সকাল ১০:১৪ ; সোমবার ;  ২২ জুলাই, ২০১৯  

মাও থেংগারিতে যা অাছে...

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

চাকমা ভাষায়ও বাংলাদেশে ছবি বানানো শুরু হয়েছে। এ ভাষায় নির্মিত প্রথম ছবি ‘আমার সাইকেল’ (মাই বাইসাইকেল)। অার চাকমা ভাষায় এর নাম ‘মাও থেংগারি’। কবি সুফিয়া কামাল গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে উদ্বোধনী প্রদর্শনী দেখে সম্ভাবনার নতুন এ দুয়ার নিয়ে রিভিউ লিখেছেন-অামিনুল ইসলাম

'আমার সাইকেল' এ চলচ্চিত্র সম্পর্কে কিছু বলার আগেই পরিচালক অং রাখাইন, প্রযোজক মা নান খিং ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘পাণ্ডুলিপি কারখানা’কে সাধুবাদ জানাই। বিশেষ করে পরিচালকের নির্মাণশৈলী, বুদ্ধিমত্তা ও ধৈর্যের প্রশংসা করতেই হবে।

চলচ্চিত্রটির শ্যুটিং হয়েছে রাঙামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য এলাকায়। ছবিটির শুরু ও শেষ একই জায়গায়, নদীতে। তবে শুরু ও শেষের সময়টার প্রেক্ষাপট পুরোপুরি বিপরীতমুখী। যা ক্যামেরায় খুব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। শুরুতে ছিল শহর থেকে প্রত্যাগত আশাবাদী এক যুবক যে প্রিয়জনের কাছে থেকে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছে। শেষে দেখতে পাই, জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে চলে যাওয়ায় হতাশাগ্রস্ত আরেক যুবক। মাঝখানে প্রায় একঘণ্টার দৃশ্যায়ন। যেখানে নানা ঘটনার চিত্রায়ণ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রধান চরিত্র কামাল চন্দ্র বহন করেছেন অনেকগুলো রূপ। যে সমগ্র পাবর্ত্য এলাকার সাধারণ, নিরীহ ও সৎ মানুষের প্রতিচ্ছবি। সে স্ত্রী দেবী ও সন্তান দেবুকে নিয়ে দুবেলা দুমুঠো ভাত খেতে পেলেই সুখী। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যার কোনও অভিযোগ নেই। ছয় মাসের বকেয়াসহ শহুরে চাকরি হারিয়ে কামাল সাইকেল চালিয়ে মানুষ ও মালামাল পাহাড়ি বাজারে আনা-নেওয়ার কাজ করে জীবিকা নির্বাহের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু এ সামান্য চাওয়াতেও বাধ সাধে কিছুসংখ্যক মানুষ। যারা সব সমাজেই মানুষের অনিষ্ট করে বেড়ায়। এর মাধ্যমেই ফুটে উঠেছে পার্বত্য এলাকার মানুষের জীবনচিত্র।

কামাল চন্দ্র চরিত্রে অভিনয় করেছেন কমল মানি চাকমা। তিনি তার সংগ্রামী জীবনচিত্রকে অভিনয়, সংলাপ ও শারীরিক অভিব্যক্তির মাধ্যমে খুবই সহজ, সাবলীল ও বিশ্বাসযোগ্য আকারে তুলে ধরেছেন। কখনও মনে হয়নি, এ চরিত্রে তিনি অভিনয় করছেন।

কামালের স্ত্রী দেবী গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। খুব সহজ, সাধারণ গৃহিণী। স্বামী-সন্তানের খাবার তৈরি, গৃহসজ্জা, সার্বিকভাবে গৃহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কামাল ও দেবী চরিত্রের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যেমন ওঠে এসেছে, তেমনি একজন সাধারণ নারীর চাওয়া-পাওয়া, আশা-হতাশা, সুখ-শান্তিও দেখতে পাই। ছবিটির প্রদর্শনের সময় দর্শক দুবার খুব জোরে তালি দেয়। দুটি দৃশ্যেই দেবীর সরব উপস্থাপনা ছিল।

