সকাল ০৯:২৮ ; রবিবার ;  ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯  

'এমন কিছু করবেন না যাতে আমাকে আত্মহত্যা করতে হয়'

ভারত থেকে ৪৮ বাংলাদেশি নারী উদ্ধার

প্রকাশিত:

তৌহিদ জামান, যশোর॥

বিয়ের পর ১০ বছর পার হয়েছে হোসনে আরার (ছদ্মনাম)। কিন্তু সংসারে আসেনি নতুন মুখ। স্বামীর সাথে এই নিয়ে ঝগড়া-ফ্যাসাদ লেগেই থাকত তার।

এমন এক যন্ত্রণাদায়ক সময়ে বাড়ি ছাড়েন তিনি। সেলাইয়ের কাজ জানতেন। ফলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে, যন্ত্রণাহীন জীবন সাজাতে রাজধানীমুখো হন। শ্যামলীতে এনাম গার্মেন্টসে একটা চাকরিও জুটিয়ে নেন। কর্মক্ষেত্রে সুমী নামে একজনের সাথে বন্ধুত্ব হয়। সুমী তাকে বলে-- গার্মেন্টসে যদি কাজই করতে হয় তবে ভারতে গিয়ে করাই ভালো। সেখানে মাসশেষে বেতন আসবে ১০ হাজার রুপি। খেয়েদেয়ে প্রতিবছর বেশ ভালো একটা সঞ্চয় হবে। দেশে ফিরে তখন জমানো টাকায় কিছু একটা করা যাবে।

বন্ধু সুমীর এই ধরনের কথাবার্তায় বিশ্বাস আনেন হোসনে আরা। এরপর একদিন সুমী ঢাকা থেকে তাকে যশোরের বেনাপোল সীমান্তে নিয়ে আসে। সেখানে একজনের বাসায় রেখে পরদিন দালালের মাধ্যমে মোটরসাইকেলে করে ভারতে পাঠিয়ে দেয়া হয় তাকে। এরপর কখনো বাসে, কখনো ট্রেনে চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় মুম্বাইয়ে। সেখানে রাজু নামে এক বাংলাদেশি যুবকের জিম্মায় দেয়া হয় হোসনে আরাকে।

হোসনে আরার জবানিতে জানা যায়, রাজুর বাড়িতে আরও কয়েকজন মেয়ে ছিল। মেয়েদের দেখে প্রথমে ভালো লাগছিল তার। ‘যাক, আমি একা নই! আরও কয়েকজন মেয়ে আছে।’ --বলেন তিনি।

গার্মেন্টসে কাজ দেয়া হয়নি তাকে। তাকেসহ অন্য মেয়েদের দিয়ে পতিতাবৃত্তি করাতো রাজু। রাজি না হওয়ায় খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করাসহ তাদের ওপর নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন।

একদিকে মারধর, অন্যদিকে না খাওয়ার যন্ত্রণা --তার ওপর বিদেশবিভূঁই। সবমিলিয়ে মেয়েরা বাধ্য হয়েই নেমে পড়ে দেহব্যবসায়! এই বাড়ি থেকে গাড়িতে করে তাকেসহ অন্যদের ভিন্ন ভিন্ন হোটেল বা বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হতো। কখনো, এক রাত কখনো বা সপ্তাহখানেকের জন্যে। প্রতিরাতে তাদেরকে এক বা ততোধিক পুরুষের শয্যাসঙ্গী হতে হয়েছে। সেক্ষেত্রে তাদের ক্লায়েন্টদেরও গুণতে হত মোটা অংকের টাকা। অথচ, সেই টাকার কোনও অংশই জোটেনি তাদের কপালে।

যেখানেই তিনি যান না কেন-- বাইরে পাহারায় থাকতো ষণ্ডামার্কা লোকজন। সবসময় নজরে নজরে রাখত তাদের। বাইরে বের হওয়ার কোনও সুযোগই ছিল না। যোগাযোগের কোনও ব্যবস্থাও নেই। প্রায় আড়াই মাস এভাবে প্রত্যহ শরীর বিকিকিনি করতে হয়েছে তাকে।

তিনি জানান, ২০১৩ সালের জানুয়ারির শেষে ভারতে যান। এপ্রিলের শেষে একদিন রুমের ভেতর সোনালী নামে এক মেয়েকে প্রচুর মারধর করে রাজু। মেয়েটি কোনও কায়দায় দৌঁড়ে ঘরের ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন। এ ঘটনায় সেখানে অনেক মানুষ জড়ো হয়। পুলিশ এসে রাজুকে আটক ও তাদের উদ্ধার করে। পরে পুলিশ আদালতে পাঠালে সেখানে তারা সবকিছু খুলে বলেন।

