দুপুর ০১:১৯ ; শনিবার ;  ২০ জানুয়ারি, ২০১৮  

সমকালীন দশটি হাইকু ও জাপানি হাইকু নিয়ে কথা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

ইংরেজি থেকে অনুবাদ : আশরাফুল মোসাদ্দেক


আধফোটা গোলাপ
একটি পিঁপড়ে ঢুকছে
এর সৌরভে
[মূল: ভারতের কবি কাশীনাথ কর্মকার]


হিত্রোর বিমান
এগিয়ে আসছে ক্রমাগত
প্রভাতের গান 
[মূল: ইংল্যান্ডের কবি ডেভিড জ্যাকব]


পাতা ঝরছে
নদীর ভিতর
চলে যায় স্রোতে
[মূল: কানাডার কবি সান্দ্রা মোনি এলারবেক]


সারারাতের প্রচেষ্টায়
চাঁদ পূর্ণ হয় 
এবং হারায় 
[মূল: আমেরিকার কবি জিম কাচিয়ান]


পুলের পাশে পাম
ছায়াদের খেলাধূলা 
সারাদিনভর 
[মূল: অস্ট্রেলিয়ার কবি সাইমন হ্যানসন]


সুদূরের ডাক
বন্ধুর কণ্ঠ
গতকাল থেকে
[মূল: পোল্যান্ডের কবি রাফাল যাব্রাতিনস্কি] 


মধ্য-গ্রীষ্মের ঝড়
একপাল দুধালো গরু
জড়ো হচ্ছে একসাথে 
[মূল: নিউজিল্যান্ডের কবি ক্রিস্টিন ক্লিফ] 


আবার কথা বলছি
শীতের ভাসমান মেঘেদের সাথে
উত্তর ফিরে আসে আবার 
[মূল: জাপানের কবি তাকাইয়োকি মোরি] 


একটি নির্জন বৃক্ষ 
গোধূলি লগনে 
তোমাকে ও আমাকে আলিঙ্গন করে  
[মূল: বুলগেরিয়ার কবি ইমানুয়েলা নিকোলোভা] 


জীবনের সূর্যাস্তে
সমুদ্রের নিচে লাল আপেল
উজ্জ্বলতম নগ্ন সৈকত  
[মূল: রুমানিয়ার কবি ম্যারিয়েটা ম্যাগলাস] 

 

 

জাপানি হাইকু নিয়ে কথা

হাইকু (haiku) ছোট আকারের কবিতা, যা ভাবনায় পরিপূর্ণ। এটাকে এক যাদুময় কম্পোজিশনও বলা যেতে পারে।   
হাইকু জাপানি ওয়াকা (waka)’র  একটি ধরন যাতে কোনো ছন্দ মিল থাকতে নেই। এতে থাকে ১৭টি মোরা (mora)। এর পরিমাপের মিটার সাজানো হয় ৫-৭-৫ মোরা দিয়ে। মোরা জাপানি ধ্বনির একক যা আবার ইংরেজি সিলেবলও নয়; তবে অনেকটা সমার্থক বলেই বিবেচনা করা হয়। হাইকুতে থাকে কিগো (kigo) বা ঋতুর বরাত এবং কিরেজি (kireji) বা বিচ্ছিন্নকরণ শর্ত। হাইকুতে কিগো থাকতে হবে যা থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে এটি কোন ঋতুতে রচিত হয়েছে। অন্যদিকে, কিরেজি হাইকুকে দুটো স্বতন্ত্র অংশে আলাদা করে দেয়। কিন্তুু আলাদা অংশ দু’টোর মধ্যে থাকে ভাবনার পরোক্ষ ও গভীর সেতুবন্ধন- যা হাইকুকে দান করে সুরভিত মহিমা। 

অষ্টম শতকের আগে জাপানে নিজস্ব কোনো লেখালেখির প্রচলন ছিলো না। তখন কবিতা মুখে মুখে আবৃত্তি হতো। সে সময়ে ৭১২ খ্রিস্টাব্দে ও নো ইয়াসুমারো (O no Yasumaro) জাপানি পুরাণ ও ইতিহাস নিয়ে কোজিকি (kojiki) রচনা করেন যা হেইদা নো আরে (Hieda no Are) আবৃত্তি করতেন এবং এভাবেই সূচিত হয় জাপানি ওয়াকা বা কবিতা। 

