বিকাল ০৫:০০ ; মঙ্গলবার ;  ২১ মে, ২০১৯  

ব্যাগভর্তি টাকায় পকেট পুরে শপিং!

প্রকাশিত:

হিটলার এ. হালিম॥

অল্পকিছু ডলার পকেটে পুরে ভিয়েতনামগামী বিমানে চড়ে বসলাম। অনেকবার দেশের বাইরে গিয়েছি কিন্তু এতো কম ডলার নিয়ে কখনোই কোথাও যাইনি। সারাটা পথ মনের ওপর ভর করে থাকল দুঃখ। অাকাশ পথ ফুরায়, আমার দুঃখ বাড়ে।

তবে অামার দুঃখ ভুলিয়ে দিল ভিয়েতনাম। জানলাম, ভিয়েতনামে ডলারের অনেক দাম। দুম করে দুঃখ উধাও। কম ডলার নিয়ে গেছি তাতে কি! ভিয়েতনামে তো সেটা কম নয়! অনেক।

ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে পৌঁছে ডলার ভাঙানোর পর দুঃখ উবে গেল। মার্কিন মুলুকের ১০০ টাকা (ডলার) ভাঙিয়ে অামি হয়ে গেলাম লাখপতি। মানি এক্সচেঞ্জের মেয়েটা আমাকে একগাদা নোট (ভিয়েতনামিজ মুদ্রা ডং) দিল। মনে মনে একটা আকর্ণ বিস্তৃত হাসি দিয়ে ফেললাম। এতো টাকা (আসলে ডং, লেখার সুবিধার জন্য এরপর থেকে টাকাই লিখব) মানিব্যাগে আঁটে না। ১০০ ডলারের বিনিময়ে পেলাম ২১ লাখ ২১ হাজার ২০০ ডং। এর মধ্যে দেখি ৫ লাখ ডংয়ের একটা নোটও আছে।

কিছু টাকা মানিব্যাগের রেখে বাকি টাকা (ডং) ব্যাকপ্যাকে রেখে দিলাম। মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। হাজার টাকা ভাঙিয়ে লাখপতি হলে মনের ভেতর তো ফুরফুরে একটা হাওয়া বইবেই।

খুশি খুশি ভাব বেশিক্ষণ থাকল না। তখনও আমরা হোটেলে উঠিনি। লাঞ্চ করেই তবে উঠব। সারারাতের ভ্রমণের ধকল তারপর এখন বাজে দুপুর ১২টা। পিপাসা মেটানোর জন্য রেস্টুরেন্টের বাইরের একটা দোকান থেকে কোকের ক্যান কিনেই মুখের ওপর উপুড় করে গলায় ঢেলে দিলাম। দারুন সোয়াদ। অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো ওয়াও!

তরল গলা দিয়ে তখনও পেটে নেমে পারেনি। দোকানিকে কত দাম জিজ্ঞেস করতেই বোর্ডে লেখার দিকে তাকাতে বলল। দাম দেখে তরল কোক আর নিচের দিকে নামতে চায় না! মনে হয় এখনই গলা দিয়ে বেরিয়ে আসবে।

দাম ৭৫ হাজার ডং। বাংলাদেশী টাকায় ২৮৩ টাকার মতো। বলে কী! ঘাম ঝরানো ঠাণ্ডা ক্যান হাতে নিয়ে মনে হলো নিজেই ঘামছি।

বাকি কোকটুকু বিস্বাদ লাগল। যারা অামার দেখাদেখি কোক বা ফান্টা নিয়েছিল তাদেরও একই অবস্থা। লাখপতি হয়েও মনে হলো বেহিসেবী হওয়া যাবে না। বাকি পথটুকু সাবধানে পা ফেলতে হবে মানে খরচ করতে হবে।

এখনও দেশে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে কথা হয়নি। জানানোও হয়নি হ্যানয়ে (স্থানীয় ভাষায় হা নোই) পৌঁছেছি। মনটা আঁকু-পাঁকু করছে। মোবাইলের সিম কেনার দরকার। সিমের দাম শুনে তো চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। বলে কি! দাম ১০ লাখ ডং। প্রায় ৫০ ডলারের মতো। কলরেট শুনে নেতানোও মুড়ির মতো আমরাও মিইয়ে গেলাম। প্রতি মিনিট ৩০ টাকা। কোন দেশে এলাম রে বাবা!

এই যখন মনের অবস্থা তখন মনে পড়ল হোটেলের কথা। আগেই জানা হয়ে গিয়েছিল হোটেলের (হোটেল লোটে, রুম নম্বর ৪৫০৮, ৪৬ তলায়) যে ঘরটায় থাকব সেটা ওয়াই-ফাই করা। নিকুচি করি তোর সিম কেনা। স্কাইপে, ভাইবার আছে না!