কোর্ট থেকে রেসকিউ ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থার জিম্মায় তাদের দেওয়া হয়। এই সংস্থার শেল্টার হোমে প্রায় ঊনিশ মাস ছিলেন তিনি। সংস্থাটি তাদের স্বাবলম্বী করতে টেইলারিংসহ ডায়মন্ড-জরির কাজ শেখায়।

এরপর গত ডিসেম্বরের ১৫ তারিখে মুম্বাই থেকে তাদের ৪৮ জনকে বাংলাদেশে ফেরত আনা হয়। যশোর সদরের বাসিন্দা হোসনে আরার বাবা একজন সামান্য গাড়িচালক। স্বামী স্বচ্ছল একজন ব্যবসায়ী। এখন স্বামীগৃহে ফেরার কোনও অবস্থা আর অবশিষ্ট নেই।

কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘দেশের বাইরে কোনও পুরুষ গেলে তাদের কোনও সমস্যা হয় না। কিন্তু, কোনও মেয়ে যদি যায়-- তবে আর নিস্তার নেই।' অপরদিকে, তার স্বামীও বলে বেড়াচ্ছে-- সে টাকা পয়সা চুরি করে পালিয়ে গেছে পরপুরুষের হাত ধরে।

এ প্রতিবেদককে তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের কাছে বিনীত অনুরোধ-- এমন কিছু করবেন না যেন আমাকে আত্মহত্যা করতে হয়'।

শুধু হোসনে আরা নন। গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর দেশের বিভিন্ন জেলার ৪৮ নারীকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সবাই দেশের বিভিন্ন গার্মেন্টসে কাজ করেছেন। বেশি টাকা রোজগারের প্রলোভনে পরিচিত বা অপরিচিত মাধ্যমে তারা ভারত পাড়ি জমান। এদের বেশিরভাগই সেখানে বাধ্য হয়েছেন যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করতে। সেখানে মদের বার, হোটেল, বাসাবাড়িতে ভিন্ন ভাষাভাষীদের সাথে সময় কাটাতে হয়েছে। সহ্য করতে হয়েছে নানা নির্যাতন।

খুলনার এক মেয়ে বলেন, 'মুম্বাইতে বাংলাদেশের অসংখ্য মেয়ে খারাপ কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। সেখানে অনেক বিল্ডিং আছে, যেখানে মেয়েদের রেখে খারাপ কাজ করানো হয়। রুমের ভেতর গোপন কুঠুরিতে রেখেও মেয়েদের মারধর করে আটকে রাখা হয়। সেখানে কেউ তাদের খুঁজে পায় না।'

এক প্রশ্নের জবাবে ফিরে আসা আরেক মেয়ে জানান, বাংলাদেশের ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সী অনেক মেয়েকেই এভাবে পাচার করা হয়েছে। সেখানে তাদের দিয়ে জোর করে খারাপ কাজ করানো হয়। অনেককে বিউটি পার্লারে কাজ দেয়া হয়। কিন্তু তার আড়ালেও দালালরা তাদের এই পেশায় নামায়।

প্রথমদিকে রাজি না হলেও পরে বাধ্য হয়ে অনেকে এ কাজে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এমন হয় যে তারা আর দেশে ফিরতে চান না।

তবে এদের মধ্যে বিভিন্ন ঘটনায় উদ্ধার পাওয়ারা রেসকিউ ফাউন্ডেশনে রয়েছে। সঠিক ঠিকানা বলতে না পারায় অনেকের দেশে ফেরা হচ্ছে না। ১৪ বছর বয়সী এক মেয়ে রয়েছে সাভারের নবীনগর এলাকার। তার নাম ঠিকানা সঠিকভাবে না জানানোয় ওখানেই রয়েছে সে।

রেসকিউ ফাউন্ডেশনের সুপারিন্টেন্ডেন্ট লীনা জাবেদ জানান, তাদের তিনটি শেল্টার হোম বৈশার, কান্দিভেলি এবং পুনেতে যথাক্রমে ৬২, ২৭ এবং ৩৭ জন বাংলাদেশি নারী ও শিশু রয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারি নাগাদ তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেবার প্রক্রিয়া চলছে।

রাইটস যশোরের প্রোগ্রাম অফিসার শাওলী সুলতানা জানান, রাইটস যশোর ২০১৪ সালে মোট ২০৬ জন পাচারের শিকার ভিকটিমকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে। যার মধ্যে ইরাক থেকে ৯৩ জন পুরুষ, থাইল্যান্ড থেকে ১৫ জন পুরুষ, লেবানন ও জর্ডান থেকে একজন করে পুরুষ এবং ভারত থেকে ৯৬ জন নারী-শিশু রয়েছে।

সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, 'উদ্ধার হওয়া নারী-শিশুদের জীবনদক্ষতা প্রশিক্ষণ, আইনগত সহায়তা, পরিবারের কাছে হস্তান্তর এবং প্রয়োজনবোধে তাদের আর্থিক সহযোগিতা করা হবে।

/এমবিআর/একে/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।