দুপুর ০২:১৩ ; রবিবার ;  ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮  

প্রিয় মজুমদার স্যার

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মুহম্মদ মুহসিন || 

আমাদের প্রিয় মজুমদার স্যার ২৮ ডিসেম্বর চলে গেলেন । এই ২৯ জানুয়ারি তিনি পঁচাত্তুরে পা রাখতেন। কিন্তু তার এক মাস আগেই পা রাখলেন আরেক জগতে যেখানে বছর দিয়ে বয়স মাপা যায় না। স্ত্রী জেকিয়া সুলতানার চলে যাওয়ার মাত্র এক বছর এগারো মাস পরে তিনিও প্রিয় স্ত্রীর পথে পা বাড়াবেন এ কথা আমরা ভাবতেও পারিনি। আমরা তাঁর প্রিয় ছাত্ররা, তাঁর ভক্ত পাঠকরা চেয়ে দেখলাম তিনি হাত বাড়ালেন স্ত্রীর দিকে; যাঁর হাত ধরার আকুতিতে তিনি লিখলেন- ‘বড্ড একা হয়ে যাব তুমি চলে গেলে/ কেন যে যেতে হবে কেন যে যেতে হয়/ কী এমন ক্ষতি দুই হাত যদি ধরা থাকে চিরকাল’। 
তিনি চলে গেছেন। রেখে গেছেন আমাদেরকে এবং রেখে গেছেন অনেক কিছুতে অনুসরণীয় তাঁর সাদামাটা জীবনের অনেক কীর্তি ও ঘটনাবলি।

