সকাল ১০:১৬ ; রবিবার ;  ২১ এপ্রিল, ২০১৯  

সিরিয়াসলি কমেডিয়ান

নাভীদ মাহবুব

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মাহাবুব রাহমান।।

একবার পুলিশের এক সার্জেন্ট নাভীদ মাহবুবকে রাস্তায় আটকালেন। মোটর সাইকেলের কাগজপত্র চেক করে নিকটবর্তী পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে গেলেন। আশপাশে উপস্থিত সমস্ত পুলিশ সদস্যকে ডেকে আনলেন। তারপর নাভীদ মাহবুবকে ধরলেন: ভাই কয়েকদিন যাবত আমার মনটা খুব খারাপ, আমাদের একটু হাসায়া যান।

নাভীদ মাহবুব ড্রয়িংরুমে একের পর এক এরকম মজার মজার গল্প শুনিয়ে যাচ্ছিলেন আর আমি দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা মাংস কাঠি দিয়ে বের করতে করতে শুনে যাচ্ছি। তার সাথে সাক্ষাতের সময় দিয়েছিলেন বিকাল ৩টায়, তার বাসায়। বাংলা ট্রিবিউন থেকে রওয়ানা দিয়েছি দুপুর ১টায়। গুলশান ২-এ তার বাসার সামনে আরিরাং রেস্টুরেন্টের পাশে যখন নামলাম মোবাইলে সময় তখন ২টা ৪০মিনিট। ক্ষুধায় পেট চোঁ-চোঁ। ভাবছি, রেস্টুরেন্টে ঢুকব নাকি নাভীদ ভাইর বাসায় ঢুকব। আমার নামের শুরু এবং তার নামের শেষ মাহবুব দিয়ে। কবির ভাষায়, আমার হলো শুরু তোমার হলো সারা (আসলে 'তোমার হল শুরু আমার হল সারা') । যাহোক, নামের সূত্রেই নাভীদ মাহবুব আমার ভাই– যাকে বলা যায় 'নামতুতো' ভাই।

লিফট ডিঙিয়ে ৩য় তলায় পদচরণ রাখি। চক্ষু মেলিয়া দেখি চার দিকে ইয়া বড় বড় ডেকচি, তৈজসপত্রের স্তূপ। হায় আল্লাহ, এ কোন ফখরুদ্দিনের (রন্ধনশিল্পী ফখরুদ্দিন, অন্য কেউ নয়) রাজ্যে এসে পড়লাম। ঠিক জায়গায় আসলাম তো? দোনামোনা করতে করতে প্রায় ৫ মিনিট হাতছাড়া হলো। আর দেরি করা ঠিক হবে না।

পোলারয়েড ক্যামেরার আদি মডেল হাতে নাভীদ মাহবুব। আলোকচিত্র: সাজ্জাদ হোসেন।

একজন কমেডিয়ান হলেও নাভীদ মাহবুবের ঠেলা আছে। আইবিএম, নকিয়া সিমেন্স কোম্পানির বাংলাদেশের সিইও ছিলেন। এধরনের লোকজন সাধারণত সময় নিয়ে হেলাফেলা একদম বরদাশত করেন না। তাই ২টা ৫৯ মিনিটেই তার কলিংবেলের সুইচে স্পর্শাঘাত করলাম। আর ১ মিনিট আগেও নয় পরেও নয় ঠিক ৩টায় তার বাসায় ঢুকে পড়লাম।

আমাকে দেখেই তিনি বললেন: “আসেন আসেন ভাই, গতকাল থেকে বাসায় ফখরুদ্দিনের বিরিয়ানি পইড়া আছে। আসেন উদ্ধার করি।” তিনি কমেডি করছেন নাকি সিরিয়াসলি বলছেন বুঝতে পারলাম না। বোঝার কথাও নয়। কারণ তার ভঙ্গিটাই এমন। তিনি যখন কমেডি করেন, মনে হয় সিরিয়াস কিছুই বোধহয় বলছেন।

নাভীদ মাহবুব সম্পর্কে প্রায় এ ধরনেরই কথা বলছিলেন মীরাক্কেলের অন্যতম বিচারক রনি। ২০১২ সালের ৫ জুন মীরাক্কেলের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে তাকে ডাকা হয়। তার কমেডি শুনে রনি বলেন, মিক্সডআপ, বাইল্যাঙ্গুয়াল প্যার্টানে একটা আন্তর্জাতিক ছাপ দিলেন। … মনে হয় না যে আপনি আলাদা করে কমেডি করছেন। কথা বলার মতো করেই... একটা বৈঠকি চাল রয়েছে, আমার কোনো বন্ধু আমার সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।

