছে। যেখানে মুসলিমদের উপদেশ দেওয়া হয়েছে বিধর্মীদের হত্যা করার জন্য। অনেক হাদিসও বলেছে একই কথা। মুসলিম হওয়ার শর্ত কোরানে অর্থাৎ আল্লাহর বাণীতে নিঃশর্ত বিশ্বাস।

ইসলামের ইতিহাস বলে ইসলামের পয়গম্বর প্রচুর যুদ্ধ করেছেন। আরবের বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠীর লোককে তখন ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হতো। বানুকোরাইজা নামের এক ইহুদি গোষ্ঠীর আটশ পুরুষকে হত্যা করা হয়েছিল, শুধু তারা মুসলিম ছিল না বলে। এখনও পয়গম্বরের কিছু অনুসারী তার পদাঙ্ক আক্ষরিক অর্থে অনুসরণ করতে চায়। অন্যান্য ধর্মের মতো ইসলামের অর্থ যুগোপযোগীভাবে বিবর্তিত হয়নি। অনেকের মনেই ইসলাম রয়ে গেছে ১৪০০ বছর আগের ইসলামের মতোই। মুহম্মদের অনুসারীরা সত্যিকার ইসলামে বিশ্বাস করে, তারা বিশ্বাস করে পুরো পৃথিবীতে তারা সত্যিকার ইসলামি সাম্রাজ্য তৈরি করবে, যে সাম্রাজ্যে সত্যিকার মুসলিম ছাড়া আর কারোর ঠাঁই নেই। তারা বিশ্বাস করে, ইসলাম নিয়ে যে মানুষই কটাক্ষ করবে, তাদের মেরে ফেলার অধিকার তাদের আছে। আজ পৃথিবীতে সন্ত্রাস করে বেড়াচ্ছে আল কায়দা, আইসিস, বোকো হারাম, আল শাবাব ইত্যাদি সন্ত্রাসী দল। এদের সবারই আদর্শ এক এবং অভিন্ন। যেন তাদের পথই সত্যিকার ইসলামের পথ।

ইসলামি মৌলবাদী কোনও ছোটখাটো সমস্যা নয়। এই বড় সমস্যার সমাধান করতে হলে আগে মূলে যেতে হবে। মত প্রকাশের অধিকারের বাণী শুনিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। সন্ত্রাসীরা কী মন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, কী মন্ত্র তাদের শেখাচ্ছে অস্ত্র হাতে নিতে, মানুষ খুন করতে, জানতে হবে।

আমার মনে হয়, যতদিন ইসলামকে এভাবে ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া হবে, ততদিন সন্ত্রাস থাকবে।


তসলিমা নাসরিন: লেখক ও কলামিস্ট।

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।