ওয়াই-ফাইয়ে যুক্ত হলে আনলিমিটেড কথা বলার সুযোগ মিলবে। এছাড়া যোগাযোগের আরেক মাধ্যম ফেসবুকও ভিয়েতনামে অন। ফলে কোনও সমস্যাকে আর সমস্যা বলে মনে হলো না। কেবল খচখচানিটা রয়ে গেল কোক খেয়ে। মনে হচ্ছে এখনও গলার কাছটায় দলা পাকিয়ে রয়েছে।

দুপুরের খাবার খাওয়া হলো কুয়ান আন নিউন নামের একটি রেস্তরাঁয়। এটা হ্যানয়ের একটি ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ। দেখতে অভিজাত কিন্তু কেমন যেন পুরনো পুরনো এক ধরনের আঁশটে গন্ধ পাওয়া যায়। জানা গেল, প্রতি বেলায় এখানে ২ হাজার লোক খাবার খায়।


 

অামাদের ২০ জনের খাবারের দাম দাম মেটানো হলো ৬ মিলিয়ন বা ৬০ লাখ ডং। একেক জনের ভাগে পড়ল লাখ তিনেকের মতো। অ্যাসোসিও কর্তৃপক্ষ দাম মিটিয়ে দিল। কি খেলাম কে জানে! পেটের কিছু অংশ খালিই থাকল। সমস্যা হলো নাম না জানা খাবার (কাঁকড়া, স্কুইড, জেলিফিশ, কাচাবাঁশের আইটেমের অাধিক্য বেশি)। ভাত মিলল বটে তবে বেশ আঠালো। খেতে হবে স্টিক বা কাঠি দিয়ে। কোন মতে শাক-লতাপাতা দিয়ে ভাত জড়িয়ে নুন ছাড়া সিদ্ধ চিংড়ি মাছ দিয়ে মাখিয়ে কাঠি সহযোগে উদরস্থ করা হলো বটে কিন্তু তৃপ্তি পাওয়া গেল না। তবে এদের খাবার পরিবেশনটা দেখার মতো। ওটা দেখেই পেট ভরে গেল।

ভিয়েতনামে ভাষা আরেকটা সমস্যা। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায়ও ভাষার সমস্যা হয়, তবে এতোটা নয়। একদমই কথা (ইংরেজি) বোঝে না ভিয়েতনামিজরা। ইশারা ইঙ্গিতে বলেও বেশি দূর এগোনো যায় না। মোট জনসংখ্যার ৭২ শতাংশ কৃষিজীবী বলেই কি না কে জানে। আমাদের দেশও কৃষি প্রধান দেশ। মনে হলো শহর ঢাকার রিকশাঅলারাও ওদের চেয়ে স্মার্ট। অন্তত জায়গার নাম বললে বোঝে, ডলারও চেনে অনেকে।

দোকানে গিয়ে বেশ মুশকিলে পড়া গেলো, কয়েকবারই ঘটল এমনতরো ঘটনা। ওরা দাম বললে আমরা বুঝি না। আমরা বললে ওরা বোঝে না। ভরসা হয়ে দেখা দিল ওদের হাতের ক্যালকুলেটর। কোন কিছুর দাম জানতে চাইলে ওরা কালকুলেটরের বোতাম চেপে চেপে যে দাম দেখায় তা হিসাব করে টাকা বা ডলারে কনভার্ট করা আরেক মুশকিলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সব কিনা লাখ লাখ টাকা থুক্কু ডংয়ের হিসাব।

শহরের রেড ব্রিজ লেকের পাশে ওল্ড কোয়ার্টার। যা টুরিস্ট বাজার হিসেবেও পরিচিত। কাজের ফাঁকে এক বিকেলে যাওয়া হলো ওখানে। বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা গিজগিজ করছে। দোকানগুলোর ভেতরে ঢোকা দায়। অামরা পছন্দসহ একটা দোকানের সামনে দাঁড়াই। ভেতরে টুপি, শাল, টি-শার্ট, মাথাল (গ্রাম দেশে কৃষকরা রোদ থেকে বাঁচতে বাশ-এবং তালপাতার তৈরি যে বিশেষ টুপি মাথায় পরে) দেখা যাচ্ছে। ভেতরটা একটু খালি হতেই অামরা ভেতরে ঢুঁ মারলাম।

জিনিসপত্র যেন অাগুন, হাত দেওয়া যায় না। এতো দাম! কি বলব বুঝে পাচ্ছি না। এক মার্কিন দম্পতিকে দেখলাম দরদাম করতে। অামরাও সুযোগটা নিলাম। 

চলবে... 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।