নারা সময়ে (৭১০-৭৯৪) জাপানি কবিরা চোকা (choka) ও তংকা (tanka) লিখতে শুরু করেন। চোকা ৫-৭ মোরা বা সিলেবলে কমপক্ষে দু’চরণ রচনার পর ৭-৭ মোরার চরণে শেষ করা হতো। হেইয়ান সময়ে (৭৯৪-১১৮৫) জাপানে তংকা খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তংকা পাঁচ চরণে রচিত হয় যার ওনজি (onji) বা সিলেবল কাঠামো হলোঃ ৫-৭-৫-৭-৭। একজন কবি তংকার প্রথম অংশটি রচনা করে আবৃত্তি করতেন এবং অন্য আরেকজন কবি শেষাংটি রচনা ও আবৃত্তি করে তংকাকে সম্পূর্ণ করতেন। এরূপ পর্যায়ক্রমিক কাব্য রচনা থেকে পরবর্তীতে রেঙ্গা (renga) এর বিকাশ ঘটে। দ্বাদশ শতকে প্রথম নূতন ধরনের কবিতার সূচনা হয়- ইমায়ু (imayo) যা চার লাইনে ৮-৫ কিংবা ৭-৫ মোরায় রচিত হতো। নাচের সাথে গান হিসেবে এটি প্রচলিত ছিলো। 

পঞ্চদশ শতকে জাপানি রেঙ্গা পরিপূর্ণভাবে পত্র-পুষ্পে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে। এর প্রথম ৫-৭-৫ অংশকে বলা হয় চো-রেঙ্গা (cho-renga) অর্থাৎ দীর্ঘ রেঙ্গা এবং শেষ ৭-৭ অংশকে বলা হয় তান-রেঙ্গা (tan-renga) অর্থাৎ ক্ষুদ্র রেঙ্গা। ইদো সময় (১৬০২-১৮৬৯) ৩৬ চরণে রচিত কাসেন (kasen) হয়ে উঠে সর্বাধিক জনপ্রিয় রেঙ্গার প্রকরণ যা কথ্য ভাষায় হাস্যরস মিশিয়ে বুদ্ধিদীপ্ততার সাথে রচিত হতো। এ থেকে পরবর্তীকালে হাইকাই নো রেঙ্গা (haikai no renga) অর্থাৎ কমিক জাতীয় সংযোগ-কাব্য বা হাইকাই এর উৎপত্তি ঘটে। 

রেঙ্গার শেকল এর প্রথম স্তবককে বলা হতো হক্কু (hokku)। ইকো সময়ে ১৬০০-১৮৬৮) তিন জন মাস্টার মাতশ্যুও বাশো (Matsuo Basho  ১৬৪৪-১৬৯৪), ইউসা বুসন (Yosa Buson ১৭১৬-১৭৮৩) এবং কোবায়েশি ইশা (Kobayashi Issa ১৭৬৩-১৮২৭) হক্কু বা হাইকাই (haikai) রচনা করে আজো বিখ্যাত হয়ে আছেন সারা দুনিয়ায়। কবি মাতশ্যুও বাশো এর সূচনা করেন এবং একক কবিতা হিসেবে রচনা করতে থাকেন। তাই কবি মাতশ্যুও বাশো-কেই হাইকুর জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। মেইজি সময়ে (১৮৬৮-১৯১২) মাসাউকা শিকি (Masaoka Shiki ১৮৬৭-১৯০২) এই হক্কু-কে ১৮৯২ সালে নামকরণ করেন হাইকু (haiku) যা হলো হাইকাই নো কু (haikai no ku) অর্থাৎ হাইকাই এর পদ্য-চরণের সংক্ষিপ্তরূপ। এভাবেই বিকশিত হয়েছিলো বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ছোট্ট কাব্যফুল হাইকু।    

জাপানে সূচনাকালে একক উল্লম্ব চরণে হাইকু রচিত হতো; কিন্তু ইংরেজিতে একে তিন চরণে লেখা হয়ে থাকে এবং বিচ্ছিন্নকরণটি সাধিত হয় প্রথম বা দ্বিতীয় লাইনের পর। এমনকি সমকালে ইংরেজিতে ১৭ সিলেবলের গণ্ডিকেও অবহেলা করে হাইকু রচনা করা হচ্ছে। খোদ জাপানের কবিরাও বর্তমানে ১৭ মোরা, কিগো বা কিরেজি থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছেন। সারা বিশ্বে ক্রমাগত এর ধরন ও বিষয়বস্তুু নিয়ে চলছে পরীক্ষা-নীরিক্ষা। অনেকে দুই বা চার লাইনেও হাইকু লিখছেন আজকাল। 

হাইকুতে কোন চিত্রকল্পের ব্যবহার হয় না, এতে ব্যক্তিরূপে কোনোকিছু প্রকাশের সুযোগ নেই, হাস্যরস প্রয়োগ করা যাবে না। একে সরলভাবে কোন বিশেষ মুহূর্ত বা ঘটনা বর্তমানকালে প্রকাশ করা হয় এবং এতে আবেগ আরোপ করা যাবে না। 

আজকাল খোদ জাপানি ও সারা বিশ্বের কবিদের মধ্যে নির্ধারিত ব্যাকরণের দেয়াল ভেঙে হাইকু রচনার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এ ধরনের প্রক্রিয়াকে কাব্যের বিকাশ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এতে হাইকুর স্বাদ ও সৌরভের হানি ঘটছে ব্যাপকভাবে।  

 

আশরাফুল মোসাদ্দেক
কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।