যাহোক, খেতে যখন রাজি হচ্ছিলাম না তখন তিনি বললেন আসেন খেতে খেতেই আলাপ সেরে নিই। ভাবলাম, সুন্দর প্রস্তাব। একসাথে খাওয়া দাওয়ায় আন্তরিকতা তৈরি হয়। কথাবার্তায়ও যার ছাপ পড়ে। দুদিন আগেই 'সামাজিক বন্ধু' শাহাদাৎ তৈয়বের বিয়ের দাওয়াত খেতে গেলাম। সবার হাতভর্তি উপহার। আমিই শুধু খালি হাতে। চামে পেয়ে এক বন্ধুর স্ত্রী বলল: সেকি মাহাবুব, বিয়ে খেতে আসলা, কি নিয়ে এসেছ। আমি তখন পকেট থেকে দাঁত খোঁচানোর কাঠি বের করে দেখালাম। বন্ধুপত্নীর তো আক্কেলগুড়ুম! কিন্তু খাবার পর শেষ হতেই দেখি সবাই আমার কাছে এসে কাঠি চায়। বাঙালির দন্তসচেতনতায় আমি খুশি হয়ে একটি কাঠি পকেটে নিয়েই নাভীদ ভাইর বাসায় ঢুকলাম।

আগেই বলেছি, নাভীদ মাহবুব আইবিএম, নকিয়া সিমেন্সের বাংলাদেশ প্রধান ছিলেন। বুয়েট থেকে অনার্স করে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছেন মাস্টার্স করতে। মার্কিন মুল্লুকে ২০ বছর চাকরিবাকরিও করেছেন। আমাদের এখানে যেমন টিকেট কেটে মানুষ নাটক সিনেমা দেখে, সে দেশে নাটক-সিনেমা ছাড়াও টিকেট কেটে মানুষ স্ট্যান্ডআপ কমেডি দেখে। অর্থাৎ নাটক-সিনেমার মতো স্ট্যান্ডআপ কমেডিও সেখানে বেশ জনপ্রিয়। মানুষ পানির বোতল, ডিম, টমেটো সাথে করে নিয়ে যায় একটু হাসতে। কমেডি ভালো না হলে সেগুলো ছুঁড়ে মারবে।

মাস্টার্স পড়ার সময়ই নাভীদ মাহবুবও একদিন স্ট্যান্ডআপ কমেডি দেখতে যান। দেখে তার শুধু কৌতুক নয়, কৌতূহলও জন্মাল। শো'র শেষে তিনি গিয়ে কমেডিয়ানের সাথে আলাপ জমালেন। জানলেন, স্যান্ডি শোর নামে এক বিখ্যাত কমেডিয়ান স্ট্যান্ডআপ কমেডি বিষয়ে ট্রেনিং দেন। নাভীদ মাহবুবও ২মাস তার কাছ থেকে তালিম নিলেন।

জগতের আনন্দযজ্ঞে নাভীদ। আলোকচিত্র: সাজ্জাদ হোসেন।

২০০৭ সালে লাসভেগাস কমেডি ফ্যাস্টিভ্যালে বিভিন্ন দেশের ১৭০জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে। নাভীদ মাহবুব শ্রেষ্ঠ পুরুষ কমেডিয়ান নির্বাচিত হন। ফলে তার দায়িত্ব বেড়ে গেল। ভাবলেন, কমেডিটাকে আরেকটু সিরিয়াসলি নেয়া যায়। কিন্তু তাই বলে এতটা সিরিয়াস! চাকরি-বাকরি ছেড়ে দিলেন প্রবাসেই শুরু করে দিলেন কমেডি শো। আর তাতে ঢোলের বাড়ি দিলেন স্ত্রী জারা জেবিন মাহবুব।

