সকাল ০৮:৫৩ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮  

জফির সেতুর কবিতা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[জফির সেতুর জন্ম ১৯৭১ সালের ২১ ডিসেম্বর, সিলেট জেলার কোম্পানিগঞ্জের এক অখ্যাত গ্রাম ফেদার গাঁওয়ে। তিনি একাধারে কবি, গল্পকার ও গবেষক। সিলেটি উপভাষার সমাজভাষাবৈজ্ঞানিক গবেষণা করে ২০০৯ সালে লাভ করেন পি-এইচ. ডি. ডিগ্রি। শিক্ষকতা করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৫। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ বহুবর্ণ রক্তবীজ (২০০৪), স্যানাটোরিয়াম (২০০৮), তাঁবুর নিচে দূতাবাস (২০১১), সিন্ধুদ্রাবিড়ের ঘোটকী (২০১২), সুতো দিয়ে বানানো সূর্যেরা (২০১৪), Turtle Has No Wings (২০১৪), ডুমুরের গোপন ইশারা (২০১৪), বাবেলের চূড়া (২০১৩), লোকপুরাণের বিনির্মাণ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (২০১১) ও সিলেটি বিয়ের গীত(২০১৩) প্রভৃতি। তিনি সম্পাদনা করেন গোষ্ঠীপত্রিকা কথাপরম্পরা ও লিটলম্যাগ সুরমস। এখানে তার একটি নতুন কবিতা ও একটি প্রকাশিত কবিতা সমালোচনাসহ প্রকাশ করা হলো।]

 

নতুন কবিতা

 

ইনান্না

ইনান্না : ফসলের দেবী। আসলে এক আর্দ্র নারী।
উর্বর শস্যভূমিতে শুয়ে গাইত রোপিত বীজের গান।
ইনান্না আমার বোন। জন্ম, দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূখণ্ডে
মেসোপটেমিয়ায়। সারাক্ষণ অপেক্ষমান গাছের নিচে
আর্তকণ্ঠ তার, ‘আমাকে বাগানে যেতে দাও, সেখানেই
রয়েছে আমার হৃদয়পুরুষ।’ 
ইনান্না ছিল আকাঙ্ক্ষায় উন্মুখ ফলবতী মাটি।
আসলে আমাদের কৃষ্ণা দ্রৌপদী
আসলে আমাদের তপ্তকাঞ্চন সীতা
আসলে সে লাজে নম্র কম্প্রবক্ষ সুজাতাই
আর ওই যে হৃদয়পুরুষ দেবতা এনকি
শিলায় উৎকীর্ণ যার মুখ, সে আমিই। আমার বিবর্ণ ছায়া।
মন্দিরগাত্রে যুগলমিলনের রক্ত ও আনন্দ লেগে আছে।

 

প্রকাশিত কবিতা

 

ময়ূর উজানে ভাসো-৪৫

ভেবো না তোমাকে সাপ ভেবেছি
যদিও পৃথিবীর সব রমণীয় বিষধর সাপ। তাদের উজ্জ্বল
ত্বকের নিচে দিব্যরতির বদলে ঘননীল মৃত্যুর সুষমা
চন্দ্রাহত রাতে দংশনে কুঁকড়ে যেতে যেতে আমি প্রত্যক্ষ করেছি
কিন্তু তোমার বাদামি চামড়ার নিচে মানুষ মানুষ গন্ধ
আর বর্ষার নদীর স্ফীত গর্ভাশয়ে একটি ভাঁটফুলের
তীব্র আলোড়ন নিয়ে যদি কখনও তোমার সঙ্গে শুই
আর তোমার কণ্ঠার হাড় স্পর্শ করি
আর তোমার ফিনফিনে জামাকে নির্মোক মনে হয়
আর তোমার শীর থেকে সাপের গন্ধ বেরিয়ে আসে
আর তোমার জিহ্বার লিকলিকে আগুন আমাকে ভস্ম করে
আর আমি যদি তখন চিৎকার করতে করতে পালাতে থাকি
তুমি অবাক হয়ো না, একটুও অবাক হয়ো না। 


প্রকাশিত কবিতার আলোচনা

 

পরম রমণীয় আগুনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব                   
তুষার প্রসূন