১৯৪০ সালের ২৯ জানুয়ারি তিনি ফেনীতে জন্মগ্রহণ করেন। লেখাপড়া করেন ঢাকা আর্মেনিটোলা গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে এবং ইংল্যান্ডে ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলসে। এছাড়াও তিনি গবেষণা করেন কমনওয়েলথ একাডেমিক স্টাফ ফেলো হিসেবে ইংল্যান্ডের কিংস কলেজে এবং সিনিয়র ফুলব্রাইট রিসার্চ ফেলো হিসেবে ইউএসএ’র ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ফ্লোরিডায়। শিক্ষকতা করেছেন ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে, চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে, চট্টগ্রাম কলেজে এবং জীবনের সিংহভাগ সময় (১৯৭৩ - ২০০৪) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। ২০০৪ সাল থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এন্ড টেকনোলজিতে কলা অনুষদ ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন নিরলস সাহিত্য সাধক।
কবিতা, গান, গল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদ প্রভৃতি শাখায় তিনি কাজ করেছেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- ‘মানুষ শ্বাপদ নয়’; ‘কলহান্তরিতা’; ‘চিঠি দিও’; ‘অনন্তকাল এই জানালায়’; ‘হৃদয় তোমার বিস্ফোরণে’; ‘বৈধ বিলাস’ ও একমাত্র ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ‘Demons and the Flag of Life’। গবেষণামূলক প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘Sir William Jones: The Romantics and the Victorians’; ‘Sir William Jones: A Poetical Study’; ‘Sir William Jones and the East’; ‘Three Essays on Sir William Jones’; ‘স্যার উইলিয়াম জোনস ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ এবং ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার এবং সেক্স বনাম লাবণ্য’। বিচিত্রমুখী লেখার সংগ্রহরূপে রয়েছে তিনটি বই- ‘বিবিধ বিচিত্র’; ‘বিবিধ বিকিরণ’ ও ‘বিচিত্র বিভাস’। ভ্রমণ কাহিনি বাংলায় ‘স্মৃতিসুধার জ্যাকসনভিল’ এবং ইরেজিতে ‘Bangor: A Lingering Glance’। অনুবাদগ্রন্থ: ‘এবারক্রম্বির সাহিত্য সমালোচনা’; ‘টি. এস. এলিয়ট: তত্ত্ব ও কৃতি’ ও হোর্হে লুই বোর্হেসের গল্পগ্রন্থ ‘সাত রাত’। এছাড়া যৌথভাবে আজ আলী মাতুব্বরের রচনা সংগ্রহ বাংলা থেকে ইংরেজি করেছেন The Quest of Truth: Secular Philosophy of Aroj Ali Matubbor নামে। গল্পগ্রন্থ: ‘মূর্ছিত দর্পণে’ ও ‘নিঃশ্বাসের কাছাকাছি’। এর বাইরেও রয়েছে শিশুতোষ গ্রন্থ ও গানের বই। আজকে দুঃখের সাথে বলতে হয় এত সংখ্যক কৃতিত্বপূর্ণ গবেষণা ও সৃজনশীল গ্রন্থের লেখককে আমরা জাতীয়ভাবে তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতিটুকু দেইনি। এ থেকে সেই পুরনো কথাটিই স্মরণ হয়- যে দেশে গুণীর কদর নেই সে দেশে গুণী জন্মায় না।
তবে শিক্ষক হিসেবে আবু তাহের মজুমদারের স্বীকৃতি এবং শিক্ষার্থীদের ভক্তি-শ্রদ্ধার সৌধটি তাঁর সহস্র ভক্ত শিক্ষার্থীর হৃদয়ে অনড় গ্রানাইটের মতো শক্ত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিয়মানুবর্তিতা, একাডেমিক নিষ্ঠা, শিক্ষার্থীর কল্যাণ বিধানে অবিচল ঐকান্তিকতা ইত্যাদি তাঁর প্রায় প্রতিটি শিক্ষার্থী প্রবাদতুল্য জ্ঞান করেন। ২০০৮ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে আবু তাহের মজুমদারের প্রথম জীবনের ছাত্র আমাদের সকলের প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ পর্যন্ত শিক্ষক হিসেবে স্যারের এই গুণগুলোর কথা গর্বের সাথে উচ্চারণ করেন। 
আমি স্যারের শেষ জীবনের ছাত্র। সরাসরি ক্লাসরুমের ছাত্র নই, তাঁর তত্ত্বাবধানে পিএইচডি গবেষণার ছাত্র। তিনি আমার পিএইচডি’র কো-সুপারভাইজার ছিলেন। পিএইচডি গবেষক হিসেবে আমি তাঁর যতোটুকু সান্নিধ্য পেয়েছি ক্লাসরুমের ছাত্ররা স্বাভাবিকভাবে অতটুকু পায় না। ফলে স্যারকে নিয়ে আমার অনুভব অন্য অনেকের চেয়েই একটু বেশি গভীর, একটু বেশি কাছের। আমি যেটুকু লিখতে শিখেছি তার সবটুকুই প্রায় তাঁর কাছে শিখেছি, তাঁর কাছেই আমি সবচেয়ে আপন শিক্ষক-সান্নিধ্য পেয়েছি। আমি জানি, তাঁর মতো এতবার ফোন করে আমার খবর জীবনে আর কোনো শিক্ষক নিবেন না, এত কাছে জীবনে আর কোনো শিক্ষক টানবেন না। থিসিস জমাদানের দিন তাঁর বিইউবিটির ক্যাম্পাসে গেলাম থিসিসে স্বাক্ষর করানোর জন্য। তাঁর স্বাক্ষর নিয়ে জাহাঙ্গীরনগরে যাবো। স্বাক্ষর দিলেন, কাছে টেনে আলিঙ্গন করলেন এবং বললেন- ‘আমি যে ক্যাবটি নিয়ে সাভার থেকে আসি সেটি আজ তোমার জন্য রেখে দিয়েছি, এতগুলো থিসিস-কপি নিয়ে তুমি পাবলিক পরিবহণে যেতে পারবে না। তুমি ওটিতেই জাহাঙ্গীরনগর যাবে’। শুনে আনন্দে আমার চোখে পানি এসে গেল। জীবনে কোনোদিন শুনিনি কোনো সুপারভাইজার নিজে গাড়ি করে তাঁর ছাত্রকে এভাবে থিসিস জমা দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে দিয়েছেন। ওপারেও যেন স্নেহময় স্যারের সান্নিধ্য পাই- এটুকুই প্রার্থনা।           
   

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।