এরপর দেশে এসে খুললেন নাভীদ'স কমেডি ক্লাব। এটি দেশের প্রথম স্ট্যান্ডআপ কমেডি ক্লাব। অর্থাৎ নাভীদ মাহবুবের হাত ধরেই বাংলাদেশে স্ট্যান্ডআপ কমেডির সূচনা। এই ক্লাবে আছেন ১৪জন কমেডিয়ান। এরা সবাই উচ্চশিক্ষিত এবং হাই প্রোফাইল। যেমন মোশাররফ ইয়াফি একটি মোবাইল কোম্পানির উর্ধ্বতন কর্মকতা, সোলায়মান একটি প্রতিষ্ঠানের হেড অফ মার্কেটিং, ইয়ামিন ব্যাংকার ছিলেন, একজন কমেডিয়ান পাইলট, একজন ডাক্তার এবং দুজন আইনজীবী। এসব কমেডিয়ানের মধ্যে ৩-৪ জন বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই পারফর্ম করেন, বাকিরা কেবল বাংলায়। প্রতিমাসে একটা শো ইংরেজিতে করা হয়। এই শো-তে বিদেশিরাই বেশি আসে। আর বাংলা শোগুলোতে সাধারণত অবস্থাপন্ন পরিবারের সদস্যরাই আসেন।

নাভীদ মাহবুবের কমেডির মধ্যে উইট, স্যাটায়ার প্রভৃতি সাহিত্যিক গুণাগুণও বিদ্যমান। কমেডির মাধ্যমে অবলীলায় তিনি সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরেন। একবার আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিয়ে তিনি কমেডি করছেন, সেখানে দুদলেরই নেতৃত্বস্থানীয় লোকজন ছিলেন। তারা একই সাথে হাসলেন। তা দেখে নাভীদ তাদের বললেন, আপনারা যদি একই সাথে হাসতে পারেন তবে একই সাথে দেশের জন্যও কাজ করতে পারবেন।

নাভীদ মাহবুব কেবল কমেডিই করেন না। অনেক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে উদ্বুদ্ধকরণ বক্তৃতাও (motivation speech) প্রদান করেন। কিন্তু একজন কমেডিয়ান হিসেবেই তিনি এসব বক্তৃতা প্রদান করেন। যেমন, একটি সিমেন্ট কোম্পানির সেফটি ট্রে‌‌‌নিংয়ে নাভীদ মাহবুবকে ডাকা হলো। এর আগে যতবার প্রতিষ্ঠানটি ত‌‌‌ার কর্মীদের সেফটি ট্রেনিং দেয়, দেখা যায় ট্রেনিংয়ের বিরক্তিকর কথাবার্তা শুনতে শুনতে কর্মীরা ঘুমিয়ে পড়ে আর কারখানাতে ঠিকই দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে। নাভীদ মাহবুব হাস্যরসের মাধ্যমেই পুরো ট্রেনিংটি সম্পন্ন করলেন। এর ফলাফলও ছিল নাকি বেশ ভালো। এরকম তিনি ইউএনআইডিএস-এর এইডস সচেতনতা ক্যাম্পেইন করেছেন। হাসপাতালে গিয়ে ক্যানসার রোগীদের আনন্দ দিয়েছেন।

বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করার কারণে তার মোটিভেশন স্পিচ শ্রোতারা বেশ গুরুত্বের সাথেই গ্রহণ করেন। তিনি যখন কর্পোরেট কোনো বিষয় নিয়ে হাসিঠাট্টা করেন তখন মানুষ বলে, ও কিন্তু শুধু কমেডিয়ানই নয়; কর্পোরেট কোম্পানির সিইও-ও ছিল। সুতরাং বিষয়টা সিরিয়াসলি নিতে হবে। ফলে বিষয়টা তারা মনোযোগ দিয়ে শুনে। তার মানে বিনোদনও হচ্ছে আবার কাজের কাজও হচ্ছে। শো-এর পরে অনেকে এসেই বলে, আজকে কিন্তু আমি আপনার কাছ থেকে এই জিনিসটা শিখলাম। আজকে থেকে আমি অনেক চাঙ্গা হয়ে গেলাম।