প্রথমেই হোঁচট খেতে হয়, ‘ময়ূর উজানে ভাসো’ কবিতাটি কি কবির চোখে দেখা কোনো রমণীর বায়োডাটা, না-কি এটা কোনো রমণীয় মোহমাখা মায়া? দীর্ঘদিন শব্দের সাথে চলাফেরা, চিন্তার সাথে ঘোরাফেরা থাকলেই একজন কবি তার শরীরের দাগগুলো তুলে দেন কবিতার খাতায় আর সেই দাগগুলোই একদিন কবিতা হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের শ্যেনদৃষ্টির বদৌলতে, তীক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে কে এমন স্থীর সিদ্ধান্তে এসে বলতে পারে ‘পৃথিবীর সব রমণীরা বিষধর সাপ’? এমন একটি রহস্যাবৃত কথাকে কবিতায় রূপান্তরিত করে জীবনের সব তাপ তিনি ঢেলে ফেলে নিরুত্তাপ থাকেন। খুব সন্তর্পনে এগিয়ে যান উপসংসারের দিকে মুখ করে। 

সৃষ্টির আদি থেকে চলে আসা মানবজাতির মধ্যে একটি বিশেষ অংশ রমণী যা আমাদের সকল অস্তিত্ব দখল করে আছে, যাদেরকে অস্বীকার করলে সমগ্র মানবজাতি মুখ থুবড়ে পড়বে মুহূর্তে। কবিরা যুগ যুগ ধরে নারীর বন্দনা করে চলেছেন। কেউ নারীকে বলছেন রাণী কেউ বলছেন দেবী, কেউ সিংহাসন ছাড়ছেন কেউ বা করছেন আত্মহত্যা এই নারীর-ই জন্যে, অথচ কবি জফির সেতু, যদিও তিনি নারীজাতিকে অস্বীকার করেননি কিন্তু দৃঢ়তার সাথে শিকার করেছেন শব্দবাণে। নারীকে মানা কিংবা অবমাননা তিনি যা-ই করেন না কেনো হৃদয়উৎসারিত সকল শব্দতরঙ্গই তার কবিতার অনুষঙ্গ হয়ে ধরা দিয়েছে। রমণীর দেহকোষ থেকে শুরু করে রক্ত অশ্রু হাড়ের কোলাজে তিনি দেখেছেন কেবলমাত্র একটি ছোবল যা একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য সাপের চিত্রকল্প হয়ে মনের মধ্যে শোভা পেয়েছে।

সাবলিল উপস্থাপনার বদলে ইদার্নিং কবিতা বেশ জটিল হয়ে চোখের মণিতে জ্বালা ধরাচ্ছে কিন্তু জফির সেতু তার কবিতার মধ্যে উত্তরাধুনিকতার পারফিউম স্প্রে করে একটি সাবলিল কবিতা উপস্থাপন করেছেন। সরল চোখে দেখা সাধারণ বিষয়গুলো সবাই অনুভব করতে পারে কিন্তু অতিসূক্ষ্ম বিষয়ের বস্তু অনুভব করাতে পারেন ক’জন? বলছি না কবিতাটি শিল্পোত্তীর্ণ হয়ে ত্রিসীমানা ছাড়িয়ে গ্যাছে। কবিতার শেষের দিকে দু’তিন লাইন তেমন কাজে আসেনি, কেন না সেখানে একঘেয়েমি বিরাজ করেছে। তবে অকপটে বলতে হয় কবিতাটি শেষ না করা পর্যন্ত পাঠক মুক্তি পাবে না। 
পৃথিবীতে প্রেম বলে যা কিছু আছে তা অপ্রেমের মৃত্যুকূপ থেকেই তুলে নিতে হয়। যেখানে সাপের গন্ধ, যেখানে জিহ্বার লিকলিকে আগুন কবি সেখানে যাবেন কেনো? নিশ্চয়ই সেখানে জন্ম-মৃত্যু একসাথে খেলা করে। খুব আলতোভাবে জফির সেতু প্রকাশ করেছেন ‘মৃত্যুকে নিয়ে খেলা করে জন্ম’ তাই তিনি সত্যের পতাকা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন ‘তোমার বাদামি চামড়ার নিচে মানুষ মানুষ গন্ধ’। না নারী না ঈশ্বর, না সাপ না মণি তবে কি রূপসচেতন মরীচিকা? এমন অপ্রচলিত চিন্তার কবিতা প্রচলিত কবিতার পাশে পড়ে থাকে ভিন্নমতাদর্শের কারণে। বিষয়বস্তু, প্রকরণ ও উপস্থাপনার ভিন্নতায় একটি স্বতন্ত্ররেখা দূর থেকে বহুদিন দেখা যাবে বলে মনে আশা পুশে রাখি। বিশ্বায়নের যুগে কষ্টকর জীবনযাপনের ছায়া আমাদের সাহিত্যে এসে প্রকট ধরা দিচ্ছে, ‘ময়ূর উজানে ভাসো’ কবিতাটি তারই প্রমাণবাহিত।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।