সিনেমাটোগ্রাফি অসাধারণ। এজন্য চিত্রগাহক কুশলী সাইয়েদ কাশেফ শাহবাজীকে ধন্যবাদ। পাশাপাশি খুব সাধারণ একটি গল্পের চিত্রনাট্যও হয়েছে চমৎকার। এজন্য গল্পকার অং রাখাইন ও চিত্রনাট্য রচয়িতা নাসিফুল ওয়ালিদেরও প্রশংসা করা যৌক্তিক। সেখানে আলোর ব্যবহার ছিল নান্দনিক। ভোর থেকে সন্ধ্যা ও গভীর রাত- এরকম বিভিন্ন সময়কে ক্যামেরায় জীবন্ত করা হয়েছে।

দৃশ্যায়নে শুধু আলো নয়, আবহ সংগীতও পরিবেশ-পরিস্থিতিকে তুলে ধরতে সহায়তা করেছে। এক্ষেত্রে আবহ সংগীত পরিকল্পনায় রতন পাল, সংগীত আয়োজনে অর্জুন ও শিল্পনির্দেশক মিজানুর রহমান বিপ্লবের নামটিও উল্লেখ করতে হয়। তাদেরও প্রশংসা প্রাপ্য।

যেকোনও সিনেমার সম্পাদনা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রায়ই শুধু সম্পাদনার দুর্বলতার কারণে কোনও চলচ্চিত্রের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যেতে যেভাবে বা যে প্রক্রিয়ায় সম্পাদনা দরকার, সে প্রক্রিয়ায় গভীর মনোযোগ ও ধৈর্য দরকার। এ প্রক্রিয়ায় শামসুল আরেফিন সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন।

৬৩ মিনিটের এ চলচ্চিত্রে কোনও বাহুল্য ছিল না। দর্শককে ধরে রাখার জন্য কোনও আলাদা উপকরণও ছিল না। তথাকথিত বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রের মতো নাচে-গানে ভরপুর কোনও দৃশ্য ছিল না। তবু এটিকে বিকল্পধারা বলে কাল্পনিক গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে চাই না। কিন্তু দর্শক পুরোটা সময়ই পিনপতন নীরবতায় ছবিটি উপভোগ করেছেন। এতে স্যাটায়ার ও কমেডির মেলবন্ধন লক্ষ করেছি। কিন্তু এর চাইতেও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে পাবর্ত্য এলাকার মানুষের জীবনসংগ্রাম।

সমালোচনা লিখতে গেলে খুঁত বের করা নাকি জরুরি। অথচ এখানে সেরকম সুযোগ নেই। তাছাড়া এটি পরিচালকের প্রথম পেশাদার চলচ্চিত্র। তাই খুঁত তুলে ধরে পরিচালককে নিরুৎসাহিত করতেও চাই না।

এ চলচ্চিত্রে অন্তত তিনবার আদিবাসীদের স্থানীয় রীতিতে ধূমপান করতে দেখা গেছে। আরেকবার তরুণদের মদ্যপানের সময়ও ধূমপান করতে দেখা গেছে। আধুনিক বিশ্বে এমনকি পাশ্ববর্তী ভারতেও এখন এসব দৃশ্য সতর্কতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়। ধূমপানের দৃশ্য বাংলাদেশে বিদ্যমান (ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার [নিয়ন্ত্রণ] আইন ২০০৫) অনুযায়ী নিষিদ্ধ। বাংলাদেশের সেন্সর বোর্ড সদস্যরা ছবিটি দেখার সময় ঘুমিয়ে ছিলেন কিনা, এটা একটা প্রশ্ন হতে পারে। কারণ ধূমপানের দৃশ্য যদি দেখানোও হয়, তবে সেক্ষেত্রেও আইন মেনে প্রদর্শন বাঞ্ছনীয়।

আবারও সাধুবাদ জানাই, চাকমা ভাষায় নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট সবাইকে। আশা করি, আগামী দিনে রাষ্ট্র আদিবাসীদের ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণসহ তাদের সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

 

/এমজে/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।