নাভীদ মাহবুবের এতসব অর্জনের মধ্যে তিনি নাকি রাঁধেনও ভালো। কথায় আছে যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। নাভীদ মাহবুবের চুল বাঁধার উপায় নাই। তিনি আর্মি ছাটের মতো ছোট ছোট করে চুল কাটান। তবে চুল বাঁধার অবসর সময়টা তিনি পুষিয়ে নেন তবলা, পিয়ানো বাজিয়ে। ছোটকাল থেকেই তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বেশ তৎপর। এমনকি তবলা বাজানো প্রতিভা দিয়ে বিয়েটা পর্যন্ত সেরে ফেলেছেন। অবশ্য শুধু তবলা বাজানো নয়, চেহারাও ছিল তার বিয়ের অন্যতম সম্বল। সুদর্শন চেহারার নাভীদ মাহবুব ৩-৪টি বিজ্ঞাপনেরও মডেল হয়েছেন। ৫-৬টি টেলিভিশনে নিয়মিত উপস্থাপনা করেন। এমনকি হলিউডের দুটি সিনেমায় অভিনয়ও করেছেন।

আমি কিন্তু রাঁধতেও পারি। আলোকচিত্র: সাজ্জাদ হোসেন।

: এতসব অর্জনের মধ্যে আপনার জীবনের সেরা অর্জন কী?
: অবশ্যই কমেডি। নাভীদ মাহবুবের প্রত্যয়ী উত্তর।

কমেডির মাধ্যমেই তিনি মানুষের খুব কাছাকাছি এসেছেন। নিজের দেশ, সংস্কৃতি, বিশ্বাসকে খুব সহজেই তুলে ধরতে পে‌‌‌রেছেন অন্যান্যা জনগোষ্ঠীর কাছে। নয় এগারোর* পরের ঘটনা। নাভিদ মাহবুব আমেরিকায় কমেডি শো-তে পারফর্ম করছেন। শো শেষে একজন আমেরিকান এসে তাকে বলল: “আমি মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্য, ইরাকে দুই বছর যুদ্ধরত ছিলাম, ওখান থেকে এসেছি মাত্র। আমি ওখানে দুবছর থেকেও তোমাদের ধর্ম সম্পর্কে যা না জেনেছি তোমার এই ১০ মিনিটের কমেডি থেকে কিন্তু অনেক বেশি জেনে গেলাম। তোমরা আসলে শান্তিপ্রিয় মানুষ, দুয়েকটা সন্ত্রাসীর জন্য তোমাদের বদনাম হয়ে যাচ্ছে।”

আরেক দিনের ঘটনা। রোজার মাস, আসর নামাজের পরের সময়। নাভীদ মাহবুব কাতারের রাজধানী দোহারের রাস্তা ধরে হাঁটছেন। সেখানে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। তারা নাভীদকে দেখে চিল্লাফাল্লা করে উঠলেন: আরে নাভীদ ভাই, নাভীদ ভাই। শ্রমিকদের মধ্যে হইচই লেগে গেল। তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছে তারা: চলেন আমাদের সাথে আপনার ইফতারি করতে হবে। নাভীদ জিজ্ঞাসা করলেন: আমাকে আপনারা চিনেন কেমনে?

: আরে আমরা তো আপনার শো ফরজের মতো দেখি।
: আমার শো আপনারা দেখেন! (নাভীদ মাহবুব কনফিউজড) আমার শো আপনারা কেন দেখেন।
: আমাদের খুব ভালো লাগে। আমরা কিছু বুঝি না তবুও আমাদের ভালো লাগে। আপনে যা বলেন তা মন থেকে বলেন– এটাই আমাদের ভালো লাগে। আর আপনার মধ্যে কোনো অভিনয় নাই। আপনার কথা আমাদের একেবারে দেশে টেনে নিয়ে যায়।

নাভীদ মাহবুবের অভিজ্ঞতার শেষ নাই, গল্পেরও শেষ নাই। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতা ও গল্প থেকে আমাদের প্রতি তার বার্তা একটাই: মানুষের জন্য কাজ করাটাই জীবনের বড় অর্জন। এবছরই (২০১৪) নাভীদ মাহবুবের Humorously Yours নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত প্রকৌশলী প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী নাভীদ মাহবুবের অর্জন সম্পর্কে বলেন, আমরা এক সময় বলতাম তুমি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কি করলা। আর এখন আমরা বলি তুমি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে মানুষ হিসেবে কী করলা। নাভীদ আমাদের বুয়েটের গর্ব।

একনজরে নাভীদ মাহবুব

ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট: http://www.naveedmahbub.com/
নাভীদ'স কমেডি ক্লাবের ফেসবুক পেইজ: https://www.facebook.com/NaveedsComedyClub
হলিউডে অভিনীত সিনেমা: You Don’t Mess with Zohan, The Ugly Truth

/এমবিআর/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।